28/06/2020
মহাবিবর্তন দ্বিতীয় পর্ব (৪)
-----------------------------------------------------------------------------------------
তৃষ্ণাসন্তপ্ত দাবদাহপ্রজ্জ্বলিত মধ্যাহ্নের পটভূমিকায় শ্যামাঞ্চলচ্ছায়া,
লোহিত গৈরিক স্বর্ণালোকরেণুময় গোধূলির পটভূমিকায় কৃষ্ণাঞ্চলচ্ছায়া,
নিবিড় জলভারনম্র বর্ষণমুখর আকাশের পটভূমিকায় নীলাঞ্চলচ্ছায়া,
অশ্রুভারাতুর উন্মনা অধীর দুটি আঁখির পটভূমিকায় প্রেমাঞ্চলচ্ছায়া,
মহাপ্রকৃতি ছায়া দিয়ে ঢাকতে চায় তার প্রেমসুধাময় মোহমগ্নতার জগৎ৷
বর্ষাস্নাত, মেঘমল্লারমুখরিত, সূর্যরশ্মিদীপ্ত, রূপমাধুর্যসিক্ত,
তরঙ্গিত, প্রশান্ত, উচ্ছ্বসিত, প্রশমিত, ঊর্মিউচ্ছলিত, নিবিড়নিস্পন্দিত
যে আবেগউচ্ছ্বাসরাশি অনুভবের উন্মাদনাকে প্রকাশ করে, পুনঃ অনুভবের নিরাকরণকে আত্মীকরণ করে, তা মহাসত্যের আকুল আবেষ্টনে নিদ্রামগ্ন হল৷ তন্দ্রিত নিশীথিনী, স্বপ্নচারিণী, চম্পা শেফালিকা চামেলী কেতকী মাধবীলতার হৃদয়বিহারিণী, নিদ্রিত, চন্দ্রকিরণস্নাত কমলমুকুলদলের মধুহৃদয়মোহিনী, অসীম অনুপ্রেরণার সুধানির্ঝরে
স্নাত হল, অসীম রূপমাধুর্যঊর্মিমুখরিত সমুদ্রে দ্রবীভূত হল৷ সমুদ্রতল
হতে নিখিল বিশ্বের অন্ধকাররাশি বিধ্বংসনকামনায় উত্থিত হল
অতুল বীর্য৷ অন্ধকার, কারাগার, তমসাপাথার, অহঙ্কার, অবিকার, নির্বিকার, বিষাধার, দুর্ভার, ভবসংসার, তীক্ষ্ণধার, তরবার, অগ্নিস্ফুলিঙ্গাধার, অঙ্গার, অপ্রতিকার, রুদ্ধদ্বার, অস্বীকার, ঝঞ্ঝাপারাবার, তরঙ্গ দুর্নিবার, রুদ্রবীণাঝঙ্কার, নটমল্লার, দুস্তর অপার, প্রত্যাহার৷ কেন প্রত্যাহৃত হল বিন্দু বিন্দু সুধা দিয়ে ঘনীভূত অনবরুদ্ধ অনবগুন্ঠিত প্রেরণাসিন্ধু? অন্ধকার গুহাগহ্বরে মুক্তির তীব্র ব্যাকুল
প্রার্থনায় একটি চিন্তাতরঙ্গ উত্থিত হয়েছিল, কমলমুকুলদলের উন্মোচিত মধুহৃদয়ে ধরা পড়েনি সে মুক্তির অনিবার্য প্রয়োজনের ক্ষীণতম মহাসত্যটি৷ সত্য তাই সৌন্দর্যহীন হবার ভয় নিয়ে, সুন্দর তাই সত্যহীন হবার ভয় নিয়ে, বন্ধন তাই অপ্রতিকারে নির্বিকারে চিররুদ্ধদ্বারে
অন্তরীণ হবার ভয় নিয়ে সকল মধুময় মোহমগ্নতাকে অস্বীকার করেছে, প্রত্যাহার করেছে৷ সব বাক্যের অবসানে একটি মহাসত্য থাক, সব
মহাসত্যের অবসানে একটি বাক্য থাক৷ সব বন্ধনের অবসানে
একটি দীপ্যমান শিখা থাক, সব দীপ্যমান শিখার অবসানে একটি বন্ধন থাক৷ কথার অবসান হোক, কথার অবসানে নৈঃশব্দ্যমুখর শ্বেতকরবীর
মধুমঞ্জরী থাক, নৈঃশব্দ্যের অবসান হোক, নৈঃশব্দ্যের অবসানে গোধূলির রক্তরাগে শত বিহঙ্গের কলকাকলিগুঞ্জরিত প্রগল্ভা রক্তকরবীর রক্তিমমঞ্জরী থাক৷ অলি, কলি, চামেলী, তুলি, শ্যামলী, স্বর্ণালী, রূপালি, দীপালি, মিতালী, চৈতালী, পূবালী, শেফালি, কুহেলী, কাকলি, বিজলি, বর্ণালি, গোধূলি, রূপাবলী, রত্নাবলী, চন্দ্রাবলী, খেয়ালী, অংশুমালী, গীতালি, শিউলি, স্বপ্নচারী, অন্তরীক্ষচারী, নক্ষত্রচারী, হৃদয়বিহারী৷ ভাষায়
সত্য জাগে, তারও ঊর্ধ্বে প্রাণোজ্জীবনরূপ সত্যে ভাষা বিলীন হয়ে যায়৷ কী অপূর্ব পরাজয় ভাষার এই বিলয়৷ জগৎ মহাজগৎ রবি চন্দ্র গ্রহ তারা ছায়াপথ নীহারিকা কৃষ্ণগহবর শ্বেতবামন নক্ষত্রের জন্ম নক্ষত্রের প্রজ্জ্বলন নক্ষত্রের ক্ষয় নক্ষত্রের নির্বাপণ সর্বলোক ভাবে পূর্ণ ভাবে পূর্ণ ভাবে পূর্ণ ভাবে পূর্ণ৷ অলয় মলয় বিলয় প্রলয় মহালয় নিলয় নিদ্রালয়
বিদ্যালয় শিক্ষালয় উপাসনালয় বাসনালয় হিমালয় দিগবলয় কুবলয়৷
কোথা হতে তার জাগরণ, কোথায় তার লয়, কোথা হতে তার পুনরুদ্ভব,
কোথায় তার পুনরাত্মনিবেদন? মনোকামনার আকাশে শ্বেতহৃদয়বলাকার
চঞ্চল পক্ষসঞ্চালনে তার জাগরণ, সে ভাষায় লেখা প্রেমের কবিতা
পাঠ করে চন্দ্রমার মৃদুমধুর হাস্যসিঞ্চিত শান্ত সরোবরে সমীরণস্পর্শের বিলীয়মান তরঙ্গস্পন্দনে তার লয়৷ ক্ষণিক সেই ভাষার কী সেই
দুর্দমনীয় মহাবিশ্বপরিক্রমা যা চিরকালের সর্বব্যাপী হৃদয়কে স্পর্শকারী, তবু একক, সঙ্গীহীন, কল্পবৃক্ষের ছিন্নপত্ররাশি দিয়ে শব্দ নির্মাণ করে করে আপনাকে করে তুলেছে পরিপূর্ণ? যে নদীর উৎস বর্ণময় লীলায়িত চন্দ্রমল্লিকা, যে নদীর মোহনা শ্বেতশুভ্র সন্ধ্যামাধুর্যময় রজনীগন্ধা, যে নদীর পশ্চিমকূলে সূর্যের পরিবর্তে রাধাচূড়া পুষ্প উদিত হয়, যে নদীর পূর্বকূলে অস্তরবির পরিবর্তে রক্তপলাশ ফুল অস্তমিত হয়, যে নদীতট প্রত্যহ পূর্ণ হয়ে থাকে শিশিরসিক্ত চম্পকফুলদলে, যে নদীর অতল গভীর বক্ষ প্রতিদিন স্পর্শ করে সৌরভময় মাধবীলতা, আর কাগজের নৌকায় করে যে নদীস্রোতে ভাসিয়ে দেওয়া হয় বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল, মধ্যাহ্নসুর্য দেখতে চাইলে যে নদীর নয়নতারকা অবগুন্ঠিত করে
রূপমাধুর্যবর্ষী কৃষ্ণচূড়ার রক্তমেঘমালা, সেই নদীর নামটি আকাশের বুকে জলের অক্ষরে লেখ৷ তার নাম চন্দ্রমালার অন্তরলীনা বকুলগঙ্গা পলাশযমুনা৷ হিমালয়ের তুষারশৃঙ্গমালা হতে নিত্যনিরন্তর হিমবাহ প্রবাহিত হয়ে চলেছে একটি বকুলফুলের হৃদয়াবগুন্ঠিত সত্যের মগ্ন প্রার্থনায়৷ সে সত্য পুষ্পদলে, বাদলে, তৃণদলে, করতলে, বৃক্ষতলে, নভোতলে, বারিবিন্দুদলে, শতদলে, সহস্রদলে, অন্তরতলে,
আত্মার অন্তস্তলে৷ সকল ছন্দহীন বাক্য বিলুপ্ত করে সকল ছন্দোবদ্ধ বাক্যের সুচনা এখানেই৷ যে নদীর নাম ধ্রুবতারকার প্রেমসুধাকণা যূথিকাকাবেরী তমালিকাকৃষ্ণা৷ কৃষ্ণা, তৃষ্ণা, সুদেষ্ণা, এষণা, দেশনা, উপাসনা, বাসনা, রসনা, সম্ভাষণা, কলস্বনা, ঘোষণা, উদ্ভাসনা, মূর্চ্ছনা, জোছনা, অঞ্জনা, ব্যঞ্জনা, রঞ্জনা, রূপাঞ্জনা,নীলাঞ্চলা, নিরঞ্জনা৷
হে মহাবিবর্তন, হে সঙ্গহীন, স্পর্শহীন, বিকারহীন, চ্যুতিহীন, স্খলনহীন,
শরীরহীন, কায়হীন, বিরামহীন, তুলনাহীন বাণী -
ওরে চিত্ররেখাডোরে বাঁধিল কে?
বহু পূর্বস্মৃতিসম হেরি ওকে৷
নৃত্যকলা যেন চিত্রে লিখা
কোন স্বর্গের মোহিনী মরীচিকা
শরৎনীলাম্বরে তড়িৎলতা
কোথা হারাইল চঞ্চলতা,
প্রিয় বন্দনাগান জাগানো রাতে
শুভ দর্শন দিবে তুমি কাহার চোখে?
হে চিত্ররেখা, একা, কেকা, রাকা, আঁকা, বলাকাপাখা, তুলিকা, লিপিকা,
বিদ্দ্যুল্লেখা, বিশাখা, পলাতকা, মালবিকা, সঞ্চালিকা, কুহেলিকা, কুজ্ঝটিকা, অরুণিকা, তোমার বিদ্যুৎবিভঙ্গময় নৃত্যকলা অতুলনীয় মোহমাধুর্যময়৷ তুমি মোহিনী, সোহিনী, তপস্বিনী, মনস্বিনী, চিরবিরহিনী, কুহকিনী, হৃদিরঞ্জিনী, তরঙ্গিনী, মর্ত্যরূপিণী, দিব্যরূপিণী, বিশ্বরূপিণী, অনন্তরূপিণী, কুমুদিনী, প্রমোদিনী, আনন্দিনী, বিজয়িনী৷ তোমার রূপপ্রভার উদ্ভাসে বিশ্ববক্ষে চঞ্চলতা জাগে, হৃদয় হতে হৃদয়ে প্রবাহিত হয় নীলাঞ্চলসঞ্চলিতা উচ্ছলতা, কিরণোচ্ছলতা, তারুণ্যোচ্ছলতা, আকুলতা, ব্যাকুলতা, বিহ্বলতা, তরঙ্গোচ্ছলতা, জেগে ওঠে সূর্যকরোজ্জ্বল আঁখিজলোচ্ছল প্রাণোচ্ছল সজল হৃদয়কুঞ্জলতা৷
অনিন্দিতা গাঙ্গুলী
২০৷ ০৮৷ ২০১৯