27/06/2026
৩ লক্ষ ৯৪ হাজার ১৬২টি ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট বকেয়া। অর্থের পরিমাণ ২ লক্ষ ২৯ হাজার ৯৯ কোটি টাকা। সিএজি বলছে এই অর্থের ব্যবহার স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি, আর রাজ্য সরকারের দাবি সব নথিই যথাসময়ে জমা দেওয়া হয়েছে। তাহলে আসল সত্যিটা কী?
----
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে সিএজি বা কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের একটি অডিট রিপোর্ট। এই রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ২০২১ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত রাজ্যের বিভিন্ন দফতরের মোট ৩ লক্ষ ৯৪ হাজার ১৬২টি ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট বা ইউসি বকেয়া ছিল, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২ লক্ষ ২৯ হাজার ৯৯ কোটি টাকা। ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট হল এমন একটি নথি, যার মাধ্যমে কোনও দফতর জানায় যে কেন্দ্র বা অন্য কোনও উৎস থেকে পাওয়া অর্থ নির্দিষ্ট প্রকল্প বা খাতে নিয়ম মেনে খরচ করা হয়েছে। এই নথি জমা না পড়লে অডিটকারী সংস্থা সেই অর্থের ব্যবহার স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারে না।
সিএজি রিপোর্টে সবচেয়ে বেশি বকেয়া ইউসির উল্লেখ করা হয়েছে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরে। এই দফতরের ৮১ হাজার ৯৫০টি ইউসি বকেয়া ছিল, যার মোট অর্থমূল্য ৮১ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে স্কুল শিক্ষা দফতর। সেখানে ৩৮ হাজার ১১৭টি ইউসি জমা পড়েনি বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৩৬ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। তৃতীয় স্থানে রয়েছে নগর উন্নয়ন ও পুর দফতর, যেখানে ৩৪ হাজার ৮৩৭টি বকেয়া ইউসির আর্থিক মূল্য ৩০ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা। শুধু এই তিনটি দফতরেই বকেয়া ইউসির মোট পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ লক্ষ ৪৯ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা, যা সামগ্রিক বকেয়া অঙ্কের বড় অংশ।
এছাড়াও কৃষি, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা, মহিলা ও শিশু উন্নয়ন ও সমাজকল্যাণ, বিদ্যুৎ ও অপ্রচলিত শক্তি সহ একাধিক দফতরের নাম রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। সিএজি জানিয়েছে, এত বিপুল পরিমাণ ইউসি জমা না পড়ায় তারা নিশ্চিত হতে পারেনি যে সংশ্লিষ্ট অর্থ নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে কি না। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতিতে অর্থের অপব্যবহার বা অনিয়মের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। সিএজি কোথাও বলেনি যে ২ লক্ষ ২৯ হাজার কোটি টাকা চুরি হয়েছে বা এই পুরো অর্থ দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। রিপোর্টে মূলত বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট অর্থের ব্যবহার যাচাই করার জন্য যে নথিপত্র প্রয়োজন, তার একটি বড় অংশ অডিটের সময় জমা পড়েনি। অর্থাৎ, সিএজি অর্থের খরচ স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। এই কারণে "২.২৯ লক্ষ কোটি টাকার দুর্নীতি" বা "২.২৯ লক্ষ কোটি টাকার হিসাব নেই"— এমন দাবি রিপোর্টে সরাসরি করা হয়নি।
অন্যদিকে রাজ্য সরকার শুরু থেকেই সিএজি রিপোর্টের এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে দাবি করেন, রিপোর্টটি ত্রুটিপূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর। তাঁর বক্তব্য ছিল, সংশ্লিষ্ট ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেটগুলি ইতিমধ্যেই বিভিন্ন কেন্দ্রীয় মন্ত্রকে জমা দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক আধিকারিকেরাও পরে সাংবাদিক বৈঠক করে বলেন, সিএজি ২০০২-০৩ অর্থবর্ষ থেকে ২০২০-২১ পর্যন্ত জমে থাকা তথ্য একত্রে দেখিয়েছে, ফলে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, রিপোর্টে যেসব দফতরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নথি যথাসময়ে পাঠানো হয়েছিল।
তবু এই রিপোর্ট রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, বিরোধী দলগুলি এই ২ লক্ষ ২৯ হাজার কোটি টাকার অঙ্ককে সামনে রেখে প্রশ্ন তুলছে, এত বিপুল অর্থের ব্যবহার যদি অডিটকারী সংস্থা যাচাই করতে না পারে, তাহলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। আবার শাসক দলের বক্তব্য, অডিট সংস্থার পর্যবেক্ষণকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং রিপোর্টের প্রকৃত অর্থ ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করা হচ্ছে। ফলে ৩ লক্ষ ৯৪ হাজার ১৬২টি বকেয়া ইউসি এবং ২ লক্ষ ২৯ হাজার ৯৯ কোটি টাকার এই অঙ্ক এখন শুধু একটি অডিট রিপোর্টের বিষয় নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অন্যতম বড় বিতর্কে পরিণত হয়েছে।