10/11/2025
টুং- সোনাদা- ঘুম পেরিয়ে ….
এবারের excursion এর গল্পটা শুরু করবো শেষ থেকে। 5 ই নভেম্বর, সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা, কলকাতা স্টেশনের 3 নম্বর প্ল্যাটফর্মে হলদিবাড়ি কলকাতা intercity express এর S3 কামরার বাইরে তখন টুকরো টুকরো স্বজন আলিঙ্গনের ছবি। কোথাও সারা tour এ দাপটে leadership করা দ্বাদশের ছাত্রী বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে, কেউ আবার প্রিয় দিদিকে পাশে নিয়ে চিৎকার করে লাফাচ্ছে। আবার কোথাও মা বাবা হারানো কোনো মেয়ের অশীতিপর দাদু নাতনিকে দেখে ছলছলে চোখে দুই হাত জোড় করে শিক্ষিকাদের কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন । কোথাও বা প্রিয় বন্ধুর সাথে হয়তো জীবনের প্রথম ও শেষ বারের মতো কাটানো সোনালী মুহূর্তের কথা মনে করে একে অপরের গলা জড়িয়ে কান্না - শিক্ষিকারা ছাত্রীদের এহেন আচরণে একেবারে হতবাক! বেশ কিছুক্ষণ চারিদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে এই খন্ডচিত্রগুলো শুধু দেখলাম। আমরাও বাকরুদ্ধ. এগুলো কি শুধুই নিকট আত্মীয়কে চারদিন বাদে পাওয়ার আনন্দ? নাকি দার্জিলিং পাহাড়কে ছেড়ে আসার বেদনা? নাকি কাছের মানুষদের থেকে কিছু সময়ের জন্য দূরে চলে গিয়ে তাদের আসল গুরুত্ব বোঝার পাঠ? উত্তরটা এখনও পরিষ্কার নয়। সনৎ রায় চৌধুরী ইন্সটিটিউশন ফর গার্লস এর এবারের ভ্রমণটা প্রকৃত অর্থেই অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়েছে ছাত্রী ও শিক্ষিকাদের, সত্যিই এ এক শিক্ষাসফর। উত্তরবঙ্গে হঠাৎ করে নেমে আসা প্রাকৃতিক বিপর্যয়, ঘূর্ণি ঝড় মোন্থার প্রভাবে প্রবল বৃষ্টি, লাল সতর্কতা , এই সব কিছুর ভয় কাটিয়ে 2 রা নভেম্বর সকাল 6.50 এ কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসের চাকা যখন গড়াতে শুরু করল তখনও আমরা বুঝি নি একাদশ দ্বাদশের ভূগোল ও সাংবাদিকতার জনা পঁচিশেক ছাত্রীকে ওদের এই ছোট্ট জীবনের সম্ভবত সেরা উপহারটা আমরা দিতে চলেছি। TTE টিকিট পরীক্ষা করতে এসে বলে ফেললেন পুরো S4 কামরাটা গোলাপি রঙে ভরে গেছে। আমাদের ভালোবাসার সেই গোলাপি তিতলিরা দার্জিলিং পাহাড়ে ওড়ার স্বপ্ন দেখেছিল, আমরা শুধু ওদের সেই স্বপ্নটুকু সত্যি করতে চেয়েছিলাম।
সন্ধ্যে ছ'টায় NJP station এ ট্রেন পৌঁছতেই বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস। স্টেশনের পার্কিং এরিয়া থেকে 4 টে গাড়িতে 33 জনের দল 4 ভাগে ভাগ হয়ে যাত্রা শুরু হল।গন্তব্য কার্শিঅং পাহাড়। শিলিগুড়ি শহর ছাড়িয়ে সুকনা elephant corridor মুখী হতেই হঠাৎ আমার গাড়িতে বসে থাকা ছয় জন ছাত্রী ও একজন প্রাক্তন ছাত্রী ও বর্তমানে স্কুলের ICT শিক্ষিকা সমস্বরে উল্লাস করে উঠলো। ততক্ষণে দূরের পাহাড় লক্ষ তারার রোশনাইতে ঝলমলে । মনে পড়ে গেলো আমার জীবনে প্রথম বার পাহাড় দেখার অভিজ্ঞতার কথা। Driver সাহেব হেসে ফেললেন। পাশের সিটে বসা আমি সমতল শহরবাসী অতি সাধারণ পরিবারের মেয়েদের প্রথম পাহাড় দেখার আনন্দ ওনাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। Rohini road ধরে গাড়ি যত উঠতে থাকলো বিস্ময়ে আনন্দে ওদের মুখে কথা সরছে না। গুরু নানক জয়ন্তীর প্রাক্কালে রুপোলী চাঁদের আলো আমাদের কন্যেদের মুখের হাসির সঙ্গে মিলেমিশে ম্যাজিক শুরু করেছে ইতিমধ্যেই। পাহাড়ের এক অদ্ভুত মায়া জড়ানো রূপ দেখতে দেখতে ঘন্টা দেড়েক পরে পৌঁছে গেলাম আমাদের নির্ধারিত থাকার জায়গায়। গোটা শিলিগুড়ি শহর লক্ষ লক্ষ হীরে নেকলেস পরে আমাদের সামনে বিছিয়ে আছে।
ঘরের ব্যালকনিতে হিমেল হাওয়া উপেক্ষা করে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকা মুখগুলো বলে ওঠে, "ম্যাম এমন সুন্দর জায়গাও পৃথিবীতে আছে এখানে না এলে বুঝতেই পারতাম না"। সারারাত বন্ধুদের সাথে ওদের সেই আনন্দের উত্তাপ আমাদের মানে শিক্ষিকাদের ঘর পর্যন্ত পৌঁছে গেছিল। পরের দিন সকালে গরম গরম ভাত, মুসুর ডাল, আলু মাখা আর ডিম ভাজা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম দার্জিলিং পাহাড় দেখতে। রং বেরঙের রুচি সম্মত পোষাকে ছাত্রীরা পাড়ি দিল স্বপ্নের জগতে। মেঘ কুয়াশার খেলায় মেতেছে পাহাড়ের রানী। বহু স্বপ্ন আর স্মৃতি মাখা কর্শিয়াং, টুং, সোনাদা, ঘুম শহর ও ষ্টেশন অতিক্রম করে ঘুম monastery, batasia loop , মহাকাল মার্কেট ঘুরে অবশেষে দার্জিলিং ম্যাল এ যখন পৌঁছলাম ওরা তখন পাখির চোখে view point থেকে দেখা তিস্তার মতোই ব্যাকুল। আনন্দের ঢেউ দুকূল ছাপিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে সুদূর কলকাতায় ওদের প্রিয়জনদের কাছে।
মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দেওয়া কাঞ্চনজঙ্ঘাকে ওরা যেন ছুয়ে দেখতে চায়। সব মুহূর্তগুলো ভীষণ সত্যি - এতক্ষণে ওরা দার্জিলিং পাহাড়ে মন হারিয়েছে। আমরা শুধু ওদের আগলে রেখেছি আর ওদের ছুঁয়ে একটু একটু করে ফিরে গেছি আমাদের ঊনিশ কুড়িতে।
পরের দিন মায়েরা কন্যেদের হাত ধরে কার্শিয়ং পায়ে হেঁটে ঘুরতে বেরোলেন। কোনো জায়গাকে চিনতে গেলে পায়ে হেঁটে তার ঘর গেরস্থালি ছুঁয়ে না দেখে উপায় নেই। Giddha পাহাড় tea factory, Hanuman top view point , Netaji museum এবং সংকীর্ণ রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে toy train এর যাতায়াত, আর পাহাড়ের chicken momo র স্বাদ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করেছে ওরা। সেই সুখের অজস্র ছবি উঠেছে ওদের ফোন ক্যামেরায় আর আমাদের মন ক্যামেরায়। সবটুকু আশ্চর্য ঝলমলে, কৈশোরের রঙে রঙিন।
চারদিন পাহাড়ে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত যেমন ওদের সারা জীবনের পাথেয় তেমনই , আমাদের ওপর চোখ বন্ধ করে ভরসা রাখা ওদের হাসিমুখগুলো আমাদের বাকি কর্মজীবনের inspiration হয়ে থেকে যাবে। আসলে এটি একাদশ দ্বাদশের ভূগোল ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষা মূলক ভ্রমণ ছিল ঠিকই, কিন্তু
ইংরেজি ক্লাসে সেই যে রাশিয়ান লেখক Leo Tolstoy এর লেখা Three Questions গল্পে ওরা শিখেছিল যে জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সময় হল বর্তমান সময় , গুরুত্বপূর্ণ কাজ সেই মুহূর্তের কাজ আর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হলেন ওই মুহূর্তে যার সঙ্গে আমরা থাকি তিনি – এক অদ্ভুত co relation দেখলাম সাহিত্যের সঙ্গে ওই ভূগোল আর সাংবাদিকতা বিভাগের মেয়েদের। জীবনের সবথেকে বড় সত্য ওরা যে এভাবে বুঝতে পারবে এই চার দিনের excursion এ না গেলে বোধহয় বুঝতেই পারতাম না। ফেরার আগের রাতে সারারাত ওদের উল্লাসে আমরা বাধা দিই নি, তবুও পরের দিন ভোর বেলা নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই বেরিয়ে পড়েছিলাম NJP স্টেশন এর উদ্দেশ্যে। সকালের মিঠে রোদে শ্বেতশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘা আমাদের সঙ্গী হল। সে যেনো চাইছেনা আমাদের বিদায় দিতে। বুদ্ধদেব তখনও শান্তির বার্তা নিয়ে হিমালয়ের শিয়রে শায়িত। আলুয়াবাড়ি স্টেশন পর্যন্ত কাঞ্চনজঙ্ঘা আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল। আমাদের ছাত্রীরাও সেই Three Questions এর পাঠ নিয়ে ওদের জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ব্যক্তি আর সময়কে সাদরে আলিঙ্গন করে গৃহমুখী। আর কলকাতায় ফেরার পর যে প্রশ্ন গুলোর উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলাম না তার নেপথ্যেও ওই Three Questions এর উত্তরগুলো। ওরে মেয়েরা, জীবনের পথে যখন অনেকটা এগিয়ে যাবি, আরো অনেকবার পাহাড় সমুদ্র ঘোরা হয়ে যাবে তোদের - তখন হয়তো কখনো কখনো শীতের কমলালেবুর মতো নরম রোদ্দুর তোদের মনের ঐ রঙিন খামের মুখটা খুলে দেবে, যার মধ্যে তোদের ইস্কুলের মায়েরা দার্জিলিং পাহাড়ের অনেক হাসি আর খুশি যত্ন করে খুঁজে এনে দিয়েছিল।