04/09/2025
শিক্ষক দিবসের প্রাক্কালে মনে পড়ে যাচ্ছে ছোটবেলায় বাবার ঘামে ভেজা স্যান্ডো গেঞ্জির ভেতরে লুকিয়ে থাকা অক্লান্ত পরিশ্রমের সংগ্রামের কথা। মনে পড়ে যাচ্ছে কাঠের উনুনে রান্না করা মায়ের হাতের সুমিষ্ট আলু সিদ্ধ ভাত খেয়ে গোল্লা ছুটে স্কুল যাওয়ার কথা।।
পথের বাকে ঘুরতে গিয়ে যখন ফেলে আসা অতীত স্মৃতিতে ডুব দি--তখন এক পলকে মনে পড়ে যায় ছোটবেলার শ্রদ্ধেয় প্রিয় স্যার লক্ষণ স্যারের কথা। আর্থিক অনটনের লক্ষণ সীমা অতিক্রম করেও কত আদর যত্নে তিনি যে আমাদের পড়াতেন তা এক কথায়-- পরশ পাথর ছিল, ছিল আরোগ্যের স্পর্শের মত।
মনে পড়ে যায় পাপা কাকুর ঘরে বসে মাথার উপর দিয়ে চলে যাওয়া ন্যারেশন ও ভয়েস চেঞ্জ শেখার কথা। মনে পড়ে যায় পথপ্রদর্শক দাদার সঠিক সময়ে জিওগ্রাফি নিয়ে পড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা ---যে সিদ্ধান্ত আমাকে আর পেছন ফিরে কোনদিন তাকাতে বাধ্য করেনি।
মেঘ পিয়নের চিঠি নিয়ে আজ মনের মধ্যে যখন তিস্তা নদীর খরস্রোতা বয়ে যায় তখনই মনে পড়ে যায় আরো এক পথপ্রদর্শক মিজানুর খান স্যারের কথা-- যিনি মেঘে ঢাকা আকাশের মধ্যেও ঈগলের মত উড়তে শিখিয়েছেন, শিখিয়েছেন-we do not grow when things are easy, we grow when we face challenges.।
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ হলেও আমার কাছে শ্রেষ্ঠ উৎসব পাঁচই সেপ্টেম্বর। জানিনা কেন ,তবে দিনটির প্রতি আমার যে তীব্র আবেগ অনুভূতি কাজ করে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ছাত্র জীবনে বিদ্যালয় কেন্দ্রিক পড়াশোনায় কোনদিনই প্রথম দ্বিতীয় বা তৃতীয় হয়নি। হয়তো হওয়ার মতো যোগ্যতাই আমার ছিল না, কিন্তু যা ছিল তা হলো চেষ্টা। --হাল ছেড়ো না বন্ধু, কন্ঠ ছাড়ো জোরে ---এই মন্ত্রের ওপর ভর করেই নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছি। তাই আজ যেটুকু পেয়েছি তার সবটাই বুদ্ধির জোরে নয় ,চেষ্টার জোরে।
ছাত্র থাকাকালীন যখন অনেক বিষয় না বুঝতে পেরে মুখস্ত করে নিতাম, তখন মনের ভেতর একদম বন্ধ করা পরিস্থিতি তৈরি হতো। সেই সময়ই মনে মনে স্বপ্ন দেখেছিলাম যদি কোনদিন ভুল করেও ছাত্র-ছাত্রী পড়ানোর দায়িত্ব অর্জন করতে পারি, তবে আগে আমার মত যারা শত শত ছাত্র-ছাত্রী বুঝতে না পেরেও ভয়ে বলে উঠতো বুঝতে পেরেছি-- যেন তাদের মত করে তাদের সামনে বিষয়টিকে আমি তুলে ধরতে পারি।
ছাত্র থাকাকালীন স্বপ্ন দেখতাম ক্লাস রুম হবে খোলা মাঠের মত, যেখানে ছাত্র-ছাত্রীরা নির্দ্বিধায় আপন মনের আনন্দে পড়া পড়া খেলায় মেতে উঠবে। বলে উঠবে--- মাগো আমায় ছুটি দিতে বলিস না, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খেলতে থাকব এই পড়া পড়া খেলা।
না শিক্ষক অবস্থায় কখনো চাইনি আমার ক্লাসরুম দম বন্ধ করা হোক, চেয়েছি পড়ানোর বাইরেও তাদের মনের মধ্যে জমে থাকা বদ্ধ গুমট হাওয়াকে আমি নামক মনের জানালার কাছে যেন তারা সহজেই তুলে ধরতে পারে। চাইনি যে ছেলেটি গান করতে ভালোবাসে সে গান ছেড়ে পড়াশোনায় মন দিক। চাইনি যে ফুটবল ভালো খেলে সে ফুটবলকে ত্যাগ করুক, যে ছেলেটি ফিজিক্স না পারলেও ইলেকট্রনিক্সের খুঁটিনাটি জিনিস সহজেই বানিয়ে নিতে পারে, চেয়েছি সমাজ তাকেও তার যোগ্য সম্মান দিক।
ছাত্র-ছাত্রী পড়ানোর এই দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায যা অনুভব করতে পেরেছি তা হল-- ছাত্র-ছাত্রীরা অনেক বিষয় একদিকে যেমন তারা বুঝতে পারেনা, তেমনি আমারও মনে হয়েছে আমিও মনে হয় তাদেরকে তাদের মত করে বিষয়টি বোঝাতে পারেনি। মনে হয়েছে এই ব্যর্থতা শুধু ছাত্র-ছাত্রীর নয় ,এ ব্যর্থতা আমারও। সেই ব্যর্থতা থেকে আরো কিভাবে সহজ সরল উপায়ে তাদের কাছে বিষয়টি তুলে ধরা যায় তার চেষ্টায় মগ্ন থেকেছি। জানিনা কতটা পেরেছি তবে এটুকু বুঝেছি জীবনে যতটুকু শিখতে পেরেছি তা সবটাই আমার প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যই। তাই শিক্ষক দিবসের এই শুভ লগ্নে আমার সকল প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীদের কে জানাই ---তোরা আছিস বলেই আমি আছি। তোরাই আমার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক। তাই তোদের প্রতি রইল আমার অকৃত্রিম ভালোবাসা।
ঈশ্বর আমাদের অনেক কিছু না দিলেও কিছু একটা ইউনিক বৈশিষ্ট্য দেয়--শিক্ষক দিবসের এই প্রাক্কালে আমার প্রিয় ছাত্রছাত্রী নামক বন্ধুদের উদ্দেশ্যে একটা কথাই বলবো --পারলে তোমাদের ভেতরে যে ইউনিক বৈশিষ্ট্য আছে তার যত্ন নেবে।
একটি পাখি মৌমাছিকে প্রশ্ন করেছিল মৌমাছি তুমি এত যত্নে যে মধু তৈরি কর ,আর সাধারণ লোক তা অতি সহজেই নিয়ে চলে যায় --তাতে তোমার মন খারাপ হয় না। মৌমাছি বলেছিল না একদমই হয় না, বরং সে বলেছিল---A man can steal my honey ,but he can never steal my skill. পারলে নিজেদেরকে সেই মৌমাছির মত দক্ষতা সম্পন্ন একজন নাগরিক তৈরি করো।তার জন্য দরকার সঠিক সিদ্ধান্ত ও সঠিক বিষয় নির্বাচন করা। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় শাহরুখ খানের সেই বিখ্যাত উক্তি-----আগার তুম কিসি চিজ কো দিল সে চাহো তো পুরি কায়ানাত উসে তুমসে মিলানে কি সাজিস মে লাগ জাতি হে।
শেষ করি আমার দুটো প্রিয় লাইন দিয়ে----
হোক না ভুল করব ঠিক
এই মন্ত্রই শিখি।
কিউকি কৌশিস কারণে বালো কি
কাভি হার নেহি হোতি।