09/05/2026
একটি মেয়ের গল্প
ছোটোবেলায় মিষ্টি দেখতে ছিলো বলে বাড়ির আদুরে নাম মিঠাই। মেয়েটি থাকে হুগলি জেলার ইতিহাস-প্রসিদ্ধ শহর চুচুঁড়াতে। প্রাচীন এই শহরের প্রাণকেন্দ্র বলা যায় ঘড়ির মোড়। আর এই অঞ্চলের মধ্যবিন্দুতেই রয়েছে মেরুদণ্ডের মত সুদৃঢ় - উল্লম্ব পিলার। আর এর ওপরেই সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো সুদৃশ্য মোড়কে ঘড়ির কাঁটা ঘুর চলেছে সময়ের সাম্যে। অথচ এই শহরের সেই সুদৃঢ় মেরুদণ্ড সম অঞ্চলের ঢিল ছোঁড়া দূরে ছোটবেলা থেকেই সময়ের পেছনে থেকে দিন থেকে রাত আর রাত থেকে দিন পার করে চলেছে অতি নমনীয় মেরুদণ্ড হয়ে বিশেষভাবে পারদর্শী হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া পাল-চৌধুরী পরিবারের ছোট জন - মিঠাই। মেয়েটির শরীরে ভিটামিন ডি সঠিকভাবে সংশ্লেষিত হতে পারে না, যার ফলে সাধারণ মানুষের হাড় শক্ত ও ভঙ্গুর ধরণের হলেও মিঠাই এর হাড়(অস্থি) ভঙ্গুর নয় — বরং ওর হাড় ভীষণ ভাবেই নরম-স্থিতিস্থাপক-নমনীয়- শক্তিহীন। ঘড়ির মোড়ের ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলেছ। আর মিঠাই এর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধীরে ধীরে বেঁকেই চলছ।
ছোটবেলায় তবুও দেওয়াল ধরে ধরে কোনোক্রমে হাঁটতে পারত। এখন সে হাঁটতেও পারে না, ঠিকমতো বসতেও পারে না। শুয়ে থাকলে কাউকে ধরে তুলে বসিয়ে দিতে হয়। খাইয়ে দিতে হয়। মিঠাই প্রতিকারহীন এক কঠিন - বিরল রোগে আক্রান্ত - সেরিব্রাল পালসি।
সেরিব্রাল পালসি হলো শিশুদের চলন, ভঙ্গি ও পেশির নিয়ন্ত্রণের একটা সমস্যা। "সেরিব্রাল" মানে মস্তিষ্ক, আর "পালসি" মানে দুর্বলতা বা পক্ষাঘাত। অর্থাৎ জন্মের আগে, জন্মের সময় বা জন্মের পর খুব অল্প বয়সে মস্তিষ্কের যে অংশ শরীরের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে, সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই অবস্থা তৈরী হয়।
ঘড়ির কাঁটা সাম্যতা দিলেও ভারসাম্য ও সমন্বয়ের অভাবজনিত এই রোগ মেয়েদের ক্ষেত্রে বিরলতমের মধ্যে বিরলতর এবং যা পুরোপুরি নিরাময় হয় না। তার সঙ্গে আছে মিঠাই এর কথা বলতে সমস্যা, ঢোঁক গিলতে অসুবিধা। কোনো ওষুধ নেই। কোনো ইনজেকশন নেই সেরিব্রাল পালসির প্রতিকারে। জীবনকে যতটুকু টিকিয়ে রাখা যায় তারই একমাত্র উপায় ফিজিওথেরাপি।
যদি কিছু পেশিকে শক্তিশালী ও নমনীয় রাখা যায়।
পরীক্ষা দিতে গেলে তাকে কোলে করে পরীক্ষার হলে নিয়ে যেতে হয়। বিশেষ অনুমতি নিয়ে তাকে বসিয়ে পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হয়। দু’ঘণ্টা স্থির হয়ে বসে থাকা তো দূরের কথা, মেরুদণ্ড সোজা করে কলম ধরে পরীক্ষা দেওয়াটাই তার পক্ষে অসম্ভব।
এই ভয়ঙ্কর পাহাড়প্রমাণ শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও, সারা পশ্চিমবঙ্গ ব্যাপী নবম শ্রেণির সব বিষয় নিয়ে এক বৃত্তিমূলক পরীক্ষা - অভয়চরণ মেরিট হান্ট - ২০২৪ এ বিশেষভাবে পুরস্কৃত হয়েছিল এবং 'Beacon Award'- অর্জন করেছিল।
সেই আদূরে মেয়েটি, মিঠাই — রিকি পাল চৌধুরী, হুগলি জেলার সারদামণি গার্লস হাই স্কুলের ছাত্রী — ২০২৬ এর মাধ্যমিকে অসাধারণ ফল করেছে। ৬৫৬ অর্থাৎ - ৯৩.৭১%।
অভয়চরণ দে ফাউন্ডেশন গর্ববোধ করে যে তাদের প্রচেষ্টার মাধ্যমে এমন এক রত্নের সন্ধান মিলেছে। রিকি পাল চৌধুরীর এই অসামান্য সাফল্য প্রমাণ করে, আমরা আমাদের সামান্য প্রচেষ্টার মাধ্যমে সঠিক পথেই আলোর দিকে এগিয়ে চলেছি। আমাদের এই যাত্রা, রিকির মত অমূল্য রতনকে খুঁজে পাওয়ার হৃদয় উৎসারিত বিনম্র অহংকার — আজ কিছুটা হলেও সার্থক।
৮ মে, ফলপ্রকাশের পরের দিনই মিঠাইয়ের জ্যেঠির তারকেশ্বরে পুজো দিতে যাওয়ার কথা ছিলো মিঠাইয়ের অসাধারণ ফলের জন্যে। কিন্তু কি মনে হল বাড়ির কাছের দৃশ্যমান ঠাকুরকেই আজ বরং নমস্কার করে আসার কথা ভাবলেন। ঘড়ির কাঁটা আর রবির মধ্য গগনের আলো জানান দিচ্ছে এখন অপরাহ্ন। আর ঘড়ির মোড়ের ঠিক পাশেই গলায় মোটা রজনীগন্ধার মালা আর একমুখ দাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে রবি ক্রমশ অভিজ্ঞ-তর-তম হচ্ছেন বৈশাখের এক-একটা পঁচিশ দেখে। মিঠাই এর প্রতিনিধি হয়ে জ্যেঠি যখন দৃঢ় মেরুদণ্ড নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা ঠাকুরকে প্রণাম করলেন মালা থেকে একটা রজনীগন্ধা ফুল হঠাৎ জ্যেঠির মাথায় এসে পড়লো। জ্যেঠি অবাক হয়ে যখন ওপরের দিকে তাকালেন, দেখলেন একটা কাক 'কা' 'কা' 'কা' করে ডেকে চলেছে.....
...................... ওর জন্য রইল আমাদের আন্তরিক শুভকামনা ও অফুরান ভালোবাসা ।