25/08/2026
তিন দিন আগে এই মহারাষ্ট্রেই এমন একটা ঘটনা ঘটেছে, যেটা শুধু মহারাষ্ট্র নয়—সারা ভারতকেই একবার থমকে দাঁড়িয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। ঘটনাটা প্রথম শুনলে হয়তো আপনার মনে হবে—“একটা আইফোনের জন্য এত বড় কিছু হয়ে গেল?” কিন্তু একটু গভীরে গেলে বোঝা যায়, গল্পটা আসলে একটা ফোনের নয়।
গল্পটা অভিমান, রাগ, মানসিক অস্থিরতা, পরিবারের ভেতরের দূরত্ব আর এক মুহূর্তের ভুল সিদ্ধান্তের।
আর সেই ভুলের মূল্য?
একটা পরিবার, তিনটে জীবন, একটা পাহাড় আর অসংখ্য মানুষের মনে থেকে যাওয়া একটা প্রশ্ন— আমরা কি আমাদের সন্তানদের সত্যিই বড় করছি, নাকি শুধু তাদের বড় হওয়ার অপেক্ষা করছি?
ছত্রপতি সম্ভাজিনগরের তিসগাঁওয়ের কাছে খাবদিয়া ডঙ্গর পাহাড়। সাধারণ একটা পাহাড়। কিন্তু দু’দিন আগে সেই পাহাড়ের একটা কিনারা যেন একটা পরিবারের সমস্ত সুখ, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎকে নিজের মধ্যে টেনে নিল। সেখানে গিয়েছিল ১৯ বছরের কুণাল। বয়সটা এমন—যে বয়সে একটা ছেলে স্বপ্ন দেখে, পৃথিবীটা নিজের মতো করে চিনতে চায়, নিজের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে জেদ করে, কখনও বাবা-মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে, আবার কিছুক্ষণ পর সেই বাবা-মায়ের কাছেই ফিরে আসে।
সেই কুণালের সঙ্গেই সেদিন বাড়িতে কোনো একটা বিষয় নিয়ে তীব্র অশান্তি হয়েছিল। শুরুতে মানুষের মধ্যে যে কথা ছড়িয়ে পড়েছিল, তা হলো—দামি একটি iPhone এবং তার EMI নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে তার ঝামেলা হয়েছিল। সেই রাগ-অভিমানের পর কুণাল চলে যায় পাহাড়ের দিকে।
তবে এখন তদন্তে পুলিশ বলছে, বিষয়টি শুধু iPhone-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। পরিবারের মধ্যে আগে থেকেই গুরুতর কিছু অশান্তি ও মতবিরোধ ছিল। অর্থাৎ, ফোনটি হয়তো আলোচনায় উঠে আসা একটি কারণ ছিল, কিন্তু পুরো গল্পটা তার চেয়েও অনেক গভীর।
কিন্তু সেদিন পাহাড়ে যা ঘটেছিল, সেটাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর।
কুণাল দাঁড়িয়ে ছিল খাদের একেবারে কিনারায়।
একজন বাবা-মায়ের কাছে সেই দৃশ্য কল্পনা করাটাই অসম্ভব। তাঁরা কি তখন আইফোনের কথা ভাবছিলেন? EMI-এর কথা ভাবছিলেন? কে ঠিক, কে ভুল—সেটা ভাবছিলেন?
না।
একজন বাবা তখন শুধু নিজের ছেলেটাকে বাঁচাতে চাইছিলেন। পরিবারের মানুষ, গ্রামের লোক, পুলিশ, দমকল—সবাই ছুটে এসেছিল। তাঁকে বোঝানো হচ্ছিল। বলা হচ্ছিল ফিরে আসতে। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চেষ্টা চলেছিল তাঁকে সেই কিনারা থেকে সরিয়ে আনার।
ভাবুন তো—
একটা ছেলে কয়েক ফুট দূরে দাঁড়িয়ে। নিচে গভীর খাদ।
আর তার বাবা-মা দাঁড়িয়ে কাঁদছেন, অনুরোধ করছেন—
“বাবা, ফিরে আয়…” কতবার যে তাঁরা এই কথাটা বলেছিলেন, আমরা জানি না। কতবার একজন বাবা নিজের বুকের ভেতরটা কাঁপতে কাঁপতে ছেলের দিকে হাত বাড়িয়েছিলেন, আমরা জানি না। কিন্তু একটা সময় কুণাল আরও কিনারার দিকে চলে যায়। আর তখন একজন বাবা আর নিজেকে আটকে রাখতে পারেননি। ছেলেকে বাঁচাতে তিনি ছুটে গেলেন। তিনি ছেলেকে টেনে ধরতে গেলেন।
আর তারপর…
দুজনেরই ভারসাম্য চলে গেল। বাবা আর ছেলে—একসঙ্গে গভীর খাদে পড়ে গেলেন। একজন মা তখন কী দেখলেন?
নিজের চোখের সামনে তাঁর স্বামী পড়ে গেলেন। তারপর তাঁর একমাত্র সন্তানও। একটা পরিবারের দুইজন মানুষ—যাদের ঘিরেই হয়তো তাঁর পৃথিবীটা ছিল—এক মুহূর্তে তাঁর চোখের সামনে হারিয়ে গেল। সেই দৃশ্য একজন মায়ের হৃদয় কতটা ভেঙে দিতে পারে, সেটা আমরা কেউ কল্পনাও করতে পারি না।
এরপর সঙ্গীতাও পাহাড় থেকে পড়ে মারা যান। একটা পরিবার শেষ হয়ে গেল। যে বাড়িতে হয়তো একদিন হাসির শব্দ ছিল, সেখানে এখন নীরবতা। যে ঘরে একটা ছেলে পড়াশোনা করত, স্বপ্ন দেখত—সেই ঘর এখন শূন্য।
আর সেই বাড়ির দরজার ভেতরে একটি কুকুরও নাকি তার মানুষগুলোর জন্য অপেক্ষা করছিল—পরে পুলিশ বাড়ি খুললে তাকে উদ্ধার করা হয়। এই ছোট্ট ঘটনাটাও যেন পুরো কাহিনিটাকে আরও অসহ্য করে তোলে।
ভাবুন… একটা কুকুর জানে না তার মানুষগুলো আর কোনোদিন ফিরবে না। সে শুধু অপেক্ষা করে। আর আমরা মানুষ? আমরা অনেক সময় পাশে থাকা মানুষটার কষ্টটাই বুঝতে পারি না।
এখানে কিছু কথা উঠে আসে-
আজকের তরুণদের মধ্যে অসাধারণ প্রতিভা আছে, স্বপ্ন আছে, সাহস আছে, ভালোবাসা আছে। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের সমাজে এমন কিছু তরুণও তৈরি হচ্ছে, যারা খুব দ্রুত সবকিছু চায়। এখনই চাই। অন্যের কাছে যা আছে, আমারও চাই। অন্যের জীবন যেমন দেখছি, আমার জীবনও তেমন হতে হবে। একটা না শুনলেই মনে হয়—�“আমাকে কেউ বোঝে না।” একটা চাওয়া পূরণ না হলেই মনে হয়— “আমার জীবনটাই শেষ।”
আর এখানেই বিপদ। কারণ জীবন কখনও আমাদের সব চাওয়া পূরণ করবে না। কখনও বাবা-মা বলবেন “না”। কখনও টাকা থাকবে না। কখনও নিজের পছন্দের জিনিসটা পাওয়া যাবে না। কখনও প্রেম ভেঙে যাবে। কখনও পরীক্ষায় ব্যর্থ হব। কখনও বন্ধুরা এগিয়ে যাবে, আর মনে হবে আমি পিছিয়ে পড়ছি। কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে— জীবনের কোনো একটা মুহূর্ত কখনও পুরো জীবন নয়।
আজ যে কষ্টটা অসহ্য মনে হচ্ছে, কয়েক বছর পর সেই কষ্টটাই হয়তো জীবনের একটা ছোট্ট অধ্যায় হয়ে থাকবে।
কিন্তু আমরা যদি সেই একটা মুহূর্তের রাগে পুরো জীবনটাই শেষ করে ফেলি—তাহলে আর কোনো আগামীকাল থাকে না।
আর বাবা-মায়েদের জন্যও এই গল্পের শিক্ষা কম নয়। সন্তানের সব চাহিদা পূরণ করতে হবে—এমন কথা কেউ বলছে না।
বরং সন্তানকে “না” শুনতেও শেখাতে হবে। কিন্তু সেই “না”-এর সঙ্গে তাকে এটাও বোঝাতে হবে—
“তুই যা চাইছিস, সেটা হয়তো এখন দিতে পারছি না। কিন্তু তোর কষ্টটা আমি বুঝতে চাই।”
সন্তানকে শুধু ভালো স্কুল, ভালো খাবার, ভালো জামাকাপড় আর দামি ফোন দিলেই বাবা-মায়ের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তার মনের দরজাটাও খোলা রাখতে হয়। সে কী নিয়ে কষ্ট পাচ্ছে? কী নিয়ে রাগ করছে? কী নিয়ে নিজেকে ছোট মনে করছে? কেন সে হঠাৎ চুপ হয়ে যাচ্ছে? কেন সে আগের মতো কথা বলছে না? এই প্রশ্নগুলোও করতে হয়। কারণ অনেক সময় সন্তান মুখে বলে— “আমি ঠিক আছি।”
কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে হয়তো একেবারেই ঠিক নেই।
আর এই ঘটনাটা আমাদের সবাইকে একটা কথা মনে করিয়ে দেয়।
আইফোনের দাম যতই হোক, একটা জীবনের দাম তার চেয়ে অসীম বেশি। EMI আবার দেওয়া যায়। ফোন আবার কেনা যায়। ঝগড়া মিটে যেতে পারে। অভিমান একদিন ভেঙে যেতে পারে। কিন্তু একজন বাবা চলে গেলে আর ফিরে আসবেন না।
একজন মা চলে গেলে আর ফিরে আসবেন না। একটা সন্তান চলে গেলে তার ঘরটা আর কোনোদিন আগের মতো হবে না।
হয়তো খাবদিয়া ডঙ্গরের সেই পাহাড় থেকে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা এটাই— কখনও কখনও একটা পরিবারের সর্বনাশ কোনো বড় ঘটনার কারণে হয় না।�হয়তো হয় এক মুহূর্তের রাগে, এক মুহূর্তের অভিমানে, এক মুহূর্তের ভুল সিদ্ধান্তে।
তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটু থামুন। সন্তানের সঙ্গে কথা বলুন। বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলুন। যে মানুষটা রেগে আছে, তার পাশে দাঁড়ান। কারণ একটা জীবন বাঁচাতে অনেক সময় বড় কোনো ওষুধ লাগে না—শুধু একজন মানুষ দরকার, যে বলবে, “আমি আছি, তুমি একা নও।”
আর যদি আমরা এই মর্মান্তিক ঘটনাটার পরও নিজেদের পরিবারে একটু বেশি কথা বলা, একটু বেশি বোঝা, একটু বেশি ধৈর্য ধরা শিখতে পারি— তাহলেই হয়তো এই তিনটি হারিয়ে যাওয়া জীবনের গল্প শুধু একটি মর্মান্তিক গল্প হয়ে থাকবে না।
এটা হয়ে থাকবে আমাদের সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। একটি শিক্ষা, একটি আয়না যেখানে আমরা নিজেদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করব—
“আমরা কি আমাদের সন্তানদের শুধু সফল হতেই শেখাচ্ছি, নাকি বেঁচে থাকতেও শেখাচ্ছি?
#মর্মান্তিক_ঘটনা
Sarkar