02/03/2024
“অহংকার তাঁর চাঁদর এবং বড়ত্ব তাঁর লুঙ্গী’
এর ব্যাখ্যা
প্রশ্ন:
হাদিসের অর্থ: (অহংকার তাঁর চাঁদর এবং সম্মান তাঁর লুঙ্গী) আল্লাহ তা‘আলার কি চাদর এবং লুঙ্গী রয়েছে?
উত্তর:
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য;
আবূ সাঈদ খুদরী ও আবূ হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। তাঁরা বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, শ্রেষ্ঠত্ব তাঁর (আল্লাহর) লুঙ্গী এবং অহংকার তাঁর চাঁদর। যে ব্যক্তি এই ব্যাপারে আমার সঙ্গে ঝগড়ায় অবতীর্ণ হবে আমি তাকে অবশ্যই শাস্তি দিব। [মুসলিম: ২৬২০]
আবূ হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেছেন: “অহংকার আমার চাদর এবং বড়ত্ব আমার লুঙ্গী” সুতরাং যে ব্যক্তি এর কোন একটি নিয়ে আমার সাথে কাড়াকাড়ি করবে তাকে আমি জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। [আবু দাউদ: ৪০৯০]
সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার সিফাত তথা গুণ হল: অহংকার ও বড়ত্ব।
আর, চাদর এবং লুঙ্গী তাঁর সিফাত নয় বরং এটা দ্বারা উদ্দেশ্য যে তিনি উক্ত বড়ত্ব ও অহংকারের গুণে গুণান্বিত। কোনো ব্যক্তি যেন এর একটি নিয়ে তাঁর সঙ্গে ঝগড়ায় অবতীর্ণ না হয়। যেমনিভাবে লুঙ্গি এবং জামা উভয়টি পোষাকের জন্য নির্দিষ্ট, যার ব্যাপারে কেউ বিতর্ক করে না।
এছাড়াও, কিবরিয়া তথা অহংকার একটি পর্দা যা আল্লাহ সুবহানাহূ ওয়া তা‘আলাকে দেখতে বাধা দেয়, ঠিক যেমনিভাবে পোশাক বাধা দেয় তা দেখা থেকে যা চাদরে দিয়ে আবৃত রাখা হয়।
অনুরূপ ইমাম মুসলিম রহিমাহুল্লাহ তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, যা আবু বকর ইবন আব্দুল্লাহ ইবন কায়স হতে বর্ণিত, তিনি বলেন; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (জান্নাতে) দুটি উদ্যান থাকবে। এই দুটির সকল পাত্র এবং এর অভ্যন্তরের সকল বস্তু রূপার তৈরি হবে। (জান্নাতে) আরও দুটি উদ্যান থাকবে। এই দুটির সকল পাত্র এবং এর অভ্যন্তরের সকল বস্তু সোনার তৈরি হবে। জান্নাতে-আদনের মধ্যে জান্নাতবাসীরা তাদের রবকে দেখবে। জান্নাতবাসী এবং তাদের রবের এই দর্শনের মাঝে আল্লাহ তা‘আলার চেহারার উপর অহংকার তথা বড়ত্বের চাদর ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। [মুসলিম: ১৮০]
এ বিষয়ে বিভিন্ন আহলে ইলম তথা জ্ঞানীদের কিছু বাণী;
১। ইমাম খাত্তাবী রহিমাহুল্লাহ বলেন; উক্ত কথা দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয় যে, “অহংকার ও বড়ত্ব” আল্লাহ তা‘আলার সিফাত। যা একমাত্র তাঁর জন্যই নির্দিষ্ট। সুতরাং উক্ত গুণ-দুটিকে গ্রহণ করা কোনো মাখলুকের জন্য কখনোই উচিত না। কারণ মাখলুকের গুণ হল বিনয়, নম্রতা অবলম্বন করা এবং আল্লাহর কাছে অবনত হওয়া।
(হাদিসে কুদসিতে) আল্লাহ তা‘আলা উদাহরণ পেশ করতে গিয়ে পোষাকের কথা উল্লেখ করেছেন এ জন্য যে, মানুষ যেমন তার লুঙ্গি, জামার সাথে কাউকে শরীক করে না। তেমনি তাঁর গুণাবলীর সাথে কোন মাখলুকের শরীক নেই। আল্লাহু আ‘লাম
২। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন; ফখরুদ্দীন আর-রাযী (আল্লাহর গুণ সাব্যস্ত করার ওপর আপত্তি করে) বলেছেন: নবম কারণ হচ্ছে, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “অহংকার আমার চাদর এবং ইয্যত সম্মান আমার লুঙ্গী”। আর জ্ঞানী ব্যক্তি কখনো আল্লাহর জন্য চাদর এবং লুঙ্গী সাব্যস্ত করতে পারে না।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ উত্তরে বলেন, তাকে বলা হবে যে, উক্ত হাদিসটি বিশুদ্ধ যা ইমাম মুসলিম রহিমাহুল্লাহ তাঁর গ্রন্থে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেছেন: “অহংকার আমার চাদর এবং বড়ত্ব আমার লুঙ্গী। সুতরাং যে এর কোনো একটি নিয়ে আমার সাথে কাড়াকাড়ি করবে তাকে আমি শাস্তি দিব।”
বস্তুত উক্ত হাদিস দ্বারা এটা বুঝায় না যে, আল্লাহ তা‘আলার জন্য লুঙ্গী এবং চাদর রয়েছে যেমনটা মানুষ পরিধান করে থাকে, যা কিনা চামড়া, তুলা বা সুতা নির্মিত। বরং উক্ত হাদিসই স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে, মানুষের পরিধেয় বস্ত্রের মত তাঁর চাদর বা লুঙ্গী নয়।
কেননা, যদি কোনো মানুষ বলে, ‘অহংকার আমার চাদর, ইয্যত আমার লুঙ্গী’; তাহলে তার কথা দ্বারা অন্য মানুষ এটাই বুঝবে যে, লোকটি তার গৌরব এবং ইজ্জতের জানান দিচ্ছে। তার ঐ চাদর এবং লুঙ্গী চামড়া, তুলা বা সুতা নির্মিত নয়। বরং গৌরব এবং ইয্যতই হলো তার চাদর এবং লুঙ্গী। এটাই এ লোকের বক্তব্যের সঠিক ও প্রকাশ্য অর্থ।
তাই যখন উক্ত বাতিল অর্থটি মানুষের গুণ হিসেবেও সে ব্যক্তির দিকে সম্পৃক্ত করা যায় না (এ কারণে যে শব্দের বিন্যাস তা করতে বাধা দেয়, বরং শব্দের বিন্যাস, পূর্বাপর বর্ণনা সেটির সঠিক অর্থ প্রকাশ করে) তখন কীভাবে এটা দাবী করা যাবে যে, উক্ত বাতিল অর্থটি শব্দের প্রকাশ্য অর্থ হিসেবে আল্লাহ তা‘আলার শানে প্রয়োগ হবে?? অথচ প্রতিটি মানুষ তথা যাদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে তারা জানে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাপড় পরিহিত আল্লাহ তা‘আলা সম্পর্কে জানান দেননি। যা কিনা গরম, শীত বা লজ্জাস্থান ঢাকার জন্য প্রয়োজন হয়ে থাকে।
এ ধরনের দাবী ঐ কথা থেকেও নিকৃষ্ট, যারা দাবি করে যে “খালিদ ইবন ওয়ালীদ রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু আল্লাহ তা‘আলার তরবারীর মধ্য থেকে একটা তরবারী, যা আল্লাহ তা‘আলা কোষমুক্ত করেছেন মুশরিকদের ওপর” এর যাহের বা প্রকাশ্য অর্থ হচ্ছে, খালিদ ইবন ওলীদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু লোহার তৈরী!
অনুরূপ; তাদের এ দাবী এ কথা থেকেও মন্দ, যাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আবু ত্বালহার ) ঘোড়ার ব্যাপারে বলেছেন, “ঘোড়াটি তো দেখছি সমুদ্রবৎ” এখানে শব্দের যাহের বা প্রকাশ্য অর্থ, ঘোড়ার মধ্যে অনেক পানি রয়েছে। এমন বহু উদাহরণ রয়েছে!!
সুতরাং এটি স্পষ্ট হলো যে, বাতিল অর্থ কখনো হাদীসের প্রকাশ্য অর্থ হতে পারে না। বরং হাদীসের ভাষ্য স্বয়ং বাতিল অর্থ গ্রহণকে নিষেধ করে।.. অবশেষে ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘অহংকার ও বড়ত্ব’ এ দু’টি কেবল রাব্বুল আলামীন এর জন্যই উপযোগী, যিনি পালনকারী, স্রষ্টা, উদ্ভাবক, অভাবমুক্ত, অমুখাপেক্ষী, সর্বসত্তার রক্ষক। এ গুণ দু’টি বান্দা, সৃষ্ট, অভাবী, মুখাপেক্ষী কারও জন্য প্রযোজ্য হতে পারে না।
আর তাঁর অহংকার গুণটা তাঁর মহত্ব গুণের চেয়ে বড়, যেমনিভাবে তিনি অহঙ্কারকে চাদর আর মহত্বকে লুঙ্গী বলে ব্যক্ত করেছেন।
এ দু’টি [অহংকার ও বড়ত্ব] গুণ আল্লাহ তা‘আলা ব্যতিত অন্য কারো জন্য উপযোগী নয়। সুতরাং উক্ত গুণ দু’টি ছাড়া তাঁর সত্তার অস্তিত্ব অসম্ভব, এমনভাবে যে, যদি তাঁর সত্তাকে ঐ দু’টি গুণ শুন্য স্থির করা হয় তবে আল্লাহ তা‘আলার সত্তায় ভয়াবহ নিষিদ্ধ দোষ-ত্রুটি, কমতি আপতিত হওয়া আবশ্যক হয়ে যাবে। সুতরাং এ দু’টি গুণ তাঁর সত্তার জন্য এমনিভাবে আবশ্যক এবং তাঁর সত্তার পূর্ণতার জন্য এতই বাঞ্ছনীয় যে, কোনোভাবেই সত্তাকে তা থেকে মুক্ত কিংবা শূণ্য করা যাবে না। যেমনিভাবে কোনো ব্যক্তি যদি কাপড় থেকে মুক্ত হয়ে যায় তবে অবস্থা অনুযায়ী তার ওপর দোষ-ত্রুটি ও অপূর্ণতা অর্জিত হবে; যা বাধ্য করে যে, তার একটি পোষাক থাকবে।
তাছাড়া, কাপড় সাধারণত পরিধানকারীর ভিতর দেখা এবং স্পর্শ করা হতে অপরকে বাধা দেয়। আল্লাহ তা‘আলার অহংকার ও বড়ত্ব বান্দা কর্তৃক তাকে চাক্ষুষভাবে আয়ত্ব করা ও অনুরূপ কিছু থেকে বাধা প্রদান করে। এমনটিই বিশুদ্ধ হাদিসে এসেছে, যা ইমাম মুসলিম রহিমাহুল্লাহ আবু মুসা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণনা করেন; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন; জান্নাতুল ফিরদাউস হলো চারটি: “দু’টি হবে স্বর্ণের: এ দু’টির সকল ভূষণ, পাত্র এবং এর ভিতরে সকল বস্তু স্বর্ণের (তৈরী হবে)। এবং আরো দু’টি থাকবে রূপার: এ দু’টির সকল ভূষণ, পাত্র এবং ভিতরের সকল বস্তু (রৌপ্য নির্মিত হবে)। জান্নাতু আদনে এর অধিবাসী এবং তাদের প্রতিপালকের দর্শনের মাঝে আল্লাহর তা‘আলার চেহারার ওপর তাঁর (কিবরিয়া) অহংকারের চাদর ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।
আর এটাই সে আড়ালকারী চাদর, যা তিনি তাদের (জান্নাতীদের) জন্য উন্মোচন করে দিবেন অতঃপর তারা তাঁর দিকে তাকাবে। এজন্য তিনি অহংকারের চাদর নামে নামকরণ করেছেন। তাহলে সেটার ব্যাপারে কী ধারণা, যা তাঁকে আয়ত্ব ও পূর্ণরূপে ধারণ করতে বাধা প্রদান করে??! এটাই কি অহংকার গুণে হওয়ার বেশি যোগ্য নয়?
ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটি (ফাতাওয়া আল-লাজনাহ্ আদ-দা’ইমাহ)’র ফতোয়ায় এসেছে:
প্রশ্ন; আবু হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদিস, যা ইমাম মুসলিম রহিমাহুল্লাহ’র নিকট মারফু‘ সূত্রে এসেছে, “অহংকার আমার চাদর, বড়ত্ব আমার লুঙ্গী, সুতরাং যে ব্যক্তি এর কোন একটি নিয়ে আমার সাথে কাড়াকাড়ি করবে তাকে আমি জাহান্নামে নিক্ষেপ করব”।
তাহলে কীভাবে আমাদের জন্য এই হাদিসটি বুঝা উচিত হবে? স্বাভাবিকভাবে আল্লাহ তা‘আলার দিকে “লুঙ্গী এবং চাদর” সম্বন্ধ করা বৈধ হবে, নাকি ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন?
উত্তর: ইমাম খাত্তাবী রহিমাহুল্লাহ তাঁর ব্যাখ্যা গ্রন্থ সুনানে আবী দাউদে বলেছেন; হাদিসের অর্থ; অবশ্যই “অহংকার ও বড়ত্ব” আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলার দু’টি গুণ যা একান্তই তাঁর নিজস্ব, কারো সাথে গুণ দু’টির অংশিদারিত্ব নেই। উক্ত গুণ-দুটিকে গ্রহণ করা কোনো মাখলুকের জন্য কখনোই উচিত না। কারণ মাখলুকের গুণ হল বিনয়, নম্রতা অবলম্বন ও অবনত হওয়া। এটা বুঝানোর জন্যই “লুঙ্গী এবং চাদরের” উদাহরণ দিয়েছেন এ জন্য যে, মানুষ যেমন তার লুঙ্গি, জামার সাথে কাউকে শরীক করে না। অনুরূপ অহংকার ও বড়ত্বে আমার সাথে কোনো মাখুলুকের শরীক নেই। আল্লাহু আ‘লাম।
আল্লাহ তা‘আলার নিকটই একমাত্র তাওফিক, সলাত ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর পরিবার ও সকল সাহাবীদের উপর।
ইলমী গবেষণা ও ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটি;
বকর আবু যায়েদ... সালিহ‘ আল-ফাওযান... ‘আব্দুল্লাহ ইবন গুদাইয়্যান... ‘আব্দুল আযীয আ’ল আশ-শাইখ...‘ আব্দুল আযীয ইবন ‘আব্দুল্লাহ ইবন বায।
অনুরূপভাবে, আশ-শাইখ ‘আব্দুল মুহসিন আল-‘আব্বাদ’ হাফিযাহুল্লাহ’র নিকট প্রশ্ন করা হলো;
“হাদিসে কুদসী’তে এসেছে”; “বড়ত্ব আমার লুঙ্গী এবং অহংকার আমার চাদর”, লুঙ্গী এবং চাদর আল্লাহ তা‘আলার গুণ সাব্যস্তের জন্য এই হাদিস দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে?
অত:পর তিনি উত্তরে বলেন;
না,,.. এটা প্রমাণ করে না যে, লুঙ্গী এবং চাদর আল্লাহ তা‘আলার গুণ। বরং এ দুটি দ্বারা অহংকার এবং বড়ত্ব গুণ আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট হওয়াকে শক্তিশালী করে। অর্থাৎ; উদাহরণস্বরূপ মানুষ লুঙ্গী এবং চাদর ব্যবহার করে, আর আল্লাহ ত‘আলা “অহংকার ও বড়ত্ব” গুণে গুণান্বিত এবং এই দু’টি গুণই তাঁর চাদর এবং লুঙ্গী। কিন্তু এটা বলা যাবে না যে, চাদর এবং লুঙ্গী আল্লাহ তা‘আলার সিফাত তথা গুণের মধ্য থেকে দু’টি গুণ। বরং বলা হবে, “বড়ত্ব ও অহংকার” তাঁর ‘লুঙ্গী’ ও ‘চাদর’।
আর এটি আনসারদের সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন তারই অনুরূপ; তিনি বলেছিলেন, “আনসারগণ হচ্ছে (নবীর) ভিতরের পোশাক (যে পোষাক শরীরের সাথে লেগে থাকে) আর অন্যান্য লোক হচ্ছে উপরের পোশাক” , যার অর্থ; তাঁরা ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’এর অধিক নিকটতম। তাঁরা তাঁর আনুগত্যে এমন ভাবে লেগে থাকত যেমনটা ভিতরের পোষাক শরীরের সাথে লেগে থাকে। আর সাধারণ মানুষ যারা তার পিছে থাকত তাদের উপমা হলো কাপড়ের মত।
সুতরাং এখানে শুধুমাত্র সাদৃশ্যই উদ্দেশ্য, এটা উদ্দেশ্য নয় যে, আল্লাহ তা‘আলার লুঙ্গী ও চাদর রয়েছে যা তাঁর সিফাত বা গুণ। “অহংকার ও বড়ত্ব” আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলার দু’টি গুণ যা একান্তই তাঁর নিজস্ব, কারো সাথে গুণ দু’টির অংশিদারিত্ব নেই। তাই একথা বলা কখনোই জায়েয হবে না যে, লুঙ্গী ও চাদর তাঁর সিফাত।
পরিশেষে, উপরোক্ত আলোচনার ফলে এটাই বুঝতে পারি যে, অহংকার ও বড়ত্ব একমাত্র তাঁরই মহান দু’টি গুণ, সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা। কোনো মানুষের জন্য কখনোই বৈধ হবে না একথা বলা যে, তিনি উক্ত গুণ দু’টিতে পরবর্তীতে সম্পৃক্ত হয়েছেন, যা কিনা আগে ছিল না।
বস্তুত উক্ত হাদিসে আলোচিত শব্দ “লুঙ্গী এবং চাদর” দুটিকে তাঁর জন্য “অহঙ্কার” ও “বড়ত্ব” গুণাবলী দু’টি বিশেষভাবে নির্দিষ্টকরণের জন্য নিয়ে আসা হয়েছে। আরো নিয়ে আসা হয়েছে এটা বুঝানোর জন্য যে, অহংকারের চাদর তাঁকে দেখা হতে বাধা হয়ে আছে।
আল্লাহ তা‘আলা ভাল জানেন।
-------------------------------
1. মা‘আলিমুস সুনান: ৪/১৯৬
2. বরং এটি বাতিল অর্থ বলে পরিগণিত হবে। কারণ প্রকাশ্য অর্থ নির্ধারিত হয় শব্দের ব্যবহার বিধি, অগ্র-পশ্চাত বিবেচনায়।
3. আনাস ইবনে মালেক রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, একদা মদীনায় (বিকট শব্দ হলে) ভীতিকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু তালহা রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুর মানদূৰ নামের ঘোড়াটি ধার নিয়ে তাতে চড়ে সেদিকে গেলেন। অতঃপর ফিরে এসে বলেন, তেমন কিছু তো দেখলাম না। আর ঘোড়াটি তো দেখছি সমুদ্রবৎ (দ্রুতগামী)। [বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ]
4.অর্থাৎ এটি তখন বাতিল অর্থ হবে, যাহির বা প্রকাশ্য অর্থ নয়।
5.বায়ানু তালবীছিল জাহমীয়্যাহ্ [৬/২৭০-২৭৭]
6. ফাতাওয়া আল-লাজনাহ [২/৩৯৯]
7. আবদুল্লাহ ইবনু যাইদ ইবনু আসিম রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুনাইনের দিবসে আল্লাহ যখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে গনীমতের সম্পদ দান করলেন তখন তিনি ঐগুলো সেসব মানুষের মধ্যে বন্টন করে দিলেন যাদের হৃদয়কে ঈমানের উপর সুদৃঢ় করার প্রয়োজন তিনি অনুভব করেছিলেন। আর আনসারগণকে কিছুই দিলেন না। ফলে তারা যেন নাখোশ হয়ে গেলেন। কেননা অন্যেরা যা পেয়েছে তারা তা পাননি। অথবা তিনি বলেছেন, তাঁরা যেন দুঃখিত হয়ে গেলেন। কেননা অন্যেরা যা পেয়েছে তারা তা পাননি। কাজেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন, হে আনসারগণ! আমি কি আমাদেরকে পথভ্রষ্ট পাইনি, অতঃপর আল্লাহ আমার দ্বারা আমাদেরকে হিদায়াত দান করেছেন? তোমরা ছিলে পরস্পর বিচ্ছিন্ন, অতঃপর আল্লাহ আমার মাধ্যমে আমাদের পরস্পরকে জুড়ে দিয়েছেন। তোমরা ছিলে দরিদ্র, অতঃপর আল্লাহ আমার মাধ্যমে আমাদেরকে অভাবমুক্ত করেছেন। এভাবে যখনই তিনি কোন কথা বলেছেন তখন আনসারগণ জবাবে বলেছেন, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই আমাদের উপর অধিক ইহসানকারী।
তিনি বললেন, আল্লাহর রসূলের জবাব দিতে আমাদেরকে বাধা দিচ্ছে কিসে? তারা তখনও তিনি যা কিছু বলছেন তার উত্তরে বলে যাচ্ছেন, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই আমাদের উপর অধিক ইহসানকারী। তিনি বললেন, তোমরা ইচ্ছে করলে বলতে পার যে, আপনি আমাদের কাছে এমন এমন (সংকটময়) সময়ে এসেছিলেন কিন্তু তোমরা কি এ কথায় সন্তুষ্ট নও যে, অন্যান্য লোক বকরী ও উট নিয়ে ফিরে যাবে আর তোমরা তোমাদের বাড়ি ফিরে যাবে আল্লাহর নবীকে সাথে নিয়ে। যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাকে হিজরত করানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত না থাকত তা হলে আমি আনসারদের মধ্যকারই একজন থাকতাম। যদি লোকজন কোনো উপত্যকা ও গিরিপথ দিয়ে চলে তা হলে আমি আনসারদের উপত্যকা ও গিরিপথ দিয়েই চলব। আনসারগণ হচ্ছে (আমার) ভিতরের পোশাক আর অন্যান্য লোক হচ্ছে উপরের পোশাক। আমার বিদায়ের পর অচিরেই তোমরা দেখতে পাবে অন্যদের অগ্রাধিকার। তখন ধৈর্য ধারণ করবে (দীনের উপর টিকে থাকবে) যে পর্যন্ত না তোমরা হাউজে কাউসারে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করছ। [৭২৪৫; মুসলিম ১২/৪৬, হাঃ ১০৬১, আহমাদ ১৬৪৭০]
তথ্য অনুবাদ: শাইখ খালিদ আব্দুল্লাহ আল-মাদানী
সম্পাদনা: প্রফেসর ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া