30/01/2022
মানুষ গড়ার কারখানা
==================
ফুটবল খেলতে গিয়ে একটি সেভেনের ছাত্র ছিটকে পড়লো রুক্ষ জমিতে। হাঁটু কেটে দরদর করে রক্ত। দৌড়ে গিয়ে একজন ব্যাগ থেকে নিয়ে এলো জলের বোতল। ধুয়ে দিল জায়গাটা। একজন রুমাল ভিজিয়ে চেপে ধরলো। দু তিনজন তাকে জড়িয়ে রাখলো। কয়েকজন দৌড়ে এল অফিস রুমে,স্যার স্যার ডেটল দিন, স্প্রে টা দিন।ওর খুব লেগেছে। জলদি আসুন স্যার। অবাক হয়ে দেখছিলাম। সদ্য কৈশোর,কিন্তু কতো দায়িত্ব।কোথা থেকে শিখলো এইভাবে অন্যের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া?
স্কুলের পথে আসছিল ছেলেটা। সাইকেলে ছুটছে দ্রুত।হঠাৎ ঝপ করে নেমে,দৌড়ে গিয়ে রাস্তার পাশের জল পড়তে থাকা কল বন্ধ করে দিল। পথ চলতি একজন বললো, বা রে ছেলে, কোথা থেকে শিখলি? ব্যস্ততার মধ্যে বললো,আমি ক্লাসের ক্যাপ্টেন, আমাকে সব দেখতে হয়। আবার ক্লাস থামিয়ে দিয়ে এক ছাত্র দৌড়ে বাইরে গেল, স্কুলের উঠোনে স্বাধীনতা দিবসের দিন সাজানোর একটা কাগজের পতাকা পড়ে ছিল। সেটাকে মাথায় ঠেকিয়ে কুড়িয়ে নিয়ে এল। স্কুল এভাবেই তৈরি করে সু চেতনা, সচেতনতা।
গরম কালে ক্লাসরুম যেন হিট চেম্বার। ফ্যানের নিচে বসার জায়গার খুব ডিমান্ড। এক বেঞ্চে সাতজন মিলে গুঁতোগুঁতি।কেউই ভালো করে বসতে পারে না। এদিকে কেউ উঠতেও চায় না। এ বলে আমি আগে বসেছি, ও বলে আমি আগে।শেষে একজন বললো ঠিক আছে,আমি কষ্ট করছি, তোরা হাওয়া খা। ব্যাগ নিয়ে উঠতেই,অন্যজন বলল ধুর তুই কেন ছাড়বি, আমিই লাস্টে এসেছি,তুই বোস। ব্যাস এক প্রীতির বন্ধনের সুর ক্লাস জুড়ে।গোটা গরমে আর জায়গা নিয়ে ঝামেলা হয় নি।রোজই কেউ না কেউ জায়গা ছেড়ে আনন্দ পেত অন্যকে আরাম দিয়ে।অনেক নীতি কথা পড়ি আমরা,কিন্তু বাস্তব উদাহরণ পাওয়ার যথাযথ জায়গা ক্লাস রুম।
মিড ডে মিলের লাইনে দাঁড়াতে পারে না পঙ্গু ছেলেটা। রোজ কেউ না কেউ লাইনে দাঁড়িয়ে তার ভাত নিত।তাকে দিয়ে আবার হাসিমুখে দাঁড়াতো, নিজের জন্য।যে কোনো লাইনে একজনকে ছাড়তে যখন আমাদের কষ্ট হয়,তখন রোজ অন্যের জন্য লাইন দেওয়ার দৃষ্টান্ত দেখে অবাক। শুনলাম,প্রথমদিকে একজন লাইন দিত,পরে তার দেখাদেখি দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছে ওরা। এতগুলো সমমনস্ক শুভ চিন্তা একসাথে হতে পারে একটা জায়গাতেই।সেটা ক্লাস রুম।এই খাবার লাইনে পাশাপাশি দাঁড়ায় মহেশ্বর, মইদুল, কমল মাঝি, নারায়ন দুবে এক সাথে। এক বেঞ্চে ভাত খায়। চোখের সামনে ফুটে ওঠে ভারতের ছবি।
ভীষন খারাপ গালাগালি দিয়েছে ফাইভের একটা ছেলে। ক্লাসে যা হয়, তুমুল উত্তেজনা। কেউ চাইছে সেটা স্যার কে শোনাবে, কেউ সেই প্রস্তাবে আঁতকে উঠছে,কেউ চাইছে লিখে দেবে। তখন একটা বাচ্চা উঠে বললো, কাউকে প্রধানমন্ত্রী বললে সে যেমন প্রধানমন্ত্রী হয় না, কুকুর বললে কুকুর ও হয়ে যায় না। গালাগালি যে দেয়,সেই ছোটো হয়, সবাই ভাবে ওর বাড়ির লোক এইরকম ভাষা বলে। তার বাড়ির সবাই ছোটো হয়। বলুন স্যার? আরে এ যে কোনো একদিন ক্লাসে বলা আমারই কথা। ওই বাচ্চা যখন বললো,বন্ধুর কথায় সবাই সমর্থন করলো। মনে মনে ভাবলাম,যতদিন মনে থাকবে এরা কু কথা বলবে না। এভাবেই তৈরি হয় সমাজ,তৈরি হয় নাগরিক,ক্লাস রুমের মধ্যে।
ছেলেটা পড়াশোনায় তেমন কিছু না। তাৎক্ষণিক বক্তৃতায় চাপাচাপির পর নাম দিলো। বলতে যখন উঠলো,কি সাবলীল,কি সুন্দর বাচনভঙ্গি। সেদিন নিজেকে নিজেই আবিষ্কার করলো সে।আমরা বললাম মার্কেটিং এর চাকরি তোর ভালো হবে। খেয়াল রাখিস,আর নিজের এই বলতে পারার গুনটার চর্চা করিস।
আবার ক্লাসে এক টিচার দেখেন একজন মন দিয়ে পেছনের বেঞ্চে কি যেন করছে,গিয়ে দেখেন তাঁরই কার্টুন আঁকছে সে। স্যার রাগতে গিয়ে বিস্মিত হলেন।এই তুই আঁকা শিখিস? বেশ এঁকেছিস তো। ছেলেটা ভয়ে ভয়ে বলে,শিখিনা স্যার। বেশ আজ থেকে শেখ,আমি ব্যবস্থা করছি। স্যারের উদ্যোগে আঁকা শেখা সেই ছেলে আজ বিভিন্ন কোম্পানির প্রোডাক্টের প্যাকেটের ডিজাইন করে।
সরস্বতী পুজোর দায়িত্বে থাকে ছেলে মেয়েরা। আলপনা দেওয়া, মণ্ডপ সজ্জা, বাজার করা, পুজো করা এবং বিশাল সংখ্যক ছাত্র ছাত্রীদের খাওয়ানো। পুরো দায়িত্ব ওরা নিতে শেখে। এতো দায়িত্ব কেউ দেয়নি তাদের। এই কাজ করতে করতেই কেউ অনুষ্ঠান বাড়ি সাজানোর কাজকে পেশা করে নিল, কেউ বা ক্যাটারিং ব্যবসা শুরু করলো। দেখা হলে বলে শুরুটা কিন্তু ওই সরস্বতী পুজো থেকে। একই ভাবে স্কুলের স্পোর্টস থেকে ওঠে কতো প্রতিভা, স্কুলের ফুটবল প্রতিযোগিতা সাপ্লাই দেয় ফুটবল একাডেমীর প্লেয়ার। আবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আবিষ্কৃত হয় সঙ্গীতের বা আবৃত্তির নানা ক্ষুদে সম্ভাবনা। আসলে সবার সৃজনশীলতার চর্চা বাড়িতে হয় না। স্কুল লালন করে সেই সমস্ত প্রতিভা।
এই মোটা, এই ভোঁদা, এই সিঙ্গারা, এই কালু, এই লম্বু, এই টাকলা, এই ট্যাঁরা এইরকম হাজার নাম দেয় ছেলেরা নিজেদের মধ্যে। একদম শারীরিক বৈশিষ্ট্যকে উল্লেখ করে,সেগুলিকে ব্যঙ্গ করে। আমরা বোঝাই, কিন্তু নাম গুলি চলতেই থাকে, আমাদেরও নাম দেয়, বারন শুনবে কি! ছেলেরা প্রথমে রাগ করে, পরে হয় উপেক্ষা করে, মানিয়ে নেয়, আবার বন্ধুর খুঁত বার করে তাকে পাল্টা নাম দেয়। বাড়িতে সোনা, বাবু, গোপাল শুনে অভ্যস্ত হওয়া ছেলেটা বুঝতে শেখে সব পথ ফুল ছড়ান নয়। সেই পথেও চলা শিখতে হবে। মানিয়ে নিতে হবে পরিস্থিতির সঙ্গে। আবার ফুটবল মাঠে বা ক্লাসের ঝগড়ায় সে শেখে লড়ে নেবার মানসিকতা। যা তাকে তৈরি করে ভবিষ্যতের লড়াইয়ের জন্য। এই প্রতিকুল পরিবেশের শিক্ষাও দেয় ক্লাসরুম। আবার দেয় সেই পরিস্থিতি কাঁধে জড়ানোর মত একটা বা অনেকগুলি হাত। তার নাম বন্ধুত্ব।
এক ভালো ছাত্র ক্লাসে আনমনা, কখনো ঘুমিয়ে পড়ছে। টিচারদের চোখে সব ধরা পড়ে। খবর নেওয়া শুরু হল। বন্ধুরা জানালো ওর বাবা যখন বাইরে যায়, বাবার ল্যাপটপ নিয়ে বসে ও। যা বোঝার বোঝা হয়ে গেল। বাবাকে ডেকে জানানো হল। ল্যাপটপ দেওয়া বন্ধ হল। ছেলের জন্য শুরু হল বোঝানো, বন্ধুদের সেই কাজে লাগানো হল। পথে ফিরল ছেলেটি। অনেক সময় পরিবারের চোখ যা এড়িয়ে যায়, তাও ধরা পড়ে টিচারদের চোখে।
এক ফাইভের ছাত্র খুব অনিয়মিত। খবর নিয়ে জানা গেল পারিবারিক সমস্যা। মা নেই, বাবা আবার বিয়ে করেছে। প্রচুর কাজ করায়। তারপর একদিন দেখালো পায়ে গরম জল ঢেলে দিয়েছে বাবা। ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে বাবাকে ডেকে সাবধান করা হল। ভালোবাসা হয়ত পাবে না, তবে অত্যাচার বন্ধ করার একটা পথ পাওয়া গেল। এভাবেই কার চোখের সমস্যা, কার পেটে প্রায়ই ব্যথা হয়, কাউকে কুকুর কামড়ালে সব ক্ষেত্রেই উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করে স্কুল, কখনো অভিভাবককে ডেকে, কখনো নিজেরাই। আজো বহু বহু অভিভাবক বাচ্চার স্বাস্থ্যের ব্যাপারে উদাসীন।কে দেখবে তাদের? স্কুল থাকে সজাগ দৃষ্টি মেলে।
ক্লাসের মধ্যে বা প্রার্থনার সময় মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়া একটা পরিচিত সমস্যা। খোঁজ নিলে জানা যায় অনেক ছাত্র ছাত্রী না খেয়ে আসে। কেউ সকালে চা বিস্কুট খেয়েছে, কেউ বা সকালে একটা রুটি বা চা দিয়ে মুড়ি। ঘরে চাল আছে, কিন্তু মা কাজে বেরিয়ে যায়, দুপুরে ফেরে। ফলে রান্নার সুযোগ নেই। ক্ষুধার্ত বাচ্চাগুলো মুখিয়ে থাকে টিফিনের ঘণ্টার জন্য, মিড ডে মিলের ডাকের জন্য। জানিনা এই দুই বছরে কতো ক্ষিদে চেপে রইলো তারা, কতো পুষ্টির অভাব হয়ে গেল?
দুই বছরের শেষে ড্রপ আউট ভয়ঙ্কর পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্কুলের তরফ থেকে যাওয়া হচ্ছে ছাত্রদের বাড়ি বাড়ি। এক ছাত্র কেঁদেই আকুল স্যারদের দেখে। কি যে সমস্যা বলতেই পারলো না, গোপন রাখা ব্যাথা স্যারদের দেখে ঝরে পড়লো দুচোখ বেয়ে। জানিনা কতো কান্না চাপা আছে ঘরে ঘরে। আর একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম বাড়ির লোক বুঝিয়ে, বকে যাদের স্কুলে ভর্তি করাতে পারেনি। আমরা যাওয়ার পর অনেকেই এসে আবার ভর্তি হচ্ছে। বুঝিয়ে দিচ্ছে আজো স্কুলের কথার একটা আলাদা গুরুত্ব আছে তাদের কাছে।
আসল কথা অনেক অ্যাপ বেরোবে, অনেক অনলাইন বা অফ লাইন কোচিং সেন্টার হবে, অনেক প্রকাশনীর সহায়িকা বেরোবে, চোখ ধাঁধানো বিজ্ঞাপন হবে, কিন্তু ক্লাস রুমের অপরিহার্যতাকে কিছুতেই অস্বীকার করা যাবে না। অনলাইন অ্যাপ এর ভিডিও গুলি হয়ত খুবই আকর্ষণীয়, কিন্তু শিক্ষা একমুখী সেখানে। সেখানে আদান প্রদানের সুযোগ কম। প্রতিনিয়ত ছাত্রের প্রতি নজর রেখে তাকে শিখনের অভিমুখে চালনা করবেন কে? ছাত্রের অন্যমস্কতা দূর করার জন্য সজাগ দৃষ্টি কার থাকবে? আর এর জন্য চাই ক্লাস রুম, চাই স্কুল, চাই সকলের মধ্যে আদান প্রদানের মানসিকতা, ঘরে বসে অনলাইনে যা খুবই কঠিন। ক্লাস রুমে বা স্কুলের মধ্যে ভাইরাস কতটা সংক্রমিত হয় জানিনা। কিন্তু ভালোবাসা, শুভ চেতনা, শুভ ইচ্ছা, দায়িত্ব, দায়বদ্ধতা সংক্রমিত হয় ওই ক্লাসরুমে। নিশ্চিত করেই হয়। জাতি গড়তে, সুনাগরিক গড়তে তাই স্কুলের কোনও বিকল্প নেই আজও।
#কলমে_পার্থ_চক্রবর্তী
সংগ্রহীত