20/06/2026
।ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (মুখার্জি) (১৯০১ – ১৯৫৩) ছিলেন স্বাধীন ভারতের একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, রাজনীতিবিদ এবং প্রখর জাতীয়তাবাদী নেতা। ভারতের ইতিহাস এবং বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের গঠনে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর জীবন ও অবদানের প্রধান দিকগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
১. শিক্ষা ও শিক্ষাবিদ জীবন
তরুণ উপাচার্য: তিনি মাত্র ৩৩ বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য (Vice-Chancellor) হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তাঁর কার্যকালে বাংলায় উচ্চশিক্ষার প্রসার এবং সিলেবাসে আমূল পরিবর্তন আনা হয়।
শিক্ষানুরাগী: তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.লিট (D.Litt) উপাধি পান এবং ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য ইংল্যান্ডে যান। শিক্ষাক্ষেত্রে মাতৃভাষার ব্যবহারের পক্ষে তিনি সওয়াল করেছিলেন।
২. পশ্চিমবঙ্গ গঠনে ঐতিহাসিক ভূমিকা
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় যখন সমগ্র বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তখন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন।
তিনি যুক্তি দেন যে, ভারত যদি ধর্মীয় ভিত্তিতে ভাগ হয়, তবে বাংলার হিন্দুপ্রধান অংশটি ভারতের অংশ হওয়া উচিত। তাঁর এই দূরদর্শী ও দৃঢ় পদক্ষেপের ফলেই আজকের 'পশ্চিমবঙ্গ' রাজ্যটি ভারতের মানচিত্রে স্থান পেয়েছে।
৩. রাজনৈতিক জীবন ও মন্ত্রীত্ব
প্রথম কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা: স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর ক্যাবিনেটে তিনি শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন।
পদত্যাগ: ১৯৫০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার 'লিয়াকত-নেহেরু চুক্তি'-র বিরোধিতা করে এবং পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) সংখ্যালঘু হিন্দুদের সুরক্ষায় নেহেরু সরকারের নীতির প্রতিবাদে তিনি মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন।
জন সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা: ১৯৫১ সালের অক্টোবর মাসে তিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (RSS) সহযোগিতায় 'ভারতীয় জন সঙ্ঘ' প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমান 'ভারতীয় জনতা পার্টি' (BJP)-র পূর্বসূরি।
৪. কাশ্মীর আন্দোলন ও মহাপ্রয়াণ
জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা (তৎকালীন ৩৭০ ধারা) এবং সেখানে যাওয়ার জন্য বিশেষ 'পারমিট' বা অনুমতির ব্যবস্থার তীব্র বিরোধী ছিলেন তিনি। তাঁর বিখ্যাত স্লোগান ছিল:
"এক দেশে দুই প্রধান, দুই বিধান, দুই নিশান—চলবে না, চলবে না।"
১৯৫৩ সালের মে মাসে তিনি পারমিট ছাড়াই কাশ্মীরে প্রবেশ করেন এবং সেখানে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৫৩ সালের ২৩ জুন শ্রীনগরে বন্দিদশায় রহস্যজনক পরিস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু হয়।
ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে আধুনিক ভারতের অখণ্ডতা এবং জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে স্মরণ করা হয়। তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ এবং দেশের প্রতি অবদান আজও ভারতীয় রাজনীতিতে গভীর প্রভাব বজায় রেখেছে।