10/08/2026
#একটি সাফল্যের গল্প
— স্বপন সিংহ, প্রধান শিক্ষক, নগর ডাকালীগঞ্জ হাই স্কুল।
#একদিন দুপুরে হঠাৎ আমার ঘরে এসে হাজির হল জয়দীপ।
— “কী রে জয়দীপ, কী খবর? কেন এসেছিস?”
মুখে আনন্দের ঝিলিক নিয়ে জয়দীপ বলল,
— “স্যার, আমি UPSC (CAPF) পরীক্ষায় পাশ করেছি।”
খবরটি শুনে আমিও অত্যন্ত আনন্দিত হলাম।
— “খুব ভালো খবর! তাহলে এরপর কী? এবার তো জয়েনিং?”
জয়দীপ বলল,
— “না স্যার। এরপর ফিজিক্যাল টেস্ট এবং মেডিক্যাল টেস্ট আছে।”
সত্যি বলতে কী, এই পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে আমারও বিস্তারিত জানা ছিল না।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম,
— “আজ তাহলে কী জন্য এসেছিস?”
জয়দীপ একটু ইতস্তত করে বলল,
— “স্যার, স্কুলের লোহার বলটা আমার লাগবে।”
— “লোহার বল? কী করবি এটা দিয়ে?”
— “ফিজিক্যাল টেস্টের জন্য প্র্যাকটিস করব, স্যার।”
আমি সঙ্গে সঙ্গে স্কুলের গেমস টিচারকে ডেকে লোহার বলটি জয়দীপের হাতে তুলে দিলাম। যাওয়ার সময় বললাম,
— “ভালো করে প্র্যাকটিস কর। যেন সফল হতে পারিস।”
জয়দীপ তখন মৃদু হেসে বলল,
— “স্যার, আমি তো রোজ সকালে স্কুলের মাঠেই প্র্যাকটিস করি।”
কথাটা শুনে মনটা ভরে গেল। আমাদের সেই বিস্তৃত সবুজ মাঠ—যেখানে ছোটবেলা থেকে জয়দীপ দৌড়েছে, লং জাম্প দিয়েছে, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে এবং বহুবার প্রথম স্থান অধিকার করেছে—সেই মাঠই এবার তার স্বপ্নপূরণের প্রস্তুতির ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
শুরুটা এই বিদ্যালয় থেকেই
২০১৯ সালে জয়দীপ আমার বিদ্যালয়, নগর ডাকালিগঞ্জ হাই স্কুল (H.S.), থেকেই মাধ্যমিক পাশ করেছিল। মাধ্যমিকে সে ৬৫২ নম্বর পেয়ে ব্লকে প্রথম হয়েছিল। তার এই অসাধারণ ফলাফলের জন্য সে রায়-মার্টিনের পক্ষ থেকেও এককালীন আর্থিক সহায়তা পেয়েছিল।
পরবর্তীতে সে কলকাতায় Fishery Science নিয়ে পড়াশোনা করে। পাশাপাশি নিজের উদ্যোগে অনলাইন কোচিংয়ের মাধ্যমে UPSC (CAPF)-এর প্রস্তুতি চালিয়ে যায়।
ছোটবেলা থেকেই জয়দীপের মধ্যে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও শরীরচর্চার প্রতি বিশেষ আগ্রহ ছিল। বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় দৌড়, দীর্ঘলম্ফনসহ বিভিন্ন ইভেন্টে সে নিয়মিত অংশগ্রহণ করত এবং সাফল্য অর্জন করত।
অবশেষে দীর্ঘ অধ্যবসায়, কঠোর পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসের ফল মিলল।
গত ৭ জুলাই প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলে জয়দীপ UPSC (CAPF)-এ All India Rank 150 অর্জন করেছে।
খবরটি শুনে সত্যিই আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত বোধ করেছি।
আমাদের বিদ্যালয়ের বহু ছাত্রছাত্রী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে চাকরি পেয়েছে। কিন্তু UPSC-এর মাধ্যমে সরাসরি Assistant Commandant পদে নির্বাচিত হয়ে জয়দীপ আমাদের বিদ্যালয় তথা এই এলাকার মধ্যে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
জয়দীপের সাফল্যের গল্পটি শুধু একটি চাকরি পাওয়ার গল্প নয়। এটি একটি স্বপ্নকে সামনে রেখে নিরন্তর এগিয়ে চলার গল্প। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও নিজের মেধা, পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর গল্প।
একদিকে বিদ্যালয়ে নিয়মিত পড়াশোনা, অন্যদিকে পড়াশোনার পর বিদ্যালয়ের বিস্তৃত সবুজ মাঠে শরীরচর্চা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে জয়দীপের ভিত।
একটি প্রান্তিক পরিবারের সন্তান হয়েও জয়দীপ প্রমাণ করেছে—স্বপ্ন যদি বড় হয়, লক্ষ্য যদি স্থির থাকে এবং পরিশ্রম যদি অবিচল থাকে, তাহলে প্রতিকূলতা কখনও সাফল্যের পথে চূড়ান্ত বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
আজ জয়দীপ শুধু তার পরিবারকে নয়, তার বিদ্যালয়, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং সমগ্র এলাকার মানুষকে গর্বিত করেছে।
তার এই সাফল্য আমাদের বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীদের কাছে একটি বার্তা বহন করে—
“সুযোগের অপেক্ষায় বসে না থেকে নিজের সুযোগ নিজেকেই তৈরি করতে হয়। অধ্যবসায়, শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাস থাকলে সাফল্য একদিন আসবেই।”
জয়দীপের এই সাফল্যের গল্প তাই শুধু তার নিজের নয়—এটি আমাদের বিদ্যালয়েরও সাফল্যের গল্প। এটি প্রমাণ করে, একটি বিদ্যালয় শুধু পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষা দেয় না; একটি বিদ্যালয় স্বপ্ন দেখতে শেখায়, স্বপ্নকে লালন করতে শেখায় এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার শক্তি জোগায়।
জয়দীপের আগামী কর্মজীবন সাফল্যমণ্ডিত হোক। সমাজ ও দেশমাতৃকার সেবায় তার মেধা, সাহস ও যোগ্যতা নিয়োজিত হোক—এই কামনাই করি।।