26/07/2024
মেয়েটি ক্লাস নাইনে পড়ে। সে এখন এক জনের বেটার হাফ্। গতরাতে তার ঘুম হয় নি। সারারাত ধরে আকাশকুসুম ভাবনায় তার হৃদয় ব্যকুল ছিল। বোধ হওয়ার পর থেকে নিজের বাড়িতে সকলের সাথে কাটানো সময়ের যতো স্মৃতি সব যেন চোখের সামনে ঘোরাফেরা করছে। একই সময়ে তার হবু স্বামীর সাথে লুকিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে কাটানো কিছু মুহূর্ত তার শৈশব স্মৃতি গুলোকে ধীরে ধীরে পরাজিত করে চলেছে একের পর এক। তার অবুঝ হৃদয়ে বিপরীত ধর্মী এই স্মৃতির লড়াই তাকে ঘুমোতে দেয় নি সারারাত।
ভোর বেলা ঘরের বাইরে পাখির কলতান আর হিমেল বাতাস। ক্লান্ত শরীরে বিছানায় ছকটফটানি। অশ্রু জলে ভেঁজা বালিশ। ঘুম আর আসে না। এভাবেই সকাল ৭টা বাজলো। প্রতিদিনের মতো মায়ের ডাক, " কিরে ঘুম থেকে কখন উঠবি? অনেক বেলা হয়েছে এবার ওঠ্।"
ডাক শুনে তম্বীরুপার দুচোখে যেন স্রোতের বন্যা বয়ে চলেছে। আজকের পর থেকে এই ডাক সে আর হয়তো শুনতে পাবে না। এক অজানা অচেনা কণ্ঠ হয়তো বলবে,” ইশ্! রাজার বেটি, ৬ টা বেজে গেছে, এখনো ঘুম থেকে ওঠার নাম নাই।"
তম্বীরুপা হিসাব মেলানোর চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। অবুঝ, অপরিপক্ব হৃদয় দাম্পত্য জীবনের জটিল অংক মেলাবে কি করে? দাম্পত্য জীবনের জটিল যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগ তার চেনাজানা সরল সূত্র দিয়ে যে মেলা খুব কঠিন ; এটা তো সে জানেই না। তাই ভাবনা ছেড়ে আবেগের ওপর ভর করে বিছানা ছেড়ে উঠে পরে সে। ঘর থেকে বেরোনোর আগে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তার ঘুম না হওয়া ফোলা চোখ দুটোকে শান্ত করার চেষ্টা করে। তারপর, ঘরের বাইরে এসে নিজের মুখ, নিজের কষ্ট, নিজের গোপন অভিসন্ধি লুকোনো চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু যে মা তাকে পেটে ধরেছে, যে মা দিনের পর দিন কষ্ট করে, রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে তাকে মানুষ করেছে তাকে কি ফাঁকি দেওয়া যায়? মা জিজ্ঞেস করে, " কি রে কি হয়েছে তোর?" তম্বীরুপা চুপ করে থাকে। কোনো উওর দেয় না। তার কাছে উত্তরই বা কি আছে? সে তো আর বলতে পারে না," মা, আমি তোমাদের অকৃত্রিম, নিঃস্বার্থ ভালোবাসাকে ত্যাগ করে আজকে চলে যাচ্ছি এক অজানা জীবন যুদ্ধে। " না, সে বলতে পারে না এটা। তার আবেগ তাকে পাগল বানিয়েছে। তার, সাময়িক ভালোলাগা, ভালবাসা তাকে অন্ধ, বধির, অজ্ঞ করে দিয়েছে।
তাই সে চুপ থাকে। মা, আরও জিজ্ঞেস করে, "কি হয়েছে তোর?" তম্বীরুপা রেগে যায়। সে চিৎকার করে বলে, " বলছি তো কিচ্ছু হয় নি। বিরক্ত করো না তো।" হ্যা, মায়ের কথা তার বিরক্ত লাগছে। আবেগের বশে অন্যের সাময়িক ভালোবাসায় সে এখন সম্মোহিত। তাই তার মায়ের সারাজীবনের নিখাত ভালোবাসা তার বিরক্ত লাগছে। মা চুপ করে যায়। মা জানে না তার মেয়ে কতো বড় একটা ভুল করতে যাচ্ছে আজ। মা চুপ করে যায় ঠিকই কিন্তু তার মন মানে না। চিন্তামগ্ন হয়ে পড়ে সে।
এভাবে ১০টা বাজে। এখন স্কুলে যাওয়ার সময়। তম্বীরুপা স্নান সেরে নেয়। তারপর, বাড়ির উঠোন, ঘরের ভিতর, আলমারি, পড়ার টেবিল, রান্নাঘর, সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে। বাবা বাড়িতে নেই, কাজে বেড়িয়ে গেছে। তম্বীরুপা নিজের ব্যাগ গুছিয়ে রেডি হয়ে খেতে বসে। খেতে পারে না। এক অজানা আতঙ্ক তাকে গ্রাস করে নেয়। মা বুঝতে পারে মেয়ের কিছু হয়েছে। মা স্কুলে যেতে নিষেধ করে। কিন্তু, তম্বীরুপা যে একজনকে কথা দিয়েছে। তাকে তো আজকে যেতেই হবে। তাই মায়ের না শব্দটা আজ তার কানে ঢোকে না।
সে বেড়িয়ে পড়ে। বেড়িয়ে পড়ে অজানা এক যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে, যে যুদ্ধে তার সেনাপতি অপরিপক্ক ঢাল-তরোয়ালহীন এক নব্য যুবক।
সে পোঁছে যায় পূর্বনির্ধারিত গোপন ঘাঁটিতে। তার সারাজীবনের সবকিছুকে পেছনে ফেলে রেখে কল্পনা আর স্বপ্নকে বাহন করে এক চুক্তিহীন প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা রেখে অথৈজলে নেমে পরে সে। যার সাময়িক ভালবাসা পরাজিত করেছে অগণিত প্রিয় মানুষ গুলোর দীর্ঘদিনের ভালবাসকে সে এবার এগিয়ে আসে। সিঁথিতে সিঁদুর লাগিয়ে সাতপাক ছাড়াই সে সঙ্গী করে নেয় তম্বীরুপাকে। শুরু হয় তাদের ভয়ানক লড়াই; সে এক ভয়ানক লড়াই।