01/04/2026
১৭১৩ সালে আওরঙ্গজেব নাতি ফররুখসিয়ার রাজ্যাভিষেকের সময় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেঙ্গল কাউন্সিল তার কাছে একটি ডেপুটেশন পাঠিয়ে হুগলি নদীর পূর্বে ৩৩টি ও পশ্চিমে ৫টি গ্রামে বসতি স্থাপন করার অনুমতি চায়।[৭] ১৭১৪ সালের ৪ মে তারিখে লেখা কাউন্সিলের কনসালটেশন বুকের তালিকা অনুযায়ী এই ৫টি গ্রাম হল: সালিকা (সালকিয়া), হাড়িড়া, কাসুন্দিয়া, রামকৃষ্ণপুর ও বেতড়। এগুলি আজ হাওড়া শহরেরই অন্তর্গত অঞ্চল।[৮] কিন্তু কোম্পানি শুধু এই ৫টি শহরে বসতি স্থাপনেরই অনুমতি পায়নি।[৮] ১৭২৮ সালে আধুনিক হাওড়া জেলা ছিল বর্ধমান ও মহম্মদ আমিনপুর জমিদারির অন্তর্গত।[৮] পলাশীর যুদ্ধের পর ১৭৬০ সালের ১১ অক্টোবর বাংলার নবাব মীর কাসিম সাক্ষরিত চুক্তি অনুসারে কোম্পানি হাওড়া জেলার অধিকার পায়।[৯]
বিংশ শতাব্দীর পূর্বে পৃথক জেলা হিসেবে হাওড়ার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। ১৭৬০ সালে এই অঞ্চলটি বর্ধমানের অন্তর্গত হয়। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভের পর হাওড়া ব্রিটিশদের অধিকারভুক্ত হয়।[১০] ১৭৯৫ সালে বর্ধমান জেলা থেকে হুগলি জেলাকে পৃথক করা হয়। হাওড়া জেলা সেই সময় হুগলি জেলার অন্তর্গত ছিল।[৩] ১৯১৭-১৮ সালে ফৌজদারি বিচারের ক্ষেত্রে হাওড়া জেলা হুগলি জেলা থেকে পৃথক ছিল। অবশ্য রাজস্ব ও দেওয়ানি বিচারের ক্ষেত্রে সেই সময়ও এই জেলা হুগলি জেলারই অন্তর্গত ছিল।[১০] ১৯৩৮ সালের ১ জানুয়ারি হাওড়া জেলা একটি পূর্ণাঙ্গ স্বতন্ত্র জেলার মর্যাদা পায়। স্বাধীনতার পরও হাওড়া জেলা বর্ধমান বিভাগের অন্তর্গত ছিল। ১৯৬৩ সালে এই জেলা প্রেসিডেন্সি বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হয়।[৩] ১৯৬৫ সালের ২৪ জুলাই হাওড়া শহর কলকাতার ন্যায় হাওড়া পৌরসংস্থা বা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের মর্যাদা পায়।[৩]
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকেই হাওড়া জেলার হুগলি নদীর তীরবর্তী অঞ্চলগুলিতে শিল্পের বিকাশ শুরু হয়। ১৭৯৬ সালে সালকিয়ায় একটি জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত কেন্দ্র গড়ে ওঠে। ১৮১৭ সালে বাউড়িয়ায় স্থাপিত কটন মিলটি ছিল ভারতের প্রথম কার্পাস বয়ন কারখানা। বর্তমানে হাওড়ায় কটন মিলের সংখ্যা প্রায় ৪০। ১৮৩০ সালে জেসপ কোম্পানি হাওড়ায় একটি তেলকল চালু করার পর জেলায় তেলকলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। ১৮৭৩ সালে ঘুসুড়ির কাছে ফোর্ট গ্লস্টারে একটি পাটকল চালু হয়। এটি ছিল জেলার প্রথম পাটকল। বর্তমানে জেলায় প্রায় ২০টি পাটকল রয়েছে। এছাড়া শিবপুর ও সালকিয়ায় গড়ে ওঠে দড়ি নির্মাণ কারখানা। বার্ন অ্যান্ড কোম্পানি, হাওড়া ফাউন্ড্রি, জেনকিং কোম্পানি প্রভৃতি শিল্পোদ্যোগী সংস্থা হাওড়ায় ঢালাই ও ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পকেন্দ্র গড়ে তোলে। ১৮৫৪ সালে হাওড়া স্টেশন প্রতিষ্ঠা, ১৮৬২ সালে মোগলসরাই পর্যন্ত রেলপথের প্রসার এবং ১৮৭৪ সালে হাওড়া পল্টুন ব্রিজ (পুরনো হাওড়া ব্রিজ) স্থাপনের ফলে হাওড়া জেলার শিল্পচিত্রে আমূল পরিবর্তন আসে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে হাওড়া, হুগলি ও মেদিনীপুরের তাঁতিদের অনুরোধে আন্দুলের মল্লিক পরিবার হাওড়ার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র তদনীন্তন চড়কডাঙা নামক এক স্থানে মঙ্গলা-হাট প্রতিষ্ঠা করেন। এই হাটকে ঘিরেই হাওড়ার আজকের ব্যবসাবাণিজ্যের কেন্দ্রগুলি বিকাশলাভ করেছে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইঞ্জিনিয়ারিং ও ফাউন্ড্রি সহ বিভিন্ন ভারী শিল্পে হাওড়া শহরের উৎকর্ষ ও ব্যাপকতা বিচার করে একে বাংলার শেফিল্ড বলা হত। বর্তমানে হাওড়া জেলার শিল্পচিত্রে অনেক পরিবর্তন সাধিত হলেও, এখনও ভারী ও মাঝারি শিল্পে এই জেলা একটি অগ্রপদ জেলা হিসেবেই বিবেচিত হয়।