03/10/2025
সংস্কৃত ভারতবর্ষের পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। সংস্কৃত-প্রাকৃত উত্তর –ভারতের আধুনিক আর্যভাষাগুলির জননী ও পালয়িত্রী এবং দাক্ষিণাত্যের দ্রাবিড়গোষ্ঠীর ভাষাগুলির ধারয়িত্রী। বলতে গেলে কিছুকাল আগেও সংস্কৃতই ভারতের শিষ্টজনের সহজবোধ্য সাধারণ ভাষা ছিল। আর, কেবল যে পুণে তক্ষশিলা বারাণসী মিথিলা নবদ্বীপ কেন্দ্রেই সংস্কৃত ভাষাচর্চা ও সাহিত্য দর্শন সীমাবদ্ধ ছিল এমন নয়, গ্রামাঞ্চলে যত্রতত্র চতুষ্পাঠীর মধ্যস্থতায় প্রশিক্ষণের আয়োজন ছিল যথেষ্ট। মধ্যযুগে পাঠান- মোগল সুলতানেরা ও রাজকর্মচারীরা বিদ্বান্ লেখক ও চতুষ্পাঠীর গুরুদের ভূমি ও অর্থ দিয়ে নিয়মিতভাবে সাহায্য করতেন, যেমন করতেন মক্তব ও খানকা গুলিকে। এর ফলে খ্রীস্টীয় সতেরো শতাব্দী পর্যন্ত বাঙ্লার গুরুকেন্দ্রিক চতুষ্পাঠীগুলি খুবই জীবন্ত ছিল। শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে যেমন বাঙলা ভাষা তেমনি সংস্কৃতও নোতুন সাহিত্যিক প্রেরণার সঞ্জীবিত হয়ে ওঠে, সেইসঙ্গে বাঙ্লার গৌরব নব্যন্যায় এবং বেদান্ত ও স্মৃতির পর্যালোচনায় নবদ্বীপ ভারতের মর্যাদার কেন্দ্রভূমি হয়ে ওঠে। গ্রামাঞ্চলের চতুষ্পাঠীগুলিও যথাসাধ্য এই ঐতিহ্য বহন করতে থাকে। মোগল প্রশাসনের শেষ ও কোম্পানি প্রশাসনের প্রারম্ভ সময়কার দেশের সাধারণ অবক্ষয়িত পরিস্থিতির সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত টোলগুলিও আহত হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু নিশ্চিহ্ন হয়নি, পুরানো ও নব্য-উদ্গত জমিদারির সূত্রে কিছু কিছু সংরক্ষিত হয়েই এসেছিল। আঠারো শতাব্দীতে পুরানো গ্রাম-কলকাতায় এবং ভাটপাড়া-হুগলী প্রভৃতি অঞ্চলে সংস্কৃত কাব্য-ব্যাকরণ স্মৃতি-দর্শনের চর্চা যে ছিল তার প্রমাণ মিলছে। নবদ্বীপের নব্যন্যায়ের ট্রডিশন ধরে গণনা করলে কলকাতা পর্যন্ত এর অনুসৃতি ধরা যেতে পারে। রঘুনাথ শিরোমণির পরস্পরাক্রম মথুরানাথ তর্কবাগীশ, জগদীশ তর্কালংকার, গদাধর ভট্রাচার্য, কলকাতার নিমাইচন্দ্র শিরোমণি, জয়নারায়ণ তর্কপঞ্চানন ও মহেশচন্দ্র ন্যায়রত্ন পর্যন্ত শিষ্যাদিক্রমে এর পরিব্যাপ্তি। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ সংলগ্ন জয়গোপাল তর্কালংকার, মদনমোহন তর্কালংকার, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার প্রমুখ পণ্ডিতবর্গও এর দৃষ্টান্ত। ত্রিবেণীর প্রখ্যাত পণ্ডিত ও ‘বিবাদভঙ্গার্ণব ‘ নামে মূল্যবান্ স্মৃতি (হিন্দু আইন) গ্রন্থের লেখক জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন এঁদেরও আগেকার। মিশনারি ওআর্ড সাহেব টোলের যে তালিকা করেছিলেন তাতে দেখা যায় কলকাতার বিভিন্ন পাড়া- অঞ্চলে আটাশটি টৌল ছিল, ছাত্রসংখ্যা ছিল ১৭০। কলকাতার বাইরে থেকে এসে যাঁরা যেসব চতুষ্পপাঠী খুলেছিলেন সেগুলির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিল হাতিবাগানের ঠাকুরদাস ভট্রাচার্য চূড়ামণির টোল (১৭৮০-৯০ খ্রীঃ) এখানে সব শাস্ত্রই পড়ানো হত এবং এখানকার ছাত্র সংখ্যা ছিল ৫০।
ক’লকাতায় সংস্কৃত চর্চার নোতুন দিগন্ত খুলে গেল সার্ উইলিয়ম জোন্স-এর এশিয়াটিক সোসাইটি প্রবর্তনে ও সংস্কৃত ভাষা ও সংস্কৃতে নিহিত সম্পদ বিষয়ে তাঁর উচ্ছ্বসিত ভাষণের পর। কোম্পানির সরকারি কাজে এলেন মহামহোপাধ্যায় কোলব্রুক এবং তারপর হোরেস্ হেম্যান উইলস্ন। এঁরা প্রাচ্য দর্শন , বিজ্ঞান, সাহিত্য, ব্যাকরণ, স্মৃতি এবং বেদ-উপনিষদের কোনো শাখাই তাঁদের গবেষণা ও পর্যালোচনায় বাকি রাখলেন না, যার ফলে শিক্ষিত দেশবাসীর চিত্তও সংস্কৃতের ঐশ্বর্যের দিকে নোতুন করে আকৃষ্ট হল। সংস্কৃত তখন কলকাতার গণ্ডি ছাড়িয়ে ইয়োরোপের গবেষণা ও আলোচনার বস্তু হয়ে পড়েছে। কারণ ঋগ্বেদই হল ইন্দো-ইয়োরোপীয় ভাষা ও সাস্কৃতির প্রাচীনতম সাহিত্যিক নিদর্শন। ১৮১৭ খ্রীঃ হিন্দু কলেজ স্থাপনার পর রাজা রাধাকান্ত দেব ( শব্দকল্পদ্রুম অভিধানের রচয়িতা) প্রমুখ প্রাচ্য- বিদ্যারসিকদের চিত্তে পাশ্চাত্য ধারায় আধুনিকভাবে পরিচালিত একটি সংস্কৃত কলেজ প্রবর্তনের স্বপ্ন থাকলেও তা প্রকৃতপক্ষে বাস্তবায়িত হয় তৎকালীন গভর্নর জেনারেলের সচিব ও প্রাচ্যবিদ্যায় অসামান্য পণ্ডিত হোরেস্ হেম্যান্ উইলসনের আগ্রহে। বহু আগেই আঠারো শতাব্দীর শেষের দিকে আরবী-ফারসী ভাষায় নিহিত শাস্ত্রাদি বিষয়ে জ্ঞানের প্রয়োজনে কলকাতা মাদ্রাসা এবং প্রাচ্যবিদ্যার জন্য বারাণসীতে সংস্কৃত কলেজ স্থাপিত হয়ে গেছে। এদিককার সংস্কৃত কলেজ ত্রিহূতে অথবা নবদ্বীপে হবে এই নিয়ে কথা চলছিল, উইলিসন্ সাহেবের হস্তক্ষেপের ফলে কলকাতাতেই তার প্রারম্ভ হল ১৮২৪ খ্রীঃ প্রথমে একটি ভাড়া বাড়িতে, পরে ১৮২৬ খ্রীঃ থেকে বর্তমান গৃহে, হিন্দুকলেজের সংলগ্ন ভূমিতে। সরকারি নির্দেশনায় দুটি উদ্দেশ্য নিয়ে সংস্কৃত কলেজের স্থাপ্না হয় –প্রাচ্যবিদ্যার অনুশীলন ও সেইসঙ্গে পাশ্চাত্যের জ্ঞান- বিজ্ঞানে ছাত্রদের দীক্ষা দান।
কলেজ প্রথমের দিকে কেবল প্রাচ্যবিদ্যারই অনুশীলন চলেছিল এবং মাঝে মাঝে ইংরেজি পঠন-পাঠন আরম্ভ করা গেলেও বিদ্যাসাগর মহাশয় অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর ১৮৫৬ থেকেই পাকাপাকিভাবে ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তন হয়। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পর পণ্ডিত ই বি কিউয়েল যখন অধ্যক্ষ তখন ১৮৬০ খ্রীঃ এটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রচলিত আধুনিক কলেজের রূপ পরিগ্রহ করে। জদিচ তারও পরে বেশ কিছুকাল সংস্কৃত কলেজেই সংস্কৃত এম –এ শ্রেণীর পঠন-পাঠন হত। ১৮২৩ খ্রীঃ নয়া শিক্ষানীতি প্রসারের উদ্দেশ্যে ‘জেনারেল কমিটি অফ্ পাবলিক ইনস্ট্রাকশন’ (বর্তমান এর প্রাথমিক রূপ) গঠিত হলে হোরেস হেম্যান উইলসন্ তার সচিব নিযুক্ত হন এবং সেই সূত্রে তিনি সংস্কৃত কলেজের শিক্ষাপদ্ধতিও গড়ে তোলেন। উইলসন্ সাহেব পরে সংস্কৃত কলেজের সচিব (তখনকার অধ্যক্ষের আখ্যা) হিসাবেও মাঝে মাঝে কাজ করে সংস্কৃতের মধ্যস্থতায় প্রাচ্যবিদ্যার অনুশীলনকে সুরক্ষিত করার প্রয়াস করেন।
প্রথমের দিকে শ্রেণী-পরস্পরা –ক্রমে সংস্কৃত কলেজে ছটি বিষয়ে অধ্যাপনার সূত্রপাত করা হয় – যেমন প্রারম্ভে ব্যাকরণ ৩/৪ বৎসর, পরে সাহিত্য শ্রেণীতে দু’বৎসর, অলংকার শ্রেণীতে দু’বৎসর এবং তারপর ন্যায়, স্মৃতি অথবা বেদান্ত। পড়াতে আরম্ভ করেছিলেন তারানাথ তর্কবাচস্পতি,গঙ্গাধর তর্কবাগীশ, কাশীনাথ তর্কপঞ্চানন, জয়গোপাল তর্কালংকার মদনমোহন তর্কালংকার, প্রেমচাঁদ তর্কবাগীশ, নিমাইচাঁদ শিরোমণি এবং জয়নারায়ণ তর্কপঞ্চাননের মত সেকালের খ্যাতনামা পণ্ডিতবর্গ। কিছু পরে পরে ক্রমান্বয়ে অধ্যাপকরূপে যোগ দেন- দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ (‘সোমপ্রকাশ’পত্রিকার সম্পাদক) তারাশংকর তর্কররত্ন, অধ্যক্ষরূপে স্বয়ং বিদ্যাসাগর, অধ্যক্ষ ই বি কাউয়েল এবং সর্বশাস্ত্রবিশারদ ক্ষণজন্মা মহেশচন্দ্র ন্যায়রত্ন। হোরেস্ হেম্যান্ উইলসন্ সাহেবের প্রাথমিক উদ্যোগের পর সংস্কৃত কলেজের শিক্ষা পদ্ধতির সংস্কার করে তাকে আধুনিক অবস্থায় পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে ১৮৫১-১৮৯৫ খ্রীঃ মধ্যবর্তী এই তিন অধ্যক্ষের অবদান সংস্কৃত কলেজের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।
বিদ্যাসাগর অধ্যক্ষ হয়ে প্রথমে কলেজে পঠন –পাঠনের শৃঙ্খলা নিয়ে আসেন এবং সেই উদ্দেশ্যে অবৈতনিক থেকে স্বল্প বৈতনিক করে দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রদের বৃত্তি দেওয়ার- ব্যবস্থা করেন এবং ব্রাহ্মণ- বৈদ্য ছাড়া শুদ্রদের অন্যান্য যে- কোনো জাতের ছাত্রদের জন্য সংস্কৃত শিক্ষার দ্বার উন্মক্ত করে দেন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কীর্তি হল সংস্কৃতের পাশাপাশি ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তন ও দুরূহ মুগ্ধবোধের স্থানে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য বাঙ্লায় উপক্রমণিকা ও পরবর্তী পাঠের জন্য ব্যাকরণ- কৌমুদী রচনা করে সহজে ব্যাকরণ পঠন-পাঠনের ব্যবস্থা। বিদ্যাসাগরের পর প্রাচ্যবিদ্যানুরাগী ও বহু গ্রন্থের অনুবাদক ও সম্পাদক কাউয়েল সাহেব প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক পদ থেকে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ পদে এসে (১৮৫৮ খ্রীঃ) কলেজ বিভাগ ও স্কুল বিভাগকে স্বতন্ত্র করে দেন এবং কলেজকে ক’লকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত করেন (১৮৬০ খ্রীঃ)। তিনিও বিদ্যাসাগর-নির্দিষ্ট পথের পথিক হয়ে ইংরেজি- শিক্ষার সঙ্গে সহজে সংস্কৃত শিক্ষার নীতি সম্প্রসারিত করেন। ই বি কাউয়েলের পর স্মরণীয় – সুযোগ্য প্রসন্নকুমার সর্বাধিকারীর অধ্যক্ষতা এবং তারপর দূরদর্শী সংগঠক মহা মহোপাধ্যায় মহেশচন্দ্র ন্যায়রত্নের কীর্তি। প্রথমে সাহিত্য ও অলংকারের অধ্যাপক ও পরে আঠারো- কুড়ি বৎসরের মত দীর্ঘকাল সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ অলংকৃত করেছিলেন তিনি এবং এর মধ্যে সংস্কৃত কলেজকে সবদিক থেকে সমুন্নত করার ও সংস্কৃত শিক্ষার প্রসারের স্থায়ী ব্যবস্থা করে যান। তাঁর উল্লেখযোগ্য কীর্তি হল বাঙলায় পরস্পর- বিচ্ছিন্ন টোলগুলির একত্রিত পরীক্ষাগ্রহণের বিধান ও পুরানো স্বচ্ছন্দ- প্রদত্ত উপাধির পরিবর্তে কেন্দ্রীয় পরীক্ষার মধ্যস্থতায় এক এক বিষয়ে ‘তীর্থ’ উপাধির প্রবর্তন (১৮৮৪ খ্রীঃ থেকে)। মহেশচন্দ্র উপলব্ধি করতেন যে বহু শাখায় বিভক্ত প্রাচ্যবিদ্যার এক একটিতে গভীর অনুশীলন সাধারণ কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষণ ব্যবস্থায় সম্ভবপর নয়, চতুষ্পঠীর মাধ্যমেই তা সম্ভবপর। এটি তিনি প্রমাণ করে দেখিয়েছেন এবং চতুষ্পঠী শিক্ষাব্যবস্থায় পরিদর্শক নিয়োগ ও সরকারি আর্থিক সাহায্য দেওয়ার ব্যবস্থাও তিনি করে দেন। পরবর্তীকালে চতুষ্পঠী শিক্ষাব্যবস্থাকল্পে সংস্কৃত কলেজের সঙ্গে বেঙ্গল স্যান্স্ক্রিট এ্যাসোসিয়েশন স্থাপিত হয়। কলকাতায় সংস্কৃতের প্রসারের পরবর্তী অধ্যায় ক’লকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত। ১৮৬০ খ্রীঃ পর থেকে সংস্কৃত কলেজসহ বাঙ্লায় পরপর প্রতিষ্ঠিত বহু স্নাতক কলেজই ক্রমে ক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষানীতির অধীনে আসে। যেমন স্কটিশচার্চ প্রেসিডেন্সি, শ্রীরামপুর, হুগলি, কৃষ্ণনগর, বহরমপুর, সেণ্ট জেভিয়ার্স, বেথুন, বিপন, বঙ্গবাসী, ভিক্টোতিয়া, বাঁকুড়া ওয়েজলিয়ান প্রভৃতি। এগুলিতে ইংরেজি, বিজ্ঞান ও আধুনিক বিদ্যার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে সংস্কৃত পাস অনার্স শ্রেণী খোলা হয় ও ছাত্র-ছাত্রীরা সংস্কৃত পড়ার জন্য ভিড় করে। এইরূপে টোলে এককভাবে সংস্কৃত শিক্ষণের পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে সম্মিলিত সংস্কৃতের নতুন অধ্যায় প্রবর্তিত হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯০৭ খ্রীষ্টাব্দেই বৈদিক সাহিত্য ও আধুনিক সাহিত্য রীতিতে সংস্কৃতের যাবতীয় শাখার চর্চার গুরুত্ব উপলব্ধি হয়। কিন্তু ঐ সময় ও কিছুকাল ধরে খ্যাতনামা অধ্যাপক ও গবেষকদের প্রদত্ত বক্তৃতামালাতেই সংস্কৃত অধ্যাপনার কাজ চলতে থাকে। সত্যব্রত সামশ্রমী বৈদিক ধর্ম ও সাহিত্য বিষয়ে এবং পিশেল, ওলডেনবার্গ, জেকবি, সিলভ্যা লেভি, উইনটারনীৎস প্রমুখ পাশ্চাত্ত্য পণ্ডিতবর্গ অন্যান্য বিভিন্ন বিষয়ে বক্তৃতামালায় যোগ দেন। খ্রীঃ ১৯১৭ এর পর থেকে নয়টি শাখা সমেত সংস্কৃত পঠন – পাঠন অব্যাহতভাবে চলতে থাকে, যদিও ১৯২৬ খ্রীঃ থেকেই ‘স্যার আশুতোষ প্রফেসার’ নামে প্রধান অধ্যাপকের চেয়ার সৃষ্টি হয় এবং ভাগবতকুমার শাস্ত্রী, ল ক্ষ্মণ শাস্ত্রী, সীতারাম শাস্ত্রী, কোকিলেশ্বর শাস্ত্রী, প্রমথনাথ তর্কভূষণ, ফণিভূষণ তর্কবাগীশ, বিধুশেখর শাস্ত্রী প্রমুখ পণ্ডিতবর্গ উক্ত পদ অলংকৃত করেন। এছাড়া বহু নাম-করা অধ্যাপক যেমন সংস্কৃত কলেজ তেমনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেশ কিছু চিন্তামূলক গবেষণাগ্রন্থ ও টীকা-টিপ্পনী প্রকাশ করে বাঙ্লার প্রাচ্যবিদ্যার অনুশীলনকে বিশ্বখ্যাত করতে থাকেন। জীবিকাগত বৈষয়িক কারণে বর্তমানে সংস্কৃত শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমে এলেও কলকাতা- কেন্দ্রিক বাঙ্লার অপরাজেয় সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের বিষয় বিবেচনা করলে এ দৈন্য আপাতত স্বাভাবিক বলেই মনে হয়।
ক’লকাতা কেন্দ্রে প্রাচ্যবিদ্যাগত সংস্কৃতির সম্প্রসারণের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হল বঙ্গীয় সংস্কৃত শিক্ষা পরিষদ’। এটি হল চিরাচরিত ও সুপ্রসিদ্ধ চতুষ্পঠীগত শিক্ষণ ও জ্ঞান-বিতরণের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান। আধুনিক স্কুল-কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত শিক্ষা প্রবর্তনের বহু পূর্বকাল থেকে চতুষ্পাঠীর ঐতিহ্য। চতুষ্পাঠীগত বিদ্যাপ্রসারের ফলেই বাঙ্লার নবদ্বীপ এককালে ভারতের মধ্যমণি হয়ে উঠেছিল। নবদ্বীপের ঐতিহ্য বাঙ্লার অন্যান্য অঞ্চলেও যে ভালোভাবেই প্রসারিত হয়েছিল এবং সেইসঙ্গে পুরানো গ্রাম কলকাতাও যে চতুষ্পাঠী- শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল না এ কথা পূর্বেই বলা হয়েছে। সংস্কৃত কলেজ গড়ে উঠলে পর এর প্রথম দিকের শিক্ষাব্যবস্থা টোলেরই অনুরূপ ছিল এবং পরে বিশ্ববিদ্যালয়ী শিক্ষারীতির অন্তর্ভুক্ত হলেও তার সঙ্গে টোল বিভাগও সংযুক্ত ছিল। অধ্যক্ষ মহামহোপাধ্যায় মহেশচন্দ্র ন্যায়রত্ন সারা বাঙ্লায় টোলের শিক্ষাকে সমুন্নত করে কীভাবে কেন্দ্রীয় পরীক্ষা পদ্ধতি ও তীর্থ উপাধি-দানের প্রবর্তন করেন সে বিষয়ে আগেই বলা হয়েছে। পরে Bengal Sanskrit Association নামে সংস্কৃত কলেজের সঙ্গে যুক্ত এই টোল বিভাগের পরিচালন কর্তৃত্বে এসেছেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, ডঃ সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত প্রমুখে প্রখ্যাত মনীষীরা, যার ফলে সে সময় টোলবিভাগের মর্যাদা যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছিল। ১৯৪৮ খ্রীঃ থেকে বাঙ্লায় টোল বিভাগ সংস্কৃত কলেজের সংযুক্তি থেকে পৃথক হয়ে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের রূপ লাভ করেছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিয়ন্ত্রিয় এই সংস্থায় শিক্ষণ ও পরীক্ষণ ব্যবস্থা তিন শ্রেণীর – আদ্য, মধ্য ও উপাধি অর্থাৎ তীর্থের । পালিও এর অধ্যাপনা তালিকার অন্তর্গত এবং সংস্কৃতের যাবতীয় শাখা – প্রশাখা নিয়ে এতে প্রতি বৎসর পরীক্ষার দুশ’রও বেশী প্রশ্নপত্র রচনা করতে হয়। বাঙ্লার বাইরে ওড়িষায় ও বৃন্দাবনে পর্যন্ত এর পঠন-পাঠন ও পরীক্ষার কেন্দ্র রয়েছে। ‘তীর্থ’ পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বর্তমানেও চার হাজারের মত। বাঙ্লায় প্রায় নয়শ’ টোলের হাজারের উপর শিক্ষকবৃন্দ নিয়মিতভাবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রদত্ত বাৎসরিক বৃত্তি পেয়ে থাকেন এবং এসবের পরিচালনের ও পরীক্ষা গ্রহণের জন্য বর্তমানে বঙ্গীয় সংস্কৃত শিক্ষা পরিষদ নামে পুরানো হিন্দু, কলেজ ভবনে প্রতিষ্ঠানটি চালু রয়েছে-যার অধ্যক্ষতা করেন সরকারি কলেজের সংস্কৃতে অভিজ্ঞ একজন অধ্যাপক এবং যার পরিচালনা করেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক মনোনীত সমিতি। অবশ্য এইভাবে কলকাতা পরিচালিত বাঙ্লার টোল ও পণ্ডিতবর্গের বাড়-বাড়ন্ত অবস্থা চোখে পড়লেও নানা কারণে এগুলিতে আগেকার দিনের গুণগত গৌরব রক্ষিত হচ্ছে না। এ বিষয়ে দুঃখ করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে এবং এর জন্য কালোচিত সাংগঠনিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
ক’লকাতায় সংস্কৃত সংস্কৃতি প্রচারের অন্য একটি গৌরবের ক্ষেত্র হল ‘সংস্কৃত সাহিত্য পরিষদ’। যেমন বাঙ্লার ক্ষেত্রে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’। কলকাতার সংস্কৃতানুরাগী পণ্ডিতবর্গের আয়াসে ও আগ্রহাতিশয্যে এবং বদান্য ব্যক্তিদের দানে ১৯১৬ খ্রীঃ এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে এবং ক্রমে কিছু কিছু সরকারী অর্থসাহায্যেও লাভ করে। প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য আধুনিক পঠন –পাঠন, গবেষণা, অপ্রচারিত গ্রন্থের সম্পাদনা, স্মারক বক্তৃতামালা, অভিনয়াদি ও মূল্যবান একটি পত্রিকা প্রকাশের দ্বারা প্রাচীন সংস্কৃতির রক্ষণ ও প্রবর্ধন। এই পরিষদের সংলগ্ন ২০,০০০ এর উপর মূল্যবান্ গ্রন্থে সমৃদ্ধ একটি গ্রন্থাগার এবং ১৬০০০ এর উপর পুঁথিতে সমৃদ্ধ একটি পুঁথিশালা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি অদ্যাপি সজীব ও সচল অবস্থাতেই রয়েছে তবু এর অগ্রগতির জন্য সরকারি অর্থানুকূল্যের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। বস্তুতঃ যে- কোনো দেশের প্রাচীন ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও সমাজ- কেন্দ্রিক উন্নয়নে উৎসাহদান যে রাষ্ট্রিক কর্তব্য তাতে আর সন্দেহ কী?