16/05/2024
জীবনের একটা দীর্ঘ সময় ধরে, বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার শিক্ষাদানের সাথে সম্পৃক্ত থাকার সুবাদে,প্রায়শই নানান অভিভাবকেরা আমার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করেন, " স্যার, আমার ছেলেটাকে কিভাবে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করব এখন থেকেই, বলে দিন অথবা আমার মেয়ে কি বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করলে বা কোন ধরনের পরীক্ষা দিলে জীবনে সাফল্য অর্জন করতে পারে ? " ইত্যাদি, ইত্যাদি। সত্যি কথা বলতে কি, এজাতীয় প্রশ্নের কখনো এক কথায় উত্তর হয় না। ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে তাদের ইচ্ছে, মেধা, যোগ্যতা এবং বিষয়ভিত্তিক পারদর্শিতা এবং অতীতের সাফল্য - এই জাতীয় বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে এবং তা বিশ্লেষণ করে, আগামী দিনের সম্ভাব্য কাজের বাজারে তার ভূমিকা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে একটা prediction বা সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয়। এই পরামর্শ দেওয়ার কাজটা কিছুটা হলেও জটিল এবং চ্যালেঞ্জিং। যাই হোক এ ব্যাপারে নিজস্ব অভিজ্ঞতা কয়েকটি কথা বলি, আগামীদিনের সচেতন ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের উদ্দেশ্য যা কিছুটা হলেও তাদের কাজে লাগতে পারে।
আধুনিক সময়ে কেরিয়ার নির্বাচন
-------------------------------------------------
ও কিছু কথা।
--------------------
কলমে : নিরুপম রায়
(আজ প্রথম পর্ব )
1) প্রথম থেকেই নজর দিন সন্তানের Basic education তৈরীর দিকে, প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় খুব একটা সময় বা গুরুত্ব দিই না, স্বল্পশিক্ষিত কোনো স্থানীয় টিউটর কে দিয়ে বা নিজেদের জ্ঞানের খামতি সত্ত্বেও কোন রকমে বাচ্চাদের পড়িয়ে কাজ সারার চেষ্টা করি, কিন্তু এক্ষেত্রে দরকার একজন প্রকৃত দায়িত্বশীল শিক্ষকের যিনি শুরু থেকেই একেবারে পেশাদারী দক্ষতার সাথে পড়াশোনার ভিতকে মজবুত করে তুলবেন Discipline শেখাবেন, তার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীর মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে শেখার আগ্রহকে জাগিয়ে তুলতে পারবেন, পড়াশোনাকে আত্মস্থকরণ বা ভালোবাসতে শেখাবেন অনেকটা খেলার ছলে। Tutor এক না হয়ে একাধিক হতে পারে কিন্তু বাচ্চার ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমরা যেন শুরু থেকেই তার পড়াশোনার ব্যাপারে compromise না করি। ইংরেজির পাশাপাশি মাতৃভাষা শেখানোটাও খুবই প্রয়োজন, এটাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া বা উপেক্ষা করা কোনো কাজের কথা নয়। সত্যি কথা বলতে কি বাচ্চার ভিত যত মজবুত হবে পরবর্তীকালে মধ্যশিক্ষা বা উচ্চশিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে তা তত বেশী সহায়ক হবে। বিশেষভাবে ম্যাথমেটিক্স এবং ইংরেজি - এই দুটো বিষয়ে ধারণা পরিস্কার থাকা খুবই জরুরি। আপাতদৃষ্টিতে সময় পেরিয়ে গেলেও এই বিষয়গুলোর প্রাথমিক ধ্যান ধারণা আয়ত্ত করে নেওয়া অসম্ভব কিছু নয়।
2) স্কুল লেভেল থেকেই বোঝার চেষ্টা করুন কোন বিষয়ের উপরে ছাত্রছাত্রীর আগ্রহ, সর্বাধিক, সেই বিষয়টাকে সে enjoy করে কিনা!! বিষয়ভিত্তিক নম্বর গুরুত্বপূর্ণ হলেও নম্বরের মাপকাঠিতে নয়, আগ্রহের প্রাচুর্যের উপর ভিত্তি করে বিষয় নির্বাচন করুন। কোন বিষয়টা বারবার পড়া সত্ত্বেও সে ক্লান্তি অনুভব করে না - সেটাই লক্ষনীয়। এরপর দেখুন ওই বিষয়ের ভবিষ্যৎ কতটা কর্মসংস্থানের কোনো ভালো সুযোগ আছে কিনা, একান্ত না থাকলে তার কাছাকাছি বিকল্প কর্মসংস্থান কি হতে পারে সেটা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করা। বেশিরভাগ অভিভাবকই গতানুগতিক শিক্ষা ধারায় বিশ্বাসী। এই mindset থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, আপনার সময়ে যেটা খুব চাহিদার ছিল, আজ সেটা নাও থাকতে পারে। কাজেই সম্পূর্ণভাবে পরীক্ষিত না হলেও যুগোপযোগী বা নতুন ধারার কিছু বিষয় নিয়ে এগোনোর কথা অবশ্যই ভাবা যেতে পারে। এক্ষেত্রে আপনাকে একটু দূরদর্শী হতে হবে, সাম্প্রতিক সময়ে কোন বিষয়টি নিয়ে লোকে বেশী পড়ছে, সেটা একমাত্র বিবেচ্য নয় বরং আগামীদিনে কোন বিষয়ের চাহিদা বাড়তে চলেছে - এই prediction টা খুব জরুরি।
3) অল্প বয়স থেকেই Constructive Skill বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। আজকের এই আধুনিক ডিজিটাল দুনিয়াতে যার যত বেশি skill থাকবে সে তত বেশি এগিয়ে থাকবে অন্যদের চাইতে IT skill হতে পারে Video editing skill হতে পারে Graphics design skill হতে পারে, আবার চিরাচরিত Writing skill হতে পারে Photography skill হতে পারে Film making ability হতে পারে এমন আরও অনেক কিছু। একটা সময়ের পর এই Skill তাকে অসময়ে বা প্রয়োজনে বাড়তি অর্থ রোজগার করতে সাহায্য করবে, তার practical knowledge কে আরও বাড়িয়ে তাকে নিখুঁত performer হতে সাহায্য করবে। দিনের পর দিন, অন্য আরও কিছু না শিখে, skill অর্জন না করে শুধুই পড়াশোনা আর পড়াশোনা - তাকে একসময় চূড়ান্ত competition এর মধ্যে ফেলে দেবে সেখানে জিততে পারলে ঠিক আছে না হলেই কিন্তু হতাশা গ্রাস করতে বাধ্য।
4) নিজের অপূর্ণ ইচ্ছা কখনোই সন্তানের উপর জোর করে চাপিয়ে দেবেন না। এমনকি অন্যদের সাথে আপনার সন্তানের তুলনাও করবেন না অমুক বাবুর ছেলে AI নিয়ে পড়ছে কাজে তোমাকেও AI নিয়েই পড়তে হবে- এমন অযৌক্তিক, বালখিল্য আবদার ভুলেও করবেন না, সেটা আপনার সন্তানের পছন্দের বিষয় নাও হতে পারে। অভিভাবক হিসেবে আপনার কাজ হল আপনার সন্তানের মেধা বা ক্ষমতা অনুযায়ী কিছু সামাজিক পদমর্যাদা সম্পন্ন পেশার তথ্য বা সম্ভাবনা তার কাছে তুলে ধরা, তার pros and cons বুঝতে সাহায্য করা নির্দিষ্ট লক্ষ্যের পাশাপাশি বিকল্প কিছু পরিকল্পনার কথা তাকে জানানো কিন্তু ভবিষ্যতে ও কি নিয়ে পড়বে, কোন বিষয়ে পেশাদার হবে সেটা আপনার সন্তানের উপরেই ছেড়ে দিন। ও ওর সীমাবদ্ধতা ও সাবলীলতা অনুযায়ী যেটা স্বচ্ছন্দ অনুভব করবে সেদিকেই ওকে যেতে দিন। তাতে আপনি ও আপনার সন্তান দুজনেরই মঙ্গল। ক্ষেত্র বিশেষে দু'একটা অবুঝ সন্তান এর ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হতে পারে কিন্তু প্রগতিশীল চিন্তা ভাবনা, এমনটাই হওয়া উচিত।
5) যুগ যুগ ধরে ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং পেশার উপরে অধিকাংশ বাঙালি অভিভাবকদের এক চরম মোহ রয়েছে, জানিনা কেন!! অদ্ভুত ব্যাপার, এর বাইরে থাকা অজস্র পেশা কখনোই এনাদের কাছে প্রাথমিক লক্ষ্য হিসাবে পরিগনিত হয় না। ওই পেশাগুলোতে যুক্ত থাকা ব্যক্তিরা বোধহয় অন্য পেশা অর্জন থেকে লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়ে ঘটনা চক্রে এখানে নিযুক্ত হয়ে গেছে। এই তথাকথিত ডাক্তারি - ইঞ্জিনিয়ারিং mindset থেকে অভিভাবক ও ছাত্র ছাত্রীদের বেরোতে হবে, বুঝতে হবে যুগ যুগ ধরে একই ইচ্ছে এটাকে এক চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রতে পরিনত করেছে যেটা সকলের জন্য নয়। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের মাত্রাতিরিক্ত এই আকাঙ্খাকে মর্যাদা দিতে গিয়ে কিছু বানিজ্যিক সংস্থা মোটা টাকার বিনিময়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠানে তাদের শিখিয়ে পড়িয়ে certified ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তার তো বানিয়ে দিচ্ছে কিন্তু চাকরির বাজারে তাদের কদর খুবই কম। তাই একটু ঝুঁকি নিয়ে হলেও আগামীদিনে প্রসারিত হতে পারে এমন পেশা বা নতুন কোনো পেশা বা অপেক্ষাকৃত কম প্রতিযোগিতামূলক পেশা নির্বাচনের লক্ষ্যে নিয়ে এগোতে হবে। মনে রাখবেন যত বেশী পরীক্ষিত বা পরিচিত পেশা তত বেশি প্রতিযোগিতার ভীড় সেখানে। প্রতিযোগিতার ভয় করে লাভ নেই ঠিকই তবে এটাও ঠিক শিক্ষা ক্ষেত্রে সারাজীবন পিছিয়ে থাকা বাচ্চারা কেরিয়ার তৈরীতে গিয়ে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পরে। সবাই তো আর অসাধারণ মেধাবী বা দুর্দান্ত academic ক্ষমতার অধিকারী হয় না, মধ্যমেধার সাধারণ ছেলেমেয়েরা তাহলে যাবে কোথায় ?
( পরবর্তী অংশ থাকছে আগামীকাল )