01/08/2026
"লন্ডন তোড় সিং"
ভারতের বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী,পরবর্তীকালে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্ব হরকিষেণ সিং সুরজিতের ২০০৮ সালের ১ আগস্ট জীবনাবসান হয়েছিল।নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে তাঁর ১৯ তম প্রয়াণ দিবসে আমাদের শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।
২০০৫ সালে People's Democracy প্রকাশনা থেকে Memoirs: 25 Communist Freedom Fighters নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে হরকিষেণ সিং সুরজিতের একটি সাক্ষাৎকারও প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারটি থেকে জানা যায় যে, হরকিষেণ সিং সুরজিতের জীবনের প্রাথমিক চিন্তাভাবনা, পারিবারিক পরিবেশের প্রভাব, ঔপনিবেশিক-বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন বিপ্লবী ধারা এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থার সম্মিলিত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তাঁর প্রারম্ভিক জীবন গড়ে উঠেছিল।
হরকিষেণ সিং সুরজিতের জীবনের সূচনা পর্বের অভিজ্ঞতাগুলিই পরবর্তী জীবনে তাঁকে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিতে এবং সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করতে গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল।গ্রন্থটিতে প্রকাশিত হরকিষেণ সিং সুরজিতের সাক্ষাৎকারটির অংশবিশেষ নিচে দেওয়া হল।
প্রশ্ন: আপনার পারিবারিক পটভূমি, শৈশবের স্মৃতি এবং কোন কোন প্রভাব আপনাকে স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল—সে সম্পর্কে কিছু বলবেন?
হরকিষেণ সিং সুরজিত: আমার দাদু একজন সচ্ছল কৃষক ছিলেন। তিনি কয়েক বছর অস্ট্রেলিয়ায় জীবিকা নির্বাহ করার পর দেশে ফিরে এসেছিলেন। তাঁর একমাত্র ছেলে, অর্থাৎ আমার বাবা, তখন ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আমার বাবা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যোগ দেন। সে সময় আকালী পার্টি খুবই সক্রিয় ছিল এবং কংগ্রেস, আকালী পার্টি ও খিলাফত আন্দোলনের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় ছিল।
আমার বাবা আকালী পার্টিতে যোগ দেওয়ায় আমার দাদু, ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে, খুব অসন্তুষ্ট হন। তিনি বাবাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেন। পরে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের হস্তক্ষেপে দাদু রাজি হন বাবাকে দুই একর জমি দিতে।
আমাদের আর্থিক অবস্থা তখন খুবই খারাপ ছিল। সংসার চালাতে আমরা মূলত আমার মায়ের আত্মীয়স্বজনের সহায়তার ওপর নির্ভর করতাম।
আমার বাবা পরে জলন্ধর জেলা আকালী পার্টির সভাপতি হন। সে সময় ৫০০ জন করে আকালী স্বেচ্ছাসেবকের দল (জাঠা) ব্রিটিশ সরকারের কঠোর দমন-পীড়নকে উপেক্ষা করে স্বেচ্ছায় গ্রেপ্তার দিতে যেত।
আমার মা নিরক্ষর ছিলেন এবং তিনি একটি অ-শিখ পরিবার থেকে এসেছিলেন। কিন্তু সেটি তাঁকে আকালী আন্দোলনে যোগ দিতে বাধা দেয়নি। তিনি আকালী স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে আমার বাবাকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করতেন। এই পরিবারেই ২৩ মার্চ ১৯১৬ সালে আমার জন্ম হয় ।
আমার বয়স যখন সাত-আট বছর, তখন মা আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন সেই সব জাঠার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে, যারা অমৃতসর থেকে যাত্রা শুরু করে জৈতো মোরচায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে গ্রাম থেকে গ্রামে অগ্রসর হতো।
অনেক সময় ব্রিটিশ সরকার স্বেচ্ছাসেবকদের খাবার বা জল সরবরাহ করতে দিত না। তখন আশপাশের গ্রামগুলো থেকে গোপনে খাবার ও জল এনে সেই জাঠাগুলোর কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো।
১৯২৪ সালের একদিন, আমি যখন বাবার সঙ্গে মাঠে খেলছিলাম, তখন একদল পুলিশ এসে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পুরো গ্রামের মানুষ বাবার সঙ্গে থানায় গিয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১২৪(এ) ধারা (রাজদ্রোহের অভিযোগ) প্রয়োগ করে বিচার করা হয় এবং তাঁকে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আমার মায়ের অসাধারণ সাহস এবং গ্রামের মানুষের উৎসাহ ও সমর্থন বাবার মধ্যে নতুন উদ্দীপনা ও দৃঢ় সংকল্প সৃষ্টি করেছিল।
প্রশ্ন: আপনার বাবার গ্রেপ্তারের পাশাপাশি, আর কোন কোন রাজনৈতিক ঘটনা আপনার শৈশবে গভীর প্রভাব ফেলেছিল?
আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় তিন মাইল (প্রায় ৪.৮ কিলোমিটার) দূরে রুরকা কালান নামে একটি গ্রাম নিজেদের স্বাধীন বলে ঘোষণা করেছিল। সেখানে বচিন্ত সিং-এর নেতৃত্বে একটি পঞ্চায়েত গঠিত হয়। বহুদিন ধরে তিনি পুলিশ বা সশস্ত্র বাহিনীকে গ্রামে প্রবেশ করতে দেননি। এর ফলে ওই অঞ্চলের স্বাধীনতা আন্দোলন নতুন গতি লাভ করে।
অবশেষে অনেক চেষ্টার পর বচিন্ত সিংকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তিনি "রুরকার রাজা" নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তাঁর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে একটি বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় ভাষণ দেন মাস্টার মোতা সিং। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে পলাতক ঘোষণা করলেও, তাঁকে গ্রেপ্তার করার সাহস তারা দেখাতে পারেনি। আমি আমার মায়ের সঙ্গে সেই সভায় উপস্থিত ছিলাম। এই ঘটনাটি আমার জীবনে গভীর অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।
এরই মধ্যে আমাদের বাড়ি আকালী, খিলাফত এবং কংগ্রেস কর্মীদের কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। রাজ্যস্তরের বহু শীর্ষ নেতা আমাদের বাড়িতে আসতেন। আমার বাবা জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার এক বছরের মধ্যেই আবার গ্রেপ্তার হন এবং এবার তাঁকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আমাদের বাড়িতে নিয়মিত বিভিন্ন প্রগতিশীল ও বিপ্লবী মতাদর্শের সংবাদপত্র ও সাময়িকী আসত। বাবা ‘কীর্তি’ (শ্রমিক), ‘আকালী’, ‘সঙ্গীত’ এবং আরও কয়েকটি পত্রিকা পড়তেন। আমিও সেগুলো পড়ার সুযোগ পেতাম।
যখন নওজোয়ান ভারত সভা গঠিত হয়, তখন আমি তাতে যোগ দিই। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর।
আমাদের জীবিকার একমাত্র ভরসা ছিল অল্প কিছু কৃষিজমি। ফলে আমরা সবসময়ই তীব্র আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাতাম। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সেই দুরবস্থার কারণে বাবা বাধ্য হয়ে জমিটি বন্ধক রাখেন। এরপর ১৯২৯ সালে তিনি অবৈধভাবে একটি পাসপোর্টের ব্যবস্থা করে আমেরিকায় চলে যান।
পরপর পাঁচ বছর তিনি সেখান থেকে বাড়িতে কোনো অর্থ পাঠাতে পারেননি। এটি আমার মায়ের জীবনের অত্যন্ত কঠিন সময় ছিল। সংসার চালানোর জন্য তাঁকে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছিল। সেই সময় তিনি তাঁর বাবা-মায়ের কাছ থেকেও কিছু আর্থিক ও পারিবারিক সহায়তা পেয়েছিলেন।
প্রশ্ন: আপনার প্রথম রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কী ছিল?
হরকিশন সিং সুরজিত: সেই সময় মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা চলছিল। পাঞ্জাবের নিষিদ্ধ ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পিজ্যান্টস পার্টি-র নেতা বাবা করম সিং চিমা এবং ভাগ সিং কানাডিয়ান আমার বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।
১৯৩০ সালের একদিন, আমি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে দেখি, তাঁরা আমাদের বাড়িতে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। তাঁরা আমাকে নিষিদ্ধ পার্টির একটি জনসভার আয়োজন করতে বললেন। আমি ঘণ্টা বাজিয়ে সারা গ্রামে ঘুরে সভার ঘোষণা করলাম এবং মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। সভার জন্য একটি টেবিল ও একটি চেয়ারেরও ব্যবস্থা করলাম। বহু মানুষ সেই সভায় উপস্থিত হয়েছিলেন এবং নেতাদের বক্তব্য শুনেছিলেন। সভাটি অত্যন্ত সফল হয়েছিল।
পরদিন আমি যখন স্কুলে গেলাম, দেখি প্রধান শিক্ষকের ঘরে পুলিশ বসে আছে। তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে এসেছিল। প্রধান শিক্ষক, যিনি বাবার সঙ্গে পরিচয়ের কারণে আমার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, আমার কম বয়সের কথা তুলে ধরে পুলিশকে আমাকে গ্রেপ্তার করা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করছিলেন। তিনি একটি সমঝোতার চেষ্টা করছিলেন।
শেষ পর্যন্ত যে সমঝোতার প্রস্তাব এল, তা হলো—আমাকে ক্ষমা চাইতে হবে। অসহায় প্রধান শিক্ষক আমাকে ডেকে বললেন, আমার সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। তিনি বললেন, আমি যদি ক্ষমা চাই, তাহলে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারব। বাবা বিদেশে যাওয়ার আগে তাঁকে বলেছিলেন, তিনি চান তাঁর ছেলে উচ্চশিক্ষা লাভ করুক, এবং সে উদ্দেশ্যে যা প্রয়োজন তিনি করবেন।
কিন্তু আমি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলাম। আমি প্রধান শিক্ষককে বললাম, "আমি কোনো অপরাধ করিনি, তাই ক্ষমা চাইব কেন?"
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যে আমাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হবে। প্রধান শিক্ষক অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
আমি এতে কোনো লজ্জা অনুভব করিনি। বাড়ি ফিরে মাকে সব জানালাম। মা আমাকে বললেন, অন্য কোনো স্কুলে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করতে। কিন্তু আশেপাশে আর কোনো স্কুল ছিল না, আর কেউ আমাকে ভর্তি করতেও রাজি হচ্ছিল না।
অবশেষে কংগ্রেস নেতা হরি সিং জলন্ধর-এর সহায়তায় আমাকে জলন্ধরের খালসা স্কুলে ভর্তি করানোর ব্যবস্থা হয়।
কিন্তু সেখানে পড়াশোনা ও থাকা-খাওয়ার মাসিক খরচ ছিল ১০ টাকা—এর মধ্যে ৪ টাকা স্কুলের ফি, ৪ টাকা খাবারের খরচ এবং ২ টাকা দুধের জন্য।
আমি মায়ের সঙ্গে আলোচনা করলাম, প্রতি মাসে এই টাকা কীভাবে জোগাড় করা সম্ভব হবে। তখন আমাদের একটি মহিষ ছিল, যার দুধ থেকে মা ঘি তৈরি করতেন। পাশাপাশি তিনি ভালো মানের সুতোও কাটতেন। মা বললেন, তিনি প্রতি মাসে ১০ টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারবেন।
আমার মায়ের সেই কঠোর পরিশ্রমে উপার্জিত অর্থের জোরেই আমি আবার স্কুলে পড়াশোনা শুরু করতে পেরেছিলাম।
প্রশ্ন: আপনার বাবার বাইরে, যৌবনে আর কে আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছিলেন?
হরকিশন সিং সুরজিত: নিঃসন্দেহে ভগৎ সিং। ১৯৩১ সালে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তাঁর আত্মবলিদান যুবসমাজের মধ্যে এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল। অসংখ্য তরুণ তখন দেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতেও প্রস্তুত হয়ে ওঠে।
তবে ভগৎ সিংয়ের শহীদ হওয়ার আগেই তিনি আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত নওজোয়ান ভারত সভা-র সদস্য আমি তখনই হয়ে গিয়েছিলাম।
সেই সময় জলন্ধর ছিল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ১৯৩০-এর দশকে দেশের অর্থনীতি গভীর সংকটের মধ্যে ছিল এবং সর্বত্র কৃষকদের মধ্যে প্রবল অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল।
জাতীয় আন্দোলনের বহু শীর্ষ নেতা জলন্ধরে এসে জনসভায় ভাষণ দিতেন। স্কুল কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই আমি সেই সভাগুলোতে উপস্থিত হতাম।
বিশেষ করে বব্বর আকালী আন্দোলনের নেতা মাস্টার মোতা সিং-এর অগ্নিগর্ভ বক্তৃতা এবং ড. সাইফউদ্দিন কিচলু-র ভাষণ আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করত।
ক্রমশ আমি জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়ি। আর যেহেতু ওই সময়ের অধিকাংশ নেতাই আমার বাবার বন্ধু ছিলেন, তাই তাঁরাও আমাকে বিশেষ স্নেহ ও উৎসাহ দিতেন।
প্রশ্ন: আপনি প্রথম কবে এবং কেন কারাগারে গিয়েছিলেন?
হরকিশন সিং সুরজিত: আমি প্রথম ১৯৩২ সালে কারাগারে যাই। কারণ, আমি ব্রিটিশদের ইউনিয়ন জ্যাক নামিয়ে সেখানে ত্রিবর্ণ পতাকা উত্তোলন করেছিলাম।
সেই সময় আমি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার লিখিত অংশ শেষ করেছি; শুধু বিজ্ঞান বিষয়ে ব্যবহারিক পরীক্ষা বাকি ছিল। এদিকে ভগৎ সিংয়ের শহীদ দিবসের প্রথম বার্ষিকী পালন করার প্রস্তুতি চলছিল।
সেদিন পাঞ্জাবের হোশিয়ারপুরে, যা জলন্ধর থেকে প্রায় ২৫ মাইল (৪০ কিলোমিটার) দূরে, গভর্নরের আসার কথা ছিল। জেলা কংগ্রেস কমিটি ঘোষণা করেছিল, ওই উপলক্ষে জেলা আদালতের ভবনে ইউনিয়ন জ্যাকের পরিবর্তে ত্রিবর্ণ পতাকা উত্তোলন করা হবে।
এই পরিকল্পনা ব্যর্থ করার জন্য জেলার কালেক্টর সেনাবাহিনী মোতায়েন করেন এবং ঘোষণা দেন—যে-ই এমন কাজ করার চেষ্টা করবে, তাকে গুলি করা হবে।
আমি হোশিয়ারপুরে পৌঁছে কংগ্রেস কমিটির দপ্তরে গেলাম। সেখানে গিয়ে হতাশ হয়ে দেখি, সেনা মোতায়েনের কারণে কর্মসূচি বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।
আমি অফিসের সম্পাদক হনুমানকে জিজ্ঞেস করলাম, এমন সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো। তিনি পাল্টা বললেন, কালেক্টরের ঘোষণার কথা কি আমি জানি না?
আমি উত্তর দিলাম,
"শুধু গুলি করার হুমকিতেই আপনারা পিছু হটলেন? এটা জাতির অপমান।"
তিনি আমাকে চ্যালেঞ্জ করে বললেন,
"তুমি যদি এতই সাহসী হও, তাহলে তুমিই করে দেখাও।"
নির্ধারিত সময় তখন পেরিয়ে গেছে। আমি অফিস থেকে একটি ছোট লাঠিতে বাঁধা ত্রিবর্ণ পতাকা নিয়ে জেলা আদালতের দিকে রওনা দিলাম। সেই আদালত তখন ওই জেলার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রতীক ছিল।
সময় পেরিয়ে যাওয়ায় সেনারা কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে পড়েছিল। আমি সিঁড়ি বেয়ে উঠে ইউনিয়ন জ্যাক নামিয়ে ত্রিবর্ণ পতাকা উত্তোলন করলাম।
আমাকে লক্ষ্য করে দুটি গুলি ছোড়া হয়, কিন্তু কোনোটিই আমাকে আঘাত করতে পারেনি।
ঠিক তখনই মহারাষ্ট্রের বাসিন্দা তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার বাখলে বাইরে বেরিয়ে এলেন। সে সময় খুব কম ভারতীয়ই ডেপুটি কমিশনার হতেন। তিনি দেখলেন, আমি একজন কিশোর। তাই তিনি সঙ্গে সঙ্গে গুলি চালানো বন্ধ করার নির্দেশ দিলেন।
এরপর আমি ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে উচ্চস্বরে প্রতিবাদ ও তীব্র ভাষায় সমালোচনা করতে শুরু করি। যখন তারা বুঝল, আমার কাছে কোনো অস্ত্র নেই, তখন কয়েকজন সেনা সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসে আমাকে ধরে ফেলে।
আমাকে সাব-জেলে নিয়ে একটি নোংরা কুঠরিতে রাখা হয়। পরদিনই আমার বিচার শুরু হয়।
ম্যাজিস্ট্রেট যখন আমার নাম জানতে চাইলেন, আমি বললাম,
"আমার নাম লন্ডন তোড় সিং" (অর্থাৎ, যে লন্ডন ভেঙে দেয়)।
তিনি আমার প্রকৃত নাম জানতে পারেননি।
আমি স্বীকার করলাম যে কাজটি আমিই করেছি এবং আদালতেই ভগৎ সিংয়ের প্রশংসা করলাম।
আমাকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হলো।
আমি আদালতকে বললাম,
"মাত্র এক বছর?"
আমার এই কথায় ম্যাজিস্ট্রেট রাগ করে শাস্তি বাড়িয়ে চার বছরের কারাদণ্ড দিলেন।
আমি আবার বললাম,
"মাত্র চার বছর?"
তখন ম্যাজিস্ট্রেট উত্তর দিলেন,
"এই ধারায় এর চেয়ে বেশি শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।"
এরই মধ্যে আমার এই ঘটনার কথা সারা শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল। বাবার ঘনিষ্ঠ অনেক নেতা জেলে এসে আমাকে দেখলেন। তাঁরা আমার সাহসের প্রশংসা করলেন।
কয়েক দিনের মধ্যেই সংবাদপত্রের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ আমার প্রকৃত পরিচয় জানতে পারে। আমি অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় আমাকে দিল্লির রিফরমেটরি জেলে পাঠানো হয়।
কিন্তু দশ-পনেরো দিনের মধ্যেই আমাকে "উচ্ছৃঙ্খল" বা "সমস্যাসৃষ্টিকারী" বন্দি বলে চিহ্নিত করে লাহোরের বরস্টাল জেলে স্থানান্তর করা হয়।
সেখানে বহু তরুণ বিপ্লবী এবং ভগৎ সিংয়ের অনেক সহযোদ্ধা বন্দি ছিলেন।
কারাগারে নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করেই আমাকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো। এক জেল থেকে আরেক জেলে নেওয়ার সময় আমার পায়ে ভারী লোহার শিকল পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো।
প্রশ্ন: আপনার পরিবারের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?
হরকিশন সিং সুরজিত: সেই সময় আইন অমান্য আন্দোলন (Civil Disobedience Movement) চলছিল এবং বহু রাজনৈতিক বন্দি কারাগারে ছিলেন। তাঁদের অনেকের সঙ্গেই আমার পরিচয় হয়।
একজন কারারক্ষীর সাহায্যে বাবার লেখা একটি চিঠি গোপনে আমার হাতে পৌঁছায়।
চিঠিতে বাবা লিখেছিলেন—
তিনি চেয়েছিলেন আমি উচ্চশিক্ষা লাভ করি, যাতে দেশের জন্য আরও বড় অবদান রাখতে পারি। কিন্তু যেহেতু আমি এখন যে পথ বেছে নিয়েছি, তাই যেন কোনো অবস্থাতেই সেই পথ থেকে পিছিয়ে না যাই।
বাবার সেই চিঠি আমাকে অসীম সাহস ও প্রেরণা দিয়েছিল।
আমার মা যখন জেলে আমাকে দেখতে এসেছিলেন, তখন তাঁর মধ্যে রাগ বা দুঃখের সামান্যতম প্রকাশও ছিল না। বরং তিনি আমাকে বারবার সাহসী হতে বলেছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, আমার ওপর যতই কঠোর নির্যাতন হোক, যেন আমি কখনোই মনোবল হারিয়ে না ফেলি।
কারাগারের পরিবেশ এমন ছিল যে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমি সবার প্রিয় হয়ে উঠেছিলাম। এর একটি কারণ ছিল—সেখানে থাকা অনেক রাজনৈতিক নেতা আমার বাবাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন।
বাবার চিঠি পড়ার পর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, জীবনের বাকি সময় দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামেই নিজেকে উৎসর্গ করব।
যেদিন আমি হোশিয়ারপুর আদালতের ভবনের ওপর ত্রিবর্ণ পতাকা উত্তোলন করেছিলাম, সেদিনই আমার জীবন সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল। সেদিনই আমার ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারিত হয়।
তখনকার ত্রিবর্ণ পতাকাটি ছিল কংগ্রেসের পতাকা, যার মাঝখানে একটি চরকা ছিল। স্বাধীনতার পরে সেই চরকার জায়গায় অশোকচক্র বসিয়ে সেটিকেই ভারতের জাতীয় পতাকা হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
আমাদের জীবনের চরম অর্থনৈতিক দুর্দশা আমার চিন্তাভাবনার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। সেই অভিজ্ঞতাই আমাকে শ্রমিক শ্রেণির আদর্শ এবং সামাজিক বিপ্লবের দর্শনের সঙ্গে একাত্ম হতে সাহায্য করেছিল।
আজও আমি সেদিনের সেই কাজের জন্য গভীর গর্ব অনুভব করি।