16/07/2025
ডেভিলস সি (Devil's Sea), যা ড্রাগনস ট্রায়াঙ্গল (Dragon's Triangle) বা ফরমোসা ট্রায়াঙ্গল (Formosa Triangle) নামেও পরিচিত, প্রশান্ত মহাসাগরের একটি রহস্যময় অঞ্চল। এটি জাপানের মিয়াকে দ্বীপের কাছে অবস্থিত, টোকিও থেকে প্রায় ১০০০ কিমি দক্ষিণে ফিলিপাইন সাগরের মধ্যে এর অবস্থান। বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের মতোই, এই এলাকাটিও রহস্যজনকভাবে অনেক জাহাজ ও উড়োজাহাজ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার জন্য পরিচিত।
ভৌগোলিক অবস্থান ও বৈশিষ্ট্য:
* অবস্থান: প্রশান্ত মহাসাগরে জাপানের উপকূলের কাছে, ইজু দ্বীপপুঞ্জের (Izu Islands) আশেপাশে অবস্থিত। এটি মিয়াকে দ্বীপের দক্ষিণে এবং ওগাসাওয়ারা দ্বীপপুঞ্জের (Ogasawara Islands) পূর্বে প্রায় ২০০ মাইল পূর্ব-পশ্চিমে এবং প্রায় ৩০০ মাইল উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত।
* ভূ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য: ডেভিলস সি "প্যাসিফিক রিং অফ ফায়ার" (Pacific Ring of Fire) এর মধ্যে অবস্থিত, যা আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপের জন্য পরিচিত। এখানে সমুদ্রের নিচে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে, যা ভূমিকম্প এবং অস্বাভাবিক ঢেউ বা সুনামি তৈরি করতে পারে। অনেক সময় ছোট ছোট দ্বীপ হঠাৎ করে অদৃশ্য হয়ে যায় এবং নতুন দ্বীপের সৃষ্টি হয় এই আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্পের কারণে।
* গভীরতা ও আকার: এই অঞ্চলের নির্দিষ্ট গভীরতা বা আকারের কোনো সরকারি তথ্য নেই, কারণ এটি কোনো অফিসিয়াল বিশ্ব মানচিত্রে চিহ্নিত নয়। তবে, এটি একটি গভীর সমুদ্রের এলাকা যেখানে সমুদ্রের তলদেশে মিথেন হাইড্রাইডের বিশাল ক্ষেত্র রয়েছে।
রহস্য ও কিংবদন্তি:
ডেভিলস সি নিয়ে বহু লোককথা ও কিংবদন্তি প্রচলিত আছে:
* ড্রাগনের কিংবদন্তি: জাপানিজ পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, এই এলাকায় এক ভয়ংকর ড্রাগন বাস করে, যার অদম্য ক্ষুধা রয়েছে। তাই সে এখানে আসা জাহাজ ও মানুষ খেয়ে ফেলে। প্রাচীন চীনা উপকথাতেও এমন ড্রাগনের কথা উল্লেখ আছে, যারা সমুদ্রে জাহাজ টেনে নিতো।
* নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা: ১৯৪২ সাল থেকে শুরু করে বহু জাহাজ ও উড়োজাহাজ রহস্যজনকভাবে এই এলাকায় নিখোঁজ হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, ১৯৫০-এর দশকে এখানে বেশ কয়েকটি জাপানি সামরিক জাহাজ নিখোঁজ হয়, যেখানে প্রায় ৭০০ মানুষ মারা যায় বলে দাবি করা হয়।
* "ভাইল ভর্টেক্স" (Vile Vortex): স্কটিশ জীববিজ্ঞানী ইভান টি. স্যান্ডারসন এই ডেভিলস সি-কে পৃথিবীর বারোটি "ভাইল ভর্টেক্স" এর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যেখানে উচ্চ ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক অসঙ্গতি (electromagnetic aberrations) দেখা যায়। তার মতে, এই স্থানগুলি রহস্যময় এবং অস্বাভাবিক আবহাওয়া বা চৌম্বকীয় গোলযোগের সৃষ্টি করে।
* প্রাকৃতিক কারণ: এই রহস্যজনক ঘটনার পেছনে কিছু প্রাকৃতিক কারণও প্রস্তাব করা হয়েছে:
* মিথেন হাইড্রাইড: সমুদ্রের তলদেশে মিথেন হাইড্রাইডের বিশাল ক্ষেত্র থেকে গ্যাস নির্গমনের ফলে পানির ঘনত্ব কমে যায়, যার ফলে জাহাজ ডুবে যেতে পারে। মিথেন গ্যাসের বুদবুদ জলের পৃষ্ঠে উঠে আসে এবং জাহাজের ভারসাম্য নষ্ট করে সেগুলিকে ডুবিয়ে দিতে পারে।
* আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ: সক্রিয় আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপের কারণে সৃষ্ট শক্তিশালী ভূমিকম্প, সুনামির মতো বিশাল ঢেউ এবং বিদ্যুচ্চুম্বকীয় ব্যাঘাতও জাহাজ বা উড়োজাহাজ নিখোঁজ হওয়ার কারণ হতে পারে।
* প্রবল স্রোত ও ঝড়: এই অঞ্চলে তীব্র সামুদ্রিক স্রোত এবং অপ্রত্যাশিত ঝড় প্রায়শই দেখা যায়, যা নৌচলাচলের জন্য বিপজ্জনক।
বিতর্ক ও সমালোচনা:
অনেক বিজ্ঞানী এবং গবেষক ডেভিলস সি-এর রহস্যময়তার দাবিগুলিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ১৯৭৫ সালে আমেরিকান লেখক ল্যারি কুশে তার "দ্য বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল মিস্ট্রি সলভড" (The Bermuda Triangle Mystery Solved) বইয়ে ডেভিলস সি-এর কিংবদন্তিগুলিকে খণ্ডন করেন। তিনি দাবি করেন যে, সরকারি কার্যালয়গুলি এই অঞ্চলকে বিশেষ বিপজ্জনক এলাকা হিসাবে জানে না এবং রিপোর্ট করা নিখোঁজ ঘটনাগুলির অধিকাংশই ছোট মাছ ধরার নৌকা বা দুর্বল বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থার জাহাজগুলির ছিল। আবহাওয়াও সবসময় "নিখুঁত" ছিল না, যেমনটা কিছু গল্পে দাবি করা হয়েছে। অনেক নিখোঁজ ঘটনার পেছনে মানব ত্রুটি এবং প্রাকৃতিক কারণগুলিই দায়ী বলে মনে করা হয়।
সংক্ষেপে, ডেভিলস সি জাপানের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরের একটি ভৌগোলিক অঞ্চল, যা রহস্যময় জাহাজ ও উড়োজাহাজ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার জন্য পরিচিত। যদিও এর পেছনে কিংবদন্তি এবং অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যার প্রচলন আছে, বেশিরভাগ বিজ্ঞানী এই ঘটনাগুলির পেছনে প্রাকৃতিক কারণ (যেমন আগ্নেয়গিরি, মিথেন গ্যাস, প্রতিকূল আবহাওয়া) এবং মানব ত্রুটিকে দায়ী করেন।