20/05/2026
হিকমতের পথে কোরবানি: মুমিনের জন্য সময়ের জরুরি বার্তা
- মুফতি হাবিবুল্লাহ কাশেমী
এই বছর আমাদের রাজ্যের পরিবেশ এমন এক অদ্ভুত নীরব উত্তেজনা ও উদ্বেগে ঘেরা, যেন চারপাশের বাতাসেও সতর্কতার শব্দ ভেসে আসে। গরু–মহিষ নিয়ে কঠোর নজরদারি, প্রশাসনিক সংবেদনশীলতা, হঠাৎ তল্লাশি, অজানা অভিযোগ, জনমতের চাপ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এক নাজুক বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে। মানুষ কথা বলছে ধীরে, চলছে সাবধানে; যেন প্রত্যেক পদক্ষেপ বিচার করে নিতে হচ্ছে। আমাদের বহু ভাই–বোন উদ্বিগ্ন, অনেক পরিবার উৎকণ্ঠায়, আর অসংখ্য যুবকের মনে আবেগ আর আশঙ্কার দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। ঠিক এমন সময়েই ইসলাম আমাদের যে বাণী শিখিয়েছে, সেটি আজ আরও বেশি প্রাণবন্তভাবে কানে বাজছে।
আল্লাহ তাআলা কত স্পষ্ট সতর্কবাণী দিয়েছেন—
وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ
অর্থাৎ “তোমরা নিজেদেরকে নিজেদের হাতে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না।” (
সূরা বাকারা : ১৯৫)
এই আয়াতটি আজ যেন প্রতিটি গলিতে, প্রতিটি বাজারে, প্রতিটি কথোপকথনে নতুন করে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। কারণ গরু-মহিষ কেনা এখন আর শুধুই একটি ইবাদতের প্রস্তুতি নয়—এটি সম্ভাব্য বিপদ, মামলা-মোকদ্দমা, শাস্তি ও অশান্তির দ্বার খুলে দেওয়ার মতো একটি ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ। একজন মুমিন কি নিজেকে, তার পরিবারকে, তার সমাজকে এমন বিপদের দিকে ঠেলে দিতে পারে?
রাসূলুল্লাহ ﷺ তাই আমাদের সতর্ক করে বলেছেন—
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ
অর্থাৎ “নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ো না, এবং কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করো না।” ( সুনান ইবনে মাজাহ )
এমনই পরিপূর্ণ, এমনই জীবন্ত শিক্ষা! আজ গরুর হাটে যাওয়া মানেই সন্দেহে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা। পরিবহন মানেই ভয়ের ছায়া। ক্রয়-বিক্রয় মানেই অজানা বিপদের সম্ভাবনা। ঠিক এমন সময়েই নবী ﷺ আমাদের আরেকটি অমূল্য দিকনির্দেশনা দিয়েছেন—
دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَى مَا لَا يَرِيبُكَ
অর্থাৎ “যা সন্দেহজনক, সেটি ছেড়ে দাও; আর যা সন্দেহহীন, সেটিকে গ্রহণ করো।” ( সুনান আত-তিরমিযী)
আজকের পরিস্থিতি যেন এই হাদীসকে বাস্তবতার পটে উজ্জ্বল করে তুলেছে। যদি কোনও কাজ সন্দেহে ভরা হয়, ঝুঁকিতে ভরা হয়, অশান্তির সম্ভাবনায় ঢাকা পড়ে—তবে একজন তাকওয়াবান মুমিন সেই পথ পরিত্যাগ করেন। কারণ ইসলাম আবেগের ধর্ম নয়—ইসলাম হিকমতের ধর্ম, শান্তির ধর্ম, দূরদর্শিতার ধর্ম।
মনে রাখবেন, প্রিয় ভাই ও বোনেরা— অন্য কেউ করছে বলে আপনারও করতে হবে—এ ধারণা ইসলামের শিক্ষা নয়। ইসলাম বলে—
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ
“তোমরা যতটুকু পারো আল্লাহকে ভয় করে চলো।” (সূরা আত-তাগাবুন : ১৬)
আজ আমাদের আল্লাহভীতি আমাদের নিরাপদ পথ বেছে নিতে আহ্বান করছে। আজ আমাদের সামর্থ্য—গোপনে ঝুঁকি নেওয়া নয়;
বরং নিরাপদ, হালাল, সহজলভ্য ছাগল-ভেড়া দিয়ে কোরবানি করা।
শরীয়ত পরিষ্কারভাবে বলছে—ছাগল-ভেড়া-দুম্বা দ্বারা কোরবানি সম্পূর্ণ হয়।
গরু-মহিষ না করতে পারলে কোরবানি “অসম্পূর্ণ” হয়—এ ধারণা ভুল।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِن يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنكُمْ
“তাদের মাংস বা রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না; বরং তোমাদের তাকওয়াই তাঁহার কাছে পৌঁছায়।” (সূরা আল-হাজ্জ : ৩৭)
তাই গোপনে, ভয়ে, বিপদে মাথা গুঁজে গরু আনার নাম কোরবানি নয়;
তাকওয়া, শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রেখে ইবাদত করা—এটাই কোরবানির প্রকৃত রূপ।
রাসূল ﷺ বলেছেন—
الحِكْمَةُ ضَالَّةُ المُؤْمِنِ
“হিকমত (বুদ্ধিমত্তা) মুমিনের হারানো ধন।” ( সুনান আত-তিরমিযী)
আজ সেই হিকমতই আমাদের রক্ষা করবে। হিকমতই আমাদের পরিবারকে নিরাপদ রাখবে। হিকমতই আমাদেরকে মামলার অপমান, অশান্তি, বিপদ, আতঙ্ক—সবকিছু থেকে বাঁচাবে।
প্রিয় পাঠক—
আমি আপনার ভাই হিসেবে, একজন দায়িত্ববান মুসলিম হিসেবে, একজন আলেম হিসেবে নয় বরং একজন মানুষ হিসেবে আপনাকে হৃদয়ের গভীরতা দিয়ে অনুরোধ করছি— এই পরিস্থিতিতে গরু-মহিষ কেনার চেষ্টা করবেন না।
অন্যের সাহস দেখে আবেগে পা বাড়াবেন না। নিজেকে, পরিবারকে, সমাজকে অকারণে বিপদের মুখে ফেলবেন না।
ইবাদত নিরাপত্তার সঙ্গে, তাকওয়ার সঙ্গে, প্রশান্ত হৃদয়ে করা উচিত।
আজ নিরাপদ কোরবানি—আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কোরবানি।
আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন, হিকমতের পথে চলার তাওফিক দিন এবং শান্তি, নিরাপত্তা ও তাকওয়ার সঙ্গে কোরবানি করার সৌভাগ্য দান করুন। আমিন!