07/06/2018
একটি খুন হওয়া ভবিষ্যতের গল্প..
লিখাটি অনেক বড় তবুও বাংলার নষ্ট হতে যাওয়া এই ভবিষ্যতেদের স্বার্থে পড়বেন pls..
GKCIET..
মালদার একটি অখ্যাত কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ কলেজ..সেখানকার ছাত্রছাত্রী হিসাবে আজ আমরা ডিগ্রী-রেজাল্ট-পড়াশুনার সুযোগের বদলে পেয়েছি শুধু প্রহসন আর প্রতারণা..
১)২০১০ সাল - সোনিয়া গান্ধী এবং প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এসে উদ্বোধন করলেন মড্যুলার প্যাটার্নে চলা ভারত বর্ষের চার নম্বর কলেজ..
২)মড্যুলার প্যাটার্ন হওয়ার সুবাদে এখানে মাধ্যমিক পাশের পর ভর্তি হলেই ক্রমান্বয়ে প্রথমে দুই বছরের 12th ক্লাস সমতুল্য ডিগ্রী, দুই বছরের ডিপ্লোমা ও দুই বছরের B.Tech কোর্স পড়ানোর পর উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেখিয়ে আমাদের All India Entrance Test-এর মাধ্যমে ভর্তি নেওয়া হলো..
৩)২০১৪সালে এই কলেজে ভারতবর্ষের রাষ্ট্রপতি আসলো..কলেজের নতুন ভবন উদ্বোধন সঙ্গে btech কোর্সের উদ্বোধন করলেন..
৪)২০১৬ সাল ছাত্রছাত্রীদের B.Tech কোর্স শেষ হলো..সার্টিফিকেট চাইতে গিয়ে জানতে পারলো কলেজটি affiliated’ই নয় অর্থাৎ তারা কোনোরকম সার্টিফিকেট প্রদান করতে পারবে না অর্থাৎ এক অর্থে ভুয়ো কলেজ..
৫)ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলনে বসলো..২৬দিন অনশন, জাতীয় সড়ক অবরোধ, রেল ব্লকের পর ডিপ্লোমা পর্যন্ত affiliation দেওয়ার কথা রাজ্য সরকার ঘোষণা করল..B.Tech’এর affiliation দুর্গাপুরের NIT দেবে বলে কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক চিঠির মাধ্যমে জানায়.. পুরো ব্যাপারটা মালদার অতিরিক্ত জেলাশাসক, রাজ্য টেকনিক্যাল কাউন্সিলের ও.এস.ডি ও কলেজ-কর্তৃপক্ষ সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতিতে ঘোষণা করেন..
৬)রাজ্য সরকারের কথা মতো পরবর্তীতে রাজ্য টেকনিক্যাল কাউন্সিল pass-out ছাত্রছাত্রীদের সার্টিফিকেট প্রদান ও সার্টিফিকেট কোর্স থেকে ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তিও নেয়..কিন্তু দুর্গাপুর NIT কর্তৃপক্ষ তার দেওয়া কথা থেকে সরে আসে এবং কোনো ছাত্রছাত্রীকেই সার্টিফিকেট প্রদান বা ভর্তির ব্যবস্থা করেনি..
৭)২০১৭ সাল..কলেজের আধিকারিক(in-charge) ও GKCIET এর মেন্টর-ডিরেক্টর B.Tech কোর্সের ক্লাস ও ভর্তি প্রক্রিয়া মাঝরাস্তায় বন্ধ করে দিলেন..ছাত্ররা বাধ্য হয়ে affiliation-এর বার্তা নিয়ে আসা মালদার অতিরিক্ত জেলাশাসকের নিকট উপস্থিত হয়..অতিরিক্ত জেলাশাসক ছাত্রদের কাছে দুঃখপ্রকাশ করেন এবং ব্যাপারটি কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের অধীন হওয়ায় তিনি এই বিষয়ে কোনো সাহায্য করতে পারবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন..ছাত্রছাত্রীরা আরো একবার প্রতারিত হয়ে এক অনিশ্চিত অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়..
৮) ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাস..ডিপ্লোমা ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রছাত্রী যাদের ফাইনাল সেমিস্টার পরীক্ষা জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল, কলেজ কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে তা শেষ হলো ডিসেম্বরে..B.Tech কোর্সে অন্যত্র সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ছাত্রছাত্রীরা ভর্তি থেকে বঞ্চিত হলো..
৯) বঞ্চিত ছাত্রছাত্রীরা পড়াশুনা জীবনের একটা বছর বাঁচানোর উদ্দেশ্যে ও মড্যুলার প্যাটার্নের নিয়ম অনুযায়ী GKCIET'তেই ভর্তির দাবিতে আন্দোলনে নামলে আন্দোলনের কয়েকদিনের মাথায় কর্তৃপক্ষ ছাত্রছাত্রীদের লিখিত আশ্বাস দেয় যে মার্চ, ২০১৮ নাগাদ কলেজ-কর্তৃপক্ষ MAKAUT থেকে affiliation পাবে ও সেই সময় ছাত্রছাত্রীদের একটি লেট সেমিস্টার কলেজ কর্তৃপক্ষ শুরু করবে..মাঝের সময়টুকু ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হরিয়ানাতে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করবে..
১০) ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে কলেজ-কর্তৃপক্ষ ডিপ্লোমা passout ছাত্রছাত্রীদের সাফ জানিয়ে দেয় যে তারা কোনোরকম ট্রেনিং করাতে পারবে না..কেউ যদি তারপরেও ট্রেনিং করতে চায় তাহলে তাকে ট্রেনিং-খরচা বাবদ কর্তৃপক্ষকে ১৫,০০০ টাকা প্রদান করতে হবে..ছাত্রছাত্রীরা আরো একবার প্রতারিত..কিন্তু তারা এবার আন্দোলনে যায়নি..তারা চুপ থেকেছে, শুধুমাত্র মার্চে ভর্তি হবে সেই আশায়..
১১)২০১৮-এর মার্চ মাস..বঞ্চিত ছাত্রছাত্রীরা, কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে যাদের একবছর নষ্ট হয়েছে তাদের বহু প্রতীক্ষার পর একটি আশার মাস ছিল..কিন্তু কলেজ-কর্তৃপক্ষ মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে এই ব্যাচের কিছু ছাত্রকে ডেকে সাফ জানিয়ে দেয় যে GKCIET-এর এখনো affiliation হয়নি..তাই তারা ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি নিতে পারছে না..আর কবে affiliation হবে সেটাও কর্তৃপক্ষের অজানা..ছাত্রছাত্রীরা তারপরেও কর্তৃপক্ষকে আরো দুই মাস সময় দেয়..
১২)কর্তৃপক্ষ এবারও ব্যর্থ..জুনের এক তারিখ পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীরা কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাইলে কর্তৃপক্ষ তাদের তখন পর্যন্ত বলেন যে জমিসংক্রান্ত সমস্যার জন্য কলেজের affiliation হচ্ছেনা..কবে হবে তারা জানেনা.. তার সঙ্গে কর্তৃপক্ষের দোলাচলে এবছরের ডিপ্লোমা ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রছাত্রীদের সেমিস্টার’ও গত বছরের ছাত্রছাত্রীদের সেমিস্টারের মতো দেরিতে শেষ হবে..
১৩)ছাত্রছাত্রীরা আরো একবার প্রতারিত হয়ে তাদের পড়াশুনার ভবিষ্যতকে অচিরেই খুন হতে দেখছে..এবার ছাত্রছাত্রীরা চুপ থাকেনি..তারা আন্দোলনের প্রস্তুতি শুরু করে..কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের ন্যায্য দাবি পূরণ করতে না পারলেও..ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন থেকে সরানোর কাজে দক্ষতার সঙ্গে লেগে পড়ে.. বহু ছাত্রছাত্রীকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, পরীক্ষায় ফেলের ভয়, বাড়িতে ফোন করানোর ভয় দেখাতে থাকে..আন্দোলন আরো জোরদার হয়..
১৪)৪ঠা জুন, ২০১৮..ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের ন্যায্য দাবি B.Tech কোর্সের affiliation, approval ও সমস্ত ব্রাঞ্চের ছাত্রছাত্রীদের B.Tech’এর দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তির দাবিতে কলেজের প্রধান আধিকারিক ডিরেক্টরের অফিসের প্রধান ফটকের সামনে ধর্ণায় বসে..ধর্ণায় বসার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ‘দিল্লিতে আছি' বলে দাবি করা ডিরেক্টর কলেজে আসে এবং সমস্ত শিক্ষকের সঙ্গে মিটিং ক’রে আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের জানায় যে জমি সংক্রান্ত জট মিটে গেছে এবং affiliation দ্রুত হয়ে যাবে। তাই ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন থেকে সরতে বলে..কিন্তু পুরোনো ছাত্রছাত্রীদের B.Tech’এ GKCIET’তেই ভর্তির ব্যাপারটি তিনি এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেন..ছাত্রছাত্রীরা কর্তৃপক্ষের কাছে affiliation হওয়ার পরে তাদের ভর্তির ব্যাপারে লিখিত আশ্বাস চাইলে কর্তৃপক্ষ তা নাকচ করে..ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলন অব্যাহত রাখে..
১৫)আন্দোলনের ৬ দিনের মাথায় কর্তৃপক্ষ জানায় যে GKCIET’এর affiliation হয়েছে রাজ্য সরকারের কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং affiliation মিলেছে লিখিত। MAKAUT প্রদত্ত কাগজ ছাত্রছাত্রীরা দেখলে দেখা যায় সেখানে পুরনো ছাত্রছাত্রীদের ভর্তির ব্যাপারে কোনো কথা লেখা নেই..আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীরা কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞেস করলে কর্তৃপক্ষ নীরব থাকে..
১৬)টানা ১১ দিন রাত-দিন কলেজ গেটে অবস্থান বিক্ষোভের পর ছাত্রছাত্রীরা বাধ্য হয়ে অনশনে নেমে আসে..প্রথমদিন ৪ জন ছাত্র অনশন শুরু করে...তারপরের দিন আরেকজন আন্দোলনকারী ছাত্র অনশনে বসে..
১৭)এই গ্রীষ্মে টানা অনশন চলার ফলে একের পর এক অনশনকারী ছাত্র অসুস্থ হতে থাকে..তারপরেও কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি..ছাত্রছাত্রীরা বাধ্য হয়ে কলেজের ডিন(একাডেমিক)-কে ঘেরাও করে..লাভ হয়নি..ঘেরাওয়ের ৫ ঘন্টা পরেই ছাত্রছাত্রীদের দাবি পূরণে ব্যর্থ ডিন ছাত্রছাত্রীদের ন্যায্য দাবিগুলি মাড়িয়ে আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের উপর দিয়ে টপকে পালিয়ে যায়..প্রতারিত ছাত্রছাত্রীরা আরো একবার হতাশ হয়..
১৮)অনশনের ১৩তম দিনেও ছাত্রছাত্রীদের ন্যায্য দাবি পূরণে কর্তৃপক্ষ উদ্যোগী না হওয়ায় আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীরা বাধ্য হয়ে কলেজের গণ্ডী পেরিয়ে নিজেদের ন্যায্য দাবিতে রাস্তায় নামে..ছাত্রছাত্রীরা মালদা শহরে মিছিল করে তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে জেলাশাসকের নিকট উপস্থিত হয় ও তাকে সমস্যা সমাধানের অনুরোধ করে..জেলাশাসক ব্যাপারটা দেখবে বলে আশ্বাস দেয়..
১৯)অনশনের ১৫তম দিনে হঠাৎ কলেজের ডিরেক্টর ও অতিরিক্ত জেলাশাসক কলেজে উপস্থিত হয় এবং অনশনকারীদের নিয়ে আলোচনায় বসবেন বলে জানায়..
২০) কলেজ কর্তৃপক্ষ, অতিরিক্ত জেলাশাসক ও পুরাতন মালদা থানার I.C. এবং ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর জেলাশাসক ও কলেজ কর্তৃপক্ষ অনশনকারীদের তাদের B.Tech’এর দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তির ব্যাপারে করা বিভিন্ন চিঠি ও কাগজপত্র দেখায় এবং সভার বিবরণীতে ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি নেওয়া হবে ব’লে লিখে সেখানে সকলে সই করেন..বহু ছাত্র অতিরিক্ত জেলাশাসককে পুরোনো প্রতারণার সময় তার নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে অতিরিক্ত জেলাশাসক ও GKCIET-এর ডিরেক্টর সমস্বরে বলে ওঠেন যে পুরনো কর্তৃপক্ষ যে প্রতারণা করেছে সেগুলো না ভেবে আরও একবার তাদেরকে বিশ্বাস করার কথা.. ছাত্রছাত্রীদের ন্যায্য দাবি দ্রুত পূরণ হবে এবং না হলে তিনি নিজে দায়িত্ব নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের ন্যায্য দাবি B.Tech কোর্সে দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তির ব্যবস্থা করবেন বলে জানান অতিরিক্ত জেলাশাসক এবং তিনি ছাত্রছাত্রীদের অনশন থেকে সরে আসতে বলেন..
২১)আমরা GKCIET-এর সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা আমাদের আগামী ৪ঠা জুন থেকে তৃতীয় সেমিস্টার পরীক্ষার কথা ভেবে ও বহুবার বিশ্বাস ভাঙার পরেও কিছুটা হলেও অতিরিক্ত জেলাশাসকের কথায় আরো একবার বিশ্বাস করে আন্দোলন থেকে না সরলেও আপাতত কয়েকদিনের জন্যে অনশনের ১৬তম দিনে এসে শুধুমাত্র অনশন স্থগিত রাখছি..
তার সঙ্গে জনগণের কাছে একটা আবেদন রাখছি যে বহুবার আমরা GKCIET-কর্তৃপক্ষ, প্রশাসনকে বিশ্বাস করেছি এবং বারবার প্রতারিত হয়েছি..এই প্রতারণার ফলে আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার..এই অন্ধকার ভবিষ্যতের মধ্যেও অতিরিক্ত জেলাশাসকের আশ্বাস ও লিখিত আমাদের কাছে কিঞ্চিৎ আলো স্বরূপ লেগেছে, তাই শেষবারের মতো আমরা আরো একবার কলেজ কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনকে বিশ্বাস করতে যাচ্ছি..
এইবারও কি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হবে?..বহুবার প্রতারণার ফলে আজ নষ্ট ভবিষ্যতে আমরা বিরক্ত..এইবারও যদি আমাদের ন্যায্য দাবি B.Tech দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি না করানো হয়, প্রতারণা করা হয় এবং এর ফলে হতাশ হয়ে কোনো ছাত্র বা ছাত্রী আত্মহত্যার পথ বেছে নিলে এই প্রাতিষ্ঠানিক হত্যার দায় কি GKCIET-কর্তৃপক্ষ তথা প্রশাসন নেবে?..সাধারণ জনগণ কি এই প্রতারণা এবং এর ফলে ঘটতে চলা কোনো ছাত্রছাত্রীর প্রতারিত হয়ে সম্ভাব্য আত্মহত্যার বিচার পাইয়ে দেবে??..নাকি আরো একবার এই মৃত উপতক্যার দেশে আরোও কিছু ছাত্র বা ছাত্রীকে প্রতারিত হয়ে অচিরেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে খুন হতে হবে আর আপনারা চুপ থাকবেন??..
.......
.......