17/04/2022
Philosophical Thoughts
ᴘʜɪʟᴏsᴏᴘʜɪᴄᴀʟ ᴛʜᴏᴜɢʜᴛs
17/04/2022
দর্শন মানুষের চিন্তন ক্রিয়ার প্রসার ঘটাতে বিপুল পরিমাণে সাহায্য করে। এই দর্শন আবার মানুষকে জীবন ধারণের উপযোগী পথপ্রদর্শন করে ।জীবনে যদি কেউ ভালোভাবে চলতে চাই বা সহজ-সরল ভাবে বাঁচতে চায় তবে তাকে দর্শনের পথে চলতে হবে।
সাংখ্য দর্শন - পর্ব ২
----------------------
অধ্যয়নের সুবিধার্থে আমরা সাংখ্যতত্ত্বকে নিম্নলিখিত দিক হতে বিশ্লেষণ করবো।
১) সাংখ্য অধিবিদ্যা বা মূলতত্ত্ব
এর ভিতরে চারখানি বিষয় অনুধাবনীয়
ক) সৎকার্যবাদ বা কার্য-কারণবাদ
খ) প্রকৃতি এবং গুণ
গ) পুরুষ
ঘ) জগতের উদ্ভব
২) সাংখ্যমতের ভিত্তিতে জ্ঞান
৩) সাংখ্যমতের ভিত্তিতে মুক্তির ধারণা
৪) সাংখ্যমতের ভিত্তিতে ঈশ্বরের ধারণা
--------------------------------------------------------
-------------------------------
১) সাংখ্য অধিবিদ্যা বা মূলতত্ত্ব
-------------------------------
ক) সৎকার্যবাদ বা কার্য-কারণবাদ
---------------------------
সাংখ্য দর্শনের মূলভিত্তি সৎকার্যবাদ তত্ত্ব, এতে একটিমাত্র নির্দিষ্ট প্রশ্ন করা হয় : কোনো কাজের ফলাফল কি সেই কাজের কারণের মধ্যে আগে থেকেই, এমনকি কাজটি শুরু হওয়ার আগে থেকেই বিদ্যমান থাকে ?
উত্তরে সাংখ্য বলেন - হ্যাঁ; প্রতিবাদে বৌদ্ধ, ন্যায় এবং বৈশেষিক বলেন - না, থাকে না। কিন্তু তাদের যুক্তি ও প্রতিযুক্তিগুলি বিবেচনার পূর্বে একটু বোঝা দরকার এইরকম আপাতজটিল প্রশ্নের প্রয়োজন পড়লো কেন, কি প্রসঙ্গে।
দর্শনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য - জগৎসৃষ্টির কারণ নির্ণয় এবং জগতের প্রকৃত স্বরূপ নির্ণয়। এখন ভেবে দেখলে দেখা যায়, জগৎসৃষ্টি একটি "কাজ"; আর কাজ মাত্রেই তাতে দুইটি কারণের প্রয়োজন হয় - একটি, উপাদান কারণ, বা উপকরণ, যার দ্বারা কাজটি হবে; দ্বিতীয়, নিমিত্ত কারণ, বা একজন কর্তা, যে কাজটা করবে। কাজের একটা ফল, বা রেজাল্টও থাকে।
মাটি থেকে কুমোর কলসী বানালেন - এটি একটি কাজ। এই কাজের উপাদান কারণ - মাটি, নিমিত্ত কারণ - কুমোর, ফল - কলসী।
আরো দুটি জিনিস বোঝার - বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, উপাদান কারণ এবং নিমিত্ত কারণ সর্বদা আলাদা হবে (কুমোর এবং মাটি এক নয়!), এবং নিমিত্ত কারণ সর্বদা এক সজীব অস্তিত্ব হবে, তার নিজের বুদ্ধি থাকবে।
কার্য কারণের মধ্যে এই যে সম্পর্ক আমরা দেখলাম, এই সম্পর্ক মাত্র একটি জায়গাতেই খাটে না - সেটি হল জগৎসৃষ্টি। জগতসৃষ্টির ক্ষেত্রে উপাদান কারণ এবং নিমিত্ত কারণ দুইই এক, সেইটি ঈশ্বর। অর্থাৎ ঈশ্বর নিজেই উপাদান, আবার নিজেই কর্তা।
এই পটভুমিকার প্রেক্ষিতে এবারে ফিরে আসা যাক আগের তর্কটিতে।
বৌদ্ধ এবং ন্যায়-বৈশেষিকগণ বলেন :
১) কোনো একটি কারণের দ্বারা উত্পন্ন না হওয়ার আগে অব্দি ফলের অস্তিত্ব আছে এরূপ আদৌ বলা চলে না।
২) উত্পত্তির আগেই যদি ফল তার কারণের মধ্যে থাকে, তাহলে "ঐটি উত্পন্ন হলো" বা "ঐটি সৃষ্টি হলো" এরূপ বলার কোনো মানেই থাকে না। এছাড়াও, ফলের উত্পত্তির জন্যে কোনো বুদ্ধিমান নিমিত্ত কারণেরও কোনো প্রয়োজন থাকে না। যদি মাটির মধ্যে ঘটটি আগে থেকেই বর্তমান থাকে, তবে কর্মকার কেনই বা কষ্ট করেন বা তাঁর কর্মকৌশল প্রয়োগ করে ঘট তৈরী করেন ?
৩) আরোও, যদি ফল তার উপাদান কারণের মধ্যেই থাকে, তাহলে যুক্তিগতভাবে বলা যেতে পারে যে - ফলকে তার কারণ থেকে কখনই আলাদা করা যাবে না, এবং ঘট ও মাটিকে আমাদের একই নামে ডাকা উচিত, আর একটি ঘট দ্বারা ও একতাল মাটি - দুইই একই কাজে ব্যবহারের যোগ্য হওয়া উচিত।
৪) ফল এবং উপাদান কারণের মধ্যে কেবল রূপ ও আকারের পার্থক্য - এরূপ বলাও ঠিক নয়, কারণ তাহলে আমাদের স্বীকার করতে হয় উপাদান কারণের মধ্যে এমন কিছু নিশ্চয়ই আছে যা তার ফলের মধ্যে নেই, অতএব, কারণের মধ্যে ফল কখনই পূর্ব হতে অবস্থান করে না। এই তত্ত্বটি অসৎকার্যবাদ নামে পরিচিত (অর্থাৎ, কার্য্য বা ফল প্রকৃতিগতভাবে অসৎ, যা উত্পত্তির পূর্বে বর্তমান থাকে না)।
সাংখ্যগণ কার্য-কারণের এই তত্ত্বটি নিম্নের যুক্তিগুলির সাহায্যে বাতিল করেন :
১) যদি কারণের মধ্যে সত্যি সত্যিই ফল অনুপস্থিত থাকে, তবে জগতের কেউই, সব রকমের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সেই কারণ থেকে সেই ফলের উত্পাদন করে উঠতে পারেন না। নীল রংকে লাল রং, বা চিনিকে নুনে কেউ কি পরিবর্তন করতে পারেন ? তাই সঠিকভাবে বলতে গেলে আমাদের বলা উচিত যে, কোনো কারণের দ্বারা কোনো ফল যখন উত্পন্ন হয়, সেই ফল আগে থেকেই কারণের মধ্যেই বর্তমান থাকে এবং নির্দিষ্ট কিছু শর্তের অধীনে সেই ফলগুলি প্রকাশিত হয় মাত্র, ঠিক যেমন বীজ পেষণ করে তেল নির্গত হয়। বুদ্ধিমান কারণের কর্ম, যেমন কুমোর এবং তাঁর যন্ত্রাদি, প্রয়োজন কেবল ফলটিকে (ঘট) বিকাশের জন্যে প্রয়োজন, যা আগে থেকেই তার কারণের (মাটি) মধ্যে বর্তমান।
২) আমরা দেখতে পাই কেবল নির্দিষ্ট কারণই নির্দিষ্ট ফলের উত্পত্তি ঘটিয়ে থাকে। দইয়ের উত্পত্তি কেবল দুধ থেকেই হতে পারে, কাপড়ের উত্পত্তি কেবল সুতো থেকেই হতে পারে। এতে এই বোঝা যায় যে - কোন না কোন ভাবে ফল তার কারণের মধ্যে আগে হতেই বর্তমান থাকে। তা যদি না হতো, তবে যে কোন কারণ হতেই যে কোন ফল উত্পাদন করা সম্ভব হতো। ঘট তৈরী করার জন্যে কর্মকার কেবল মাটিই না নিয়ে, দুধ বা সুতো, বা অন্য কোনো জিনিস নিতেন এবং তা থেকে ঘট তৈরী করে ফেলতেন।
৩) একটি কাঙ্খিত ফল একটি সম্ভাব্য কারণ হতেই উত্পন্ন হয় - এর থেকে বোঝা যায় যে ফল একটি সম্ভাব্যতার আকারে কারণের মধ্যেই নিহিত থাকে। উত্পন্ন বা বিকশিত হওয়ার আগে ফলটি সুপ্ত বা অ-বিকশিত অবস্থায় কারণের মধ্যে থাকে।
৪) যদি কারণের মধ্যে ফল সত্যিই না থেকে থাকে, তবে আমাদের বলতে হয়, ফল উত্পন্ন হওয়া মানে "কিছুই নেই" থেকে "কিছু একটা" তৈরী হলো, যা এক প্রলাপোক্তি।
৫) আমরা দেখতে পাই যে ফল কারণের থেকে আলাদা কিছু নয়, বরং একই। বস্তুত, ফল এবং কারণ একই বস্তুর বাহ্য এবং আভ্যন্তরীণ দুই অবস্থা। কাপড়, সুতো হতে উত্পন্ন এবং দেখতে গেলে সুতোর থেকে কাপড় প্রকৃতপক্ষে আলাদা কিছু নয়; একটি প্রস্তরমূর্তি তার উপাদান, পাথরের সাথে একই, কেবল এক নতুন আকার এবং রূপ তাকে দেওয়া হয়েছে; একটি টেবিলের ওজন তার মধ্যে যে পরিমাণ কাঠ আছে তার সমানই।
এই সমস্তকিছু হতে সাংখ্যগণ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে - বিকশিত বা উত্পাদিত হওয়ার আগে ফল তার কারণের মধ্যেই অবস্থান করে। এইটিই সৎকার্যবাদ (অর্থাৎ, বিকশিত বা প্রকাশিত হওয়ার পূর্বে ফলের অস্তিত্ব থাকে)।
**********************
সৎকার্যবাদের দুই প্রকার
**********************
সৎকার্যবাদের দুইটি প্রকার আছে, যথা - পরিণামবাদ এবং বিবর্তবাদ। প্রথমটির মতে, একটি ফল যখন উত্পন্ন হয়, তখন তার কারণটি প্রকৃত অর্থেই পরিবর্তিত হয়ে যায় (একে পরিণাম বলা হয়), যেমন - মাটি থেকে ঘট তৈরী হয়, বা দুধ থেকে দই তৈরী হয়। সাংখ্যগণ এই প্রকারের সৎকার্যবাদের সমর্থক।
দ্বিতীয় প্রকারের মতে, যা অদ্বৈতবেদান্ত স্বীকার করেন, কারণের এই ফলে পরিবর্তন আপাত, প্রকৃতপক্ষে কোনো পরিবর্তন হয় না। আমরা যখন একটি দড়িতে সাপ দেখি, দড়িটি সাপে পরিণত হয়ে গেছে - তা কিন্তু আদৌ নয়; আসলে দড়িটি কেবল সাপের মতো দেখায়, এই মাত্র। একইভাবে, ঈশ্বর বা ব্রহ্ম তাঁর সৃষ্ট এই জগতে নিজেই পরিবর্তিত হয়ে গেছেন তা নয়, তিনি একই আছেন, কিন্তু আমরা ভুলবশত: ভাবি ঈশ্বর পরিবর্তিত হয়ে এই জগত তৈরী হয়েছে।
(ক্রমশ)
সাংখ্য দর্শন - পর্ব ১
---------------------------
ভূমিকা
----------
সাংখ্য মতের স্রষ্টা মহর্ষি কপিল। সাংখ্যের সৃষ্টি কোন যুগে, তা আজ খুঁজে বার করা দুঃসাধ্য; তবে এইটি ভারতের প্রাচীনতম দর্শন বললে অত্যুক্তি হয় না। এর প্রাচীনত্বের অন্যতম প্রমাণ এই যে, প্রাচীন ভারতের সকল সাহিত্যে - শ্রুতি, স্মৃতি, পুরাণে - সর্বত্র সাংখ্য চিন্তার প্রভাব অতি সুস্পষ্ট।
সাংখ্য দর্শনের প্রথম গ্রন্থ কপিলের তত্ত্বসমস্যা। কিন্তু এই রচনাটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও দুর্বোধ্য হওয়ায়, কপিল আরেকটি ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থ রচনা করেন, যার নাম সাংখ্য-প্রবচন-সূত্র। এইকারণে সাংখ্যদর্শনের আরেক নাম সাংখ্যপ্রবচন।
মহর্ষি পতঞ্জলি প্রণীত যোগ দর্শন, যা সেশ্বর-সাংখ্য নামে পরিচিত,তার তুলনায় কপিলের মতকে নিরীশ্বর-সাংখ্য বলা হয়। এর কারণ : কপিল ঈশ্বরের অস্তিত্বকে স্বীকার করেননি,এবং এও মত পোষণ করেন যে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণই করা যায় না - যদিও এটি বিতর্কিত বিষয়।
কপিলের পরে তাঁর শিষ্য অসুরী, এবং তারও পরে, অসুরীর শিষ্য পঞ্চশিখা সাংখ্যমতের স্বচ্ছ এবং বিস্তৃত ব্যাখ্যাসূচক গ্রন্থ রচনা করেন। কিন্তু কালের গ্রাসে এই সকল গ্রন্থই আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত, সেগুলি সম্বন্ধে আজ আর আমরা কিছুই জানতে পারি না। সাংখ্যমতের প্রাচীনতম প্রামাণ্য গ্রন্থ যা আজ আমরা পাই, তা হলো ঈশ্বরকৃষ্ণের সাংখ্যকারিকা। এছাড়াও গৌড়পাদের সাংখ্যকারিকা-ভাষ্য, বাচস্পতির তত্ত্বকৌমুদী, বিজ্ঞানভিক্ষুর সাংখ্য-প্রবচন-ভাষ্য এবং সাংখ্যসার ইত্যাদি গ্রন্থ সাংখ্য মতবাদের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি।
--------------------------
সাংখ্য নামের উৎস
--------------------------
সাংখ্য নামের উৎস রহস্যে ঘেরা। কিছু চিন্তনবিদের মতানুযায়ী, "সাংখ্য" শব্দটি "সংখ্যা" শব্দ হতে উদ্ভূত। গণনার মাধ্যমে, জ্ঞানের পরমতত্ত্ব ও বাস্তবতার প্রকৃতি সম্বন্ধে জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে এই দর্শন - সেই হিসাবে সংখ্যার মাহাত্ম্য।
আরেকটি সম্ভাব্য মতবাদ হলো : সাংখ্য শব্দের অর্থ "সম্যক জ্ঞান"; যে দর্শন আমাদের এইরূপ সম্যক জ্ঞান প্রদান করে, তাই সাংখ্য।
ন্যায় ও বৈশেষিক দর্শনের মতোই, সাংখ্য দর্শনের উদ্দেশ্যও বাস্তবতার জ্ঞানের মাধ্যমে, সকল দুঃখ ও কষ্টের বাস্তবিক অবসান। সাংখ্য আমাদের আত্মজ্ঞান প্রদান করে, যা অন্যান্য সকল মত অপেক্ষা স্পষ্টতই উচ্চতর, কেবল বেদান্ত ব্যতিরেকে।
সাংখ্য দর্শন দ্বৈতবাদী দর্শন। ন্যায় ও বৈশেষিক দর্শন পরম বাস্তবকে যেখানে বহু অস্তিত্বের সমাহার বলে বর্ণনা করেন - পরমাণু, মন, আত্মা - সেখানে সাংখ্য কেবল দুইপ্রকারের বাস্তবকে স্বীকার করেন - পুরুষ, এবং প্রকৃতি।
(ক্রমশঃ)
ধর্মদর্শন হলো ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাথে জড়িত কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু এবং ধারণার দার্শনিক চিন্তাভাবন।[১] ধর্মদর্শন বিষয়ে দার্শনিক আলোচনা প্রাচীন কাল থেকেই হয় এবং দর্শনের এই বিষয় প্রাচীন গ্রন্থগুলিতেও পাওয়া যায়।
স্ট্যানফোর্ড এনসাইক্লোপিডিয়া অব ফিলসফি অনুসারে, ধর্মদর্শন হচ্ছে, "ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কিত ধারণা এবং কেন্দ্রীয় বিষয় নিয়ে দার্শনিক অনুসন্ধান"।[১] এটি একটি প্রাচীন পাঠ্য বিষয়, যা অনেক প্রাচীন পাণ্ডুলিপিতে দার্শনিক আলোচনায় পাওয়া যায়, এবং এটি দর্শনের অন্যান্য শাখা যেমন অধিবিদ্যা, জ্ঞানতত্ত্ব ও নীতিশাস্ত্রের সাথে সম্পর্কিত।[২]
ধর্মদর্শন ধর্মীয় দর্শন থেকে আলাদা কারণ ধর্মদর্শন ধর্মীয় দর্শনের মত কোন নির্দিষ্ট ধর্মব্যবস্থার সমস্যাগুলোর পরীক্ষা নীরিক্ষা করে না, বরং ধর্মদর্শন ধর্মের সামগ্রিক প্রকৃতি নিয়েই বিভিন্ন আলোচনা করে। ধর্মদর্শনের পাঠ এমনভাবে গড়ে উঠেছে যাতে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী উভয়েই নিরাবেগভাবে এই বিষয়ে পাঠ করতে পারে।[৩]ভারত উপমহাদেশের ধর্মের মূল তত্ত্ব ও তার ব্যাখ্যাকে প্রাচীনকাল হতে ভারতীয় দর্শন বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।ভারতীয় দর্শনকে সাধারণত বেদান্ত, মীমাংসা, বৈশেষিক, ন্যায়, সংখ্যা ও যোগ এই ছয়টি শাখায় বিভক্ত বলে বর্ণনা করা যায়। অনেকে আবার সমগ্র ভারতীয় দর্শনকে সনাতনী এবং অসনাতনী এ দুটি বিভাগে বিভক্ত করে দেখান।
এই অভিমতে বেদান্ত, মীমাংসা, বৈশেষিক, ন্যায়, সংখ্যা এবং যোগ এই আদি শাখাগুলি হচ্ছে সনাতনী শাখা। এর পরবর্তী বৌদ্ধ, জৈন ও চার্বাক বা লোকায়াত শাখাগুলি হচ্ছে অ-সনাতনী শাখা। ভারতীয় দর্শনের এরূপ বিভাগকরণের কিছুটা ঐতিহাসিক ভিত্তি থাকলেও এ বিভাজন কৃত্রিম। কেননা বস্তুবাদী বা লোকায়ত চিন্তার উদ্ভব সনাতনী ধারার পরে ঘটেছে, এ কথা ঠিক নয়। আদিকাল থেকেই সনাতনী চিন্তাধারার বিরোধী চিন্তা হিসাবে বস্তুবাদী চিন্তাধারারও অস্তিত্বের কথা জানা যায়।
ভারতীয় দর্শনের উল্লিখিত ধারাগুলির সংক্ষিপ্ত পরিচয় হিসাবে বলা যায়।
দর্শন শাস্ত্র ছয়টি যেগুলোতে আত্মা, পরমাত্মা, প্রকৃতি জগতের উৎপত্তি এবং মুক্তি ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
এগুলোর নাম নিম্নলিখিত
গৌতমমুনিকৃত – ন্যায় শাস্ত্র
কপিলমুনিকৃত – সাংখ্য শাস্ত্র
পতঞ্জলিমুনিকৃত – যোগ শাস্ত্র
জৈমিনিমুনিকৃত – পূর্বমীমাংসা শাস্ত্র
বেদব্যাস মুনিকৃত – উত্তরমীমাংসা শাস্ত্র ও বেদান্ত শাস্ত্রপতঞ্জলিমুনিকৃত – যোগ শাস্ত্র
জৈমিনিমুনিকৃত – পূর্বমীমাংসা শাস্ত্র
বেদব্যাস মুনিকৃত – উত্তরমীমাংসা শাস্ত্র ও বেদান্ত শাস্ত্র
১. বেদান্ত: বেদের অন্ত বা শেষ অর্থ ‘বেদান্ত’। বেদের উপর উপনিষদের ব্যাখ্যা নিয়ে বেদান্ত তৈরি। ব্রহ্ম বা বিশ্বাত্মা কিংবা পরমাত্মা ও বিশেষ আত্মার তত্ত্ব বেদান্ত ধারার বৈশিষ্ট্য। বস্তুত পরমাত্মা ও বিশেষ আত্মার যে ব্যাখ্যা উপনিষদসমূহে দেওয়া হয়েছে তার গ্রহণ ও বর্জনের ভিত্তিতেই পরবর্তী ভারতীয় দর্শনের ধারাগুলির বিকাশ ঘটেছে। উপনিষদে ধর্মের রহস্যমূলক ব্যাখ্যা প্রদান করা হলেও এর মধ্যে বস্তুবাদী ও নিরীশ্বরবাদী চিন্তার যে বিরূপ সমালোচনার সাক্ষাত পাওয়া যায় তাতে এই পর্যায়ে জনসমাজে বস্তুবাদী চিন্তাও যে কিছুটা প্রভাবশালী ছিল তা বুঝতে পারা যায়।
২. মীমাংসা: বেদ সংক্রান্ত অনুসন্ধান ও সমস্যার আলোচনা নিয়ে মীমাংসা সৃষ্টি। মীমাংসার তত্ত্বগত তাৎপর্য্য তেমন কিছু আছে বলে পণ্ডিতগণ মনে করেন না। তবে তারা এই পর্যায়ের একটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখযোগ্য বলে মনে করেন। মীমাংসায় বেদকেই অবিনশ্বর বলে স্বীকার করা হয়েছে। বেদই ভগবান। বেদের বাইরে কোনো ভগবানকে মীমাংসায় উল্লেখিত হতে দেখা যায় না।
৩. বৈশেষিক: বিশেষ থেকে বৈশেষিক। বৈশেষিকের দর্শন অনুগামী। ক্ষিতি, অপ, তেজ, ব্যোম, মন সবই হচ্ছে বস্তু। এই সমস্ত বিশেষ বস্তু সম্মেলনেই সর্বপ্রকার বস্তুর সৃষ্টি। এমনকি আত্মা, স্থান, সময় ইত্যাকার সত্তাও মূল বস্তুর সম্মেলনের ফল। এখানে একটা বিষয় উল্লেখযোগ্য। বৈশেষিক বা সংখ্যা উভয় ধারাতেই মনকে বস্তু এবং আত্মা থেকে পৃথক বলে বিবেচনা করা হয়েছে।
৪. ন্যায়: যুক্তি ও তর্কের পদ্ধতি নিয়ে তৈরি হয়েছে ন্যায়। ভারতীয় দর্শনের বিপুল ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধারা-উপধারার মধ্যে তীব্র বিরোধ ও কূটতর্কের মাধ্যমে পরস্পরকে খন্ডন করার চেষ্টা চলত। তার ফলে ভারতীয় ন্যায়শাস্ত্র বিশেষভাবে বিকাশ লাভ করে। জ্ঞানতত্ত্বের ক্ষেত্রে ভারতীয় ন্যায়শাস্ত্র বিশ্বের প্রাচীন ন্যায়শাস্ত্রসমূহের মধ্যে সর্বাধিক বিকশিত, সূক্ষ্ম ও বিস্তারিত বলে বিবেচনা করা হয়। ন্যায়শাস্ত্রে পঞ্চস্তর বিশিষ্ট অনুমানের যে বর্ণনা পাওয়া যায় তা আরোহী অনুমানের প্রকৃষ্ট পদ্ধতি বলে বিবেচিত হয়। প্রতিজ্ঞা, হেতু, উদাহরণ, সাদৃশ্য বা উপনয় এবং উপসংহার-এই পাঁচটি স্তরকে অনুমানের অঙ্গ বলে অভিহিত করা হতো। যুক্তির পদ্ধতি ব্যতীত ন্যায়ের অপর একটি তাত্ত্বিক মত হচ্ছে: ক্ষিতি, অপ, তেজ ইত্যাদির সম্মেলনে বিশ্বলোক সৃষ্টির জন্য একটি আদি কারণের প্রয়োজন আছে। আর সেই আদি কারণই হচ্ছে ভগবান।
৫.সাংখ্য: সংখ্যা থেকে সাংখ্য। তত্ত্বগতভাবে সাংখ্য অনুবাদী নয়। সাংখ্যর মতে বিশ্বজগত সৃষ্টি হয়েছে প্রকৃতি এবং পুরুষ এর সহযোগে। প্রকৃতি হচ্ছে বস্তু আর পুরুষ হচ্ছে অচেতন আত্মা। আত্মার চেতনা ও মুক্তিলাভ প্রকৃতির বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে সম্ভব।
৬. যোগ: সাধনার জন্য দেহ এবং মনের উপর ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যাখ্যা নিয়ে তৈরি হয়েছে যোগ। সনাতনী এই ছটি ধারার প্রত্যেকেই যেমন বেদকে একমাত্র মান্য বলে স্বীকার করে তেমনি পুনর্জন্মের বন্ধন থেকে আত্মার প্রশ্নেও তারা ঐকমত্য পোষণ করে।
৭. [[ জৈনতত্ত্ব]]: অ-সনাতনী ধারার মধ্যে জৈনশাখা আপেক্ষিকতার তত্ত্ব বলে পরিচিত।
৮. বৌদ্ধবাদ: বৌদ্ধবাদ সনাতনী সকল ধারা থেকে আত্মার প্রশ্নে ভিন্ন ভিন্ন তত্ত্ব পোষণ করে। বৌদ্ধবাদের মতে ভগবান বা পরমাত্মা বলে কিছু নেই। আত্মা হচ্ছে বস্তুপুঞ্জের প্রবাহ। এই প্রবাহের অন্তরালে স্থির সত্তা বলে কিছু নেই। বস্তুত বৌদ্ধবাদের মতে, বিশ্বে স্থির বা নিত্য সত্তা বলে কিছু নেই। সবই অনিত্য। মানুষের অভিজ্ঞতা মুহূর্তের ঘটনার সমাহার ব্যতীত আর কিছু্ই নয়।
৯. বস্তুবাদ: পূর্বেই বলা হয়েছে যে, সকল ধারার শেষে বস্তুবাদ উদ্ভূত হয়েছে— এরূপ ধারণা ঠিক নয়। সমস্ত সনাতনী ও ভাববাদী ধারার প্রভাবকালেই তার প্রতিধারা হিসাবে বস্তুবাদী বা লোকায়ত চিন্তার অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। চারুবাক বা জনপ্রিয় তত্ত্ব হিসাবে চার্বাক মতের সমালোচনা সনাতনী শাখাগুলির প্রায়টির মধ্যেই দেখতে পাওয়া যায়। ভারতীয় প্রাচীন বস্তুবাদের প্রকাশ দেখা যায় প্রধানত অস্তিত্ব, জ্ঞান ও আত্মার প্রশ্নে। অস্তিত্ব বস্তুবাদের মতে মনসহ সব অস্তিত্বই বস্তু। বস্তুর সম্মেলনেই বস্তু গঠিত।
জ্ঞান: অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরোক্ষ অনুমান একেবারে সম্ভব না হলেও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই হচ্ছে জ্ঞানের একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপায়।
আত্মা: আত্মার পুনর্জন্মের কোনো প্রমাণ নেই। কাজেই আত্মার পুনর্জন্ম ঘটে, এ তত্ত্ব গ্রহণ করা চলে না।
দশম শতাব্দীতে ইসলামের ভারতে আগমন ভারতীয়দশম শতাব্দীতে ইসলামের ভারতে আগমন ভারতীয় দর্শনের ক্ষেত্রে একটি নতুন সংযোজনের সূচনা করে। ইসলাম ধর্ম একেশ্বরবাদী। ইসলামের প্রভাবে ভারতীয় ধর্ম ও দর্শনেও একেশ্বরবাদের প্রকাশ ঘটতে দেখা যায়। এর দৃষ্টান্ত হিসাবে কবীর পন্থা ও শিখ ধর্মের উল্লেখ করা যায়।
ভারতীয় রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনৈতিক জীবনে নতুনতর পরিবর্তনের সূত্রপাত ঘটে আধুনিককালের ইংরেজ সভ্যতা ও সাম্রাজ্যবাদের ভারত আগমনের সঙ্গে। আধুনিক ইংরেজ ও ইউরোপীয় সভ্যতার বৈজ্ঞানিক দক্ষতার স্বীকৃতির সঙ্গে সঙ্গে ভারতবাসীগণ নিজেদের স্বাধীনতার প্রয়োজন উপলব্ধি করতে শুরু করে। সনাতন সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতির স্থলে আধুনিক পুঁজিবাদের বীজ উপ্ত হতে শুরু করে। এই পর্যায়ে জাতীয় মর্যাদা, ঐতিহ্য, ধর্ম ইত্যাদি বিষয়ে নব্য শিক্ষিতদের পুরোধাদের মধ্যে যে চিন্তাপ্রবাহ সৃষ্টি হয় তাকে ভারতীয় দর্শনের আধুনিক পর্যায় বলা যায়। এই পুরোধাদের মধ্যে রাজা রামমোহন রায়, তিলক গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অরবিন্দ ঘোষ, মোহাম্মদ ইকবাল, সর্বপল্লী রাধা কৃষ্ঞন প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। এঁদের কারোর মধ্যে ধর্মীয় পুনর্জাগরণের কিংবা নবতর উদার ধর্মের সৃষ্টি (ব্রাহ্ম সমাজ) এবং কারো মধ্যে ইউরোপীয় বিজ্ঞানের সঙ্গে ভারতীয় ভাববাদের সম্মেলন ঘটাবার প্রয়াসমূলক চিন্তার সাক্ষাত পাওয়া যায়।
দর্শন (𝚙𝚑𝚒𝚕𝚘𝚜𝚘𝚙𝚑𝚢)ঃ জ্ঞানের অন্যতম প্রাচীন একটি শাখা। ফিলোসফি শব্দটির প্রথম ব্যবহার করেছিলেন গ্রিক চিন্তাবিদ ও গণিতজ্ঞ পিথাগোরাস। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ অব্দের দিকে শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয়। পিথাগোরাস নিজেকে প্রাজ্ঞ ভাবতেন না, বরং প্রজ্ঞার অনুরাগী ভাবতেন। তিনিই ফিলোসফি শব্দটি ব্যবহার করেন 𝚕𝚘𝚟𝚎 𝚘𝚏 𝚠𝚒𝚜𝚍𝚘𝚖 তথা প্রজ্ঞার প্রতি অনুরাগ অর্থে। দর্শনের সংজ্ঞা হিসেবে এই বিষয়টিকেই গ্রহণ করা যায়। আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে দর্শন জ্ঞানের এমন একটি ধারা যা, মানুষের কিভাবে জীবন নির্বাহ করা উচিত (নীতিবিদ্যা); কোন ধরনের বস্তুর অস্তিত্ব রয়েছে এবং তাদের প্রকৃতি কি (অধিবিদ্যা); প্রকৃত জ্ঞান বলতে কোন জিনিসটিকে বোঝায় এবং কারণ প্রদর্শনের সঠিক নীতিগুলো কি কি (যুক্তিবিদ্যা); এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে।
দর্শন শব্দটি ইংরেজি 𝚙𝚑𝚒𝚕𝚘𝚜𝚘𝚙𝚑𝚢 শব্দ থেকে এসেছে। ফিলোসফি শব্দটি এসেছে প্রাচীন গ্রিক ভাষা থেকে। গ্রিক ভাষায় φιλοσοφία (𝚙𝚑𝚒𝚕𝚘𝚜𝚘𝚙𝚑í𝚊) শব্দটি দুটি শব্দ থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। শব্দ দুটি হল: φίλος (ফিলোস: বন্ধু, ভালোবাসার পাত্র) এবং σοφία (সোফিয়া: প্রজ্ঞা)। এ থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায়, দর্শনের সাথে মূল সম্পর্ক হচ্ছে প্রজ্ঞার, আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, প্রজ্ঞার প্রতি ভালোবাসার। জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা এক জিনিস নয়। ঘটনা ও তথ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ও নির্ভুল ধারণা থেকে জ্ঞান লাভ করা যায়, কিন্তু দার্শনিক (যিনি দর্শন চর্চা করেন তাকেই দার্শনিক বলা হয়) কেবল তথ্যগত জ্ঞানের উপর নির্ভর করেন না। দর্শনের প্রধান কাম্য বিষয় প্রজ্ঞা। প্রজ্ঞার অনুসন্ধান ও চর্চার মাধ্যমেই দর্শন বিকাশ লাভ করে। পিথাগোরাস সারা জীবন প্রজ্ঞার সাধনা করেছেন, কখনও জ্ঞানের গরিমা অনুভব করেননি। এজন্য তিনি দার্শনিক হিসেবে বিদগ্ধ। দর্শনের জন্য যে প্রজ্ঞা কাম্য তার মধ্যে রয়েছে, অন্তর্দৃষ্টি, দৃষ্টিভঙ্গির অভ্রান্ততা, বিচারের ভারসাম্য ও বিশ্লেষণের সামঞ্জস্য।
09/04/2022
Educational Tree🌳
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Website
Address
Krishnagar City
741121