01/08/2026
লিখে রাখি প্রেম ✍️ প্রশান্ত সরকার
কিছু মানুষের সঙ্গে আমাদের দেখা হয় খুব দেরিতে। আবার কিছু মানুষের সঙ্গে দেখা হয় ঠিক সময়ে, কিন্তু গল্পটা শেষ হয়ে যায় অসময়ে।
অরিন্দমের জীবনটা ছিল ঠিক পুরোনো বইয়ের মতো—পাতা ছিল অনেক, কিন্তু পড়ার মানুষ ছিল না।
কলেজ স্ট্রিটের পুরোনো বইয়ের দোকানগুলোই ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় আশ্রয়। সে বই কিনত না, স্মৃতি কিনত। পুরোনো পাতার ভাঁজে আটকে থাকা শুকনো ফুল, অচেনা হাতের লেখা, অসমাপ্ত চিঠি—এসব তার কাছে ইতিহাস নয়, জীবন্ত মানুষ।
সেদিন বিকেলে আকাশে বৃষ্টি নামার অপেক্ষা। এক কোণে ধুলো জমা বইয়ের স্তূপ ঘাঁটতে ঘাঁটতে সে পেল একটি নীল কাপড়ে বাঁধানো ডায়েরি।
প্রথম পাতায় লেখা—
"যদি কখনো তুমি আমাকে খুঁজতে চাও, আমার ঠিকানা খুঁজো না। আমার লেখা পড়ো। আমি সেখানে অপেক্ষা করে থাকব।"
তার নিচে আরও একটি লাইন—
"প্রেম সবসময় মানুষকে কাছে আনে না। কখনো কখনো শুধু তাকে আজীবন অপেক্ষা করতে শেখায়।"
আর শেষে একটি নাম—
মেঘলা।
অদ্ভুতভাবে নামটা তার বুকের ভেতর গিয়ে আটকে গেল।
সেই রাতেই পুরো ডায়েরি পড়ে ফেলল অরিন্দম।
ডায়েরির পাতায় ছিল এক মেয়ের ভালোবাসা, অপেক্ষা, হারিয়ে যাওয়া আর অসমাপ্ত থেকে যাওয়ার গল্প।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—ডায়েরির শেষ পাতা ফাঁকা।
মনে হচ্ছিল, গল্পটা শেষ হয়নি।
ঠিক যেমন কিছু মানুষ হঠাৎ জীবন থেকে হারিয়ে যায়, কিন্তু মন থেকে নয়।
কয়েকদিন পর শহরের একটি ছোট্ট পাঠাগারে বইমেলা চলছিল।
বৃষ্টিভেজা বিকেলে একটি মেয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বই সাজাচ্ছিল।
সাদা সালোয়ার, খোলা চুল আর চোখে অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা।
অরিন্দমের বুক কেঁপে উঠল।
সে এই চোখ দুটো আগে কোথাও দেখেছে।
খুব কাছ থেকে।
খুব গভীরভাবে।
হয়তো কোনো ছবিতে।
হয়তো কোনো লেখায়।
মেয়েটি তাকিয়ে বলল—
— "আপনি কি কাউকে খুঁজছেন?"
অরিন্দম উত্তর দিল—
— "হ্যাঁ। অনেকদিন ধরে।"
— "পেয়েছেন?"
— "জানি না। হয়তো এখনই পেলাম।"
মেয়েটি একটু হেসেছিল।
সেই হাসির মধ্যে অদ্ভুত এক কষ্ট ছিল।
সেদিনই প্রথম কথা।
তারপর প্রতিদিন।
ধীরে ধীরে অরিন্দম বুঝল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্কগুলো কোনো ঘোষণা দিয়ে শুরু হয় না।
একদিন হঠাৎ করেই শুরু হয়ে যায়।
মেঘলার সঙ্গে তার সম্পর্কটাও তেমনই।
তারা কখনো হাত ধরেনি।
কখনো ভালোবাসি বলেনি।
তবুও দুজনেই একে অপরের দিনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অংশ হয়ে উঠেছিল।
একদিন বৃষ্টির মধ্যে ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে মেঘলা বলেছিল—
— "জানো, আমি চলে যেতে খুব ভয় পাই না।
আমি ভয় পাই ভুলে যেতে।"
অরিন্দম জিজ্ঞেস করেছিল—
— "আর যদি কেউ তোমাকে কোনোদিন ভুলে না যায়?"
মেঘলা উত্তর দিয়েছিল—
— "তাহলে আমি কোথাও না কোথাও বেঁচে থাকব।"
সেদিন অরিন্দম ডায়েরিটা নিয়ে এসেছিল।
ডায়েরি দেখে মেঘলার চোখ ভিজে উঠল।
খুব আস্তে বলল—
— "এটা আমার।"
— "তোমার?"
— "না... আমার মায়ের।
কিন্তু শেষ কয়েকটা পাতা আমি লিখেছিলাম।"
অরিন্দম চুপ করে রইল।
মেঘলা জানাল—
— "শেষ পাতাটা ইচ্ছে করেই ফাঁকা রেখেছিলাম। কারণ আমি কখনো গল্প শেষ করতে চাইনি।"
— "কেন?"
মেঘলা মৃদু হেসে বলেছিল—
— "যে গল্প শেষ হয়ে যায়, মানুষ তাকে ভুলে যায়। অসমাপ্ত গল্পগুলোই মানুষ সারাজীবন মনে রাখে।"
তার কয়েকদিন পরেই মেঘলা হারিয়ে গেল।
ফোন বন্ধ।
বাড়ি খালি।
কোনো ঠিকানা নেই।
কোনো খবর নেই।
শুধু অনুপস্থিতি।
আর অরিন্দমের বুকের ভেতর এক বিশাল শূন্যতা।
দুই বছর পরে।
অরিন্দম লেখক হয়েছে।
তার প্রথম বইয়ের নাম—
"লিখে রাখি প্রেম"
বইয়ের উৎসর্গপত্রে লেখা—
"যে মানুষটি আমার গল্পের শেষ পাতাটা ফাঁকা রেখে চলে গেছে।"
প্রকাশনার দিন ভিড়ের মধ্যে একজন মেয়ে এসে বইটা কিনল।
সাদা পোশাক।
চোখে চেনা বিষণ্ণতা।
অরিন্দম দূর থেকে শুধু দেখল।
মেয়েটি বইয়ের প্রথম পাতায় হাত বুলিয়ে খুব আস্তে হাসল।
তারপর চলে গেল।
কাউন্টারে একটি চিরকুট রেখে।
চিরকুটে লেখা—
"শেষ পাতাটা এখনও ফাঁকা আছে।
তুমি কি এখনও লিখছ?
— মেঘলা"
অরিন্দম বাইরে দৌড়ে এল।
আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে।
চারপাশে শুধু মানুষ।
কিন্তু মেঘলা নেই।
হয়তো সত্যিই ছিল।
হয়তো ছিল না।
অরিন্দম সেদিন বাড়ি ফিরে ডায়েরির শেষ ফাঁকা পাতাটা খুলল।
কলম হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর লিখল—
"আজও তোমাকে খুঁজছি না। কারণ হারিয়ে গেলে খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু যে মানুষ হৃদয়ে থেকে যায়, তাকে শুধু লিখে রাখা যায়।"