10/02/2026
মৃত্যু এবং তার পরের জীবন
একদিন আপনি মারা যাবেন।
সেদিন আপনার ফোনটা হয়তো বিছানার পাশে পড়ে থাকবে।
কেউ সেটি হাতে নিয়ে আপনার শেষ কল, শেষ মেসেজ, শেষ ছবি দেখবে। তারপর একসময় ফোনটির পাসওয়ার্ড বদলে যাবে। আপনার আঙুলের ছাপ আর সেটি খুলবে না।
আপনার আলমারিতে ঝোলানো জামাগুলো কয়েকদিন, কয়েক সপ্তাহ হয়তো একইভাবে থাকবে। তারপর একদিন কেউ বলবে,
“এগুলো আর কী করা হবে?”
আপনার জুতা জোড়া দরজার পাশে পড়ে থাকবে।
যে জুতায় আপনি কত পথ হেঁটেছেন, সেগুলো আর কোনোদিন আপনার পায়ে উঠবে না।
আপনার টেবিলে পড়ে থাকা কলমটা অন্য কেউ ব্যবহার করবে।
আপনার বইয়ের পাতায় অন্য কারও হাতের দাগ পড়বে।
আপনার চেয়ারে অন্য কেউ বসবে।
আপনার ঘরে নতুন করে রং হবে।
আপনি যে বিছানায় শেষবার শুয়েছিলেন, একসময় সেই বিছানাতেও অন্য কেউ ঘুমাবে।
আপনার ব্যবহৃত চাদর, বালিশের কভার, তোয়ালে, সাবান, চিরুনি, কাপড়, ঘড়ি, ব্যাগ… একে একে সবকিছুর নতুন ব্যবহার বা নতুন মালিক হবে।
শুধু আপনিই আর থাকবেন না।
আপনার জানাজায় অনেক মানুষ আসবে।
কেউ সত্যিই কাঁদবে। কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকবে। কেউ হয়তো দায়িত্ববোধ থেকে আসবে। কেউ আপনাকে খুব ভালোবাসত, কিন্তু আপনাকে হারানোর কষ্ট মুখে প্রকাশ করতে পারবে না।
আর কেউ কেউ হয়তো জানাজা শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই অন্য কোনো কথায় হাসবে, ফোন দেখবে, কারও সঙ্গে গল্প করবে।
এটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে কঠিন সত্যগুলোর একটি।
আপনার মৃত্যু পৃথিবীকে থামিয়ে দেবে না।
আপনি মারা যাওয়ার পরও বাজার খুলবে।
বাস চলবে।
স্কুলে ক্লাস হবে।
অফিসে মিটিং হবে।
মানুষ দুপুরের খাবার খাবে।
কেউ নতুন জামা কিনবে।
কেউ বিয়ের পরিকল্পনা করবে।
কেউ সন্তানের জন্মের খবর পাবে।
আপনার পৃথিবী থেমে যাবে।
অন্য সবার পৃথিবী চলতে থাকবে।
প্রথম কয়েকদিন আপনার নাম অনেকবার উচ্চারিত হবে।
কয়েক মাস পর কমে যাবে।
কয়েক বছর পর আপনার কথা উঠবে বিশেষ কোনো প্রসঙ্গে।
আর একসময় এমন মানুষও থাকবে, যারা আপনাকে দেখেনি, আপনার কণ্ঠ শোনেনি, আপনার সঙ্গে কথা বলেনি।
আপনার ছবি হয়তো কোনো পুরোনো অ্যালবামে থাকবে।
ছবির পেছনে লেখা থাকবে একটা তারিখ।
কিন্তু সেই ছবির মানুষটির সঙ্গে আপনার পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের সম্পর্কও হয়তো একদিন শুধু একটি নাম হয়ে থাকবে।
দুই প্রজন্ম পর কে জানে, আপনার কবরের ঠিকানা কেউ জানবে কি না।
আপনার নাতি হয়তো জানবে আপনি ছিলেন।
আপনার নাতির সন্তান হয়তো শুধু শুনবে,
“তোমার দাদার বাবা এমন ছিলেন।”
তারপর?
নামটাও হয়তো হারিয়ে যাবে।
আজ যে ঘরটাকে আপনি “আমার ঘর” বলছেন, একশো বছর আগে সেখানে কে থাকত আপনি জানেন না।
আজ যে জমিটাকে আপনি “আমার সম্পদ” বলছেন, একশো বছর আগে সেটার মালিক কে ছিল, আপনি জানেন না।
আর একশো বছর পর?
আপনার নামের সঙ্গে সেই জমির কোনো সম্পর্ক থাকবে না।
অন্য কেউ সেখানে ঘর তুলবে।
অন্য কেউ জানালা দিয়ে বাইরে তাকাবে।
অন্য কেউ বলবে,
“এটা আমাদের বাড়ি।”
আপনি যে চেয়ারে বসে ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করছেন, একদিন অন্য কেউ সেই চেয়ারে বসে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করবে।
আপনার জমানো টাকা অন্য কেউ খরচ করবে।
আপনার বানানো বাড়িতে অন্য কেউ থাকবে।
আপনার সংগ্রহ করা বই অন্য কেউ পড়বে।
আপনার রেখে যাওয়া ছবিতে অন্য কেউ ধুলো মুছবে।
আর আপনি?
আপনার সঙ্গে পৃথিবীর সম্পর্কটা ধীরে ধীরে শুধু স্মৃতিতে পরিণত হবে।
তাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আমি মৃত্যুর পর কী রেখে যাব? শুধু সম্পদ নয়।
কত টাকা রেখে গেলাম, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হতে পারে,
কতটা ভালোবাসা রেখে গেলাম?
কতজন মানুষ আমার কারণে একটু ভালো মানুষ হয়েছে?
কতজনের দুঃসময়ে আমি পাশে দাঁড়িয়েছিলাম?
কতজনের মনে আমার জন্য দোয়া থাকবে?
কারও চোখের পানি কি আমার জন্য একদিনও পড়বে?
কারও জীবনে আমার কোনো ভালো কাজ কি আমার অনুপস্থিতির পরও বেঁচে থাকবে?
কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ তার বাড়ি নিয়ে যেতে পারে না।
জমি নিয়ে যেতে পারে না।
ব্যাংকের ব্যালান্স নিয়ে যেতে পারে না।
আলমারি ভর্তি কাপড় নিয়ে যেতে পারে না।
সে শুধু চলে যায়।
আর পৃথিবী ধীরে ধীরে তার জায়গাটা পূরণ করে ফেলে।
এই তো জীবন।
আমরা এখানে স্থায়ী বাসিন্দা নই।
শুধু কিছুদিনের জন্য আমাদের নামে একটা ঘর, একটা চেয়ার, কিছু সম্পর্ক আর কিছু দায়িত্ব বরাদ্দ থাকে।
তারপর একদিন সবকিছু অন্য কারও হয়ে যায়।
শুধু আমাদের কাজগুলোই হয়তো আমাদের সঙ্গে যায়।