13/04/2026
মৃ'ত্যুর দর্শন এক অসীম গভীর বিষয়। এটি শুধু শেষ নয়, বরং জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক।
মৃ'ত্যু অনিবার্য সত্য, কিন্তু ভয়ের নয়
মৃ'ত্যু আসে নির্বিশেষে। রাজা-প্রজা, ধনী-গরিব, যুবক-বৃদ্ধ কারও প্রতি তার কোনো পক্ষপাত নেই। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে প্রত্যেক প্রাণীই মৃ'ত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। অতঃপর তোমরা আমারই কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে।” (সূরা আল-আম্বিয়া: ৩৫)
এই আয়াতটি শুধু সতর্কবাণী নয়, বরং একটি মুক্তির ঘোষণা। মৃ'ত্যু জীবনের শেষ নয়, বরং একটি সেতু দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মায়া থেকে আখেরাতের অনন্ত জীবনের দিকে।
ইসলামী চিন্তায়ও এর প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়। রাসুল (সা.) বলেছেন মৃ'ত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করো, যা আনন্দ বিনাশী। (তিরমিজি) এই স্মরণ মানুষকে অহংকার, লোভ আর দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত করে। ইবনে ওমর (রা.) বলতেন: “সকালে উঠে সন্ধ্যার আশা করো না, সন্ধ্যায় উঠে সকালের আশা করো না। সুস্থতায় রোগের প্রস্তুতি নাও, জীবনে মৃ'ত্যুর প্রস্তুতি নাও।
আমাদের হাতে এখনো অনেক সময় আছে ভেবে আমরা সময় নষ্ট করি, কিন্তু মৃ'ত্যু যদি আজই আসে?
ইসলামী দর্শনে মৃ'ত্যু পরীক্ষা ও প্রত্যাবর্তন
ইসলাম মৃ'ত্যুকে বরযখ (অন্তর্বর্তী অবস্থা) বলে দেখে। মৃ'ত্যুর পর আত্মা কবরে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়, তারপর কিয়ামতের দিন পুনরুত্থান। এটি শেষ নয়, বরং হিসাবের শুরু।
কুরআনে বলা হয়েছে নিশ্চয় তুমি মরবে এবং তারাও মরবে। (সূরা আজ-জুমার: ৩০)
আরেক আয়াতে: তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, মৃ'ত্যু তোমাদেরকে পৌঁছে যাবে, যদিও তোমরা সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করো।” (সূরা আন-নিসা: ৭৮)
মৃ'ত্যু ভ'য়ং'কর য'ন্ত্রণারও হতে পারে, আবার শান্তিরও। রাসুল (সা.) নিজে মৃ'ত্যুর যন্ত্রণা অনুভব করে বলেছিলেন, “হে আল্লাহ, মৃ'ত্যুর যন্ত্রণা আমার জন্য সহজ করে দাও।” কিন্তু মুমিনের জন্য মৃ'ত্যু “প্রশান্ত আত্মা”র (নাফসে মুতমাইন্নাহ) ফিরে যাওয়া: “হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি তোমার প্রভুর কাছে ফিরে যাও—সন্তুষ্ট ও সন্তোষজনক অবস্থায়।” (সূরা আল-ফজর: ২৭-২৮)
জীবনকে গুরুত্ব দাও, কিন্তু মোহে আবদ্ধ হয়ো না।
আজকের মুহূর্তকে অর্থপূর্ণ করো ভালোবাসো, ক্ষমা করো, স্বপ্ন দেখো, ভালো কাজ করো।
অহংকার ত্যাগ করো। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কেউ যদি তোমার এপিটাফ পড়ে, সে যেন দেখে যে তুমি একজন মানুষ ছিলে যে জীবনকে সত্যিকার অর্থে যাপন করেছিল।
প্রস্তুতি নাও। মৃ'ত্যু অপ্রত্যাশিত, কিন্তু তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া যায়নামাজ, তওবা, সদকা, ভালো আমলের মাধ্যমে।
মৃ'ত্যু যখন আসে, তখন সে কোনো আলোচনায় বসে না। সে শুধু নিয়ে যায়। যা রেখে যায়, তা শুধু দুটো তারিখ আর মাঝখানের একটা ড্যাশ। সেই ড্যাশটাকে যতটা সম্ভব উজ্জ্বল করে যাওয়াই আমাদের একমাত্র বিদ্রোহ। বিদ্রোহ অর্থহীনতার বিরুদ্ধে, ভুলে যাওয়ার বিরুদ্ধে, মৃ'ত্যুর বিরুদ্ধে নয় মৃ'ত্যুকে আলিঙ্গন করে জীবনকে জয় করার।
কারণ যে মৃ'ত্যুকে ভুলে থাকে, সে জীবনকেও অর্থহীন করে। আর যে মৃ'ত্যুকে স্মরণ করে, সে প্রতিটি শ্বাসকে মূল্যবান করে তোলে।