02/07/2022
১) এবারের ফাইনাল ইয়ারের দাদাদিদিদের বাইশজনের মধ্যে নয়জন আইআইটি জ্যামের অল ইন্ডিয়া র্যাঙ্ক হোল্ডার, আর একজন জেস্ট কোয়ালিফায়েড? তারওপর একজন এনজিপিই'র ন্যাশনাল টপার? উরিব্বাস, দারুণ তো।
২) ডিপার্টমেন্টের নিজস্ব ওয়েবসাইট? বাপরে বাপ… ঝাঁ চকচকে, আর কত কি ইনফর্মেশন ঠাসা। আবার শুধুমাত্র এখানকার স্টুডেন্ট দের জন্য পাসওয়ার্ড দেওয়া স্টাডি মেটিরিয়ালস আর এন্ট্রান্স এক্সাম সাপোর্ট রয়েছে দেখছি।
৩) ডিপার্টমেন্টের সেমিনার লাইব্রেরীতেই সাড়ে সাতশোর ওপরে বই! ঢোকার মুখেই বিশাল কাঁচের আলমারিতে থরে থরে সাজানো টেক্সট, রেফারেন্স...বিশাল তো! অনেকদিন ধরে তিলতিল করে বানানো হয়েছে দেখছি... তার ওপর ই-বুকের প্রায় এক-টেরাবাইটের বি-শা-ল কালেকশন। শেয়ার বা ডাউনলোড করে নিজের ডিভাইসে তুলে নেওয়াটাই বাকি শুধু। চিল্যাক্স ড্যুড।
৪) পুরোপুরি ইকুইপড নিজস্ব অনার্স ল্যাবরেটরী। আলাদা আলাদা ভাগে ভাগ করা, জেনারেল, থার্মাল, ওয়েভ-অপ্টিক্স, ইলেক্ট্রিকাল, অ্যানালগ, ডিজিটাল, মডার্ণ, সলিড স্টেট, ই-এম-টি। বাঃ। ফিজিক্সের ইউনিভার্সাল কন্সট্যান্টগুলোর নামে নামে আবার সেইগুলো… G, kB, c, 1/4πε0, h-cut…, কুল ব্রো।
৫) শুনলাম যে ল্যাবের যন্ত্রপাতি হ্যান্ডল নিজেদেরই করতে হবে এবার থেকে। মানে কাজ করতে করতে কোনো কিছু বেগড়বাঁই করলে, স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে চটপট খুলে ফ্যালো, গুগল করে দেখে নাও, তারপর একছুটে চাঁদনি থেকে কিনে নিয়ে এসে লাগিয়ে দাও তাঁতাল গরম করে। দ্বায়িত্ববোধও বাড়লো, আর এক্সপেরিমেন্টাল ফিজিক্সের হ্যান্ডস অন ট্রেণিং-টাও হলো। স্কিল ডেভেলপমেন্টে আরড্যুইনো পড়ানো হবে, আরো কত কি যে করা যাবে তাই দিয়ে…
৬) সিলেবাসের কম্পিউটেশন ল্যাবের জন্য নিজেদের সার্ভার দিয়ে কানেক্টেড তিরিশ খানা টার্মিনাল ওয়ালা 'বাইট' ল্যাবরেটরি। কি ঠান্ডা ভিতরে। বাইরে থেকে এসে শরীর মন জুড়িয়ে যাচ্ছে একেবারে। পাইথন প্রোগ্রামিং, নিউম্যারিকাল অ্যানালিসিস – পাঁচখানা কোর পেপার। তাছাড়া ল্যাটেক আছে। প্রজেক্ট রিপোর্ট লিখতে হবে, আবার পাওয়ার পয়েন্ট বানিয়ে প্রেজেন্টও করতে হবে। এটা নাকি কম্পালসারি, এখানকার নিয়ম।
৭) ডিপার্টমেন্টের মধ্যে ওয়াই-ফাই কানেক্টিভিটি টা জাস্ট ফাটাফাটি। টুক করে এক কোণে বসে পড়ে, কানে হেডফোন গুঁজে, পদ্মনাভন, বালাকৃষ্ণান বা লিওণার্ড সাস্কাইন্ড এর ভিডিও লেকচার্স হালকা করে চালিয়ে নাও...
৮) এক-একটা সেমেস্টারের দুটো করে ল্যাব ব্যাচ। এক-একটা ব্যাচে, তিনজন করে করে গ্রুপ। আলাদা আলাদা আপডেটেড ল্যাবরেটরি ম্যানুয়াল, ইলেক্ট্রনিক্স এর কিট-বক্স...। ল্যাব পার্টনার চুজ করতে হবে এমনভাবে, যাতে পালস বোঝা যায় একে অপরের...
৯) আরে ভাই সবসময় তো ক্লাস আর ল্যাব করতে ভালো লাগবেনা। তাই ওয়াল-ম্যাগাজিন 'ইকুইনক্স', মধ্যে মধ্যে এগজিবিশন, সেমিনার, ল্যাব ভিজিট... এসব আছেই। হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট বলেছেন, প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার করে একটা দেড় ঘন্টার সেমিনার/ কোলোকোয়াম থাকবে রুটিনে। বাইরের স্পিকাররা তো আসবেনই, আমরাও বলবো…
১০) ‘চ্যাট উইথ আ স্কলার’ এর ভিডিও যা দেওয়া আছে কলেজের ইউটিউব চ্যানেলে, সেগুলো তো যাকে বলে জাস্ট বিন্দাস। শুনছি নাকি ‘চ্যাট উইথ অ্যান অন্ত্রেঁপ্রিনিয়র’ ও হবে এবার থেকে…, কিভাবে ফিজিক্স পড়ে ব্যাবসা বাণিজ্যও করা যায়। ঝক্কাস ব্যাপার স্যাপার।
১১) অনার্স ল্যাবে ঢোকার মুখেই একটা ‘প্রব্লেম অফ দ্য উইক’ এর বোর্ড। ডিপার্টমেন্টের সাথে কোল্যাবোরেট করেছেন মন্টানা স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রফেসর অ্যান্টন ভোরোন্তসভ স্বয়ং। সপ্তাহের প্রথমেই, সোমবার, একটা বেশ চ্যালেঞ্জিং অঙ্ক লিখে রাখা থাকে। কে করবে এসে কষে দিয়ে যাও, ইটস ওপেন টু অল। ভাবো ভাবো, ভাবা প্র্যাক্টিশ করো ...
১২) অ্যাটেনডেন্সের বেশ ভালোরকম কড়াকড়ি। যেমন এসেছো, তেমনই নম্বর পাবে। নাহলেই গার্জেন কল, সাসপেন্ড। ক্লাস হওয়ার অবশ্য কোনো কমতি নেই। পুজোর ছুটিতেও হয়। ঠেসে থিওরি পড়িয়ে, বিভিন্ন রকমের প্রব্লেম ট্যাকল করার টেকনিক..., আর আড্ডাটাও মাস্ট। আফটার অল, সাবজেক্ট টা ফিজিক্স তো।
১৩) পড়াতে পড়াতেই ডেমনস্ট্রেশন। ক্লাসের পরই হালকা করে ল্যাবে গিয়ে হাতে কলমে ওইটারই একটা ভিস্যুয়াল। ডিপার্টমেন্টের মধ্যেই দু-দুটো স্মার্ট ক্লাসরুম। টুক করে সিঁড়ি বেয়ে শুধু উঠে যাওয়া।
১৪) ল্যাদ লাগলে, একটা ম্যাগাজিন বেছে নিয়ে বসে পড়া যায় চুপচাপ। আই.আই.এস.সি থেকে বেরোনো রেসোন্যান্স এর সাবস্ক্রিপশন আছে ডিপার্টমেন্টের। এছাড়াও ফিজিক্স ফর ইউ, স্পেক্ট্রাম... একধারসে প্রব্লেম কষো বসে বসে।
১৫) বছরদুয়েক আগে একটা প্রি-মাস্টার্স ওয়ার্কশপ হয়েছিল থিওরেটিকাল ফিজিক্সের ওপর, পাঁচদিন ধরে। এক্সপেরিমেন্টাল-এর তিনদিনের ওয়ার্কশপটাও বেশ খানদানি মেজাজের ছিল শুনেছি। আমাদের বেলাতেও করাতে বলবো। কিছুই তো এক্সপোজার হয়নি তেমনভাবে।
১৬) প্রথমদিন কলেজে ঢুকতে না ঢুকতেই ওরিয়েন্টেশন লেকচার। পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন। ফিজিক্স পড়ে তারপর কি? ভার্টিকাল নাকি হরাইজন্টাল মুভমেন্ট? রিসার্চ না চাকরি? অ্যাকাডেমিক্স না ইন্ডাস্ট্রি? সব হালহকিকতের খাসখবর।
১৭) আবার প্রথমদিনেই একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো সবাইকে। ডিপার্টমেন্টের ফেসবুক গ্রুপেও সোজা এন্ট্রি। অলওয়েজ কানেক্টেড উইথ অল। প্রথমে বুঝিনি। তারপরেই প্রতি সপ্তাহে গ্রুপে আসতে লাগলো পরের পর অ্যাসাইনমেন্ট এর বোমা। বাপরে বাপ!! না জমা দিলেই ভীষণ চিৎকার করে...বকাবকি করে, এটা কলেজ না স্কুল, ভাই?
১৮) ফেসবুক গ্রুপে থাকা সিনিয়রদের সাথে আলাপ হয়ে গেলো কিছুদিনের মধ্যেই। প্রচুর চ্যাট। কি সব জায়গায় আছে সব, উফ... আইআইএসসি, আইআইটি, আইএসএম... বিদেশেও আছে অনেকে। ভালো করে গুছিয়ে ফিজিক্সটা পড়তে বললো সবাই। সে তো পড়বোই, পড়তেই তো আসা। ফিফথ আর সিক্সথ সেমেস্টারের ডিএসই গুলো তো ভাই সবকটা অফার করবে শুনছি। নন-লিনিয়ার ডায়ানামিক্স, এস্ট্রোফিজিক্স-কসমোলজি শুদ্ধু। কি নাকি একটা সারপ্রাইজ, এই বছরেই আসতে পারে শুনছিলাম। কেউ ভেঙে কিছু বললোনা তো, দেখা যাক।
১৯) আপলোড করা আছে সেই ২০০৫ সাল থেকে ঠাসা জ্যাম-জেস্ট-টিআইএফআর-জিআরই এর পেপারগুলো। সবকটার এমসিকিউ কষতে হবে। হবেই। মাথা উঁচু করে তবেই তোরা বেরোবি ডিপার্টমেন্ট থেকে, প্রথমদিনই বলে দিয়েছিল...
২০) ইন্টিগ্রেটেড পিএইচডি’র ইন্টার্ভিউয়ের জন্য মক ভাইভা? সে সব করিয়ে দেয় এখানেই, বস! শুধু এসজিপিএ আর সিজিপিএ টা ভালো করো, আর এন্ট্রান্স কিছু ক্র্যাক করে নাও। ডিপার্টমেন্ট বডি ফেলে দেবে একেবারে, তোমার ভালো রেজাল্ট আর প্লেসমেন্ট না হওয়া অব্ধি এদের শান্তি নেই।
২১) এনপিটিইএল-স্বয়ম এর লোকাল চ্যাপ্টার হলো কলেজ, তার ওপর আমাদের ডিপার্টমেন্টেই আছেন তার সিঙ্গল পয়েন্ট অফ কন্ট্যাক্ট। যাকে বলে অনেকটাই সুবিধা, কম পয়সায় স্কলারশিপ পেয়ে দারুণ সব অনলাইন কোর্স করে নিতে পারি আইআইটি’র থেকে। বাঁধানো সার্টিফিকেট আর মেডালগুলো কি সুন্দর যে দেখতে...
২২) ৫-ই সেপ্টেম্বর একযোগে টিচার্স ডে, ফ্রেশার্স ওয়েলকাম আর ২৪-এ জানুয়ারি ডিপার্টমেন্টাল পিকনিক। শুধু এই দুটো বিশেষ দিনই ক্লাস-ল্যাব থেকে ছাড়া পাওয়া যাবে। আর প্রফেসররাও নাকি এই দুইদিন একেবারে চোখ বন্ধ করে থাকেন… হাজার বদমায়েশিতেও বকেন না।
২৩) কোন কারণে মনখারাপ? স্ট্রেস বা ডিপ্রেশন? ক্লাস নিতে নিতেই কিভাবে ওনারা বুঝে যান কে জানে। ডেকে নেন, পুরোটা শোনেন, কথা বলেন…, অনেকটাই হালকা লাগে তারপর। প্রাথমিক কাউনসেলিং ডিপার্টমেন্টেই হয়। প্রয়োজন হলে তারপর ওনারাই যোগাযোগ করিয়ে দেন প্রফেশনাল কারুর সাথে।
২৪) প্যানডেমিকের মধ্যে আগের দুটো বছর কেটেছে। অনলাইনে পড়াশুনো করে অতটাও পোক্ত হয়েছি বলে নিজে মনে করিনা। ডিপার্টমেন্ট কথা দিয়েছে, আগামি তিনবছর পাশে থাকবে। স্ক্র্যাচ থেকে যদি শুরু করতে হয়, করবে। শুধু নিজেদের দমটা ধরে রাখতে বললেন ওনারা। দাঁতচাপা জেদ, জেতার জন্য। তারপর দৌড়, আরো দৌড়।
২৫) কয়েকদিন কলেজ না গেলেই কেমন যেন একটা অস্বস্তি হয় নিজের মধ্যে। ওই টানা ক্লাস ল্যাবের ফাঁকে হাহাহিহি আর চা খাওয়াটা মিস করি বড্ড। এত বেশি করে আজকাল আঁকড়ে ধরেছে ডিপার্টমেন্টটা। তিনবছর পর যখন বেরিয়ে যাবো, মনখারাপ লাগবে বড্ড। ফেয়ারওয়েল হয়না এখানে। প্রতি বার ফিরতে হয় একবার নতুন করে, নিজের সেকেন্ড হোমে, নিজের কাছে...
কি? বিশ্বাস হচ্ছেনা? এই ডিপার্টমেন্টে পড়ে বা পড়েছে, এমন কাউকে জিজ্ঞেস করুন না একবারটি... 🥰