14/06/2022
#কাতার।।
মিডল-ইষ্টের একটা ক্ষুদ্রতম দেশ হলো কাতর।। মাত্র 15/20 বছর আগে দেশটার কোনো গুরুত্বই ছিলো না।। এরপর হঠাৎ করেই ধুমকেতুর মতো উত্থান।। বিশ্ব তাদের কথা শুনতে শুরু করে দিলো,, বেড়ে গেলো কাতারের গুরুত্ব,, বিশ্বের বহু দেশ তাদের সমীহ করা শুরু করে দিলো।।
হঠাৎ করে এই গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় কারণ কি ??
তারা কি কোনো নিউক্লিয়ার বম্ব তৈরী করে ফেলেছে ?? নাকি,, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়ে গেছে ??
না,, তেমন কিছুই না,, তারা তেমন কিছু করে উঠতে পারেনি,, তবে,, একটা কাজ তারা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে করতে পেরেছে।।
কাতার বর্তমানে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মিডিয়া হাউস নির্মাণ করে ফেলেছে।। কেবলমাত্র একটা নিউজ চ্যানেল রয়েছে,, যেটা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য,, এবং,, নির্ভরযোগ্য।। গোটা বিশ্বের কোনায় কোনায় এই চ্যানেলটি পৌঁছে গেছে।। কাতার চাইলেই কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা,, গোটা বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিতে পারে।।
1996 সালে "আল-জাজিরা" গঠিত হয়।।
প্রথমে একটি আরবি নিউজ চ্যানেল হিসেবে শুরু হয় পথচলা।। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে তখন একটিও স্বাধীন এবং সতন্ত্র নিউজ চ্যানেল ছিলো না।। কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রীয় চ্যানেল ছিলো,, যাদের কাজ ছিলো রাত-দিন বাদশাহ অথবা রাষ্ট্রনেতার চাপলুশি করে যাওয়া।। আচ্ছে দিনের বড়াই করা,, রাষ্ট্রনেতার সমস্ত দোষত্রুটি আড়াল করে তাকে মহান হিসাবে তুলে ধরা।। নেগেটিভ খবর প্রচার না করে,, স্রেফ চেপে যাওয়া।।
আল জাজিরা মরুভূমির দেশে মরুদ্যান হয়ে ওঠে।। গোড়া থেকেই তাদের একটাই পন্থা - নিরপেক্ষ খবর পরিবেশন করা,, খবর প্রচারের ক্ষেত্রে যথাযথ ভারসাম্য বজায় রাখা,, নায্য বিষয়বস্তু তুলে ধরা,, ষ্টুডিওতে বসে ফেক নিউজ সম্প্রচার না করে সরাসরি গ্রাউন্ড রিপোর্ট তুলে ধরা,, কথা কম বলে খবর বেশী বেশী করে সম্প্রচার করা,, সর্বোপরি সমস্ত পক্ষকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া।।
একটি আরবি চ্যালেন হয়েও,, ইংরেজিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হতো।। তারা জানতো,, বিশ্বদরবারে সহজে পৌঁছে যাওয়ার মাধ্যম হলো ইংরেজি ভাষা।। বিশ্বের সমস্ত বড়ো মাপের এবং স্বনামধন্য সাংবাদিকদের যোগদান করানো হলো।। সাংবাদিকতার নৈতিকতাকে প্রায়রিটি দেওয়া হয়েছে সর্বদা।।
বিবিসির আদর্শে বিশ্বাস রেখে,, বিবিসি-কে ছাপিয়ে যাওয়া ছিলো তাদের প্রধান উদ্দেশ্য।। আল জাজিরার উদ্দেশ্য ছিলো,, বিবিসির মতোই আদর্শ এবং নিরপেক্ষতা বজায় রেখে এগিয়ে যাওয়া।।
আফগানিস্তান,, ইরাক,, সিরিয়া,, 9/11,, আরব বসন্তের মতো ইস্যু নিয়ে গোটা দুনিয়া তোলপাড় করে দিয়েছে তারা।। বিষ্ময়কর গ্রাউন্ড রিপোর্ট,, লাইভ-ওয়ার জোন,, সাংবাদিকরা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে পৌঁছে গেছেন একের পর এক দুর্গম এলাকায়।। মার্জিত ভাষা,, যথাযথ রিপোর্ট,, অহেতুক ভন্ডামি অথবা অভিনয় না করে সত্যটুকু ঘটনাস্থল হতে তুলে আনা,, এগুলোর কারনে আল জাজিরা খুব অল্পদিনের মধ্যেই জায়গা করে নিয়েছে বিশ্ব-দরবারে।।
ডের ডজনেরও বেশী সাংবাদিক নিহত হয়েছেন।। বেশ কয়েকজন ধরা পড়েছেন,, নিঁখোজ হয়ে গেছেন কয়েকজন সাংবাদিক,, আহত হয়েছেন অনেকেই।। তবুও ভয় পায়নি আল জাজিরা।। তারা নির্ভীক ভাবে নিজেদের সাংবাদিকতা দায়বদ্ধতা বজায় রাখার চেষ্টা করে গেছে।।
আরো একটি দিক ছিলো,, প্যালেষ্টাইন,, ইজরায়েল,, তালিবান,, আল কায়দার মতো বিশ্বের মানুষের কাছে নিন্দনীয় সংগঠনের কাছে পৌঁছে গেছে তারা।। কাউকে ভিলেন অথবা কাউকে হিরো হিসাবে তুলে ধরা হয়নি,, মিডিয়া-ট্রায়াল না করে,, সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হয়েছে ,, সাধারণ মানুষের উপর।।
আজ বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশে পৌঁছে গেছে আল জাজিরা।। তাদের কভারেজ,, খবরের বিষয়বস্তু,, সঞ্চালকের উপস্থাপন,, কোনো কিছুতেই সাধারণ মানুষ বিশ্বাস হারান না।। মাত্র 25 বছরের মধ্যে,, আল জাজিরা নামের একটি নিউজ চ্যানেল,, একটা দেশকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করে দিয়েছে।।
দোহা এখন এশিয়ার নরওয়ে হয়ে উঠেছে।।
আমেরিকা-তালিবানের মধ্যে শান্তি চুক্তি,, ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের সঙ্গে আলোচনা করে সেদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা,, আরব-ইজরায়েল বিরোধ নিয়ে আলোচনা,, গাজা ষ্ট্রিপ বিষয়ে মধ্যস্থতা,, সবকিছুই হচ্ছে কাতারের রাজধানী দোহা শহরে।।
কোনো এক সময় যে দেশের কোনো অস্তিত্ব ছিলো না,, কেবলমাত্র একটি নিউজ চ্যানেল সেই দেশকে উল্লেখযোগ্য বিশ্বশক্তিতে পরিণত করে ফেলেছে।।
আজকে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ,, কাতারকে উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না।। চার বছর আগে প্রতিবেশী আরব দেশগুলো একবার অবরোধ করে রেখেছিল কাতারকে।। শর্ত ছিলো,, আল জাজিরা বন্ধ করে দিতে হবে,, তবেই অবরোধ তুলে নেওয়া হবে।। কারণ,, আল জাজিরা আরবের অধিকাংশ দেশের স্বৈরাচারী শাষকের চরিত্র,, তাদের দূর্নীতি প্রকাশ করে দিয়েছে বিশ্ব দরবারে।। এটা আরবের শাষক শ্রেণী মেনে নিতে পারতো না।। কিন্তু,, আল জাজিরা মাথা নত করেনি,, বরং দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে আরো নিত্যনতুন অপকর্ম তুলে ধরেছে।। বাধ্য হয়ে চুপ করে গেছূ অন্যান্য আরব দেশ।।
25 বছর আগে আমাদের দেশেও ঘটেছিল স্যাটেলাইট বিপ্লব।। বহু নিত্যনতুন চ্যানেল এসেছে,, তারা যথাযথ নিরপেক্ষতা বজায় রেখে,, খবর পরিবেশন করে গেছে।। আমরা তখন সরকারি নিউজের মুখাপেক্ষী ছিলাম না।। আমরা বিশ্বাস করতাম,, বেসরকারি চ্যানেলের কোনো বাধ্যবাধকতা নাই,, তারা সত্য সংবাদ পরিবেশন করতে দ্বিধাবোধ করবে না।।
যেভাবে নিউজ চ্যানেল এগিয়ে গেছে,, আমরাও ভেবেছিলাম অচিরেই আমরা বিবিসি অথবা আল-জাজীরার মতো কোনো নিউজ চ্যানেল উপহার পেতে চলেছি।। অথচ,, আজকের দিনে আমরা অত্যন্ত আশাহত।।
আমাদের দেশের নিউজ চ্যানেল আজকে আবর্জনা স্তূপে পরিণত,, নিউজ মানেই এখন সরকারি মুখপাত্র।। একপেশে খবর পরিবেশন,, ফেক নিউজ সম্প্রচার,, মদ খেয়ে এ্যাঙ্কারিং,, অভদ্র ভাষার ব্যাবহার,, অশোভন আচরণ,, গালাগালি-খিস্তি এমনকি ষ্টুডিওতে বসে হাতাহাতি,, এগুলোর কারনে বিশ্ব দরবারে আমাদের মিডিয়া সার্কাসে পরিণত।। এ্যাঙ্কার-এ্যাঙ্কারনী এক একজন জোকার,, বিনোদনের জন্য অনেক রসিক মানুষ দেখতেই পারেন,, কিন্ত,, যারা খবরের জন্য খবর দেখেন,, তারা আজকে টিভি বিমুখ।।
ফেক নিউজ এখন USP,, TRP বাড়ানোর জন্য অবিরাম হিন্দু-মুসলমান,, মন্দির-মসজিদ।। কয়েকজন ভাড়া করা মৌলভী আর অশিক্ষিত সাধুকে ষ্টুডিওতে বসিয়ে,, মোরগ লড়াই চলছে দিনের পর দিন।। কোনো সমস্যা সমাধানের আগেই,, মিডিয়া দোষী অথবা অপরাধী হিসাবে যাকে ইচ্ছে সনাক্ত করে নিচ্ছে।। আসল সমস্যা ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়ে,, নন-ইস্যু গুলো নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় অপচয় করা হয়ে চলেছে।। এটাই আমাদের চাহিদা,, মিডিয়া আমাদের চাহিদা পুরণ করে চলেছে।।
অথচ,, আমাদের সামনেও সুযোগ ছিলো,, এগিয়ে যাওয়ার।। আমরা এগিয়ে যেতে পারিনি,, কারণ,, এগিয়ে যাওয়ার সদিচ্ছা আমাদের ছিলো না।।
আমাদের মিডিয়া চূড়ান্ত অপরাধ করে চলেছে।। যারা দিনের পর দিন এই সমস্ত মিডিয়ার পাশে থেকে TRP দিয়ে চলেছেন,, তারাও সমান অপরাধী।। কাতারের মতো ছোট্ট একটি দেশ,, কেবলমাত্র একটি নিউজ চ্যানেলের দ্বারা বিশ্বের অন্যতম শক্তিতে পরিণত।। অথচ,, আমরা আজতক,, কালতক,, পরশুতকের মতো শত শত নিউজ চ্যানেল নিয়েও,, গোটা বিশ্বের কাছে ধিকৃত,, অপমানিত,, অবহেলিত।।
😢😢😢