07/08/2026
স্যার আসছি তাহলে', 'স্যার চলে গেলাম কিন্তু', 'স্যার তাহলে আসছি', তিনবার "স্যার আসছি" শুনে সটান পকেটে হাত দিয়ে মানিব্যাগ থেকে মাস্টার মশাই ২০০ টাকা বার করে বললেন, "তোরা আর বড় হবি না! যাওয়ার পথে তিন জন এগ চিকেন রোল খেয়ে নিস।" অজয়দার দোকানের সামনে ভিড় করেছিল পাঁচ বছর আগে স্কুল ছাড়া কলেজ ইউনিভার্সিটির তিনজন ছাত্র ৫ ই সেপ্টেম্বরের খাওয়া চাইতে যাওয়ার ঠিকানা - কেদারেশ্বর এপার্টমেন্ট, মহাজাতি।মাস্টার মশাই মানে কি শুধুমাত্র ছোটবেলার হিরো? পাঠ্য বিষয়ের বিশেষজ্ঞ? অনুসরণ যোগ্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী একজন মানুষ? হয়তো না। মাস্টার মশাই মানে একটা বিশাল বড় আব্দারের জায়গা। এই আবদার কে প্রশ্রয় কজন দিতে পেরেছে?
হাফপ্যান্ট থেকে ধীরে ধীরে ফুল প্যান্ট। সমাস, প্রত্যয়ের ব্যাকরণ এর সাথে সাহিত্যের ইতিহাস। শরীর-মনের ব্যাপক পরিবর্তনের সময়, কৈশোরের বহিঃপ্রকাশ তখন চেতনে-মননে। তখন পাঠ্য ছিল জসীমউদ্দীন, সুকান্ত, জীবনানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, যতীন্দ্র, শঙ্খ, সুনির্মল প্রমুখ। এক-একটা গল্প, এক-একটা কবিতা যেন জীবনবোধের মহান পাঠ। ৩০-৪০ মিনিট ধরে মাস্টারমশাই যখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়াতেন, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠত। আধমরাদের ঘা মেরে কি করে বাঁচাতে হবে? পাহাড়ের মত মৌন মহান হাওয়া কি আদৌ সম্ভব? রাজার হস্ত কেন সমস্ত কাঙালের ধন চুরি করছে? ইত্যাদি গূঢ় রহস্যের প্রথমবারের জন্য উদঘাটনের সেই অনুভূতি রোমাঞ্চকর! মনে মনে তখন প্রত্যেক বিজ্ঞ সাহিত্যিক। খাতা কলম দিয়ে দিলেই যেন মহাকাব্য লিখে ফেলবো! মহাকাব্য লেখার দুঃসাহসের নাবিক বাংলার মাষ্টার মশাই।
কালো জেল কালির পেন দিয়ে লেখা মুক্তের মত হাতের লেখা। মাত্রাগুলোতে একটা অতিরিক্ত দাগ জুড়ে দিয়ে সৃষ্টি হওয়া অভিনবত্ব। অলংকরনের জন্য ব্যবহৃত বিশেষ রকম একটা কলকা! প্রকৃতপক্ষেই সুশিক্ষিত উচ্চ মননের অভিজ্ঞান ছিল এই হাতের লেখা। কত ছেলে মেয়ে চেষ্টা করেছে এই হাতের লেখা অনুকরণ করতে, জানেন শুধু ঈশ্বর!
কিরে 'শুক্রবার সকালের ব্যাচ' তুই সাইকেল নিয়ে 'মঙ্গলবার রাতের ব্যাচের' রিকশ'র পিছনে ওইভাবে ঘুরছিলি কেন রে! কি ভেবেছিস দেখতে পাইনি! রিকশাওয়ালা কে দ্বিগুন ভাড়া দিয়ে নেমে ভদ্রলোক একটু গুরু গম্ভীর হয়ে বললেন, পড়াশোনাটা কিন্তু মন দিয়ে করিস। এর ঠিক ১৫ বছর পরের একটি দিন! দু'হাত ভরে শুভ বিবাহের দিনে আশীর্বাদ করলেন ১৫ বছর আগেকার সেই অভিসারিনী ও কিশোর প্রেমিক কে। বিরাটি দুর্গানগরের অলিতে গলিতে উপরের ঘটনার কত পুনরাবৃত্তি হয়, শুধু protagonist বদলে যায়!
০৩৩-২৫১৪-৫৫৫২ জানিনা এই নাম্বারে ফোন করলে ফোনটা আজও বাজে কিনা। তবে এক সময় ছাত্র-ছাত্রী পিতা-মাতা দাদা দিদি সকলের রাগ, দুঃখ, অভিমান, আশঙ্কা দুশ্চিন্তা সমস্ত কিছুর রিসিভার ছিল এই ফোন নাম্বার। যুগের নিয়মে ফোন নাম্বারটা হয়তো বদলে গেছে তবে রিসিভার কিন্তু একই রয়ে গেছে। ছাত্র-ছাত্রীরা আজও হৃদয়ের কলিজায়, আর্তজনের বিপদে আজও একইবার ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন রিসিভারের উল্টো দিকে থাকা মানুষটা। রক্তদান শিবির থেকে বৃক্ষরোপণ, সাহিত্য সভা থেকে রাত দখল - সপ্রতিভ উপস্থিতিপূর্ণ এই মানুষও যে কি করে অবসর নিতে পারেন, ভাবনার গণ্ডির বাইরে।
স্কুলের/এলাকার আপামর ছাত্র-ছাত্রীদের ভালবাসা আজ আপনার সাথে। বিরাটির আকাশের আজকে মুখ ভার! উত্তর/দক্ষিণ বঙ্গ, ভারতের ভিন রাজ্য, ইউরোপ আমেরিকা বা অন্য মহাদেশের কোন শহর অথবা এই কলকাতা শহরের অফিসের চার দেয়ালের মধ্যে একটি কর্মব্যস্ত দিনের আড়ালে ফেসবুকে জানতে পারা - স্যারের অবসর গ্রহণ! বুকের ঠিক মাঝখানে যেন, একটা ধাক্কা লাগে আর শৈশব, কৈশোরের স্মৃতি মেদুরতা মুহ্যমান করে তোলে ক্ষনিকেই। কে যেন হঠাৎ করেই ছোটবেলাটা- কে কেড়ে নিল!
তবে মেঘ কেটে গিয়ে সূর্যের আলো দেখা দেয়, আরও বেশী করে কার্টুন, কবিতা, বাঁশি অথবা বিদেশী অচেনা বাদ্য যন্ত্র হাতে দেখব, ওনাকে এক নতুন ক্লাসরুমে। ছকে বাধা সিলেবাসের বাইরে আপনি থাকছেন স্যার, আমাদের হৃদয়ের চিলেকোঠায়, মনের মণিকোঠায় আর ৫-১০-১৫-২০ বছরের পুরোনো স্মৃতির পাতায়!
সৌম্যর্ষি। (Soumyarshi Das) ১/৮/২৬