09/03/2018
নারী দিবসে নারী ---আমার ব্যাক্তিত্বময়ী শ্বাশুড়ি মা ------
By - Krishna Sengupta
নিজে বিয়ে এবং সংসার না করেও যিনি সকলের মা ,তিনি আমার শ্বাশুড়ি মা |তিনি আমার স্বর্গত শ্বশুরের আপন সহোদর ছোট বোন ,আমার পিসি শ্বাশুড়ি |তিনি ছিলেন একটি উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ের প্রধানা শিক্ষিকা |যে স্কুলটা তিনি তিলে তিলে নিজের হাতে তৈরি করে
উচ্ছ মাধ্যমিক পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন | স্কুলটি হলো চিন্তামণি চমৎকার বালিকা বিদ্যালয় |
তিনি স্কুলে শুধু দশটা পাঁচটা করেই ক্ষান্ত ছিলেন না ,তিনি আরো লেখাপড়া না জানা বাড়ির
গৃহবধূদের শিক্ষিত করার জন্য সেই স্কুলে সান্ধ্য ক্লাসের আয়োজন করেছিলেন |যাতে সেই
গৃহবধূরা অন্তত নিজের নামটা নিজে লিখতে পারে ,তাদের ছেলেমেয়েদের প্রাইমারি শিক্ষাটুকু
দিতে পারে |তিনি বয়স্ক মহিলাদের সাক্ষরতার জন্য রামকৃষ্ণ মিশনেও একটা ক্লাসের ব্যবস্থা
করেছিলেন |তাছাড়া আরো অনেক সংগঠন যেমন নারী কল্যাণ সমিতি ,নাগরিক কমিটির
সদস্য ,রামকৃষ্ণ মিশন ,সারদা সংঘের প্রেসিডেন্ট প্রভৃতি সংঘঠনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন |
এত গেলো বাইরের জগৎ |আর বাড়ির সংসারের জগতে তার ছত্রছায়ায় ? কে ছিল না |
সকলে বলতো এই বাড়িটা একটা আশ্রম |আর সেই আশ্রমে তার ছত্রছায়ায় কে কে ছিল জানেন
ছিল নিঃসন্তান দাদা বৌদি ,৮০ বছরের অবিবাহিত পিসতুতো ভাই , পিতৃমাতৃহীন বড় দাদার
তিন মেয়ে ও দুই ছেলে ,নিজের বিধবা দিদি ও তার অসুস্থ মেয়ে ,অন্যান্য দিদির ছেলেরা
দিদির নাতনি ,এবং আরো কোনো আত্মীয় যদি চোখের জল ফেলতো তবে সেও তার ছত্রছায়ায়
আশ্রয় পেয়ে যেতো |যদি কোনো পরিচিত সহায়হীন ব্যাক্তি হাসপাতালে ভর্তি থাকতো তবে
তিনি তার জন্য নিত্য খাবার পাঠানোর ব্যাবস্থাও করতেন |আসল কথা আকাশের মতো
উদার একখানা হৃদয় ছিল তার আর সেখানে দায়িত্ব আর কর্তব্য পাশাপাশি অবস্থান করতো |
তার ছত্রছায়ায় আমি এবং আমার ছোট জা তার দাদার ছেলের বৌ হিসাবে জায়গা পাই |ইতিমধ্যে তিনি তার দাদার মেয়েদের ও নাতনিকে যোগ্য করে যোগ্য পাত্রের হাতে তুলে দেন |
বাড়ির গেটের বাইরে তিনি ছিলেন ভীষণ কঠোর ,আপোষহীন ,এবং ব্যাক্তিত্বময়ী |বাইরের লোকেরা তাকে যেমন ভয় পেতো তেমন সন্মান করতো |কিন্তু বাড়ির গেটের মধ্যে ঢুকলেই
তার চেহারা একদম পাল্টে যেতো |তিনি হয়ে উঠতেন সকলের মা |বাড়িতে উনি হাসিমুখে
ঢুকতেন ,বাড়িতে এসে তিনি ক্লান্ত হয়ে বসে পড়তেন না ,আগে দেখতেন বাড়িতে সবাই ঠিক আছে কিনা ,কারো কোনো সমস্যা হয়েছে কিনা ,রান্নার লোক ,কাজের লোক এসেছে কিনা |
বিশ্রাম বলে তাঁর কিছু ছিল না |সকালে উঠে প্রাণায়াম ,স্নান করে ,পুজো করে স্কুল যাওয়ার জন্য তৈরি হতেন রোজই একই সময়ে |বাসন মাজার লোক না আসলে আমাদের সরিয়ে দিয়ে
নিজেই বসে পড়তেন বাসন মাজতে |বিশ্রামের সময় সবসময় উনার হাতে থাকতো বই |
বেশিরভাগ আধ্যাতিক ,বা ঠাকুর আর মা সরদার বই |আমাদের পুরানো আমলের দোতালা বাড়ি |উপর তলায় ছিল দুই ছেলের মানে আমি আর আমার জায়ের ঘর ,আর বাকি সবাই নিচের তলায় থাকতো |কিন্তু আমাদের সবার আড্ডাখানা ছিল নিচের তলায় একটা বড় ঘরে |
সেখানে আমরা দুই জা শ্বাশুড়ি ,আমাদের ছেলেমেয়েরা সবাই মিলে আড্ডা দিতাম ,টি.ভি দেখতাম ,লুডো খেলতাম ,|ওটাই ছিল আমাদের সকলের বসার ঘর |আর সেই সাধারণ ঘরেই
ছিল স্কুল টিচার ,প্রফেসর ,ডাক্তার ,এম.এল এ .সাংবাদিকদের আনাগোনা |সবাই আসতো
আমার স্বাশুড়ীমার কাছে নানারকম আলোচনার জন্য |শ্বাশুড়ি মা কিন্তু আমাদের একবারও
সেই ঘর থেকে চলে যেতে বলতেন না |বলতেন বৌমারা ওনাদের কিছু খেতে দাও |আমরা ওই ঘরে বসেই সবাই একসঙ্গে গল্প করতাম |সাংবাদিকরা বাড়িতে এসে স্বাশুড়ীমার সম্বন্দে কিছু
জানতে চাইলে বলতেন আমার সম্বন্দে আর কি লিখবেন |আমি খুব সাধারণ |সভা সমিতিতে
উদ্বোধনের জন্য বাড়ির সামনে গাড়ি আসলে উনি খুব উনি খুব সাধারণ ভাবেই যেতেন |
একই সাজ একটা ভালো শাড়ি হাতে ঘড়ি ,আর ঘরে ব্যাগ |আমরা দুই বৌ জোর করে হাতে একটা বালা পরিয়ে ,গায়ে বডিস্প্রে দিয়ে দিতাম |উনি হাসিমুখে বিরক্ত হতেন |বলতেন কি করছো তোমরা ,আমার এসব ভালো লাগে না |পরবর্তীকালে উনি সভা সমিতি পছন্দ করতেন
না |বলতেন আরো অনেক লোক আছে ,ওদের নিয়ে যাও ,আমার ভালো লাগে না |বাইরের কত লোককে যে উনি অর্থ সাহায্য করতেন |মেয়েদের উনি খুব সন্মান করতেন |মেয়েদের অপমান
সহ্য করতে পারতেন না |নাতি নাতনিরা বলতো দিদা চলন্ত ডিকশনারি |নাতি নাতনিদের সব সময় বলতেন ভালো করে পড়াশুনা করে নিজের পায়ে দাড়াও |উনি নিজের কাজ নিজেই করতে ভালোবাসতেন |বলতেন আমাকে করতে দাও নইলে পঙ্গু হয়ে যাবো |শেষের দিকে অবশ্য
আমরা জোর করে আয়া রেখেছিলাম |কিন্তু শেষপর্যন্ত উনাকে যেতেই হলো |নিত্য প্রাণায়াম ,
যোগাসন ,ব্যায়াম ,স্বল্প আহার ,কিছুই তাকে অনিবার্য্য অবধারিত পরিণতির হাত থেকে
রেহাই দিলো না |নিজের জেদ ,অহমিকা ,দাপট ,সবকিছু ঠিক রেখে মাথা উঁচু রেখেই পরিণত
৯০ বছরে পা রেখে ১৯১১ সালে ২৩সে ফেব্রুয়ারী তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন |আমরা আমাদের মা কে হারালাম |বিশ্বাস রাখি তিনি মর্ত্যধামে যে সুকর্ম করে গেলেন ,স্বর্গধামে
গিয়ে তিনি নিশ্চয় তাঁর সুফল লাভ করবেন |
তাঁর কথায় বলতে চাই -----জীবনের লক্ষ্য নয় সুখ | সাধারণ জীবনের লক্ষ্য হলো কর্তব্য পালন |