24/04/2026
|| মাথাব্যথার কারন যখন মাথায় নেই ||
রোগী দীর্ঘদিন ধরে তীব্র মাথাব্যথায় ভুগছিলেন। ইন্টারমিডিয়েট পড়ে, সামনে পরীক্ষা। মাথাব্যথার জন্য কোন কাজে ঠিকমতো মনোযোগ দিতে পারে না, লেখাপড়ায়ও না। একটা টিউশনি ছিল, ছেড়ে দিতে হয়েছে। রাতের ঘুমেও সমস্যা হচ্ছে। এই সমস্যার জন্য সে ফার্মেসি থেকে শুরু করে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, নিউরোলজিস্ট এমনকি সাইকিয়াট্রিস্ট থেকেও ওষুধ খেয়েছেন, কিন্তু কোনো স্থায়ী সমাধান পাননি। মাথাব্যথার পাশাপাশি তার আরেকটি বড় সমস্যা ছিল—মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং অসহ্য ব্যথা। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে এক সময় তার শরীরে রক্তশূন্যতা (Anemia) দেখা দেয়।
রক্তশূন্যতা ও মাসিকের সমস্যা নিয়ে তিনি একজন গাইনোকোলজিস্টের শরণাপন্ন হন। পরীক্ষায় দেখা যায় তার হিমোগ্লোবিন অনেক কমে গেছে এবং জরায়ুতে (Uterus) একটি ছোট টিউমার বা ফাইব্রয়েড রয়েছে। চিকিৎসক ধারণা করেন, এই টিউমারের কারণেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে আয়রনের অভাব মনে হলেও রক্তস্বল্পতার মাত্রা বেশি হওয়ায় তাকে শরীরে রক্ত দেওয়ার (transfuse) পরামর্শ দেওয়া হয়।
রক্ত দেওয়ার পর কিছুদিন ভালো থাকলেও পুনরায় তার মাথাব্যথা এবং মাসিকের সমস্যা শুরু হয়। চিকিৎসক তাকে 'মায়োমেকটমি' (Myomectomy) অপারেশনের পরামর্শ দেন। অপারেশনের আগে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে দেখা যায়, আগে একটি ফাইব্রয়েড থাকলেও এখন তা বেড়ে দুটি হয়েছে। সুস্থ হওয়ার আশায় এবং রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে তিনি অপারেশন করান। অপারেশনের পর রক্তক্ষরণ কমলেও তার মাথাব্যথা কমেনি, বরং অন্যান্য ওষুধ খাওয়ার পরেও কোনো উন্নতি হচ্ছিল না।
পরবর্তীতে রোগী যখন আমার চেম্বারে আসেন, আমি সময় নিয়ে তার পুরো হিস্ট্রি শুনি এবং শারীরিক পরীক্ষা করি। ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় দেখা যায় রোগীর চোখ লাল এবং তার মধ্যে পলিসাইথেমিয়া (Polycythemia)-র লক্ষণ বিদ্যমান। আগের সব ইনভেস্টিগেশন রিভিউ করে এবং রোগীর বয়স বিবেচনায় আমার মাথায় অনেকগুলো ডিফারেনশিয়াল ডায়াগনসিস আসে। বিশেষ করে এটি কি প্রাইমারি না কি সেকেন্ডারি পলিসাইথেমিয়া, সেটি নিশ্চিত হওয়া জরুরি ছিল। কারণ, জরায়ুর ফাইব্রয়েড (Uterine Fibroid) থেকেও সেকেন্ডারি পলিসাইথেমিয়া হতে পারে।
রোগীকে একজন হেমাটোলজিস্ট দেখানোর পরামর্শ দিই এবং সিবিসি (CBC) করার কথা বলি। রক্তে হিমোগ্লোবিন এবং হেমাটোক্রিটের মাত্রা অনেক বেশি থাকলে শরীর থেকে রক্ত বের করে দিলে (Venesection/Phlebotomy) মাথাব্যথা কমতে পারে। হেমাটোলজিস্ট কিছু দামি পরীক্ষার পরামর্শ দিলেও সঠিক কাউন্সেলিংয়ের অভাবে এবং পরীক্ষার খরচ বেশি হওয়ায় রোগী কনফিউজড হয়ে পুনরায় আমার কাছে ফিরে আসে। তাদের বুঝিয়ে বলি যে, রোগের কারণ (প্রাইমারি নাকি সেকেন্ডারি) নিশ্চিত হওয়ার জন্য অন্তত একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তাদের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় প্রাইমারী কারন নির্ধারক জেনেটিক পরীক্ষাটি করার পরামর্শ দেয়া হয়।
অনেকদিন পরে তারা রিপোর্ট নিয়ে আসে। রিপোর্টে জেনেটিক কারন নেগেটিভ আসে। রোগিনীর বাবা-মা সহ তাদের রোগের ব্যাপারে কাউন্সেলিং করা হয়। তারা বিষয়টি বুঝতে পারে। রক্তে লোহিত কণিকার মাত্রা দেখে রক্তের কিছু অংশ নিয়মিতভাবে ফেলে দেবার পরামর্শ দেয়া হয়, একই সাথে গাইনাকোলজিস্ট এর নিকট রেফার করা হয়। কারন রোগের কারনটা মাথায় নয়, ছিল জরায়ুতে।
এ পর্যায়ে রোগীর একটা প্রশ্ন ছিল -
" আমি যদি রক্তটা ফেলে না দিয়ে কাউকে দান করে দেই (Donate) করি?"
উত্তরটা আপনারা দেবেন (বিশেষ করে চিকিৎসক)।
#রোগী_কথন
[ছবিটা প্রতিকী। ক্লিনিক্যাল এক্সামিনেশন করার সময়]