01/05/2023
#আইনস্টাইনের_ধর্ম_ও_ঈশ্বর_প্রসঙ্গ
পৃথিবীতে এমন অনেক শিক্ষিত গাধা আজও আছেন যারা প্রচার করেন, 'আইনস্টাইন ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর মতন একজন বিজ্ঞানীও যখন মেনেছেন ঈশ্বরের অস্তিত্ব তখন বাকিরা কেন মানবেনা?'
কিন্তু সত্যি টা ঠিক কি?আইনস্টাইন কি ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন?আসুন এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়া যাক।
ইহুদী ধর্মাবলম্বী দার্শনিক এরিখ গুটকিন্ড আইনস্টাইনকে নিজের লেখা একটি বই পাঠিয়েছিলেন পড়বার জন্য। বইটির নাম ছিল "চুজ লাইফ: দ্য বাইবেল কল টু রিভোল্ট"। এই বইটি পড়ার পর আইনস্টাইন ১৯৫৪ সালে ৩ জানুয়ারি জার্মান ভাষায় এরিখ গুটকিন্ডের কাছে লেখা একটি চিঠিতে ঈশ্বর এবং ধর্ম সম্পর্কে নিজের মতামত ব্যক্ত করেন। এ চিঠি সম্পর্কে যারা আগে থেকেই অবগত আছেন তাদের কাছে চিঠিটি 'ঈশ্বর চিঠি' (God Letter) নামে পরিচিত। ঈশ্বর সম্পর্কে তার ধারণার পাশাপাশি এটি আরেকটি কারণে বেশ গুরুত্ব, তা হল ইহুদী জাতিগোষ্ঠীকে তিনি অন্য সব জাতিগোষ্ঠীর থেকে আলাদা কিছু মনে করেন না। এ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে তাঁর বিরুদ্ধে আধ্যাত্মবাদের প্রতি প্রচ্ছন্ন সমর্থনের যে অভিযোগ আছে তা ভ্রান্ত।
মে, ২০০৮ সালে একটি নিলামে চিঠিটির প্রাথমিক মূল্য ধরা হয়েছে ৩ মিলিয়ন ডলার। চিঠিটির বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য অংশ ইংরেজিতে অনুবাদ করে প্রকাশ করা হয়েছে। রিচার্ড ডকিন্স তার নিজস্ব ওয়েবসাইটে এই নিলাম এবং চিঠির সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন এবং সাথে চিঠি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আকারে নিজস্ব মতামতও রেখেছিলেন।
Childish superstition: Einstein’s letter makes view of religion relatively clear-
https://www.theguardian.com/science/2008/may/12/peopleinscience.religion
আইনস্টাইন কাল্পনিক ঈশ্বর অর্থাৎ গডেশ্বরাল্লহর অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন না। আইনস্টাইন, পাস্কাল ইত্যাদিরা যদি ঈশ্বরে বিশ্বাসও করেন তাতেও ঈশ্বরের অস্তিত্ব মোটেই প্রমাণিত হয় না। কারণ বিজ্ঞানের কাছে কারোর ব্যাক্তিগত বিশ্বাসের কানাকড়িরও দাম নেই। যদিও এসব অতিবোদ্ধাদের বোঝানো আর হাতিকে জাঙিয়া পড়ানো একই ব্যপার।
📌 ধর্ম ও বিজ্ঞান নিয়ে আইনস্টাইনের আরো কিছু প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি (আইনস্টাইনের বিবিধ রচনা থেকে সংকলিত) :
🎗 ‘আমার ধর্ম-প্রীতি নিয়ে যা শোনা যায় তার সবটাই মিথ্যে ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রচারিত। আমি কোনো ব্যক্তি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না এবং এটা আমি স্পষ্টভাবে বারবার জানিয়ে এসেছি। আমার মধ্যে ধর্মীয় ভাব বলতে শুধু আছে এই অসীম রহস্যময় মহাবিশ্বের বিশালতার প্রতি এক বিস্ময়’।
– Albert Einstein, in a letter March 24, 1954; from Albert Einstein, the Human Side, Helen Dukas and Banesh Hoffman, eds., Princeton, New Jersey, Princeton University Press, 1981, p 43
🎗 ‘আমি তো এমন ঈশ্বরের কথা ভাবতেই পারি না যে তার নিজের সৃষ্টিকে শাস্তি দেয়। যার উদ্দেশ্য বিধেয় আমাদের নিজেদের মত করে বানানো। সোজা কথায়, এরকম ঈশ্বর মানবচরিত্রের প্রতিফলন। আর মানুষ কি ভাবে মৃত্যুর পরেও বেঁচে ওঠে তাও কোনোভাবেই আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়, যদিও ভয় পেয়ে বা ধর্মীয় অহংবোধের বশবর্তী হয়ে দুর্বলচিত্ত মানুষ তা বিশ্বাস করে। আমি এই সর্বব্যাপী জীবনের আর সুবিশাল মহাবিশ্বের নিয়ে গবেষণা করতেই ভালবাসি। এই বিশাল প্রকৃতিরাজ্যে কার্যকারণের যে সামান্য বহিঃপ্রকাশ সামনে আসে, তা খুঁজে বের করাতেই আমার আনন্দ’।
– Albert Einstein, The World as I See It, Citadel Press, 1930
🎗 “কল্যাণময়, সর্বশক্তিমান ও নীতিবাগীশ এক ব্যক্তি-ঈশ্বরের ধারণা যে অসহায় মানুষকে সান্ত্বনা ও সহায়তার জন্যই দরকার ছিল, কারোর পক্ষেই তা অস্বীকার করা সম্ভব নয়। ধারণাটি সহজ সরল হওয়ায় মানুষের মনে সহজেই স্থানও করে নিয়েছে। কিন্তু অন্যদিকে এই ধারণার দুর্বলতাও ছিল। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে তা বারেবারে দেখা যায়। সহজ হিসাবে, যদি ঈশ্বর সর্বশক্তিমান হন, তাহলে মানুষের সব কাজ, ইচ্ছা বা চিন্তা আদপে তারই কর্তৃত্বে। তাহলে, মানুষকে কি ভাবে তার কৃতকর্মের জন্য দায়ী করা সম্ভব? ঈশ্বর মানুষের বিচার করে শাস্তি বা পুরষ্কার দিয়ে তাহলে তো নিজের কৃতকার্যেরই বিচার করছে। এর সাথে কিভাবে কল্যাণময় ও নীতিবাদী ঈশ্বরের ধারণাকে মেলানো যায়?
এক ব্যক্তি-ঈশ্বর সব প্রাকৃতিক ঘটনাবলীকে নিয়ন্ত্রণ করে – এই ধারণাকে বৈজ্ঞানিকভাবে অসত্য প্রমাণ করার কোনো উপায় নেই। কারণ এই ধারণাগুলো তখন এমন সব যুক্তির আশ্রয় নেবে যেসব বিষয় বিজ্ঞান তখনও আয়ত্তে আনতে পারে নি।
নৈতিকতার ভালর জন্যই ধর্মপ্রচারকদের উচিত এই ব্যক্তি-ঈশ্বরের ধারণা থেকে সরে আসা। এর অর্থ হল, যে শাস্তির ভয় আর পুরস্কারের লোভ এই ধর্মপ্রচারক সাধু-সন্তের এত ক্ষমতার উৎস, তা থেকে মানুষকে মুক্ত করতে হবে।”
– Science, Philosophy and Religion, A 1934 Symposium, published by the Conference on Science, Philosophy and Religion in Their Relation to the Democratic Way of Life, Inc., New York, 1941.
🎗 “ধর্মে যে সৌভ্রাতৃত্বের কথা বলা আছে, তা আদপে যুদ্ধক্ষেত্রের সৈনিকদের কাঁধে কাঁধ মেলানোর বন্ধুত্ব, অর্কেস্ট্রায় সুরে সুর মেলানোর বন্ধুত্ব নয়।”
– Published in Ideas and Opinions, Crown Publishers, Inc., New York, 1954.
🎗 “আমি তো এমন ঈশ্বরের কথা ভাবতেই পারি না যে তার নিজের সৃষ্টিকে শাস্তি দেয়। যার উদ্দেশ্য বিধেয় আমাদের নিজেদের মত করে বানানো। সোজা কথায়, এরকম ঈশ্বর মানবচরিত্রের প্রতিফলন। আর মানুষ কি ভাবে মৃত্যুর পরেও বেঁচে ওঠে তাও কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়, যদিও ভয় পেয়ে বা ধর্মের ইগোর বশবর্তী হয়ে দুর্বলচিত্ত মানুষ তাও বিশ্বাস করে ।”
– Albert Einstein, obituary in New York Times, 19 April 1955
🎗 “ব্যক্তি ঈশ্বরের ধারণা আমার কাছে একেবারেই ভিন দেশি, এবং ক্ষেত্রবিশেষে খুবই সরল।”
– Albert Einstein in a letter to Beatrice Frohlich, December 17, 1952; from The Expanded Quotable Einstein, p. 217.
🎗 “আমি একজন গভীরভাবে ধর্মনিষ্ঠ অবিশ্বাসী। এটিকে বলা যেতে পারে এক শ্রেণীর নতুন ধর্ম”।
– Albert Einstein in a letter to Hans Muehsam, March 30, 1954; from The Expanded Quotable Einstein, p. 217.
🎗 “ব্যক্তি ঈশ্বরের ধারনা আমার কাছে কল্পনার নরাত্বরোপ ছাড়া আর কিছু নয়, আর এটাকে আমি এত গরুত্ব সহকারে নিতে পারি না। আমি মানবীয় বৃত্তের বাইরে কোন উদ্দেশ্য এবং গন্তব্য কল্পণা করতে পারি না। আমার চিন্তাধারা অনেকটা স্পিনোজার দর্শনের কাছাকাছি- সৌন্দর্যের প্রতি যার ছিল প্রগাঢ় প্রশস্তিবোধ, আর শৃঙ্খলার সরল যুক্তির উপর ছিল বিশ্বাস – একে আমরা আস্বাদন করতে পারি বিনম্র চিত্তে কিন্তু অসম্পূর্ণভাবে।”
– Albert Einstein, 1947, from Banesh Hoffmann, Albert Einstein: Creator and Rebel, New York: New American Library, 1972, p. 95.
🎗 “আমি বিশ্বাস করি না যে ঈশ্বর মহাবিশ্ব নিয়ে পাশা খেলেন।”
– Albert Einstein on Quantum Mechanics, published in London Observer, April 5, 1964
🎗 “কেন আপনি ভাবছেন যে ‘ঈশ্বর ইংরেজদের শাস্তি দেবেন’ –এই ধারণা আমি সমর্থন করব? আমার ঈশ্বর কিংবা ইংরেজ – এ দু’জনের কারও সাথেই কোন সম্পর্ক নেই। আমার শুধু খারাপ লাগে এ কথা ভেবে যে, ঈশ্বর তার অগনিত সন্তানদের ইচ্ছেমত শাস্তি দিতে পারেন তাদের নির্বুদ্ধিতার জন্য, অথচ যে সব নির্বুদ্ধিতার মূল কারণ আসলে ঈশ্বর নিজে – একটা অযুহাতেই তিনি তা থেকে মুক্তি পেতে পারেন, আর তা হল তার অনস্তিত্ব।
– Albert Einstein, letter to Edgar Meyer, a Swiss colleague, January 2, 1915, from The Expanded Quotable Einstein, p. 201.
🎗 “যতই মানব সভ্যতা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, ততই আমি খুব নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারছি যে, সত্যিকারের (মানবিক) ধর্মপরায়নতা কখনোই জীবন কিংবা মৃত্যুভয়ে ভীত থাকতে পারে না, অন্ধ বিশ্বাসে নিমজ্জিত থাকতে পারে না, বরং এটি যৌক্তিক জ্ঞানের পেছনে ধাবিত হবে।”
– Science, Philosophy and Religion, A 1934 Symposium, published by the Conference on Science, Philosophy and Religion in their Relation to the Democratic Way of Life, Inc., New York, 1941.
🎗 “আমি সে রকম ঈশ্বরের ধারনাকে মন থেকে মেনে নিতে পারি না যার ভিত্তি গড়ে উঠেছে মৃত্যু ভীতি থেকে কিংবা অন্ধবিশ্বাসের কাঁধে ভর করে”।
-Albert Einstein, from Einstein: The life and Times, p. 622.
🎗 “আমি স্পিনোজার ঈশ্বরে বিশ্বাসী যে ঈশ্বর মহাজাগতিক ছন্দে নিজেকে ধরা দেন, আর সেই ঈশ্বরে আমি বিশ্বাস রাখতে পারি না যে মানুষের কৃতকর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকেন।”
– Albert Einstein, following his wife’s advice in responding to Rabbi Herbert Goldstein of the International Synagogue in New York, who had sent Einstein a cablegram bluntly demanding “Do you believe in God?”
🎗 “কিছু কিছু ক্যাথলিক সংস্থার আচার-আচরণ ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বীদের পক্ষে খুবই ক্ষতিকর। সারা পৃথিবীতে যখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যা পৃথিবীর শান্তি বিঘ্নিত করতে চলেছে, সেই অবস্থায়ও তারা জন্মনিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করে চলেছে।”
– Albert Einstein, letter, 1954
🎗 “আমি মানুষের অমরত্বে বিশ্বাসী নই। আমি মনে করি নৈতিকতা মানুষের জন্য ভাল কিন্তু এটা ব্যাখ্যা করার জন্য কোনো অতিপ্রাকৃতিক শক্তির কল্পনা করার প্রয়োজন নেই।”
– Albert Einstein, letter to a Baptist Pastor, from Albert Einstein: The Human Side, edited by Helen Dukas and Banesh Hoffman, Princeton University Press
🎗 “বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তি হচ্ছে প্রাকৃতিক নিয়মকানুনের সাহায্যে সবকিছুর ব্যাখ্যা দেয়া। কাজেই এটি কার্যকারণের সাথে যুক্ত। সে কারণে, একজন বৈজ্ঞানিক গবেষক বিশ্বাস করেন না যে প্রার্থনার মাধ্যমে কোন কিছু প্রভাবিত হয়, কিংবা কোন অলৌকিক সত্ত্বার ইচ্ছা-অনিচ্ছায় কিছু ঘটে।”
– Albert Einstein in response to a child who had written him in 1936 and asked if scientists pray; from Albert Einstein: The Human Side, edited by Helen Dukas and Banesh Hoffman, Princeton University Press, p 32.
🎗 “মানুষের নৈতিকতার জন্য তো ধর্মের কোনো দরকারই নেই, দরকার মানবিকতা, সহমর্মিতা, শিক্ষা আর সামাজিকতার। মানুষ যদি পরকালের শাস্তির কথা ভেবে নৈতিক হয়, সেই নৈতিকতার মধ্যে মহত্ত্ব কোথায় থাকে?”
– Albert Einstein, Religion and Science, New York Times Magazine, 9 November 1930
✍️ অভিষেক দে