17/04/2022
সাংখ্য দর্শন - পর্ব ২
----------------------
অধ্যয়নের সুবিধার্থে আমরা সাংখ্যতত্ত্বকে নিম্নলিখিত দিক হতে বিশ্লেষণ করবো।
১) সাংখ্য অধিবিদ্যা বা মূলতত্ত্ব
এর ভিতরে চারখানি বিষয় অনুধাবনীয়
ক) সৎকার্যবাদ বা কার্য-কারণবাদ
খ) প্রকৃতি এবং গুণ
গ) পুরুষ
ঘ) জগতের উদ্ভব
২) সাংখ্যমতের ভিত্তিতে জ্ঞান
৩) সাংখ্যমতের ভিত্তিতে মুক্তির ধারণা
৪) সাংখ্যমতের ভিত্তিতে ঈশ্বরের ধারণা
--------------------------------------------------------
-------------------------------
১) সাংখ্য অধিবিদ্যা বা মূলতত্ত্ব
-------------------------------
ক) সৎকার্যবাদ বা কার্য-কারণবাদ
---------------------------
সাংখ্য দর্শনের মূলভিত্তি সৎকার্যবাদ তত্ত্ব, এতে একটিমাত্র নির্দিষ্ট প্রশ্ন করা হয় : কোনো কাজের ফলাফল কি সেই কাজের কারণের মধ্যে আগে থেকেই, এমনকি কাজটি শুরু হওয়ার আগে থেকেই বিদ্যমান থাকে ?
উত্তরে সাংখ্য বলেন - হ্যাঁ; প্রতিবাদে বৌদ্ধ, ন্যায় এবং বৈশেষিক বলেন - না, থাকে না। কিন্তু তাদের যুক্তি ও প্রতিযুক্তিগুলি বিবেচনার পূর্বে একটু বোঝা দরকার এইরকম আপাতজটিল প্রশ্নের প্রয়োজন পড়লো কেন, কি প্রসঙ্গে।
দর্শনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য - জগৎসৃষ্টির কারণ নির্ণয় এবং জগতের প্রকৃত স্বরূপ নির্ণয়। এখন ভেবে দেখলে দেখা যায়, জগৎসৃষ্টি একটি "কাজ"; আর কাজ মাত্রেই তাতে দুইটি কারণের প্রয়োজন হয় - একটি, উপাদান কারণ, বা উপকরণ, যার দ্বারা কাজটি হবে; দ্বিতীয়, নিমিত্ত কারণ, বা একজন কর্তা, যে কাজটা করবে। কাজের একটা ফল, বা রেজাল্টও থাকে।
মাটি থেকে কুমোর কলসী বানালেন - এটি একটি কাজ। এই কাজের উপাদান কারণ - মাটি, নিমিত্ত কারণ - কুমোর, ফল - কলসী।
আরো দুটি জিনিস বোঝার - বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, উপাদান কারণ এবং নিমিত্ত কারণ সর্বদা আলাদা হবে (কুমোর এবং মাটি এক নয়!), এবং নিমিত্ত কারণ সর্বদা এক সজীব অস্তিত্ব হবে, তার নিজের বুদ্ধি থাকবে।
কার্য কারণের মধ্যে এই যে সম্পর্ক আমরা দেখলাম, এই সম্পর্ক মাত্র একটি জায়গাতেই খাটে না - সেটি হল জগৎসৃষ্টি। জগতসৃষ্টির ক্ষেত্রে উপাদান কারণ এবং নিমিত্ত কারণ দুইই এক, সেইটি ঈশ্বর। অর্থাৎ ঈশ্বর নিজেই উপাদান, আবার নিজেই কর্তা।
এই পটভুমিকার প্রেক্ষিতে এবারে ফিরে আসা যাক আগের তর্কটিতে।
বৌদ্ধ এবং ন্যায়-বৈশেষিকগণ বলেন :
১) কোনো একটি কারণের দ্বারা উত্পন্ন না হওয়ার আগে অব্দি ফলের অস্তিত্ব আছে এরূপ আদৌ বলা চলে না।
২) উত্পত্তির আগেই যদি ফল তার কারণের মধ্যে থাকে, তাহলে "ঐটি উত্পন্ন হলো" বা "ঐটি সৃষ্টি হলো" এরূপ বলার কোনো মানেই থাকে না। এছাড়াও, ফলের উত্পত্তির জন্যে কোনো বুদ্ধিমান নিমিত্ত কারণেরও কোনো প্রয়োজন থাকে না। যদি মাটির মধ্যে ঘটটি আগে থেকেই বর্তমান থাকে, তবে কর্মকার কেনই বা কষ্ট করেন বা তাঁর কর্মকৌশল প্রয়োগ করে ঘট তৈরী করেন ?
৩) আরোও, যদি ফল তার উপাদান কারণের মধ্যেই থাকে, তাহলে যুক্তিগতভাবে বলা যেতে পারে যে - ফলকে তার কারণ থেকে কখনই আলাদা করা যাবে না, এবং ঘট ও মাটিকে আমাদের একই নামে ডাকা উচিত, আর একটি ঘট দ্বারা ও একতাল মাটি - দুইই একই কাজে ব্যবহারের যোগ্য হওয়া উচিত।
৪) ফল এবং উপাদান কারণের মধ্যে কেবল রূপ ও আকারের পার্থক্য - এরূপ বলাও ঠিক নয়, কারণ তাহলে আমাদের স্বীকার করতে হয় উপাদান কারণের মধ্যে এমন কিছু নিশ্চয়ই আছে যা তার ফলের মধ্যে নেই, অতএব, কারণের মধ্যে ফল কখনই পূর্ব হতে অবস্থান করে না। এই তত্ত্বটি অসৎকার্যবাদ নামে পরিচিত (অর্থাৎ, কার্য্য বা ফল প্রকৃতিগতভাবে অসৎ, যা উত্পত্তির পূর্বে বর্তমান থাকে না)।
সাংখ্যগণ কার্য-কারণের এই তত্ত্বটি নিম্নের যুক্তিগুলির সাহায্যে বাতিল করেন :
১) যদি কারণের মধ্যে সত্যি সত্যিই ফল অনুপস্থিত থাকে, তবে জগতের কেউই, সব রকমের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সেই কারণ থেকে সেই ফলের উত্পাদন করে উঠতে পারেন না। নীল রংকে লাল রং, বা চিনিকে নুনে কেউ কি পরিবর্তন করতে পারেন ? তাই সঠিকভাবে বলতে গেলে আমাদের বলা উচিত যে, কোনো কারণের দ্বারা কোনো ফল যখন উত্পন্ন হয়, সেই ফল আগে থেকেই কারণের মধ্যেই বর্তমান থাকে এবং নির্দিষ্ট কিছু শর্তের অধীনে সেই ফলগুলি প্রকাশিত হয় মাত্র, ঠিক যেমন বীজ পেষণ করে তেল নির্গত হয়। বুদ্ধিমান কারণের কর্ম, যেমন কুমোর এবং তাঁর যন্ত্রাদি, প্রয়োজন কেবল ফলটিকে (ঘট) বিকাশের জন্যে প্রয়োজন, যা আগে থেকেই তার কারণের (মাটি) মধ্যে বর্তমান।
২) আমরা দেখতে পাই কেবল নির্দিষ্ট কারণই নির্দিষ্ট ফলের উত্পত্তি ঘটিয়ে থাকে। দইয়ের উত্পত্তি কেবল দুধ থেকেই হতে পারে, কাপড়ের উত্পত্তি কেবল সুতো থেকেই হতে পারে। এতে এই বোঝা যায় যে - কোন না কোন ভাবে ফল তার কারণের মধ্যে আগে হতেই বর্তমান থাকে। তা যদি না হতো, তবে যে কোন কারণ হতেই যে কোন ফল উত্পাদন করা সম্ভব হতো। ঘট তৈরী করার জন্যে কর্মকার কেবল মাটিই না নিয়ে, দুধ বা সুতো, বা অন্য কোনো জিনিস নিতেন এবং তা থেকে ঘট তৈরী করে ফেলতেন।
৩) একটি কাঙ্খিত ফল একটি সম্ভাব্য কারণ হতেই উত্পন্ন হয় - এর থেকে বোঝা যায় যে ফল একটি সম্ভাব্যতার আকারে কারণের মধ্যেই নিহিত থাকে। উত্পন্ন বা বিকশিত হওয়ার আগে ফলটি সুপ্ত বা অ-বিকশিত অবস্থায় কারণের মধ্যে থাকে।
৪) যদি কারণের মধ্যে ফল সত্যিই না থেকে থাকে, তবে আমাদের বলতে হয়, ফল উত্পন্ন হওয়া মানে "কিছুই নেই" থেকে "কিছু একটা" তৈরী হলো, যা এক প্রলাপোক্তি।
৫) আমরা দেখতে পাই যে ফল কারণের থেকে আলাদা কিছু নয়, বরং একই। বস্তুত, ফল এবং কারণ একই বস্তুর বাহ্য এবং আভ্যন্তরীণ দুই অবস্থা। কাপড়, সুতো হতে উত্পন্ন এবং দেখতে গেলে সুতোর থেকে কাপড় প্রকৃতপক্ষে আলাদা কিছু নয়; একটি প্রস্তরমূর্তি তার উপাদান, পাথরের সাথে একই, কেবল এক নতুন আকার এবং রূপ তাকে দেওয়া হয়েছে; একটি টেবিলের ওজন তার মধ্যে যে পরিমাণ কাঠ আছে তার সমানই।
এই সমস্তকিছু হতে সাংখ্যগণ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে - বিকশিত বা উত্পাদিত হওয়ার আগে ফল তার কারণের মধ্যেই অবস্থান করে। এইটিই সৎকার্যবাদ (অর্থাৎ, বিকশিত বা প্রকাশিত হওয়ার পূর্বে ফলের অস্তিত্ব থাকে)।
**********************
সৎকার্যবাদের দুই প্রকার
**********************
সৎকার্যবাদের দুইটি প্রকার আছে, যথা - পরিণামবাদ এবং বিবর্তবাদ। প্রথমটির মতে, একটি ফল যখন উত্পন্ন হয়, তখন তার কারণটি প্রকৃত অর্থেই পরিবর্তিত হয়ে যায় (একে পরিণাম বলা হয়), যেমন - মাটি থেকে ঘট তৈরী হয়, বা দুধ থেকে দই তৈরী হয়। সাংখ্যগণ এই প্রকারের সৎকার্যবাদের সমর্থক।
দ্বিতীয় প্রকারের মতে, যা অদ্বৈতবেদান্ত স্বীকার করেন, কারণের এই ফলে পরিবর্তন আপাত, প্রকৃতপক্ষে কোনো পরিবর্তন হয় না। আমরা যখন একটি দড়িতে সাপ দেখি, দড়িটি সাপে পরিণত হয়ে গেছে - তা কিন্তু আদৌ নয়; আসলে দড়িটি কেবল সাপের মতো দেখায়, এই মাত্র। একইভাবে, ঈশ্বর বা ব্রহ্ম তাঁর সৃষ্ট এই জগতে নিজেই পরিবর্তিত হয়ে গেছেন তা নয়, তিনি একই আছেন, কিন্তু আমরা ভুলবশত: ভাবি ঈশ্বর পরিবর্তিত হয়ে এই জগত তৈরী হয়েছে।
(ক্রমশ)