13/11/2025
🍂প্রিয়তমার দুল🍂
✍️লেখক-গণপতি মন্ডল🍂
হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পরে বাড়ি ফিরে,
কখনোই তোমার ভালো মন্দের খোঁজ নেওয়া হয়নি।কোন ক্রমেই দু' মুঠো অন্ন মুখে গুজেই ,
বিছানায় শুয়ে পড়তে মন চায়।
একদিনও আমি, তোমার ইচ্ছার কথা জানতে চাইনি। হয়তো অভিমানের পাহাড় জমে আছে তোমার বক্ষে,হয়তো তোমার পছন্দ অপছন্দের খবর রাখা হয়নি কখনো। তুমি সবসময়, মুখ বুজে সয়ে গেছো সবিই।সবসময় নিজের প্রাধান্যকে সুপ্ত রেখে, আমার সেবাযত্ন করে গেছো নিঃস্বার্থভাবে।
সেই ভোর থেকে উঠে শুরু হয় তোমার কর্মকাণ্ড,
ঘর বাড়ি ঝাঁটা দেওয়া,জল দিয়ে মোছা, উঠোনে জল ছড়া দিয়ে ঝাঁটা দেওয়া। তারপর শৌচাগার সেরে ,কাপড় ছেড়ে রান্না করা। তোমার রান্নার শেষ হওয়ার কিছু পূর্বে আমি উঠেই ব্রাশটা মুখে নিয়েই শৌচাগারের দিকে ছুটি, শৌচাগার থেকে বেরোতেই তুমি মগে করে জল নিয়ে এগিয়ে দাও আমার দিকে মুখ ধোওয়ার জন্য।তারপর তেল,সাবান, শ্যাম্পু ও গামছা হাতে তুলে দিয়েই,
রান্না ঘরের বাকি থাকা কাজ করতে চলে যাও, টিফিন বক্সে ভাত তরকারি গুছিয়ে ব্যাগে ভরে দেওয়া, সকালে খাবার জন্য ভাত বেড়ে তালপাতার পাখা দিয়ে হাওয়া করে সদ্য গরম ভাত ও তরকারি ঠান্ডা করতে থাকো,আর অপেক্ষা করো আমার জন্য ! স্নান থেকে ফেরার অপেক্ষায়।দেরি হলে মাঝে মাঝে হাঁক দিয়ে ডাকো কৈ-গো তোমার স্নান হলো ,সাতটা তিরিশ হয়ে গেছে।আমি তরিঘরি করে এসে দাঁড়ায়,তার মধ্যেই তুমি আমার প্যান্ট , জামা,রোমাল ,বেল্ট ও মানিব্যাগ সবই প্রস্তুত রাখো হাতের নাগালে,খাটের এককোনে।আমি তরিঘরি জামা প্যান্ট পরতে থাকি, তারমধ্যে তুমি ভাত সুন্দর করে মাখিয়ে মুখের দিকে এগিয়ে দাও খাওয়ানোর জন্য আমিও খেয়ে নিই গোগ্রাসে, জলের বোতলটা হাতে তুলে দাও খাওয়া র জন্য । আমার খাওয়া দাওয়া বরাবরই খুবই
তাড়াতাড়ি।সেই স্কুল -কলেজ জীবন থেকেই তাড়াতাড়ি খাওয়ার অভ্যাসটা রপ্ত করে ছিলাম ।ভাত গালে দিয়ে অল্প চিবিয়েই গিলে ফেলা আমার অভ্যাস আর তার সাথে এক ঢোক জল খেতেই হবে। তুমি আমার সাথে ১২ বছর আছো,
আমার অভ্যাস-অনভ্যাস,ইচ্ছা-অনিচ্ছা,
সবই জেনে গেছো একে একে। তুমি আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছো। তারপর খাওয়া শেষে ,কাজে বেরনোর আগে ব্যাগটা এগিয়ে দাও আমার দিকে।কাছে কোন খরচার টাকা আছে কিনা জিজ্ঞাসা করো,না থাকলে নিজের ব্যাগের থেকে টাকা বের করে আমাকে দাও বরাবরই।
কত টাকা যে তোমার থেকে এমন ভাবে নিয়েছি তার ইয়াত্তা নেই। কোনদিন ১০ টাকাও দেওয়া হয়নি তোমার হাত খরচার জন্য, সংসার চালাতে প্রতিমাসের টাকা বেরিয়ে যায় বেতনের প্রথম মাসেই। তুমি সারাদিনের হার ভাঙা খাটুনির পরেও ঠোঙা করে সংসারের ছোট ছোট খরচা চালিয়ে সাহায্য করো আমাকে। টিভির কেবলের টাকা,মেয়ের স্কুলের টিফিনের খরচা,মাঝে মাঝে মেয়ের প্রাইভেট টিউটর এর খরচাও তুমি দাও নিঃস্বার্থভাবে। কোনদিন মুখফুটে তোমার নিজের জন্য কোন কিছুর দাবি করোনি আমার থেকে। আমার সাথে কোথাও গেলে বাহুল্যতা করে কিছু খেতে চাওনি ইচ্ছামতো,আমি যা কিনে দিয়েছি খেয়েছো তৃপ্তি করে। আমার বাবা-মা কে আপন করেছো তুমি। যদিও তোমার বাবা মায়ের তুমি একা সন্তান। তবুও তোমার সম্পর্কে যতটা বলব অনেক স্বল্প বলা হবে। সেদিন খুবই খুশি মনে ,ঘরে
এসে দেখি তুমি কেমন নিশ্চুপ মনমরা।প্রথমে তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার কেমন সন্দেহ হয়েছিল, জিঞ্জাসা করেছিলাম কিছু হয়েছে নাকি, কারোর সাথে ঝগড়া হয়েছে। তুমি হাসি মুখে বললে কৈ- নাতো। তোমার হাসির মাঝেই আমি সেদিন অসীম দুঃখের আভাস পেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি এক মুহুর্তের জন্য একটুও বুঝতে দাওনি সেদিন। পরের দিন কোন কারনে একি ভাবে তোমার মুখে বিষন্নতার ছাপ দেখে মনে সন্দেহ হয় , ভালো করে তোমার মুখের বিষন্নতার পর্যালোচনা করতে থাকি ,আর তখনই তোমার কানের দিকে লক্ষ্য দিয়ে দেখি তোমার কানের দুটো দুল নেই। আমার বুঝতে এক মুহুর্তও সময় যায়নি তোমার দুঃখের কারন।ভয়ে আমাকে বলোনি কি না কি বলি তোমাকে।আমি জিজ্ঞেস করলাম তোমার কানের দুল কোথায় গেছে,কান খালি কেন, তুমি বললে খুলে রেখেছি কানটা মিশ মিশ করছে বলে।আমি হেঁসে বললাম আমার দিব্যি দিয়ে বলো দুলটা কোথায়,ও আমার হাসি দেখে হাল্কা হয়ে বলল বুঝতে পারিনি কিভাবে কোথায় দুলটা পড়েছে, তবুও পুকুরের ঘাটে সাবান শ্যাম্পু মেখে ছিলাম তাই জলে ছেকুনিজাল কাটিয়ে মাটি তুলে দেখেছি অনেকক্ষন তবুও পায়নি। যদিও ওর দুলটা অনেক দিনের পুরাতন ছোট্ট বেলাকার ছোট ও পাতলা হয়ে গেছে ।আমি আশ্বাস দিয়ে বললাম ছাঁড়ো তো হারিয়ে গেছে যাক আমি একটা সোনার দুল কিনে দেবো তোমাকে।ও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল আমার খুবই কান্না পাচ্ছে কত ছোট্ট বেলা থেকে পড়েছি দুলটা।আমি জানতাম এত্ত বড়ো সংসারটা চালিয়ে টাকা বাঁচিয়ে তোমার দুল কবে যে কিনতে পারবো 'তা' একমাত্র ঈশ্বর জানেন।
প্রিয়তমার দুল আমি কিনব'ই,আর সেদিন আমার কাছে তোমার জন্য কিছু করার ইচ্ছা সফল হবে।
একটা "দুল" আমার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো যে তুমি আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছো।
তোমার জায়গা আমার জীবনে কতটা প্রভাব বিস্তার করে আছে।
যতদিন বাঁচবো বোধ হয় বাবা মায়ের মতো তোমার ঋন বোধ হয় শোধ করতে পারবো না।।
ভালো থেকো তুমি "হে প্রিয়তমা"।