17/08/2026
'মনসা' শব্দটা শুনলেই কেউ কেউ হাতজোড় করে কপালে ঠেকাবেন, কেউ হয়তো নাক সিঁটকোবেন। তবে, বাংলার বুকে 'মনসা'-কে অগ্রাহ্য করা যাবে না, তাই শব্দবাজির তরফ থেকে আমরা 'মনসা' শব্দের উৎস আর ইতিহাস আলোচনা করলাম...
বন্দিলাম বন্দিলাম মাগো যন্ত্রে দিয়া ঘা।
অবধান করগো জগৎগৌরী মা।।
(মনসামঙ্গল; কবিবর বিজয় গুপ্ত)
তথ্য সংকলন: শব্দকর্মী প্রীতম দাশগুপ্ত
বাংলা তথা সমগ্র ভারতে দেবী মনসা পূজিত হন সর্পগণের দেবী রূপে। বাংলায় মনসা পুজোর উৎপত্তি নিয়ে ঐতিহাসিকগণ মনে করেন যে , মধ্যযুগে বাংলায় তুর্কি আক্রমণের সময়ে বাংলার গ্রাম-গ্রামান্তরে সর্পাঘাতে মৃত্যু হওয়া খুব স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। তখন বাংলার মানুষেরা দেবীশক্তির প্রতি আস্থা জ্ঞাপন করেন, এবং পৌরাণিক দেবী মনসা বাংলার ঘরে ঘরে পূজিত হতে থাকেন।
দেবী মনসার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় মহাভারত ও ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে; তাছাড়া আরও বেশ কিছু পুরাণে মনসাদেবীর উল্লেখ রয়েছে। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুসারে, একবার প্রজাপতি ব্রহ্মা বিশেষ ‘সর্পমন্ত্র’ তৈরির জন্য ঋষি কশ্যপের কাছে গেলেন, যা দেবতাদের উপকারে লাগবে। ব্রহ্মার নির্দেশে ঋষি কশ্যপ তপস্যায় বসে ‘সর্পমন্ত্র’ উদ্ভাবন করলেন এবং ব্রহ্মাকে নিবেদন করলেন। কিন্তু স্মৃতি থেকে যখন সেই মন্ত্র উচ্চারিত হল তখন সেই মন্ত্র এক মূর্ত রূপ ধারণ করল। যেহেতু মূর্তিটির আবির্ভাব হয়েছে ঋষি কশ্যপের মন থেকে, তাই দেবীর নামকরণ করা হল ‘মনসা’। তিনি ঋষি কশ্যপের মানসকন্যা, বাসুকি নাগের ভগিনী। আবার দেবীভাগবত অনুযায়ী তিনি পরমাপ্রকৃতি মহামায়ারই এক রূপ।
দেবী মনসার বিবাহ হয় ঋষি জরৎকারুর সঙ্গে। ‘জরৎকারু’ কথাটা এসেছে ‘জরা’ থেকে। পুরাণ অনুসারে, ঋষি জরৎকারুর কঠোর তপস্যার কারণে শরীর জরাগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিল, তাই এই নাম। বিবাহের আগে ঋষির দুই শর্ত ছিল, পাত্রীর নামও ‘জরৎকারু’ হতে হবে, এবং বিয়ের পর স্ত্রী তাঁর কোনো কাজে বাধা দিতে পারবেন না। দেবী মনসার আরেক নাম যেহেতু ‘জরৎকারু’ তাই ঋষির সঙ্গেই তাঁর বিবাহ হয়, এবং আস্তিক মুনির জন্ম হয়, যিনি রাজা জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞ থেকে নাগেদের উদ্ধার করেন। এই একই গল্প মহাভারতের আদিপর্বেও রয়েছে। তবে দেবী মনসার নামও ‘জরৎকারু’ কেন, সেই নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।
দেবী মনসার আরেক নাম ‘জগৎগৌরী’, কারণ তিনি গৌরবর্ণা এবং জগতের কল্যাণের জন্য তাঁর আবির্ভাব। তিনি ‘সিদ্ধযোগিনী’, কারণ তিনি মহাদেবের কাছ থেকে ‘সিদ্ধযোগ’ লাভ করেছিলেন। তিনি বিষ্ণুর ভক্তা, তাই ‘বৈষ্ণবী’; এবং শিবের শিষ্যা, তাই ‘শৈবী’। তিনি নাগেদের ঈশ্বরী, তাই ‘নাগেশ্বরী’। তিনি জগতের বিষ হরণ করেন, তাই ‘বিষহরি’।
এবার চলে আসি মধ্যযুগের বাংলার চিরাচরিত লৌকিক কাব্য, মনসামঙ্গল কাব্যে। প্রসঙ্গত বলে রাখি, বাংলায় একাধিক মনসামঙ্গল কাব্য একাধিক কবি দ্বারা রচিত হয়েছে, যদিও সব ক্ষেত্রে মূল গল্প প্রায় একই, সেই চাঁদ সওদাগর-বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনী। মনসামঙ্গল কাব্যগুলির মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় কাব্যের নাম কোথাও ‘পদ্মাপুরাণ’, কোথাও ‘মনসার ভাসান’, কোথাও ‘মনসার জাগরণ’ বলেও উল্লিখিত রয়েছে। মনসামঙ্গলের কাহিনী পৌরাণিক কাহিনী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি ভিন্ন রচনা। দেবী মনসা এখানে ঋষি কশ্যপের মানসকন্যা থেকে সরাসরি হয়ে গেলেন মহাদেবের কন্যা। পদ্মের উপর তিনি অধিষ্ঠিত, তাই তিনি ‘পদ্মাবতী’। মহাদেব তাঁর পিতা, দেবী চণ্ডী তাঁর সৎমা। স্বর্গের ধোপা-কুমারী নেতা তাঁর ভগিনী ও নিত্য সহচরী। মঙ্গলকাব্যের মনসাদেবীর চরিত্রে সাধারণ মানুষের মতো আচরণ খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি কোপনস্বভাব, মানুষের সঙ্গে তিনি ছলনা করেন; আবার তিনি ভক্তের ওপর প্রসন্ন হলে তার ওপর কৃপাও করেন। দেবী মনসা পৌরাণিক দেবী থেকে হয়ে ওঠেন বাংলার এক লৌকিক দেবী।
মনসামঙ্গলে দেবী মনসাকে আরেক নামে সম্বোধন করা হয়। এই নামটির কোনো পৌরাণিক উৎস নেই, এটি সম্পূর্ণ বাংলার লৌকিক নাম। যদিও সেই নামটি ভক্তিভরে নয়, অবজ্ঞার সাথেই সম্বোধন করা হয়ে থাকে; চাঁদ সওদাগর প্রদত্ত নাম ‘চ্যাংমুড়ি কানী’। এই ‘চ্যাং’ শব্দটি এসেছে দেশি শব্দ ‘চ্যাঙ্গ’ বা ‘চোঙ্গ’ থেকে, যার অর্থ ‘বাঁশ’(যেমন আমরা বলি ‘চ্যাংদোলা’)। বলা হয়, একটা সরু বাঁশের গায়ে কাপড় জড়িয়ে রাখলে যেমন দেখায়, মনসাদেবীকেও নাকি সেরকম রোগা দেখতে; তাই এই নামের উদ্ভব। ‘কানী’ বলার কারণ হল, দেবী চণ্ডী মনসাদেবীর সাথে কোন্দল করার সময়ে তিনি মনসার চোখে কুশের বাণ (মতান্তরে বেলের কাঁটা) ঢুকিয়ে দেন, তাই তিনি কানী। এমনকি বিজয় গুপ্তের মনসামঙ্গল অনুযায়ী, মনসা পূজায় চাঁদ সওদাগরের আপত্তির কারণ হলো মনসাদেবী কানা। -
অঙ্গহীন দেবতার পূজা আছে মানা।
তাহাতে শুনেছি পদ্মার এক চক্ষু কাণা।।
কিন্তু বিজয় গুপ্তের মনসামঙ্গলে আবার দেখা যাচ্ছে; কাব্যের প্রথম দিকে চণ্ডী-মনসার কোন্দল দেখালেও, কাব্যের শেষে চাঁদ সওদাগরকে চণ্ডী ও মনসা অভিন্ন রূপে দেখা দিয়েছেন-
এক রথে পদ্মা দুর্গা অন্তরীক্ষে থাকি।
দুইজনে দেখে চান্দ একই মুরতি।।
মনসামঙ্গলে কোথাও কোথাও মনসাকে দেবী চণ্ডী/দুর্গার আরেক রূপ বলেও ধরা হয়েছে।
এভাবেই নানা নামে, নানা রূপে বাংলার নানা অঞ্চলে মনসা দেবীরূপে পূজিতা হয়ে আসছেন।
তথ্যসূত্র- বাংলার দেবদেবী ও পূজাপার্বণ- দেবাশিস ভৌমিক; মহাভারত (কালীপ্রসন্ন সিংহ অনূদিত); মনসামঙ্গল- কবিবর বিজয় গুপ্ত; মনসামঙ্গল- বিপ্রদাস পিপিলাই; বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতি (একাদশ শ্রেণী)- পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ।