Abta Nadia

Abta Nadia নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতি,নদিয়া জেলা শাখা।
শিক্ষার দাবি,জাতীয় দাবি
জাতীয় মানতে হবে।

আগামীকাল পশ্চিমবঙ্গ দিবস বলে কিছু একটা বস্তু উদযাপিত হবে। চাড্ডিকূল লম্ফঝম্প করবে যে শ্যামাপ্রসাদ না থাকলে পশ্চিমবঙ্গ হত...
19/06/2026

আগামীকাল পশ্চিমবঙ্গ দিবস বলে কিছু একটা বস্তু উদযাপিত হবে। চাড্ডিকূল লম্ফঝম্প করবে যে শ্যামাপ্রসাদ না থাকলে পশ্চিমবঙ্গ হতই না, হিন্দু বাঙালিরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত ইত্যাদি। কাজেই এই পুরো ঘটনাটা নিয়ে একটা লেখা তুলে দিলাম। বছর তিনেক আগে, আরেকরকম পত্রিকার পুজোসংখ্যার জন্যে লিখেছিলাম। একটা বড় প্রশ্ন সবার আগে করা দরকার। দেশভাগের কোনো ঘটনাই কি উদযাপনের মত ঘটনা? এই লেখাটা থেকেই একটা অংশ আগে তুলে দিই। প্রশ্নটা নিজেকে করবেন।

"আদৌ কাউকেই এই কৃতিত্ব দেওয়া যায় কিনা সে সম্পূর্ণ আলাদা প্রসঙ্গ, আলাদাভাবে লেখা প্রয়োজন তাই নিয়ে। শুধু এইটুকু বলি - দেশভাগের হিউম্যান কস্ট আর দুটো দেশেরই ক্ষয়ক্ষতি, বিশেষ করে রিসোর্সের হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বিচার করলে কৃতিত্ব শব্দটাই এখানে বেমানান। দেশভাগ বাঙালীর কাছে একটা যন্ত্রণার ঘটনা, এবং পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে এমন একটা ধাক্কা যেখান থেকে এই রাজ্যটা কখনোই বেরিয়ে আসতে পারেনি। তাই, অত্যন্ত নোংরা খুনে মানসিকতার লোক না হলে ২০শে জুন তারিখটা নিয়ে উৎসব কেউ করবে না।"

রইলো পুরো লেখাটা 👇

*** বেঙ্গল ফাইলস ***
পশ্চিমবঙ্গের জন্মবৃত্তান্ত ও শ্যামাপ্রসাদ

(১)

"শ্যামাপ্রসাদ পশ্চিমবঙ্গের জনক" বা "শ্যামাপ্রসাদের জন্যেই কলকাতা পশ্চিমবঙ্গে রয়ে গেছে" এই মিথদুটোর বয়স বেশ কয়েকবছর হল। ফি বছর হিন্দুত্ববাদীরা এই নিয়ে প্রচার করে, তার পালটা লেখাও তৈরী হয়, আবার তার পরের বছর একই ঘটনা ঘটে। তবে দুটো মিথকেই সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া যায় কিছু তথ্য আর ম্যাপ দিয়ে। এই লেখার উদ্দেশ্য সেইটাই। যদিও তার আগে ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতটা একটু দেখে নেওয়া প্রয়োজন - তার জন্যে খানিক গৌরচন্দ্রিকা…

তিরিশের দশকের মাঝামাঝি থেকেই ম্যাকডোনাল্ড অ্যাওয়ার্ড (কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড নামেও ইতিহাসে পরিচিত) আর বেঙ্গল টেনেন্সী অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট - মূলত: এই দুটো ঘটনা, আর গ্রামের দিকে বাড়তে থাকা কৃষক আন্দোলন - এই সবকিছুর জেরে ভদ্রলোক হিন্দুরা কংগ্রেসের দিক থেকে মুখ ফেরাতে শুরু করে। বিশেষ করে যে জমিদার আর হিন্দু ব্যবসায়ীদের চাঁদার ওপর কংগ্রেস ভালোমত নির্ভরশীল ছিল, তারা বিমুখ হওয়ায় কংগ্রেস বেশ চাপে পড়ে যায়। ১৯৩৬-৩৭-এর প্রাদেশিক ভোটে আশিটা সাধারণ আসনের মাত্র আটচল্লিশটা আর বিশেষ সংরক্ষিত হিন্দু আসনের মাত্র চারটে জেতে কংগ্রেস। নির্দল হিন্দু প্রার্থীরা জেতে সাঁইত্রিশটা আসনে, হিন্দু মহাসভা দুটো আসনে।

হিন্দু এবং হিন্দুধর্মকে রক্ষার দাবী নিয়ে ততদিনে হিন্দু ভদ্রলোক আইডেন্টিটি তৈরী হয়ে গেছে - মূলত: শিক্ষিত সমাজকে ঘিরে, যাদের বেশিরভাগের গ্রামের দিকে জমিজমা, বাড়ি আর শহরে চাকরি ছিল - অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা ক্ষমতাশালী উচ্চবিত্ত, বা মধ্যবিত্তের ক্রীমি অংশ। চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে প্রান্তিক গোষ্ঠীর লোকজনকেও এই বৃহত্তর হিন্দু সমাজের অংশ হিসেবে টেনে আনার চেষ্টা শুরু হয়। জনপ্রিয় ধর্মীয় উৎসবগুলো হয়ে ওঠে রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র, ফলে গ্রাম বা ছোট মফস্বল শহরের সাধারণ হিন্দুদের মধ্যেও এই প্রবল হিন্দু আইডেন্টিটি ছড়াতে শুরু করে।

১৯৩৬-৩৭ এর ভোটের ফলাফলের পর কংগ্রেসও আর এর বাইরে থাকার কথা ভাবেনি। কমতে থাকা ফান্ড আর সরতে থাকা "ভদ্রলোক সাপোর্টের" ধাক্কায় কংগ্রেসও উঠেপড়ে লেগেছিল হিন্দু প্রোফাইল তৈরী করতে। প্রথম পদক্ষেপ ছিল সুভাষ-শরতের আমলে কংগ্রেস ছেড়ে চলে যাওয়া হিন্দু জমিদারদের খুব কাছের লোক নলিনীরঞ্জন সরকারকে আবার বড় দায়িত্ব দিয়ে ফিরিয়ে আনা। তারপর ক্রমশ: কৃষক আন্দোলন থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়ে উলটে জমিদারদের পক্ষ নেওয়া, সুভাষ-শরতকে একঘরে করে দেওয়া এবং শেষপর্যন্ত সরিয়েই দেওয়া – সবটাই ঘটেছিল বাংলা কংগ্রেসকে ফের ভদ্রলোকদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার উদ্দেশ্যে। জয়া চ্যাটার্জী তাঁর বেঙ্গল ডিভাইডেড বইয়ে রীতিমত তথ্য দিয়ে দেখিয়েছেন যে, এই সময়ে, মানে সুভাষ আর শরৎ বসুকে বের করে দেওয়ার পর, হিন্দু মহাসভা আর বাংলা কংগ্রেসের মধ্যে বিশেষ কোনো তফাৎ সাধারণ চোখে ধরাই পড়তো না।

১৯৪৫-৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে হাতেনাতে ফল পায় কংগ্রেস এই আইডেন্টিটি পরিবর্তনের - বাংলার হিন্দুরা একজোটে কংগ্রেসের পক্ষে ভোট দেয় - একাত্তরটা সাধারণ আসন আর পনেরোটা বিশেষ হিন্দু আসন জেতে কংগ্রেস, তার মধ্যে বেশ কয়েকটা হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের হাত থেকে ছিনিয়ে আনা। হিন্দু মহাসভা ছাব্বিশটা আসনে কংগ্রেসের বিপক্ষে লড়ে পায় মোটে ২.৭৩% ভোট। একটা মাত্র আসনে - বিশেষ ইউনিভার্সিটি আসন – সেখানে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় জেতেন শ্যামাপ্রসাদ। খুব স্পষ্টভাবে, ভদ্রলোক হিন্দুদের রায় ছিল কংগ্রেসের পক্ষেই। অন্যদিকে, সংরক্ষিত তফশিলী আসনের ৮০% জেতে কংগ্রেস, ৩৬-৩৭ সালে যেটা ২৫%-এরও কম ছিল। সব মিলিয়ে মোটামুটি ৯০% হিন্দু ভোটার মনে করেছিল যে কংগ্রেসই তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে। সবচেয়ে বড় কথা - ধনী ব্যবসায়ী, জমিদার - যাদের মধ্যে হিন্দু মহাসভা তিরিশের দ্বিতীয়ভাগ থেকে ক্রমশ: শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, তাদেরও বিপুল সমর্থন পেয়েছিল কংগ্রেস - এই নতুন পাওয়া হিন্দু আইডেন্টিটির জোরে [১]।

আলাদা হিন্দু অধ্যুষিত রাজ্যের দাবীও ওঠে এই সময় থেকেই। ১৯৪৬-এর ভোটে সুরাহওয়র্দীর মন্ত্রীসভার ক্ষমতায় আসা, বিশেষ করে দুর্ভিক্ষের সময়ে যে সুরাহওয়র্দীকে নিয়ে প্রবল ক্ষোভ ছিল হিন্দুদের মধ্যে, ছেচল্লিশের কুখ্যাত দাঙ্গা, এবং সেই সময়ে কলকাতার রাস্তায় ঘটে চলা রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ সামলাতে না পারা - সব মিলিয়ে বাংলার হিন্দুদের বদ্ধমূল ধারণা তৈরী হয়ে যায় যে "মুসলমানদের সরকার" থাকলে বাংলার পাকিস্তান হওয়া কেউ আটকাতে পারবে না, হিন্দুদের থেকে যেতে হবে মুসলমানদের অধীনে। স্বয়ং শ্যামাপ্রসাদের হাতে লেখা ছেচল্লিশ সালের একটা নোট [২] পাওয়া যায় এই মর্মে, যার মূল বক্তব্য ছিল – “বাংলা যদি পাকিস্তান হয়ে যায়, বাঙালী হিন্দুদের যদি পাকাপাকি মুসলমান শাসনে থাকতে হয়, তাহলে সেটা হবে বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতির শেষ অধ্যায়…নীচু জাতের কিছু হিন্দু যারা মুসলমান হয়েছে, তাদের খুশী করতে হিন্দু সংস্কারকে বলি দেওয়া…”

একসময় "অবিভক্ত বাংলা"-র সমর্থক শ্যামাপ্রসাদ সেই সময়েই কিন্তু বাংলা ভাগের পক্ষে চলে গিয়েছিলেন। আর, ব্রিটিশ রাজের শেষ দুটো বছরে, বাংলার হিন্দু ভদ্রলোকদের মধ্যে হিন্দু মহাসভা বস্তুত: কংগ্রেসের সেকেন্ড ফিডল হিসেবেই থেকে গিয়েছিল।

(২)

ছেচল্লিশের দাঙ্গায় দোষী কে সেই প্রসঙ্গে যাওয়া এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। হাজারো লেখা আছে, বই আছে - পড়ে দেখতে পারেন। যেটা বাস্তব, সেটা হল ১৯৪৭ সালে দেশভাগই যে একমাত্র পথ সেইটা মোটামুটি সমস্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বই মেনে নিয়েছিলেন। ১৯৪৭-এর ৮ই মার্চ কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিও জানিয়ে দেয় যে দেশভাগ যদি হতেই হয়, তাহলে মুসলমান-প্রধান বাংলা আর পাঞ্জাবকেও ভাগ করতে হবে। ৩রা জুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলি ঘোষণা করেন যে দশ সপ্তাহের মধ্যে ইংরেজরা ভারত ছেড়ে যাবে। ১৫ই আগস্ট ব্রিটিশ ভারতের দুই উত্তরসুরীর হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া হবে। দুই মুসলমান প্রধান রাজ্য, বাংলা আর পাঞ্জাবকে ভাগ করে মুসলমান অধ্যুষিত পাশাপাশি জেলাগুলো দেওয়া হবে পাকিস্তানকে, আর অ-মুসলমানপ্রধান বাকি জেলাগুলো থেকে যাবে ভারতে।

মানে, ওই দশ সপ্তাহের মধ্যে বাংলার সব হিন্দু রাজনৈতিক নেতা (কংগ্রেস ও মহাসভা মিলিয়ে) - যাঁরা আগের কয়েক বছর ধরে নিরন্তর রাজ্যভাগের কথা বলে এসেছিলেন - তাঁদের সকলকেও এবার দেশভাগের জমাখরচের হিসেব কষতে হবে…

দেশভাগের অধিকাংশ ইতিহাস জানায় যে স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফ তাঁর মর্জিমত কলমের আঁচরে ভারত আর পাকিস্তানকে আলাদা করেছিলেন। তড়িঘড়ি করে করা এই কাজে ভারত আর পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ ছিল দাবার বোড়ে মাত্র। বাস্তবে যদিও, যে রাজনীতিকরা দেশভাগের পক্ষে মত দিয়েছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই স্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে এই নতুন রাজ্যের বর্ডার কী হবে সেইটা স্থির করার কাজ করে গিয়েছিলেন।

কাজটা অবশ্যই সহজ ছিল না। ৩রা জুন থেকে ১৭ই আগস্ট - এই অল্প কয়েকটা দিনের মধ্যেই শুধু যে দুই দেশের সীমা নির্ধারণ করতে হবে তা নয়, ভাগ করতে হবে আরো অনেক কিছুই - নদীনালা, রাস্তা, ব্রিজ, রেলপথ, গুদামে থাকা জিনিসপত্র, মায় সরকারি কর্মচারীদেরও। আর, এমনও নয় যে এর কোন ব্লুপ্রিন্ট কোথাও ছিল, যাতে সেটা দেখে দেখে কাজটা সহজেই করে ফেলা যায়। বেসিক গ্রাউন্ডরুল লন্ডন ও দিল্লী থেকেই বলে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু রাজ্যের কোন অঞ্চল কীভাবে ভাগ হবে - সেটা ছাড়া হয়েছিল রাজ্যের ওপরেই। এই গ্রাউন্ডরুল অনুযায়ী বাংলার আইনসভাকে দুটো ভাগে ভাগ করা হবে - মুসলমান আসনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটা ভাগ, আর হিন্দু আসনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে আরেকটা ভাগ - দুটো ভাগেই আলাদা করে দেশভাগের ওপর ভোট নেওয়া হবে আর, কোনো একটা ভাগে পার্টিশনের পক্ষে ভোট হলেই ভাগ করা হবে রাজ্যকে। ২০শে জুন ১৯৪৭ - যে দিনটাকে হিন্দুত্ববাদীরা পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে পালন করা শুরু করেছে - সেই দিন, বাংলার আইনসভায় এই দুটো ভাগ তৈরী করে ভোট হয়। সেই ঐতিহাসিক ভোটে, একেবারে প্রত্যাশিতভাবেই হিন্দু অংশ ভোট দেয় বাংলা ভাগের পক্ষে আর মুসলমান অংশ ভোট দেয় বিপক্ষে। বাংলার রাজ্যপাল ফ্রেডেরিক বারোওজ টেলেক্স করে মাউন্টব্যাটেনকে জানান -
Separate meetings of members West repeat West Bengal Legislative Assembly this afternoon decided under paragraph six of H.M.G.’s statement by 58 votes to 21 votes that Province should be partitioned; and under paragraph eight of statement by 58 votes to 21 votes again that West Bengal should join existing Constituent Assembly. Separate meeting of members East repeat East Bengal Legislative Assembly this afternoon decided under paragraph six of statement by 106 votes to 35 votes that Province should not repeat not be partitioned; under paragraph eight of statement by 107 votes to 34 that East Bengal should join new Constituent Assembly; and under paragraph thirteen of statement by 105 votes to 34 votes that East Bengal would agree to amalgamation of Sylhet. [৩, ৪]

এখানে যেটা দেখার, সেটা হল বাংলা ভাগের পক্ষে রাজ্যের হিন্দু প্রতিনিধিরা একজোট হয়েই ভোট দিয়েছিলেন, আর সেই সময়ে আইনসভায় হিন্দু মহাসভার তরফে ছিলেন একজনই - শ্যামাপ্রসাদ নিজে। কাজেই, খুব সাধারণ অঙ্কের হিসেবেও ৫৮টা ভোটকেই শ্যামাপ্রসাদ হিসেবে ধরা যায় না (সে ইদানীংকালে কেউ কেউ ২৯৪ আসনে তাঁকেই প্রার্থী হিসেবে দেখতে বললেও)...

মানে, আগে যে ধারণার কথা লিখেছিলাম - বাংলার অধিকাংশ হিন্দু রাজনৈতিক নেতৃত্বই রাজ্যভাগের প্রশ্নে একমত ছিলেন - আইনসভাতে হিন্দু অংশের সংখ্যাগরিষ্ঠের মত সেই ধারণাকেই প্রতিষ্ঠিত করে। আর এই হিন্দু প্রতিনিধিদের প্রায় সকলেই বাংলা কংগ্রেস থেকে আসা। পশ্চিমবঙ্গের গঠনের পিছনে হিন্দু মহাসভা ও শ্যামাপ্রসাদের আলাদা কোনো কৃতিত্ব নেই। বরং বলা ভালো কোনো কৃতিত্বই নেই।

[আদৌ কাউকেই এই কৃতিত্ব দেওয়া যায় কিনা সে সম্পূর্ণ আলাদা প্রসঙ্গ, আলাদাভাবে লেখা প্রয়োজন তাই নিয়ে। শুধু এইটুকু বলি - দেশভাগের হিউম্যান কস্ট আর দুটো দেশেরই ক্ষয়ক্ষতি, বিশেষ করে রিসোর্সের হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বিচার করলে কৃতিত্ব শব্দটাই এখানে বেমানান। দেশভাগ বাঙালীর কাছে একটা যন্ত্রণার ঘটনা, এবং পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে এমন একটা ধাক্কা যেখান থেকে এই রাজ্যটা কখনোই বেরিয়ে আসতে পারেনি। তাই, অত্যন্ত নোংরা খুনে মানসিকতার লোক না হলে ২০শে জুন তারিখটা নিয়ে উৎসব কেউ করবে না।]

(৩)

এবার আসা যাক অন্য প্রসঙ্গটায় - কলকাতার পশ্চিমবঙ্গে থাকা বা না-থাকা নিয়ে…তার জন্যে আমাদের যেতে হবে ২০শে জুন ১৯৪৭-এর পরের কয়েক সপ্তাহে, ঢুকতে হবে বাউন্ডারি কমিশনের ভিতরে...যার কাজ শুরু হয়েছিল তুমুল অনিশ্চয়তার মধ্যে। বাংলা আর পাঞ্জাব, দুই জায়গাতেই চারজন বিচারককে নিয়ে তৈরী হয়েছিল বাউন্ডারি কমিশন, দুই কমিশনেই চেয়ারপার্সন ছিলেন সিরিল র‍্যাডক্লিফ। আর চারজন বিচারককে মনোনীত করেছিল কংগ্রেস আর মুসলিম লীগ। বাংলা কংগ্রেসের তরফে এই কমিশনে ছিলেন জাস্টিস বি.কে. মুখার্জী এবং জাস্টিস সি.সি. বিশ্বাস। মুসলিম লীগের মনোনীত সদস্য ছিলেন জাস্টিস আবু সালেহ মহম্মদ আক্রম, এবং জাস্টিস এস.এ. রহমান। এবং স্বাভাবিকভাবে সকলেই রীতিমত অনুগতভাবে নিজের নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং দলগত নীতির প্রতিনিধিত্ব করে গেছিলেন পুরো সময়টা জুড়ে। মাসখানেক ধরে ৩৬জন উকিল ৩৬টা আবেদন এই কমিশনের সামনে হাজির করলেও (সময়াভাবে আরো ৭১টা আবেদন পেশই করা যায়নি) র‍্যাডক্লিফ পুরো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন শুধুমাত্র কমিশনের চার সদস্যের আনা দাবী আর পাল্টা-দাবীর ওপর ভিত্তি করে - মানে বাস্তবে কংগ্রেসের "সেন্ট্রাল কো-অর্ডিনেশন কমিটি" আর মুসলিম লীগের পেশ করা বক্তব্যের ওপরেই [৫]।

এই পুরো পর্বটা জুড়েই কংগ্রেস হাইকম্যান্ড বাউন্ডারি কমিশন থেকে হাজার মাইল দূরে দাঁড়িয়ে থেকেছিল, রাজ্যের সীমানা সংক্রান্ত সমস্ত সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর ছেড়ে দিয়ে। এই নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি। স্বয়ং বাবাসাহেব আম্বেদকর কংগ্রেসের এই অবস্থানের কড়া সমালোচনা করেছিলেন - তাঁর বক্তব্য ছিল এই সীমানা নির্ধারণ রাজ্যের নয়, দেশের সরকারের দায়িত্ব হওয়ার কথা, এবং এখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বদলে সেনাবাহিনীর লোকজনের থাকা প্রয়োজন, কারণ শেষ অবধি, সীমানার দেখভালের দায়িত্ব তাদেরই। অবশ্যই আম্বেদকরের এই কথায় বিশেষ কেউ কান দেয়নি - না কংগ্রেস হাইকম্যান্ড, না ব্রিটিশ রাজ, না প্রতিরক্ষা দপ্তরের কেউ (ওই দপ্তর থেকে কেউ বাউন্ডারি কমিশনের সামনে হাজির পর্যন্ত হননি)।

সেন্ট্রাল কো-অর্ডিনেশন কমিটিটা ছিল খানিক খিচুরি সংগঠন - বারো সদস্যের এই কমিটিতে দুজন ছিলেন বাংলা কংগ্রেস থেকে (এই দুজনের একজন ব্যারিস্টার অতুল চন্দ্র গুপ্ত - কমিটির চেয়ারম্যান), বাকি দশজন ছিলেন হিন্দু মহাসভা, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন আর নিউ বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের তরফে। বারোজনের মধ্যে দশজন দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদী - স্পষ্টতই যাকে বলা যায় "বিপর্যয়ের রেসিপি"।

এবার, পার্টিশনের গ্রাউন্ড রুল - যেটা লন্ডন থেকে বলে দেওয়া হয়েছিল - সেটা ছোট করে বুঝে নেওয়া দরকার। লন্ডনের তরফে ৩রা জুনের স্টেটমেন্টটা যদি একবার দেখি -

For the immediate purpose of deciding on the issue of partition, the members of the legislative assemblies of Bengal and the Punjab will sit in two parts according to Muslim majority districts (as laid down in the Appendix) and non-Muslim majority districts. This is only a preliminary step of a purely temporary nature as it is evident that for the purposes of final partition of these provinces a detailed investigation of boundary question will be needed; and as soon as a decision involving partition has been taken for either province a boundary commission will be set up by the Governor-General, the membership and terms of reference of which will be settled in consultation with those concerned. It will be instructed to demarcate the boundaries of the two parts of the Punjab on the basis of ascertaining the contiguous majority areas of Muslims and non-Muslims. It will also be instructed to take into account other factors. Similar instructions will be given to the Bengal Boundary Commission. Until the report of a boundary commission has been put into effect, the provisional boundaries indicated in the Appendix will be used. [৬]

পাশাপাশি অবস্থিত মুসলমানপ্রধান জেলাগুলো যাবে পাকিস্তানে, আর বাদবাকি জেলাগুলো থেকে যাবে ভারতে - শুধু এই নিয়মের ভিত্তিতে যদি বাংলা ভাগ করা হয়, তাহলে ভাগীরথী-হুগলীর পূর্বদিকের প্রায় পুরো অঞ্চলই বাদ দিতে হয়, বাদ দিতে হয় গঙ্গার উত্তরের একটা বড় অংশও। ভদ্রলোক হিন্দু বাঙালি পার্টিশন চেয়েছিল কারণ তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের সঙ্গে একসাথে থাকতে চায়নি, ক্ষমতার ভাগাভাগি চায়নি। সেক্ষেত্রে মুসলমান প্রধান জেলাগুলোকে বাদ দিয়ে দিলে পশ্চিমবঙ্গের ভাগে পড়ে থাকে দক্ষিণবঙ্গের অর্ধেক - শুধু বর্ধমান, হুগলী, হাওড়া, কলকাতা, ২৪ পরগণা, বাঁকুড়া, বীরভূম, আর মেদিনীপুর - মানে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলো - ঠিক যে যে জেলায় পার্টিশনের পক্ষে সবচেয়ে বেশি প্রচার চলেছিল...[প্রথম ছবি: Map 1]

অক্ষরে অক্ষরে নিয়ম মেনে চললে এ বড় কঠিন বাস্তব। যে পশ্চিমবঙ্গের জন্য ভদ্রলোক হিন্দু এতদিন লড়ে এলো, বা যে পাকিস্তানের জন্যে মুসলিম লীগ, সেই সবই যদি এরকম পোকায় কাটা অর্ধেক রাজ্য হয়ে যায়, তাহলে সেই রাজ্য কি আদৌ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে? যে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল নিয়ে এত কথা, এই অর্ধেক রাজ্যে সেই ক্ষমতার কতটুকুই বা বাকি থাকবে?

কাজেই, ওই বেঁধে দেওয়া গ্রাউন্ডরুলের মধ্যে একটা বাক্যের আশ্রয় নিতে হয়েছিল কো-অর্ডিনেশন কমিটি আর লীগকে - “It will also be instructed to take into account other factors" - দুই পক্ষই এই "আদার ফ্যাক্টরস"-কে নিজের মত করে ব্যাখ্যা করে তাদের ভাগের অংশকে বাড়ানোর চেষ্টা করে গেছিল ক্রমাগত। তবে, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পয়েন্ট হল যে এই "আদার ফ্যাক্টরস" শব্দবন্ধকে ব্যবহার করে কতটা জমি পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে আনার চেষ্টা করা হবে, তাই নিয়ে কো-অর্ডিনেশন কমিটির মধ্যেই বড়সড় মতভেদ ছিল, আর সেটা একেবারে শুরুতেই সামনে আসে।

এই মতবিরোধটাই এই প্রসঙ্গে আপাতত জরুরী। শ্যামাপ্রসাদের জন্যেই কলকাতা পশ্চিমবঙ্গে এসেছিল কিনা সেটা যাচাই করতে আমাদের ঠিক এই জায়গাতেই যেতে হবে...

(৪)

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল পশ্চিমবঙ্গ কত বড় হলে রাজ্যভাগের রাজনীতির আঙিনার চরিত্ররা সন্তুষ্ট হবেন, আর এই নতুন রাজ্যটাও অর্থনৈতিকভাবে কার্য্যকর হবে। আর এই প্রশ্নে সেন্ট্রাল কো-অর্ডিনেশন কমিটির বিভিন্ন পক্ষ একে অপরের সম্পূর্ণ উলটো মেরুতে বসে ছিলেন। একদল ছিলেন রাজ্যের কলেবর যতটা সম্ভব বাড়ানোর পক্ষে, আরেকদল ছিলেন ছোট কমপ্যাক্ট রাজ্যের পক্ষে - যা শাসন করা অপেক্ষাকৃত সহজ। আর, এই বিভেদ ছিল একেবারে পার্টি লাইন বরাবর। ছোট দলগুলোর দাবী ছিল আকাশপ্রমাণ। হিন্দু মহাসভা আর নিউ বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন চেয়েছিল যতটা সম্ভব এলাকা দাবী করতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ওই "আদার ফ্যাক্টরস" শব্দবন্ধকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অসম্ভব বাড়িয়ে তুলে। এগারোটা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা (বর্ধমান, মেদিনীপুর, বীরভূম, বাঁকুড়া, হাওড়া, হুগলী, কলকাতা, ২৪ পরগণা, খুলনা, দার্জিলিং আর জলপাইগুড়ি) ছাড়াও মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলার অনেক অংশও এদের দাবীর মধ্যে ছিল - যেমন নদীয়ার বড় অংশ, ফরিদপুর, দিনাজপুর, এবং রংপুর আর রাজশাহীর বেশ কিছু অঞ্চল। মহাসভা আর নিউ বেঙ্গলের দাবী মানলে পশ্চিমবঙ্গে আসতো অবিভক্ত বাংলার পাঁচভাগের প্রায় তিন ভাগ [দ্বিতীয় ছবি - Map 2][৭]

উল্টোদিকে, অতুল চন্দ্র গুপ্তর নেতৃত্বে কংগ্রেস ক্যাম্পের দাবী তুলনামূলকভাবে অনেক নিচু স্কেলে বাঁধা ছিল। তাঁরা বলতে চেয়েছিলেন যে অহেতুক অযৌক্তিক দাবীর ফলে পশ্চিমবঙ্গের সীমানা সংক্রান্ত সমস্ত দাবীই লঘু হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলগুলোর প্রতিনিধিরা এই প্রস্তাব নাকচ করলে অতুল চন্দ্র গুপ্ত স্ট্র্যাটেজি বদলে দুটো প্রস্তাব রাখেন - একটা "কংগ্রেস স্কিম", যেখানে অনেক বড় আকারে দাবী পেশ করা হয়েছিল - মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলার অংশ জুড়ে (যদিও সেটাও মহাসভার দাবীর চেয়ে কমই ছিল), আর দ্বিতীয়টা "কংগ্রেস প্ল্যান", যেখানে প্রথম স্কিমের চেয়ে কম এলাকা চাওয়া হলেও সেটা মোটামুটিভাবে ওই মৌলিক তত্ত্ব মেনেই, অর্থাৎ হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোকেই নিয়ে। "আদার ফ্যাক্টরস" হিসেবে অল্প কিছু মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল চাওয়া হয়েছিল এই প্ল্যানে। তৃতীয় ছবি, অর্থাৎ Map 3 খেয়াল করে দেখলে দেখতে পাবেন কংগ্রেস স্কিম আর কংগ্রেস প্ল্যান - দুটোর ক্ষেত্রেই প্রস্তাবিত এলাকা দাগ দিয়ে বোঝানো রয়েছে। এবং, দুটো ম্যাপেই কলকাতা কিন্তু প্রস্তাবিত পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই রয়েছে। হিন্দু মহাসভা এই প্রস্তাবও মানেনি। শেষ অবধি তারা আলাদাভাবে পিটিশন জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। Map 2 তারই ফসল।

মোদ্দা কথা হল, যে কয়েকটা পিটিশন জমা পড়েছিল কংগ্রেস আর হিন্দু মহাসভার তরফে, তার প্রতিটাতেই কলকাতা ছিল পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই। অর্থাৎ, হিন্দুত্ববাদীদের দ্বিতীয় দাবী, যে শ্যামাপ্রসাদের জন্যেই কলকাতা পশ্চিমবঙ্গে এসেছে, সেই দাবীটিকেও এই ম্যাপের দৌলতে সহজেই নস্যাৎ করে দেওয়া যায়।

(৫)

এই লেখাটা এইখানেই শেষ করে দেওয়া যেত। কিন্তু মনে হল সম্পূর্ণতার খাতিরে আরো কিছু তথ্য জুড়ে দেওয়া দরকার। উদ্দেশ্য শ্যামাপ্রসাদ ও হিন্দু মহাসভা, এবং আজকের বিজেপি – উগ্র দক্ষিণপন্থার আসল মানসিকতাটা চিনে নেওয়া…

চল্লিশের দশকের রাজ্যভাগের রাজনীতির সঙ্গীদের থেকে পশ্চিমবঙ্গের জন্যে অনেক কম এলাকা দাবী করে কংগ্রেস বেশ বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়েছিল। যেহেতু দেশভাগের পর তারাই সরকারে বসবে, অর্থাৎ তারাই হবে ব্রিটিশ রাজের উত্তরাধিকারী, সেহেতু, তাদের বিরুদ্ধে “বাংলার জন্মগত অধিকার খর্ব করা” বা “ভারতের নিজস্ব ভৌগলিক এলাকা শত্রুর হাতে তুলে দেওয়া” জাতীয় অভিযোগ তোলা সহজেই সম্ভব। কংগ্রেসের যুক্তিটা এখানে কংগ্রেসেরই দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝতে হবে - তাদের লক্ষ্য ছিল এই নতুন রাজ্যের রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখা, শুধু উত্তরাধিকারী হিসেবে নয়, তার পরেও। এবং তার জন্যে যদি এই অভিযোগের জবাব দিতে হয়, তাহলে সেটাই এই ক্ষমতা ধরে রাখার দাম। এবং হিন্দু মহাসভাও এইটা ভালোমতনই বুঝে গেছিল।

হিন্দু কো-অর্ডিনেশন কমিটি পাকাপাকি ভেঙে যাওয়ার পর হিন্দু মহাসভা আর তাদের সঙ্গীরা বুঝে যায় যে তাদের আর হারানোর কিছু নেই, এবং তারা চাইলে নির্বিচারে আরো যুক্তিহীন দাবীও তুলতে পারে। এবং দক্ষিণপন্থী হিন্দুদের সামনে এই দেখনদারি চেঁচামেচিতে বরং তাদের লাভ হওয়ার সম্ভাবনাও থেকে যায় (যেটা আজ একেবারে ১০০% বাস্তব)। চরম দক্ষিণপন্থী সংগঠনগুলো আরো চমকপ্রদ দাবী তুলতে থাকে মহাসভার উস্কানিতে...যেমন আর্য্য রাষ্ট্র সংঘ (হয়তো হাতে গোনা একশোটা লোক ছিল এতে) অবিভক্ত বাংলার পাঁচভাগের চারভাগ চেয়ে বসে, সঙ্গে বাংলার প্রত্যেকটা শহরও, কারণ বাংলার শহরাঞ্চলে হিন্দুদের সংখ্যা বেশি…

মহাসভা এই নতুন জন্মানো রাজ্যের সীমানা নিয়ে ক্রমশঃ আরো উদ্ভট দাবী করতে শুরু করে কারণ তারা পুরোপুরি বুঝে গিয়েছিল যে এই নতুন রাজ্যে তাদের কোনো রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নেই। কাজেই, পাশাপাশি জেলার তত্ত্ব উড়িয়ে দিয়ে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ যে কোনো জেলাকেই তারা পশ্চিমবঙ্গে ঢোকানোর কথা বলে ওই "আদার ফ্যাক্টরস"-এর হিসেবে। যেমন, গোটা নদীয়া চেয়ে বসে শ্রীচৈতন্যের জন্মস্থান হিসেবে, রাজশাহী চেয়ে বসে সেখানে বারেন্দ্র রিসার্চ সেন্টার রয়েছে বলে, এবং বরিশাল - সেখানকার হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জন্যে। মহাসভা জানতো যে তাদের এই দাবীগুলো কোথাওই কোনো গুরুত্ব পাবে না, তা সত্ত্বেও নিজেদের "হিন্দুস্বার্থ রক্ষার সৈন্য" হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টায় খামতি রাখেনি। দুইদিকেই লাভ - একদিকে হিন্দুস্বার্থ রক্ষার একনিষ্ঠ সৈনিকের খ্যাতি - যদি দাবীগুলোর একটাও বাস্তবে সত্যি না হয়; অন্যদিকে কংগ্রেসের প্ল্যানের বাইরে সামান্য এলাকাও পশ্চিমবঙ্গে এলে তার কৃতিত্ব নেওয়ার সুযোগ...একই সঙ্গে ভবিষ্যতের ইলেকশন যুদ্ধে নিজেদের জায়গা পোক্ত করা। বস্তুতঃ প্রোপাগান্ডাই ছিল মহাসভার মূল উদ্দেশ্য। সেদিনও যা ছিল, আজও তাই।

উল্টোদিকে কংগ্রেসের হাতে এই কল্পনাবিলাসের সুযোগ ছিল না। নতুন যে রাজ্য তৈরী হবে, তাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল, আর তাদের প্রতি পদক্ষেপ ছিল সেই লক্ষ্যে। অতুল গুপ্তের তত্ত্বাবধানে কংগ্রেসের কমিটি রাজ্যের প্রতিটা থানার জনসংখ্যার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব করেছিল সেন্সাস রিপোর্টের সাহায্য নিয়ে [চতুর্থ ছবি - Map 4]। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে দেখলে, কংগ্রেস প্ল্যানে অনেক সমস্যা চোখে পড়লেও, কংগ্রেসের প্ল্যানাররা মোটামুটিভাবে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির কথা ভেবেই সীমানা নির্ধারণের চেষ্টা করেছিলেন। দার্জিলিং এর চা-বাগান এলাকা, ভাগিরথী-হুগলীর নদীপথ, এবং কলকাতা বন্দরের কথা ভেবে মালদা-মুর্শিদাবাদ-নদীয়া - এগুলো সব তাঁদের প্ল্যানে ধরা ছিল - “this territory has been included in West Bengal for the most compelling factor of essential necessity for requirements and preservation of the Port of Calcutta. The life of the Province of West Bengal is mostly dependent on Calcutta, and with the partition it will become wholly so dependent” [৮] - অর্থাৎ, এখানেও কলকাতাকে বাদ দিয়ে কোনো প্ল্যানই ছিল না। পশ

19/06/2026

*_দেশভাগের ইতিহাস :_*
*_যে কথা মৌলবাদী রাজনীতির আড়ালে হারিয়ে যায়_*
”"""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""

১৯৪৭ সালের দেশভাগ ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গভীর ক্ষতচিহ্ন। মানুষের মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি, এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করে চলা স্মৃতির যন্ত্রণা নিয়ে আজও সীমান্তের কাঁটাতার সেই ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে।

এই ভাগ শুধু মানচিত্রের আঁকাবাঁকা রেখা নয়, মানুষের বুকের উপর দিয়ে ছুরি চালিয়ে আধখানা করে দেওয়ার থেকেও কষ্টকর।

কিন্তু আজকের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি সেই জটিল ইতিহাসকে একটি সরল, বিদ্বেষমূলক বয়ানে পরিণত করছে — যেন ভাগের জন্য একমাত্র দায়ী মুসলিম লিগ এবং মুসলমান সম্প্রদায়।

এই বয়ান কেবল অর্ধসত্য নয়, এটি ইতিহাসের সঙ্গে সুচিন্তিত প্রতারণা। তথ্য ও গবেষণার আলোয় এই মিথকে ভাঙা দরকার।

হিন্দুত্ববাদী আখ্যানের কেন্দ্রে আছে - মুহম্মদ আলি জিন্নাহ ও মুসলিম লিগের দ্বিজাতি তত্ত্বই দেশ ভাগের মূল কারণ। জিন্নাহ নিশ্চয় দায়ী এবং তার সাথে দায়ী অন্যান্যরাও।

ঐতিহাসিক সত্য হল এই জিন্নার আগেই দ্বিজাতি তত্ত্ব সমান্তরালভাবে হিন্দু মহাসভাতেও প্রচারিত হচ্ছিল।

বিনায়ক দামোদর সাভারকর — হিন্দুত্বের প্রধান তাত্ত্বিক — ১৯৩৭ সালে হিন্দু মহাসভার আহমেদাবাদ অধিবেশনের সভাপতির ভাষণে স্পষ্ট বলেছিলেন: "ভারত দুটি জাতি নিয়ে গঠিত — হিন্দু এবং মুসলমান।"

জিন্নাহ এই একই কথা বলেছিলেন ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবে।
অর্থাৎ দ্বিজাতি তত্ত্ব এককভাবে কোনো এক পক্ষের উদ্ভাবন নয় — এটি উভয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির যৌথ ফসল।

A. G. Noorani তাঁর The RSS: A Menace to India গ্রন্থে বলেছেন - যে RSS ও হিন্দু মহাসভার বিভাজনমুখী রাজনীতি দেশ ভাগের পরিবেশ তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল।

আয়েশা জালাল তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ The Sole Spokesman: Jinnah, the Muslim League and the Demand for Pakistan (১৯৮৫)-এ দেখিয়েছেন যে জিন্নাহ মূলত পাকিস্তানকে একটি দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছিলেন — তাঁর আসল লক্ষ্য ছিল একটি ফেডারেল বা কনফেডারেল ভারতে মুসলমানদের জন্য সাংবিধানিক সুরক্ষা।

কিন্তু নেহরু ও প্যাটেল সেই সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, কারণ তাঁরা দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর চাইছিলেন এবং একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন।

রামচন্দ্র গুহ তাঁর India After Gandhi (২০০৭) গ্রন্থে লিখেছেন যে মাউন্টব্যাটেনের ত্বরান্বিত পরিকল্পনায় কংগ্রেস নেতারা স্বেচ্ছায় সম্মতি দিয়েছিলেন।

মুশিরুল হাসান তাঁর Legacy of a Divided Nation (১৯৯৭) গ্রন্থে আরও বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছেন যে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং ক্ষমতার লড়াই কীভাবে বিভাজনকে অনিবার্য করে তুলেছিল।

হিন্দুত্ববাদী বয়ান ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক দায়কে সুকৌশলে আড়াল করে। অথচ ইতিহাসের পাঠ বলে, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বীজ ব্রিটিশ শাসনই বপন করেছিল — পরিকল্পিতভাবে।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ছিল এই নীতির প্রথম বড় প্রয়োগ — হিন্দু ও মুসলমানদের আলাদা প্রশাসনিক এককে বিভক্ত করে তাদের মধ্যে স্বার্থের বিরোধ তৈরি করা।

১৯০৯ সালের মর্লে-মিন্টো সংস্কারে প্রথমবারের মতো সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে আলাদা ভোটাধিকার দেওয়া হয়, যা হিন্দু-মুসলমানকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিল।

Yasmin Khan তাঁর The Great Partition: The Making of India and Pakistan (২০০৭) গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছেন যে সাইরিল র‍্যাডক্লিফ মাত্র পাঁচ সপ্তাহে বাংলা ও পাঞ্জাবের সীমারেখা টেনেছিলেন — এমন একজন আইনজীবী যিনি এই অঞ্চলে কখনো আসেননি, এখানকার ভাষা, সংস্কৃতি বা ভূগোল সম্পর্কে যাঁর কোনো প্রত্যক্ষ জ্ঞান ছিল না। সেই অযত্নের, তাড়াহুড়োর রেখা চিহ্ন লক্ষ লক্ষ মানুষকে উদ্বাস্তু জীবনে ঠেলে দিয়েছিল। এই দায় কোনো ভারতীয় সম্প্রদায়ের নয় — ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের।

বাংলার ভাগ নিয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সত্য হিন্দুত্ববাদী বয়ানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। ১৯৪৭ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শরৎচন্দ্র বসু মিলে অবিভক্ত স্বাধীন বাংলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন — একটি ধর্মনিরপেক্ষ, সম্মিলিত বাংলা রাষ্ট্রের স্বপ্ন। এই প্রস্তাব নেহরু ও প্যাটেল নাকচ করেছিলেন — কিন্তু শুধু তাঁরাই নন। বাংলার ভেতর থেকেই এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সক্রিয় বিরোধিতা এসেছিল।

ইতিহাসবিদ জয়া চ্যাটার্জি তাঁর যুগান্তকারী গবেষণাগ্রন্থ Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932–1947 (Cambridge University Press, ১৯৯৪)-এ এই বিস্মৃত সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর মূল থিসিস ছিল: বাংলার বিভাজন কেবল মুসলিম লিগের দাবির ফলাফল নয় — এটি ছিল বাংলার হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সক্রিয় এবং সুপরিকল্পিত অর্জন।

তিনি তথ্য ভিত্তিক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ১৯৩২ সালের পর থেকেই বাংলার হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেসের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পশ্চিমবঙ্গের জন্য আলাদা প্রদেশের দাবি তুলতে শুরু করেছিল।

এর মূল কারণ ছিল শ্রেণিগত ভয়। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের পরে নির্বাচনী রাজনীতি শুরু হলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে পূর্ববঙ্গের মুসলমান কৃষক সমাজ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে রাজনৈতিক ক্ষমতায় আসবে। হিন্দু জমিদার শ্রেণি এবং কলকাতাকেন্দ্রিক বাবু সমাজ — যারা বহু শতাব্দী ধরে পূর্ববঙ্গের ভূমি ও বাণিজ্যের উপর কর্তৃত্ব ভোগ করে এসেছিল — তারা এই পরিবর্তনকে তাদের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখেছিল।

তিনি দেখিয়েছেন যে হিন্দু বাঙালি মধ্যবিত্তের কাছে "বাঙালি জাতীয়তাবাদ" এবং "হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা" কীভাবে অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠেছিল।

রবীন্দ্রনাথের ভাষা ও সংস্কৃতির বাংলা এবং ধর্মীয় পরিচয়ের বাংলা — এই দুইকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছিল। ফলে মুসলমান বাঙালিকে কার্যত বাঙালি সংস্কৃতির বাইরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছিল।

তাঁর তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ: ১৯৪৬-৪৭ সালে হিন্দু মহাসভা এবং বাংলা কংগ্রেসের হিন্দু নেতারা অবিভক্ত বাংলার পক্ষে একটি গণভোটের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তারা চেয়েছিলেন হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলি নিয়ে একটি পৃথক পশ্চিমবঙ্গ, যেখানে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য অক্ষুণ্ণ থাকবে।

তিনি এই প্রক্রিয়াকে বলেছেন "হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার রাজনৈতিক বিজয়" — যা ইতিহাসের পাতায় চাপা পড়ে গেছে।
আজকের প্রেক্ষিতে এই গবেষণার রাজনৈতিক তাৎপর্য অপরিসীম।

আজকের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি যে বয়ান দেয় — "মুসলমানরা বাংলাকে ভেঙেছে" — জয়া চ্যাটার্জির দলিলভিত্তিক গবেষণা সেই বয়ানকে নস্যাৎ করে ।
সত্য হল,বাংলার বিভাজনে সে দিনের হিন্দু অভিজাত শ্রেণির সম্মতি এবং উৎসাহ ছিল সমানভাবে — কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশিই — সক্রিয়।

হিন্দুত্ববাদী প্রচার দাবি করে যে কেবল হিন্দুরাই দেশ ভাগের শিকার হয়েছিলেন। সংখ্যা ও তথ্য ভিন্ন কথা বলে। পাঞ্জাবে হিন্দু, শিখ ও মুসলমান — তিনটি সম্প্রদায়ই সমানভাবে নৃশংস সহিংসতার শিকার হয়েছিল। Urvashi Butalia তাঁর The Other Side of Silence: Voices from the Partition of India (১৯৯৮) গ্রন্থে শত শত মৌখিক সাক্ষ্য সংগ্রহ করে দেখিয়েছেন সব সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ এই নৃশংসতার শিকার হয়েছিলেন।

আজকের ভারতে দেশ ভাগের ইতিহাসকে ঘৃণার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

পার্থ চট্টোপাধ্যায় তাঁর The Nation and Its Fragments (১৯৯৩) গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে জাতীয়তাবাদী ইতিহাস-রচনা সবসময়ই নির্বাচিত স্মৃতির উপর দাঁড়িয়ে থাকে — কিছু ঘটনাকে সামনে আনে, কিছুকে ঢেকে রাখে।

হিন্দুত্ববাদী বয়ানও তাই করে: ব্রিটিশের দায়, কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত, হিন্দু মহাসভার ভূমিকা — এগুলি আড়াল করে শুধু মুসলমানকে দোষী করা হয়।

জ্ঞানেন্দ্র পান্ডে তাঁর Remembering Partition: Violence, Nationalism and History in India (২০০১) গ্রন্থে এই ঘটনাকে বলেছেন "ইতিহাসের রাজনৈতিক ব্যবহার" — যা বর্তমানের বিভাজনকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য অতীতকে নতুন করে লেখে।

দেশভাগের প্রকৃত শিক্ষা হলো—মানুষকে যদি ধর্মের খাঁচায় বন্দি করা হয়, তবে শেষ পর্যন্ত সবই হারিয়ে যায় ।

সত্যিকারের ইতিহাস কখনও একরেখার গল্প নয়। সেখানে কোনো একক ভিলেন নেই, কোনও একক শিকারও নেই।

আছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ষড়যন্ত্র, উভয় পক্ষের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, নেতাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, এবং লক্ষ কোটি সাধারণ মানুষের অসহায় কান্না।

ইতিহাসের উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নয়, প্রজ্ঞা।

"""""'""'''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''

গ্রন্থপঞ্জি ও তথ্যসূত্র :-
১. Ayesha Jalal — The Sole Spokesman: Jinnah, the Muslim League and the Demand for Pakistan, Cambridge University Press, 1985.

২. Joya Chatterji — Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932–1947, Cambridge University Press, 1994.

৩. Yasmin Khan — The Great Partition: The Making of India and Pakistan, Yale University Press, 2007.

৪. Urvashi Butalia — The Other Side of Silence: Voices from the Partition of India, Duke University Press, 1998.

৫. Ramachandra Guha — India After Gandhi: The History of the World's Largest Democracy, HarperCollins, 2007.

৬. Mushirul Hasan — Legacy of a Divided Nation: India's Muslims Since Independence, Westview Press, 1997.

৭. Partha Chatterjee — The Nation and Its Fragments: Colonial and Postcolonial Histories, Princeton University Press, 1993.

৮. Gyanendra Pandey — Remembering Partition: Violence, Nationalism and History in India, Cambridge University Press, 2001.

৯. A. G. Noorani — The RSS: A Menace to India, LeftWord Books, 2019.

১০. V. D. Savarkar — Presidential Address, Hindu Mahasabha, Ahmedabad Session, 1937.

••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••

19/06/2026

পশ্চিমবঙ্গ দিবস : শ্যামাপ্রসাদ কতটুকু কৃতিত্বের দাবিদার?

রাজ্য জুড়ে উৎসবের আবহ... যোগ বিয়োগের ঘনঘটা। এর মধ্যেই হাজির হয়েছে ২০ জুন তারিখটি। স্বাধীনতার আটাত্তরটি বসন্ত পার করে অবশেষে তার ভাগ্য সুপ্রসন্ন ... সহসা তার অঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ দিবসের সম্মান। এবং জনগণ উল্লসিত। তবে নিন্দুকও কম নেই। তারা সব ভালো কাজেই বাগরা দেয়। এবারেও প্রশ্ন তুলেছে, কেন? কী প্রয়োজন?

এমনিতেও দেশভাগ খুব জটিল একটি রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ইতিহাস। এক কথায় বা একটি ব্যক্তির নিরিখে ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা সম্পূর্ণ ভুল ভাবনা। আজ পশ্চিমবঙ্গ দিবসকে নিয়ে যা বলা হচ্ছে সমস্তটাই বিশুদ্ধ রাজনৈতিক ন্যারেটিভ। যার ঐতিহাসিক ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল। কিন্তু কিছু জনপ্রিয় কয়েনেজ ব্যবহার করে, যেমন হিন্দু বাংলা বা মুসলিম বাংলা ইত্যাদি ...এই ছদ্ম ইতিহাসকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা হয়েছে। যেভাবে হিন্দুত্ববাদী বা অন্যান্য রাজনৈতিক অন-ইতিহাস ছড়িয়ে দেওয়া হয় সেভাবেই।

২০ শে জুনকে আলাদাভাবে দেখবার চেষ্টাটা তাই সম্পূর্ণ অযৌক্তিক । দেশভাগ তথা বাংলাভাগের বীজ নিহিত ছিল ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গের মধ্যেই, কিংবা তারও আগে। এবং বিভিন্ন চাপানউতরের পর ... কমিউনাল রোয়েদাদ ইত্যাদি... দ্বি’জাতি তত্ত্বের সূত্রপাত হয় যার প্রথম উল্লেখ অবশ্য ১৯৩৭ সালে সাভারকারের ভাষণে দেখতে পাওয়া যায়। এবং সাভারকরের ভাবনার সঙ্গে মুসলিম লীগের দ্বিজাতি তত্ত্বের ভাবনা সম্পূর্ণভাবে মিলে যায় যেখানে হিন্দু এবং মুসলিমকে দুটি পৃথক জাতি হিসেবে তুলে ধরবার চেষ্টা করা হয়েছে।

এই পথেই ২০ জুন আসলে মাউন্টব্যাটেনের ৩রা জুনের ডিক্লারেশনের একটা মধ্যকালীন ধাপ মাত্র। এবং দেশভাগই যে একমাত্র পথ সেইটা মোটামুটি সমস্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বই মেনে নিয়েছিলেন। ফলে দ্বি-জাতি তত্ত্বকেই দেশভাগের ভিত্তি করে তোলা হয়। মুসলিম লীগ ১৯৪০ সালে লাহোর অধিবেশনে পাকিস্তান প্রস্তাব গ্রহণ করে। এরপর ১৯৪৭-এর ৮ই মার্চ কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিও জানিয়ে দেয় যে দেশভাগ যদি হতেই হয়, তাহলে মুসলমান-প্রধান বাংলা আর পাঞ্জাবকেও ভাগ করতে হবে। দেশ ভাগের পদ্ধতি নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতৃত্ব — দ্বন্দ্বের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয় বাংলা ও পাঞ্জাব। তৎকালীন ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেন দায়িত্ব নিয়েই এই দ্বন্দ্বের মীমাংসায় কংগ্রেস, লিগ এবং শিখ নেতৃত্বের সঙ্গে বারংবার আলোচনায় বসেন, এবং তাদের প্রায় বাধ্য করেন মেনে নিতে যে এই দ্বন্দ্বের মীমাংসায় জন্য দেশভাগ অনিবার্য সিদ্ধান্ত। তবে এটাও বোঝাপড়ায় আসে যে পাঞ্জাব ও বাংলার অমুসলিম প্রধান এলাকাগুলো পাকিস্তান থেকে বাদ দেওয়া হবে। এই প্রেক্ষিতেই ৩রা জুন মাউন্টব্যাটেন ডিক্লারেশন আসে। ইংল্যান্ডের মন্ত্রিসভা যা ঠিক করে, তাই এখানে প্রতিফলিত হয় - ‘For the immediate purpose of deciding on the issue of partition, the members of the legislative assemblies of Bengal and the Punjab will sit in two parts according to Muslim majority districts (as laid down in the Appendix) and non-Muslim majority districts. This is only a preliminary step of a purely temporary nature as it is evident that for the purposes of final partition of these provinces a detailed investigation of boundary question will be needed; and as soon as a decision involving partition has been taken for either province a boundary commission will be set up by the Governor-General, the membership and terms of reference of which will be settled in consultation with those concerned. It will be instructed to demarcate the boundaries of the two parts of the Punjab on the basis of ascertaining the contiguous majority areas of Muslims and non-Muslims. It will also be instructed to take into account other factors. Similar instructions will be given to the Bengal Boundary Commission. Until the report of a boundary commission has been put into effect, the provisional boundaries indicated in the Appendix will be used...’ : দুই মুসলমান প্রধান রাজ্য, বাংলা আর পাঞ্জাবকে ভাগ করে মুসলমান-প্রধান জেলাগুলো যাবে পাকিস্তানে, আর বাদবাকি জেলাগুলো থেকে যাবে ভারতে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলি ঘোষণা করেন যে দশ সপ্তাহের মধ্যে ইংরেজরা ভারত ছেড়ে যাবে। প্রথমে ১৯৪৮ সাল, পরে মাউন্টব্যাটেনের তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তে ঠিক হয় ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট ব্রিটিশ ভারতের দুই উত্তরসুরীর হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া হবে। এই প্রস্তাব হিন্দু-মুসলিম এবং শিখ পক্ষ ... এবং তাদের প্রতিনিধি হিসেবে কংগ্রেস, মুসলিম লীগ (হিন্দু মহাসভার কোন প্রতিনিধিত্বই ছিল না) ও শিখদের প্রতিনিধি এই প্রস্তাবটি স্বীকার করে নেওয়ায় কার্যত দেশভাগ অবশ্যম্ভাবী হয়ে যায়। যাকে আইনিভাবে ২০ জুনের প্রাদেশিক আইনসভার ভোটাভুটিতে চূড়ান্ত করা হয়। এই সময়ে গুরুদাসপুর, নোয়াখালী এবং কলকাতার দাঙ্গা হিন্দু ও মুসলিম উভয় জনগোষ্ঠীর মনে পরস্পরের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ তৈরি করে। যার সুযোগ নিয়ে কংগ্রেস ও লীগের বিভাজনপন্থী নেতৃত্ব দেশকে ভাগ করার পরিকল্পনায় সফল হয়।

তৃতীয় আরেকটি পক্ষ, কমিউনিস্টদের অবস্থান কিন্তু বরাবর দেশভাগের বিপক্ষেই ছিল। এবং অখন্ড বাংলাকে ভারতের মধ্যে রাখার পক্ষে তারা মতামত দিয়েছে - কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাদের এই মতামত স্পষ্ট ভাবে প্রকাশিত হয়েছে। অথচ দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ থাকায় কংগ্রেসের ভিতরে থেকে কাজ করা, পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমকালে ফ্যাসিবাদকে পরাস্ত করার ভাবনায় জাতীয় আন্দোলন থেকে সরে থাকলেও এবং তৎকালীন ভারতে বিভিন্ন শ্রেণী আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে যথেষ্ট প্রভাব তৈরি করলেও কমিউনিস্ট বিরোধিতার জায়গা থেকে মাউন্টব্যাটেন তাদের আলোচনার অংশীদার করেনি। তা সত্ত্বেও তারা জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের একটি মডেল উপস্থাপন করেন … যেখানে ভারতীয় ডোমিনিয়নের ভিতরে প্রতিটি স্বতন্ত্র পরিচিতিগুলি একটি ফেডারেশন হিসাবে কাজ করবে। সোভিয়েত রাশিয়াকে অনুসরণ করে এই মডেল আপাতভাবে একটি জটিল প্রক্রিয়ার কথা বলেছিল - যা অনুধাবন করা সেই সময়ের জনগণের জাতীয়তাবাদী চরিত্রের পক্ষে সহজ ছিল না। কমিউনিস্টদের মধ্যেও এই নিয়ে যথেষ্ট বিভ্রান্তি ছিল। তার ওপর তারা কোথাও পৃথক মুসলিম জাতিসত্তাকেও স্বীকৃতি দিয়েছিল, এবং হিন্দু অভিন্ন জাতিসত্তার বদলে সঠিকভাবেই তাকে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিচিতি ভিত্তিক সত্তার সম্মিলন হিসাবে দেখেছিল।

২০ জুন ভোটাভুটিতে প্রাথমিকভাবে কমিউনিস্টরা এই পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী অবস্থানের পক্ষেই মতামত দিয়েছিল। তিনজন কমিউনিস্ট প্রতিনিধি (জ্যোতি বসু, রতনলাল ব্রাহ্মিন, রূপনারায়ণ রায়) প্রথম পর্বের যৌথ অধিবেশনে বাংলার অখণ্ডতার প্রশ্নে ভোটগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে … যেহেতু গৃহীত প্রস্তাব তাদের অবস্থানের অর্থাৎ জাতির স্বায়ত্তশাসনের কথা বলেনি। কিন্তু পরবর্তীতে যৌথ অধিবেশনে অখন্ড বাংলার ভারতে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব পরাজিত হলে, দেশভাগ অবধারিত হলে মুসলমান ও অমুসলমান (হিন্দু নয়) প্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে দুটি পৃথক অধিবেশনের ভোটাভুটিতে পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে ভোট দেয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে রক্ষা করার তাগিদে … স্বাধীনতা পত্রিকায় এবং পরবর্তীকালে জ্যোতি বসুর আত্মজীবনীতে, এবং বিভিন্ন কমিউনিস্ট নেতৃত্বের লেখালেখিতে এই মনোভাব স্পষ্ট হয়। তবে তাদের এই জটিল অবস্থানের প্রতিফলন আপাতভাবে দেশভাগের পক্ষেই তাদের মতামত - এই ধারণা তুলে ধরে, দক্ষিণপন্থী অংশের মতামতে। এবং একে কেন্দ্র করে বর্তমানে দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী ন্যারেটিভ এর নির্মাণ, যা দেশভাগের জন্য কমিউনিস্টদের ভিলিফাই করে। অপরদিকে হিন্দু মহাসভার প্রতিনিধি হিসেবে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে হিন্দুদের রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই যে প্রাদেশিক সভার নির্বাচন, তাতে জনগণের সার্বিক প্রতিনিধিত্ব ছিল না, মাত্র ১৪ শতাংশের ভোটে প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়েছিলেন। বাংলা ভাগ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি গণভোটের দাবি তুলেছিল, যা কোনদিনই নেওয়া হয়নি।

এটাও ভেবে দেখার মতো যে হিন্দু মহাসভার পক্ষে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় একা প্রতিনিধি ছিলেন, সার্বিক ভোটের বিচারে তাঁর সংখ্যা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। বরং কংগ্রেসের বাংলা ভাগের পক্ষে থাকা বিধায়করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত এবং কিরণ শংকর রায়। অমুসলিম সংখ্যাধিক্য অংশ বা পশ্চিমবঙ্গের প্রস্তাব জয়ী হয় ৫৫-২১ভোটে। এই ৫৫টি ভোটের মধ্যে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী মাত্র ১টি ভোট দিয়েছেন। যদি ভোট উনি নাও দিতেন, তাতেও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হতো না। যদিও এটা ঠিক, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের হিন্দুত্ববাদী অবস্থান কোন গোপন বিষয় ছিল না। দেশভাগ প্রসঙ্গে অবশ্য প্রাথমিকভাবে আরএসএস বা হিন্দু মহাসভা কোন মতামত রাখেনি, প্রথম সভারকার তার হিন্দু রাষ্ট্রের ধারণায় হিন্দু মুসলিম পৃথক জাতিসত্তার প্রসঙ্গ স্থাপন করেন, এবং অখন্ড হিন্দু ভারত রাষ্ট্রের কথা বলেন। পরবর্তীকালে দেশভাগ অনিবার্য হলে হিন্দু মহাসভা তার অবস্থান পরিবর্তন করে এবং হিন্দু বাংলার ধারণা সামনে আনে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই পথেই উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কিন্তু তার একক প্রতিনিধিত্ব কোনদিনই এই বিষয়ে ডিসাইসিভ ভূমিকা গ্রহণ করবার জায়গায় ছিল না। এটাও ঠিক, যে তিনি সারা জীবন তার এই চিন্তা ভাবনার সঙ্গেই ঘর করেন। রাজনৈতিক প্রয়োজনে তাকে ত্যাগ করেননি, বা সরে আসেন নি। এই প্রসঙ্গে কংগ্রেসের শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এর প্রতি নরম দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তবতাও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কংগ্রেসের বিভাজনপন্থী অংশ, যারা অনেকেই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি তথা হিন্দু মহাসভার (বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের) রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি আস্থাশীল ছিল। কিংবা মুসলিম রাজনীতির বিরুদ্ধে পাল্টা হিন্দু জাতীয়তাবাদী চিন্তাভাবনার সমর্থক ছিল। কংগ্রেসের সমর্থনে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ১৯৪৬ সালের বাংলার প্রাদেশিক আইন সভায় প্রতিনিধি নির্বাচিত হন, স্বাধীনতার পরেও কংগ্রেস মন্ত্রিসভায় তাকে জায়গা দেওয়া হয়।

কংগ্রেসের হিন্দু রাজনীতির প্রতি ঝোঁক এর কথাগুলো সঠিক ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন অরিজিৎ Arijit Mukherjee । সাহায্য নিয়েছেন মূলতঃ জয়া চ্যাটার্জির লেখা ডিভাইডেড বেঙ্গল বইটির। অরিজিৎ লিখেছেন,

“তিরিশের দশকের মাঝামাঝি থেকেই ম্যাকডোনাল্ড অ্যাওয়ার্ড (কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড নামেও ইতিহাসে পরিচিত) আর বেঙ্গল টেনেন্সী অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট - মূলত: এই দুটো ঘটনা, আর গ্রামের দিকে বাড়তে থাকা কৃষক আন্দোলন - এই সবকিছুর জেরে ভদ্রলোক হিন্দুরা কংগ্রেসের দিক থেকে মুখ ফেরাতে শুরু করে। বিশেষ করে যে জমিদার আর হিন্দু ব্যবসায়ীদের চাঁদার ওপর কংগ্রেস ভালোমত নির্ভরশীল ছিল, তারা বিমুখ হওয়ায় কংগ্রেস বেশ চাপে পড়ে যায়। ১৯৩৬-৩৭-এর প্রাদেশিক ভোটে আশিটা সাধারণ আসনের মাত্র আটচল্লিশটা আর বিশেষ সংরক্ষিত হিন্দু আসনের মাত্র চারটে জেতে কংগ্রেস। নির্দল হিন্দু প্রার্থীরা জেতে সাঁইত্রিশটা আসনে, হিন্দু মহাসভা দুটো আসনে।

হিন্দু এবং হিন্দুধর্মকে রক্ষার দাবী নিয়ে ততদিনে হিন্দু ভদ্রলোক আইডেন্টিটি তৈরী হয়ে গেছে - মূলত: শিক্ষিত সমাজকে ঘিরে, যাদের বেশিরভাগের গ্রামের দিকে জমিজমা, বাড়ি আর শহরে চাকরি ছিল - অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা ক্ষমতাশালী উচ্চবিত্ত, বা মধ্যবিত্তের ক্রীমি অংশ। চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে প্রান্তিক গোষ্ঠীর লোকজনকেও এই বৃহত্তর হিন্দু সমাজের অংশ হিসেবে টেনে আনার চেষ্টা শুরু হয়। জনপ্রিয় ধর্মীয় উৎসবগুলো হয়ে ওঠে রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র, ফলে গ্রাম বা ছোট মফস্বল শহরের সাধারণ হিন্দুদের মধ্যেও এই প্রবল হিন্দু আইডেন্টিটি ছড়াতে শুরু করে। ১৯৩৬-৩৭ এর ভোটের ফলাফলের পর কংগ্রেসও আর এর বাইরে থাকার কথা ভাবেনি। কমতে থাকা ফান্ড আর সরতে থাকা "ভদ্রলোক সাপোর্টের" ধাক্কায় কংগ্রেসও উঠেপড়ে লেগেছিল হিন্দু প্রোফাইল তৈরী করতে। প্রথম পদক্ষেপ ছিল সুভাষ-শরতের আমলে কংগ্রেস ছেড়ে চলে যাওয়া হিন্দু জমিদারদের খুব কাছের লোক নলিনীরঞ্জন সরকারকে আবার বড় দায়িত্ব দিয়ে ফিরিয়ে আনা। তারপর ক্রমশ: কৃষক আন্দোলন থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়ে উলটে জমিদারদের পক্ষ নেওয়া, সুভাষ-শরতকে একঘরে করে দেওয়া এবং শেষপর্যন্ত সরিয়েই দেওয়া – সবটাই ঘটেছিল বাংলা কংগ্রেসকে ফের ভদ্রলোকদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার উদ্দেশ্যে। জয়া চ্যাটার্জী তাঁর বেঙ্গল ডিভাইডেড বইয়ে রীতিমত তথ্য দিয়ে দেখিয়েছেন যে, এই সময়ে, মানে সুভাষ আর শরৎ বসুকে বের করে দেওয়ার পর, হিন্দু মহাসভা আর বাংলা কংগ্রেসের মধ্যে বিশেষ কোনো তফাৎ সাধারণ চোখে ধরাই পড়তো না। ১৯৪৫-৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে হাতেনাতে ফল পায় কংগ্রেস এই আইডেন্টিটি পরিবর্তনের - বাংলার হিন্দুরা একজোটে কংগ্রেসের পক্ষে ভোট দেয় - একাত্তরটা সাধারণ আসন আর পনেরোটা বিশেষ হিন্দু আসন জেতে কংগ্রেস, তার মধ্যে বেশ কয়েকটা হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের হাত থেকে ছিনিয়ে আনা। হিন্দু মহাসভা ছাব্বিশটা আসনে কংগ্রেসের বিপক্ষে লড়ে পায় মোটে ২.৭৩% ভোট। একটা মাত্র আসনে - বিশেষ ইউনিভার্সিটি আসন – সেখানে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় জেতেন শ্যামাপ্রসাদ। খুব স্পষ্টভাবে, ভদ্রলোক হিন্দুদের রায় ছিল কংগ্রেসের পক্ষেই। অন্যদিকে, সংরক্ষিত তফশিলী আসনের ৮০% জেতে কংগ্রেস, ৩৬-৩৭ সালে যেটা ২৫%-এরও কম ছিল। সব মিলিয়ে মোটামুটি ৯০% হিন্দু ভোটার মনে করেছিল যে কংগ্রেসই তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে। সবচেয়ে বড় কথা - ধনী ব্যবসায়ী, জমিদার - যাদের মধ্যে হিন্দু মহাসভা তিরিশের দ্বিতীয়ভাগ থেকে ক্রমশ: শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, তাদেরও বিপুল সমর্থন পেয়েছিল কংগ্রেস - এই নতুন পাওয়া হিন্দু আইডেন্টিটির জোরে।

আলাদা হিন্দু অধ্যুষিত রাজ্যের দাবীও ওঠে এই সময় থেকেই। ১৯৪৬-এর ভোটে সুরাহওয়র্দীর মন্ত্রীসভার ক্ষমতায় আসা, বিশেষ করে দুর্ভিক্ষের সময়ে যে সুরাহওয়র্দীকে নিয়ে প্রবল ক্ষোভ ছিল হিন্দুদের মধ্যে, ছেচল্লিশের কুখ্যাত দাঙ্গা, এবং সেই সময়ে কলকাতার রাস্তায় ঘটে চলা রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ সামলাতে না পারা - সব মিলিয়ে বাংলার হিন্দুদের বদ্ধমূল ধারণা তৈরী হয়ে যায় যে "মুসলমানদের সরকার" থাকলে বাংলার পাকিস্তান হওয়া কেউ আটকাতে পারবে না, হিন্দুদের থেকে যেতে হবে মুসলমানদের অধীনে। স্বয়ং শ্যামাপ্রসাদের হাতে লেখা ছেচল্লিশ সালের একটা নোট পাওয়া যায় এই মর্মে, যার মূল বক্তব্য ছিল – “বাংলা যদি পাকিস্তান হয়ে যায়, বাঙালী হিন্দুদের যদি পাকাপাকি মুসলমান শাসনে থাকতে হয়, তাহলে সেটা হবে বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতির শেষ অধ্যায়…নীচু জাতের কিছু হিন্দু যারা মুসলমান হয়েছে, তাদের খুশী করতে হিন্দু সংস্কারকে বলি দেওয়া…”। একসময় "অবিভক্ত বাংলা"-র সমর্থক শ্যামাপ্রসাদ সেই সময়েই কিন্তু বাংলা ভাগের পক্ষে চলে গিয়েছিলেন। আর, ব্রিটিশ রাজের শেষ দুটো বছরে, বাংলার হিন্দু ভদ্রলোকদের মধ্যে হিন্দু মহাসভা বস্তুত: কংগ্রেসের সেকেন্ড ফিডল হিসেবেই থেকে গিয়েছিল। ….”

তবে পশ্চিমবঙ্গ দিবসের অন্য একটা দিকও আছে। মানে যেদিন বাংলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলি নিয়ে গঠিত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ .... তাহলে সেই জেলার বাইরে থাকা বাংলার বাকি অংশের, পূর্ববাংলার হিন্দু মানুষদের কী হলো? কি হয়েছিল আমরা, সবাই জানি .. এই বিভাজন সেই বিপুল হিন্দু জনগোষ্ঠীকে উদ্বাস্তু মানুষে পরিণত করেছিল .... তাদের নিজ বাসভূমি থেকে উচ্ছেদ করেছিল। অথচ এই হিন্দু পশ্চিমবঙ্গ তাদের সেদিন সাদরে গ্রহণ করেনি। বাঙাল বলে দূরে ঠেলেছিল। তারা না পেয়েছিল সঠিক পুনর্বাসন, না পেয়েছিল এপারের মানুষের সহমর্মিতা। বনেবাদারে, জলা-জঙ্গলে, অন্যের জমি দখল করে তাকে বসতি গড়ে তুলতে হয়েছে। পাশে বামপন্থীরা না থাকলে সেটাও হতো না। দুইটি প্রজন্ম লেগেছে এপারে থিতু হতে .... তাও সবাই পারেনি। আজকের উদ্বাস্তু পরিবারের নতুন প্রজন্ম সে খবর রাখে না, রাখতেও চায় না। যাদের জন্য দেশভাগ, যাদের জন্য তাদের শিকড় ছিন্ন হওয়া ... তাদের বিরুদ্ধে নয়, তাদেরই পক্ষে থাকে। তাদের তৈরি করা বিকৃত ইতিহাসে বিশ্বাস করে। বিভাজনকামী রাজনীতিকে শক্তিশালী করে।

আমি নিজে সেই উদ্বাস্তু উত্তরাধিকার বহন করি। তাদের সব হারিয়ে শিকড় উপড়ে চলে আসার দায়ভার নিয়ে। আমার ঠাকুরদা, বাবা পিসীদের কাছ থেকে সেই ইতিহাসের উত্তরাধিকার লাভ করেছি ... দেখেছি চূড়ান্ত বিদ্বেষ ঘৃণার মধ্যে দিয়ে হওয়া দেশভাগের পরেও তারা আজীবন তাদের মুসলিম প্রতিবেশীদের অভিযুক্ত করেননি। অনেকের ভিতরে অভিমান থাকলেও, রাগ তৈরি হলেও স্বাধীনতার পরে এপারের ধর্মনিরপেক্ষ উদার অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তার সেই নেতিবাচকতাকে তরল করেছে। পারস্পরিক বিদ্বেষের আগুন ছড়াতে পারেনি। রুজিরুটির লড়াইয়ের বাস্তবতা, প্রগতিশীল সংস্কৃতির যাপন ... বিশেষ করে সহজিয়া লোকসংস্কৃতির মিলমিশ ... এবং উদারনৈতিক ও বামমনস্ক রাজনৈতিক প্রতিবেশ এই বিদ্বেষকে পরাজিত করেছিল অনেকদিন পর্যন্ত।

ফিরে আসা যাক জুন মাসের কুড়ি তারিখে। ২০ জুন শুধুমাত্র ৩রা জুনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয় - অর্থাৎ দেশ ভাগ হবে এবং তারা পৃথক পৃথক গণ পরিষদের অংশ হবে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশের আকারের কোন নির্দিষ্টকরণ সেদিন হয়নি …. এই নির্দিষ্টকরণ প্রথম হয় র‍্যাডক্লিফ ঘোষণার মাধ্যমে, প্রকাশিত হয়েছিল ১৭ ই আগস্ট ১৯৪৭; চূড়ান্ত হয় ১৯৫৬ সালে ভারতের রাজ্যগুলির সীমান্ত নির্দিষ্ট করবার মধ্য দিয়ে।

২০ শে জুনকে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সমার্থক করে দেখানো সম্পূর্ণ ভুল ইতিহাস। এটি সম্পূর্ণরূপে গোটা দেশভাগ প্রক্রিয়ার মধ্যবর্তী একটি তারিখ মাত্র।

এবং এটাও দেশভাগের চরম দুঃখজনক স্মৃতিকে পেছনে ফেলে বাঙালি অনেকদূর এগিয়ে এসেছে। এখন আবার পিছনে হাঁটতে চাইছি কেন? সেই দুঃসহ ইতিহাসকে, যাকে ভুলিয়ে রেখেছিল বাঙালি, বিশেষ করে উদ্বাস্তু হয়ে আসা বিপুল জনগণ … নতুন করে থিতু হয়েছে এপারে …. তাকে খুঁচিয়ে সেই বিভাজনের ইতিহাসকে জনজীবনে পুনরুজ্জীবিত করার দরকার পড়ল কেন? পরিষ্কার, রাজনীতির প্রয়োজনেই। এপারে… ওপারেও। সংখ্যাগুরুর উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির হাত ধরে।

প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কোনদিকে থাকব। সদর্থক ভাবনা চিন্তার আশা দিনদিন ক্ষীন হচ্ছে। এই দ্রুতগামী কিন্তু নির্মিত তথ্যায়িত সময়ে (ক্রাফটেড ডেটা) সঠিক কথাটিও ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসে।

পুনঃ উপরের কথাগুলো চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করবেন না। এই বিষয়ে প্রচুর বইপত্র লেখালেখি আছে ... একটু ঝালিয়ে নিতেই পারেন।

@অভিজ্ঞান সেনগুপ্ত

Address

Satyapriya Bhavan, Patramarket
Krishnagar
733102

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Abta Nadia posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The School

Send a message to Abta Nadia:

Shortcuts

Share

Category