Ramakrishna Mission Calcutta Students' Home

Ramakrishna Mission Calcutta Students' Home Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from Ramakrishna Mission Calcutta Students' Home, Education, R K Mission Road, Belgharia, KOLKATA.

Ramakrishna Mission Calcutta Students’ Home evolved as one of the foremost educational initiatives inspired by Swami Vivekananda’s visionary ideas on education for comprehensive development of individuals and India as a whole.

গঙ্গোত্রীর পথে এক গুহাবাসী সাধুগঙ্গোত্রী থেকে ফিরছিলাম আমি আর আরও একজন মহারাজ। হরশিল পৌঁছানোর কিছুটা আগে মূল রাস্তা থেকে...
20/08/2026

গঙ্গোত্রীর পথে এক গুহাবাসী সাধু
গঙ্গোত্রী থেকে ফিরছিলাম আমি আর আরও একজন মহারাজ। হরশিল পৌঁছানোর কিছুটা আগে মূল রাস্তা থেকে একটু ভিতরে ঢুকে, বেশ খানিকটা পথ হেঁটে একদিন আমরা পৌঁছে গেলাম একটি গুহার কাছে। সময়টা মার্চ মাস। তখনও গঙ্গোত্রী বরফে ঢাকা। চারদিকে কনকনে ঠান্ডা, পাহাড়ের বুক জুড়ে শীতের শেষ আঁচড়। বিকেলের দিকে আমরা সেই গুহাটিতে পৌঁছেছিলাম।
গুহাটি আসলে ঠিক গুহার মতো নয়। একটি বিশাল পাথর পাহাড়ের গা থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছে; তার এক পাশে পাথর ও মাটি দিয়ে একটু ঘিরে নিয়ে থাকার মতো জায়গা তৈরি করা হয়েছে। জায়গাটি খুব বড় নয়। একেবারে গঙ্গার ধারে—সামনেই নিরন্তর বয়ে চলেছে হিমশীতল নদী।
সেই ছোট্ট গুহায় তখন বাস করছিলেন প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়সী এক সাধু। বাঙালি। শক্ত-পোক্ত চেহারা, মুখে এক ধরনের দৃঢ়তা, অথচ চোখেমুখে শিশুর মতো সরলতা। আমাদের দেখে তিনি যেন খুব খুশিই হলেন।
জানলাম, প্রায় বারো-তেরো বছর ধরে তিনি ওই গুহাতেই আছেন। একসময় রামকৃষ্ণ মিশনে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু বয়স বেশি হয়ে যাওয়ায় যোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। তারপর একদিন সব ছেড়ে চলে এসেছেন এই নির্জন পাহাড়ে।
গুহার সামনে অল্প একটু জায়গা ছিল। সেখানে তিনি আলু চাষ করেছিলেন। সেই সামান্য জমি, গুহা, সামনে গঙ্গা আর চারপাশের পাহাড়—এই নিয়েই তাঁর সংসার।
আমরা পৌঁছাতেই তিনি হেসে বললেন,
—“একটু চা বানাই?”
আমরা সানন্দে রাজি হয়ে গেলাম।
তিনি গল্প করতে করতে চা বানাতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পরে গরম ধোঁয়া ওঠা চা আমাদের হাতে দিলেন। নিজে অবশ্য চা খান না।
আমরা দুজনেই তখন ধূমপান করতাম। বাইরে তখন কনকনে ঠান্ডা। তাই মহারাজকে বললাম,
—“মহারাজ, চায়ের সঙ্গে যদি একটু স্মোক করি, তাহলে এই ঠান্ডার মধ্যে বেশ একটা আমেজ হবে।”
কথাটা শুনে তিনি আমাদের বেশ বকেই দিলেন।
বললেন,
—“সব ছেড়ে সাধু হতে এসেছ, আর স্মোকিংটা ছাড়তে পারলে না? দেখছ না, বিজ্ঞান বলছে—স্মোকিং কত খারাপ অভ্যাস! তবুও ছাড়তে পারছ না। সামান্য একটা স্মোকিং ছাড়তে পারছ না, আর কামিনী-কাঞ্চন কী করে ছাড়বে?”
আমরা একেবারে চুপ।
এভাবে কেউ আমাদের বলবেন—তা যেন আমাদের ধারণার মধ্যেই ছিল না। তাঁর কথায় রাগ ছিল না, অহংকার ছিল না; ছিল একেবারে সরল, অকপট সত্যকথন। আমরা মাথা নিচু করে শুনতে লাগলাম।
তিনি আবার বললেন,
—“সাধন-ভজন হচ্ছে? না হলে সব ছেড়ে এদিকে চলে এসো।”
আমরা বললাম,
—“মহারাজ, আমরা এখানে এসে থাকতে পারব না।”
তিনি বললেন,
—“তাহলে তোমাদের আশ্রমের সেক্রেটারি মহারাজকে জিজ্ঞেস করো—দিনে কতক্ষণ কাজ করতে হবে? পাঁচ ঘণ্টা, না ছয় ঘণ্টা? বাকি সময়টা সাধন-ভজনে ডুবে যাও।”
কথাগুলি শুনে আমরা যেন অন্য এক জগতের মানুষের সামনে বসে আছি বলে মনে হচ্ছিল।
এরপর তিনি নিজের সাধনার কথা বলতে শুরু করলেন।
—“আমি সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রায় তিন ঘণ্টা শীর্ষাসন করি।”
আমরা দুজনেই অবাক!
তিনি যেন আমাদের বিস্ময় বুঝতে পেরে বললেন,
—“আসলে শীর্ষাসন করলেই প্রাণায়াম এমনিই হয়ে যায়।”
তারপর তাঁর প্রতিদিনের সাধনার কথা বললেন। শীর্ষাসন করার পর বাইরে বেরিয়ে গঙ্গার ধারে গিয়ে বসেন। নদীর শব্দ শুনতে থাকেন। সেই শব্দ শুনতে শুনতে ধীরে ধীরে মন নিজের ভিতরে ঢুকে যায়। কখনও কখনও এভাবে বসে থাকতে থাকতে কখন যে বিকেল হয়ে যায়, তা তাঁর নিজেরই খেয়াল থাকে না।
বললেন,
—“এইভাবেই ধ্যান করি। খুব পবিত্রতা রাখতে হয়। পবিত্রতা না থাকলে ধ্যান হয় না।”
কী আশ্চর্য সরলতা! তাঁর সাধনা সম্পর্কে বলার মধ্যে কোনও জাহির করার ভাব নেই। যেন তিনি নিজের জীবনের একেবারে স্বাভাবিক একটি কথা বলছেন।
তিনি ছিলেন সত্যিই খুব সরল মানুষ। ভিতরে যা, বাইরে ঠিক তাই। কোনও আবরণ নেই, কোনও অভিনয় নেই।
আমরা জিজ্ঞাসা করলাম,
—“মহারাজ, আপনার খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা কী করে হয়?”
তিনি বললেন, দূরের রেশন দোকান থেকে কেউ কেউ চাল, আটা ইত্যাদি এনে দিয়ে যায়। আর এখানে কিছু আলু চাষ করেছেন। সেই দিয়েই কোনওরকমে চলে যায়।
তারপর আরও বললেন,
—“শীতকালে এদিকে কেউ আসে না।”
আমরা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম,
—“এতদিন কোনও মানুষ ছাড়া কী করে থাকেন?”
তিনি খুব স্বাভাবিকভাবে বললেন,
—“অভ্যাস হয়ে গেছে। গরমকালে মাঝে মাঝে দু-একজন আসে। কিন্তু শীতকালে প্রায় কেউই আসে না।”
কথাটা তিনি এমনভাবে বললেন, যেন এত নির্জনতা, এত শীত, এত একাকিত্ব—এসব তাঁর কাছে একেবারেই স্বাভাবিক।
আমরা তখন ভাবছিলাম—আমরা শহরে থেকে কত মানুষ, কত শব্দ, কত ব্যস্ততার মধ্যে থেকেও এক মুহূর্ত নিঃসঙ্গ থাকতে পারি না। আর এই মানুষটি বছরের পর বছর ধরে বরফঢাকা পাহাড়ের কোলে, গঙ্গার তীরে, একটিমাত্র গুহাকে আশ্রয় করে দিব্যি আছেন!
এইভাবে গল্প করতে করতে কখন যে এক ঘণ্টারও বেশি সময় কেটে গেল, বুঝতেই পারিনি।
এরপর আমাদের ফিরে আসার সময় হল। আমরা মহারাজকে কিছু প্রণামী দিতে চাইলাম। তিনি নিতে চাইছিলেন না। অনেকটা জোর করেই তাঁর হাতে কিছু প্রণামী দিলাম।
তারপর আমরা উঠে পড়লাম।
মহারাজও আমাদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে এলেন। বিদায়ের সময় তাঁর সেই সরল মুখটি আজও মনে পড়ে।
সেদিন সেই গুহাবাসী মহারাজের সঙ্গে দেখা করে মনে হয়েছিল—ভারতবর্ষের প্রকৃত সাধুদের কত বিচিত্র জীবন! কেউ মঠে, কেউ আশ্রমে, কেউ মন্দিরে; আবার কেউ বা হিমালয়ের কোনও অজানা গুহায়, জনমানবহীন নির্জনতায় বসে নিজের মতো করে সাধনা করে চলেছেন।

এক দম্পতির কথাআজ এমন এক দম্পতির কথা বলব, যাঁদের আমরা জীবনের পথে খুব অল্প সময়ের জন্য দেখেছিলাম, অথচ তাঁদের দেখে যে গভীর অ...
17/08/2026

এক দম্পতির কথা
আজ এমন এক দম্পতির কথা বলব, যাঁদের আমরা জীবনের পথে খুব অল্প সময়ের জন্য দেখেছিলাম, অথচ তাঁদের দেখে যে গভীর অনুভূতি হয়েছিল, তা আজও আমাদের কয়েকজনের মনে অমলিন হয়ে আছে। ঘটনাটি আমাদের জীবনে এমন একটি ছাপ ফেলেছিল, যা হয়তো কোনোদিন মুছে যাবে না।
প্রতি বছর আমাদের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রদের নিয়ে শিক্ষামূলক ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ২০২২ সালে আমরা গিয়েছিলাম বিশাখাপত্তনম, বোর্রা কেভ, আরাকু ভ্যালি এবং জগদলপুর। আরাকুর অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করে এবার আমাদের গন্তব্য ছিল জগদলপুরের অসাধারণ জলপ্রপাতগুলি।
বিশাখাপত্তনম থেকে ট্রেনে আরাকুর পথে যাত্রাটিও ছিল এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা। জানালার বাইরে পাহাড়, সবুজ বন, গভীর উপত্যকা আর একের পর এক সুড়ঙ্গ—প্রকৃতি যেন নিজের হাতে সাজিয়ে রেখেছিল সেই পথ। কতগুলি সুড়ঙ্গ যে পেরিয়েছিলাম, তার হিসাব নেই। সারাদিন বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে, স্থানীয় বিখ্যাত বাঁশের বিরিয়ানি খেয়ে, সন্ধ্যার আগেই আমরা পৌঁছে গেলাম আরাকু স্টেশনে।
সেখান থেকে রাত প্রায় এগারোটার সময় আমাদের কিরন্দুল এক্সপ্রেস ধরার কথা। ট্রেনে করে জগদলপুর যেতে হবে।
কিন্তু সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি একটু অন্যরকম হয়ে উঠল। পুলিশ এসে আমাদের সতর্ক করে দিয়ে গেল—সন্ধ্যার পর যেন কেউ স্টেশনের বাইরে না বেরোয়। সেই সময় ওই অঞ্চলে মাওবাদীদের যথেষ্ট উৎপাত ছিল। কয়েকদিন আগেই কাছাকাছি কোথাও মানুষ খুন করে চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সকলের মধ্যে একটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল।
সবাইকে স্টেশনে বসিয়ে রেখে আমি, চারজন ছাত্রকে সঙ্গে নিয়ে একটু বাইরে বেরোলাম—চা খাওয়ার উদ্দেশ্যে। তখন সন্ধ্যা প্রায় সাতটা-সাড়ে সাতটা। আশপাশে তাকিয়ে দেখলাম, একে একে প্রায় সব দোকানই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল, সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে গোটা বাজারটাই যেন গুটিয়ে নিচ্ছে নিজেকে।
একটু এগিয়ে দূরে একটি ছোট্ট চায়ের দোকান চোখে পড়ল। দোকানের কাছাকাছি গিয়ে হঠাৎ একটি দৃশ্য আমাদের চোখে পড়ল। সাদা কাপড় পরা এক বয়স্কা ভদ্রমহিলা দোকানের সামনে রাখা একটি টেবিলের উপর চিনি ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
দৃশ্যটি একটু অদ্ভুত লাগল। আমরা দোকানের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম, আর একজন বয়স্ক ভদ্রলোক দোকান বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আমরা বললাম,
—আমরা একটু চা খেতে চাই। চা কি করে দিতে পারবেন?
ভদ্রমহিলা অত্যন্ত শান্ত মুখে জিজ্ঞাসা করলেন,
—কতজন আছেন?
আমরা বললাম,
—পাঁচজন। কয়েক কাপ চা দেবেন। আমাদের সঙ্গে ফ্লাস্কও আছে।
তাঁরা আমাদের বসতে বললেন। আমরা বসে পড়লাম। কথাবার্তা শুরু হল। কিন্তু তাঁদের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, যেন এক অপূর্ব শান্তি বিরাজ করছে । কী অপূর্ব শান্তি তাঁদের মুখে! কোনো ব্যস্ততা নেই, কোনো কৃত্রিমতা নেই। খুব সাধারণ মানুষ, খুব সাধারণ একটি চায়ের দোকান—কিন্তু তাঁদের চোখেমুখে যেন এক গভীর তৃপ্তি।
কথায় কথায় ভদ্রলোক জানালেন, তাঁদের বিয়ে হয়েছিল ভালোবেসে। দুজনের ধর্মও আলাদা—একজন খ্রিস্টান, অন্যজন মুসলমান। নামগুলি আজ আর মনে নেই। তাঁদের ছেলেমেয়েরা অন্যত্র থাকে। তাঁরা দুজন মিলে এই ছোট্ট চায়ের দোকান চালান এবং এভাবেই নিজেদের সংসার চালিয়ে নেন।
আমি তখনও সেই বয়স্কা ভদ্রমহিলার একটু আগের কাজটির কথা ভাবছিলাম। তাই তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম,
—আপনি একটু আগে টেবিলের উপর চিনি ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন কেন?
ভদ্রমহিলা খুব স্বাভাবিকভাবেই বললেন,
—আমরা রাতে ঘরে চলে যাব। তখন এই টেবিলের উপর অনেক পিঁপড়ে আসে। ওরা এসে ওই চিনি খাবে।

সত্যিই দেখলাম, দু-একটি বড় কালো পিঁপড়ে ইতিমধ্যে টেবিলের উপর এসে পড়েছে।
সেদিন তাঁদের সেই কাজটি আমাদের ভিতরটা নাড়িয়ে দিয়েছিল।

চা খাওয়া শেষ হলে আমরা জিজ্ঞাসা করলাম,
—কত হয়েছে?
ভদ্রলোক হিসাব করে বললেন,
—তেষট্টি টাকা।
আমরা আনন্দের সঙ্গে বললাম,
—আমরা আপনাদের দু-শো টাকা দিতে চাই।
কিন্তু তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
—না, না। তেষট্টি টাকাই দিন।
আমরা অনেক অনুরোধ করেও তাঁকে এক টাকা বেশি দিতে পারলাম না। তিনি শুধু যতটুকু প্রাপ্য, ততটুকুই নিলেন।

স্বামী বিবেকানন্দের সেই অমোঘ বাণী মনে পড়েছিল—মানুষকে তার ছোট ছোট কাজের মধ্য দিয়েই চিনতে হয়।
শ্রীশ্রীমা সারদাদেবী নিঃশব্দে মানুষের কল্যাণ করে গেছেন। মানুষ তো বটেই, প্রতিটি প্রাণীর মধ্যেও তিনি নিজের সন্তানকে দেখতে শিখিয়েছেন। তাঁর মমতার কোনো সীমা ছিল না, কোনো ভেদাভেদ ছিল না।
আর সেই অন্ধকার সন্ধ্যায়, আরাকুর এক ছোট্ট চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা যেন সেই একই মমতার এক ক্ষুদ্র অথচ জীবন্ত প্রকাশ দেখেছিলাম—এক মুসলমান ও এক খ্রিস্টান দম্পতির সহজ সরল জীবনে।

এই ঘটনা আজ মনে আছে, চিরকাল মনে থাকবে, আমার একার নয়, আমাদের পাঁচ জনের । হয়তো জীবনের অনেক ঘটনা সময়ের সঙ্গে মুছে যাবে। কিন্তু আরাকুর সেই সন্ধ্যা, সেই দম্পতির শান্ত মুখ, তাঁদের ভালোবাসা, সততা ও নিঃশব্দ মমতা—আমাদের মনে চিরকাল থেকে যাবে।

স্বাধীনতা দিবসে গদাধর অভ্যুদয় প্রকল্পের   ছোট্ট ছেলে মেয়েরা
17/08/2026

স্বাধীনতা দিবসে গদাধর অভ্যুদয় প্রকল্পের ছোট্ট ছেলে মেয়েরা

আশ্রমের সেই “গোট ফ্রাইডে” আশ্রমের জীবনে এমন কিছু দিন ছিল, যেগুলির জন্য আলাদা করে কোনো ক্যালেন্ডার দেখার প্রয়োজন হতো না। ...
11/08/2026

আশ্রমের সেই “গোট ফ্রাইডে”

আশ্রমের জীবনে এমন কিছু দিন ছিল, যেগুলির জন্য আলাদা করে কোনো ক্যালেন্ডার দেখার প্রয়োজন হতো না। ছেলেদের মুখ দেখলেই বোঝা যেত—আজ বিশেষ দিন।

মাসে দু’টি শুক্রবার ছিল আমাদের “গোট ফ্রাইডে”—অর্থাৎ খাসির মাংসের শুক্রবার। এক শুক্রবার বাদ দিয়ে পরের শুক্রবার রাতে ডিনারে খাসির মাংস আর ভাত। একটি বড় বাটিতে চার পিস মাংস, দু’টি আলু আর বাটি ভর্তি ঝোল।

এই দিন সকাল থেকেই ছেলেদের আচরণে একটা বিশেষ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যেত। কেউ কেউ চারটে ইট নিয়ে ডন মারছে, কেউ বিকেল থেকেই মাঠে খুব ছোটাছুটি করছে। এমনকি যারা একেবারেই খেলাধুলা করতে পারে না, তারাও সেদিন ফুটবল খেলতে নেমে যেত! যেন সন্ধ্যার আগেই শরীরকে তৈরি করে নিতে হবে।

রাত ন’টায় খাওয়ার ঘণ্টা পড়বে। কিন্তু আপনি যদি ডাইনিংয়ের কাছে তার পনেরো মিনিট আগেও যান, দেখবেন অনেক ছেলে এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছে। চোখেমুখে এক অন্যরকম উত্তেজনা! মনে হতো, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা ঘটতে চলেছে।

রান্না যে খুব আহামরি হতো, তা বলব না। কিন্তু আলু আর ঝোলের কোনো অভাব ছিল না। আর ডাইনিংয়ে ছেলেদের থালার দিকে কোনো দুর্বল হৃদয়ের মানুষ যদি তাকাতেন, তাহলে তাঁর জীবনসংশয়ের সম্ভাবনা ছিল! কারণ কয়েকজনের থালায় এমন ভাতের পাহাড় দেখা যেত যে তাকে হিমালয়ের সঙ্গে তুলনা করলেও খুব বেশি বলা হবে না।

হঠাৎ কোনো অতিথি যদি সেদিন এসে পড়তেন, তাহলে শিবদাস মহারাজকে বলা একটু সমস্যার ব্যাপার ছিল। কোনো মহারাজ যদি শিবদাস মহারাজকে গিয়ে বলতেন, “আজ দু’জন অতিথি খাবেন, একটু ব্যবস্থা করে দেবেন?”
মহারাজ একটু বিরক্তির ভান করে বলতেন,
“আরে, এখন আমি কী করে সামলাব? কুলাতে পারব?”
তারপর একটু পরে বলতেন,
“ঠিক আছে, পাঠিয়ে দাও।”
এবং সেই অতিথিদের বেশ যত্ন করেই খাওয়াতেন।

আর একদিনের ঘটনা
একজন প্রাক্তন দাদা অনেক বছর পরে আশ্রমে এলেন। রাতে ডাইনিংয়ে খেতে বসেছেন। পরিবেশন চলছে। মহারাজ একটি বড় গামলা নিয়ে রুটি পরিবেশন করছেন । যার যত প্রয়োজন, তাকে তত রুটি দিচ্ছেন ।
সেই প্রাক্তন দাদা খেতে বসেছেন। মহারাজ তাঁর কাছে গিয়ে গামলা থেকে প্রায় তিরিশটি রুটি তুলে ধরলেন। তারপর দাদাকে দেখিয়ে বললেন,
“ক’টা দেব?”
তিরিশটা রুটি সামনে ধরে কেউ যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করে “ক’টা দেব?”
দাদা তো দেখে অবাক! শেষ পর্যন্ত বললেন,
“দুটো রুটি দিন।”
মহারাজ হেসে ফেললেন।
কারণ দাদার ছাত্রজীবনের ইতিহাস মহারাজের নখদর্পণে ছিল। তখন তিনি প্রচুর রুটি খেতেন। বহু বছর পরেও মহারাজ সেই রেকর্ড ভুলে যাননি। তাই একটু মজা করছেন পুরনো স্মৃতি নিয়ে।

আর একটি দেখার মতো বিষয় ছিল মহারাজের ঘি দেওয়া।

রবিবার দুপুরে সবাই খেতে বসলে মহারাজ একটি ঘি-ভর্তি বাটি এবং একটি ছোট ঘি তোলার চামচ নিয়ে প্রত্যেকের কাছে কাছে যেতেন। সামনে গিয়ে একেবারে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, একটুও না কাঁপিয়ে, ঠিক ভাতের উপর দু’চামচ ঘি ঢেলে দিতেন।
আমরা সবাই অবাক হয়ে দেখতাম।
আমি কোনোদিন মহারাজকে কারও গায়ে, জামায় কিংবা প্যান্টে একটুও ঘি ফেলতে দেখিনি। একেবারে নিখুঁতভাবে ভাতের উপর গিয়ে পড়ত ঘি।

আমি আশ্রমে যোগ দেওয়ার পর একবার সেই কৌশল অনুকরণ করার চেষ্টা করেছিলাম। প্রথম চেষ্টাতেই ঘি ভাতের বদলে এক ছাত্রের মাথায় পড়তে পড়তে কোনওরকমে গায়ে গিয়ে পড়েছিল!
সেই ছিল আমার শেষ চেষ্টা। তারপর থেকে ঘি পরিবেশনের ব্যাপারে আমি নিজের সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েছিলাম।

মহারাজের আরও একটি বিশেষ গুণ ছিল। কোনো প্রাক্তন দাদা কিংবা অতিথি হঠাৎ আশ্রমে এসে হাজির হলে, তিনি কোনো না কোনোভাবে তাঁদের জন্য বিশেষ কিছু খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতেন। কখনও ভালো মাছ, কখনও বিশেষ কোনো তরকারি, কখনও দই-মিষ্টি—কিছু না কিছু থাকতই।
অনেক সময় আগে ভালো কিছু রান্না হলে, মহারাজ সেটিও প্রাক্তন দাদাদের জন্য তুলে রাখতেন। তবে কখনও কখনও এতদিন তুলে রাখতেন যে শেষ পর্যন্ত সেটি আর খাওয়ার উপযুক্ত থাকত না!

তখন তো এসব মানুষের আধ্যাত্মিক দিক নিয়ে আমাদের কোনো ধারণাই ছিল না। আমরা শুধু দেখতাম একজন বয়স্ক মহারাজকে—যিনি ছেলেদের খাওয়াচ্ছেন, তাঁদের সঙ্গে মজা করছেন, অতিথিদের যত্ন করছেন।

কিন্তু এখন, এত বছর পরে যখন পিছন ফিরে তাকাই, তখন অবাক হয়ে ভাবি—এত বৃদ্ধ বয়সেও মহারাজের মুখে কী অপূর্ব হাসি ছিল! কী সহজ, স্বাভাবিক এবং সাবলীল ছিল তাঁর ব্যবহার! এতটা স্বাভাবিক থাকা কী করে সম্ভব?
একদিন মহারাজকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
“মহারাজ, আপনি বসে বসে কী করেন?”
মহারাজ বলেছিলেন,
“কেন, জপ করি।”
আমি আবার বলেছিলাম,
“মহারাজ, আপনি আর জপ করে কী করবেন?”
মহারাজ হেসে বলেছিলেন,
“সবার জন্য জপ করি।”
সেদিন হয়তো কথাটার গভীরতা বুঝিনি। আজ মনে হয়, সেই একটি ছোট্ট বাক্যের মধ্যেই যেন শিবদাস মহারাজের সমগ্র জীবনটা লুকিয়ে ছিল।

একটি আলুভাতের গল্পবিদ্যার্থী আশ্রমের খাওয়াদাওয়ার ক্ষেত্রেও কয়েকটি বিশেষ নীতি মেনে চলা হয়। এখানকার ছাত্রদের স্বাস্থ্য...
09/08/2026

একটি আলুভাতের গল্প
বিদ্যার্থী আশ্রমের খাওয়াদাওয়ার ক্ষেত্রেও কয়েকটি বিশেষ নীতি মেনে চলা হয়। এখানকার ছাত্রদের স্বাস্থ্য মজবুতভাবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত পুষ্টিগুণের কথা বিবেচনা করেই সারা সপ্তাহের মেনু তৈরি করা হয়েছে।
তবে শুক্রবারের দুপুরের খাবারটি একটু অন্যরকম। সেদিন থাকে কেবল আলুভাতে, ডাল আর ভাত—সঙ্গে একটুকরো লেবু। এই বিশেষ মেনুর পেছনেও একটি বিশেষ ভাবনা আছে। ছাত্রদের মনে করিয়ে দেওয়া যে, আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা প্রতিদিন পেট ভরে দু’বেলা খেতেও পান না। আমরা যেন ভালোমন্দ খেতে খেতে তাঁদের কথা ভুলে না যাই।
আমাদের সময়ে আলুভাতে আগে থেকেই গোল গোল করে পাকিয়ে রাখা হতো। তারপর লোকাদা সবার থালায় একটি করে সেই আলুভাতের গোলা দিয়ে যেতেন। ডাইনিং হলটিও বেশ লম্বা ছিল। তিন বা চারটি সারিতে ছেলেরা বসত, আর এক-একটি সারিতে প্রায় তেইশ-চব্বিশজন ছাত্র। শিবদাস মহারাজ কখনও কোনও সারির মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকতেন, আবার কখনও ধীরে ধীরে হাঁটতেন।
এরকমই একটি শুক্রবারের ঘটনা। এই সময় আলুর দাম বেশ বেড়ে গিয়েছিলো।
আমরা সবাই খেতে বসেছি। মহারাজ দাঁড়িয়ে আছেন, আর লোকাদা একে একে সবার থালায় আলুভাতের গোলা দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু আলুর দাম বেড়ে যাওয়ায়, আমাদের থালার আলুভাতের গোলা ছোট হয়ে গিয়েছে!
আমার থালায় যখন সেই ক্ষুদ্রকায় আলুভাতের গোলাটি এসে পড়ল, তখন আমি বেশ রেগে গিয়ে লোকাদাকে বললাম,
—“এইটুকু আলুভাতে দিয়ে খাওয়া যায় নাকি!”
আরও কী কী বলেছিলাম, সে ইতিহাস আর না বলাই ভালো। লোকাদা একটু অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
শিবদাস মহারাজ তখন সেখানেই ছিলেন। আমার অভিযোগ তাঁর কানে পৌঁছেছিল। তিনি ধীরে ধীরে বললেন—
—“আমাদের সময়ে আমরা খালি ডাল আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে ভাত খেতাম। তোমরা তো তাও এখন আলুভাতে পাচ্ছ! লোকা, ওকে আর একটা আলুভাতে দাও।”
ব্যস! এইটুকু।
আমি দ্বিতীয় আলুভাতের গোলাটি পেয়ে গেলাম এবং তারপর অত্যন্ত শান্ত, সংযত ও সন্তুষ্টচিত্তে খাওয়া শেষ করলাম। দেশের দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি নিয়ে আমার আর কোনও অভিযোগ রইল না!
কিছুদিন পরে আমি ব্রহ্মচারী হিসেবে বেলঘরিয়ায় যোগ দিই। তখন মহারাজ থাকতেন বিবেকানন্দ ধামে। মাঝে মাঝে দুপুরবেলা তাঁর কাছে যেতাম। একটু গল্পগুজব হতো, নানা কথা হতো।
একদিন মনে হলো, আমার পেটে যেন কোনও সমস্যা হয়েছে। তাই ডাক্তার দেখালাম। ডাক্তার আমাকে USG করাতে বললেন। সেদিন দুপুরে আর মহারাজের কাছে যাওয়া হয়নি।
পরে শুনলাম, মহারাজ কারও কাছে খবর পেয়েছেন যে, আমি USG করাতে গিয়েছি। খবরটা শুনে তিনি নাকি বেশ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন। সেই ছেলেটিকে বলেছিলেন—
—“তাই তো, এত বাচ্চা ছেলে—দেখো, ওর আবার কী হয়ে গেল!”
পরে সেই ছেলেটির কাছেই আমি কথাটা শুনি।
আমাদের একজন প্রাক্তন দাদা (শ্রীয়ঙ্কর আচার্য) এই ঘটনাটি লিখেছেন -
একবার সারা বছর ধরে প্রচুর লাউ খাওয়া হয়েছিল। এক তরুন তুর্কী প্রতিবাদী অতি উৎসাহী ভাই (এখানে প্রায়ই তার সাক্ষ্য রাখে নিজস্ব ইংরিজিতে) আমাকে এসে বলল, 'দাদা, এ-বছর প্রচুর লাউ খাওয়া হয়ে গেছে। আজ চৈত্র মাসের শেষ দিন। এমন একটা কিছু করতে হবে যাতে সামনের বছর একটু রেহাই পাই।'
আমি বললাম, 'যদি ধরা পড়ে যাই?' ভাই কালিঘাটের কাকুর মতো আত্মবিশ্বাসের সুরে বলল, 'আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন, আপনাকে কেউ টাচ করতে পারবে না'। আমি বললাম, 'জানাজানি হবে না তো?' ও বলল, 'আপনি যা করার ঘরে বসে করবেন, বাইরে বেরোবেন না। বাকিটা আমি সামলে নেব'।
ওকে বললাম একটা বড় সাদা কাগজ আনতে। রাত বারোটায় (কোনদিন পড়ার জন্য জাগি নি) মাথা থেকে বুদ্ধি বেরোলো। বড় স্কেল দিয়ে X ও Y axis আঁকলাম। X-axis বরাবর মাস আর Y-axis বরাবর লাউ ভক্ষণের পরিমাণ plot করতে আরম্ভ করলাম। Gaussian হল না, অনেকটা জায়গা জুড়ে মাঝে মাঝে উচ্চতাযুক্ত plateau তৈরী হয়েছিল। মাঝে মাঝেই শিহরণ হচ্ছিল, এত খেলাম কি করে? সেগুলো গেল কোথায়?
ওই কাগজেরই একপাশে এই অপ্রিয় বৈজ্ঞানিক কর্মকে ব্যালান্স করার জন্য সুকুমার রায়ের 'বর্ষ গেল, বর্ষ এল' কবিতাটিও লিখে দিয়েছিলাম। তাতে যদি একটু মলমের কাজ হয়। যাইহোক ভাইটি ওই ড্রইং মধ্যরাতে ডাইনিংএর নোটিশ বোর্ডে সেঁটে দিয়ে বিজয়ীর হাসি হাসতে হাসতে ঘরে চলে যায়। আমি শুধু মনে মনে ভাবছি সকালে শিবদাস মহারাজের মুখটা। সেটা দেখার জন্য সকালে উঠে ওৎ পেতে বসেছিলাম। শিবদাস মহারাজকে বোর্ডের দিকে এগোতে দেখেই আমি যেন 'অন্য কাজে' ব্যস্ত হয়ে মহারাজকে পেরিয়ে এগিয়ে গেলাম। আড়চোখে দেখলাম, মহারাজের মুখে কৌতুহলোদ্দীপক মুগ্ধ হাসি। বুঝলাম, এই সৃজনশীল কাজটি ওঁর পছন্দ হয়েছে। ভরসা পেয়ে কৌতুহলী হয়ে আমিও মহারাজের পাশে দাঁড়িয়ে বিস্ময়ে দেখতে লাগলাম। তারপর কোন কথা নেই। কেবল এক ঝলক দৃষ্টি বিনিময়।

মহারাজের সেই চাহনিআমি ভালো ছাত্র ছিলাম কি না, সে বিষয়ে ইতিহাসে বিশেষ প্রমাণ নেই। আমার নিজেরও তেমন মনে পড়ে না। তবে একটি...
07/08/2026

মহারাজের সেই চাহনি
আমি ভালো ছাত্র ছিলাম কি না, সে বিষয়ে ইতিহাসে বিশেষ প্রমাণ নেই। আমার নিজেরও তেমন মনে পড়ে না। তবে একটি বিষয়ে আজ আর কোনো সন্দেহ নেই—আমি বেশ অভদ্র ছিলাম।
কয়েকদিন আগে এক বন্ধু এসেছিল। গল্প করতে করতে হঠাৎ সে বলল—
“তোর তো সাধু হওয়া উচিত ছিল না, আমার হওয়া উচিত ছিল। আর তুই হয়ে গেলি!”
আমাদের আশ্রমে তখন কেউ বাড়ি গেলে শিবদাস মহারাজকে বলে যেত। আবার ফিরে এসে মহারাজকে জানিয়ে প্রণাম করত। ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক। মহারাজকে তো জানতে হবে, আজ কতজন ছেলে খাবে। সেই হিসাব অনুযায়ী রান্না হবে।
কিন্তু আমি বাড়ি যাওয়ার সময় কিছু বলে যেতাম না, আর ফিরেও দেখা করতাম না।
তিন বছর ধরে এই কাণ্ড করেছি।
আর আশ্চর্যের বিষয়, মহারাজ আমাকে একদিনও কিছু বলেননি।
কিন্তু বাড়ি থেকে ফিরে ডাইনিংয়ে খেতে গেলে মহারাজ আমার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। কয়েকদিন ধরে এরকম করতেন। যেনো বলছেন আমাকে তোমার বলে যাওয়া উচিত ছিল।
আর একটি ঘটনা মনে পড়ে।
আমাদের আশ্রমে একজন কর্মী ছিল। তার ভালো একটি নাম ছিল, কিন্তু আমরা সবাই তাকে ‘পাগলু’ বলে ডাকতাম। কেন এই নাম হয়েছিল, ঠিক মনে নেই। শুনেছিলাম, রাত বারোটার পর নাকি তার আচরণ কিছুটা অস্বাভাবিক হয়ে যেত। সে জন্যই ছেলেদের মধ্যে তার ওই নাম ছড়িয়ে পড়েছিল।
ছেলেটি বোধহয় খুব একটা সুবিধের ছিল না। আর আশ্রমের ছেলেরা - সবসময় তার পিছনে লাগার চেষ্টা করত।
পাগলু খাওয়ার সময় জল দিয়ে যেত।
সে গ্লাসে জল ভরে রেখে গেল।
আমরা কী করতাম?
ডাইনিংয়ের আসনের পিছনে যেখানে জল বেরোনোর জন্য গর্ত ছিল, সেখানে সেই জল ঢেলে দিতাম। তারপর খালি গ্লাসটা মেঝেতে ঠকাস করে বাজাতাম।
অর্থাৎ—
“পাগলু, জল শেষ। আবার দে।”
একদিন কোনো একটা কারণে পাগলুর সঙ্গে আমার বেশ জোর ঝগড়া হয়ে গেল। ঠিক কী নিয়ে, আজ আর মনে নেই। কিন্তু রাগের মাথায় আমি তাকে কয়েকটি চার অক্ষরের গালাগালি দিয়ে ফেললাম। আমি সাধারণত এই ধরনের ভাষায় কথা বলতাম না।
পাগলু অবশ্য ব্যাপারটি হালকাভাবে নিল না। সে সরাসরি শিবদাস মহারাজের কাছে নালিশ করল।
মহারাজ তখন ডাইনিং হলের পাশের ছোট ঘরটিতে বসেছিলেন।
আমাকে ডেকে পাঠানো হলো।
আমি গেলাম।
দেখলাম, মহারাজ চেয়ারে বসে আছেন। পাশে লোকাদা ( আশ্রমের কর্মী ) দাঁড়িয়ে। আর তার পাশে পাগলু।
আমি মহারাজের সামনে দাঁড়ালাম।
মহারাজ শান্তভাবে বললেন,
“তুমি ওকে খারাপ কথা বলেছ কেন?”
আমি - “মহারাজ, ও আমার সঙ্গে এই করেছে, ওই করেছে, এই বলেছে, ওই বলেছে…”
একটার পর একটা।
মহারাজ চুপ করে শুনলেন।
একটিও কথা বললেন না।
শেষে শুধু বললেন—
“যাও, যাও।”
আমি বেরিয়ে এলাম।
দরজার কাছে এসে শুনলাম, মহারাজ পাগলুকে বলছেন—
“তুই ওর সঙ্গে কেন লাগতে যাস?” ক্রমশ…

বিদ্যার্থী আশ্রম—আমাদের দ্বিতীয় বাড়িআমরা প্রায়ই বলি—বিদ্যার্থী আশ্রম আমাদের দ্বিতীয় বাড়ি। কিন্তু কেন?একটি বাড়ি কি ...
06/08/2026

বিদ্যার্থী আশ্রম—আমাদের দ্বিতীয় বাড়ি

আমরা প্রায়ই বলি—বিদ্যার্থী আশ্রম আমাদের দ্বিতীয় বাড়ি। কিন্তু কেন?
একটি বাড়ি কি শুধু ইট, কাঠ, পাথরের সমষ্টি? না, বাড়ি তখনই বাড়ি হয়ে ওঠে, যখন সেখানে একজন মা থাকেন। মায়ের স্নেহ, মায়ের অপেক্ষা, মায়ের অদৃশ্য নজরদারি—এসবই একটি গৃহকে আশ্রয়ে পরিণত করে। তাই মনে প্রশ্ন জাগে, এই আশ্রমেও কি কোনো মা আছেন? যদি না থাকেন, তবে একে দ্বিতীয় বাড়ি বলি কী করে?

হ্যাঁ, আমাদের সকলের চিরন্তন মা শ্রীশ্রী সারদাদেবী তো সমস্ত রামকৃষ্ণ আশ্রমেই বিরাজমান। কিন্তু বিদ্যার্থী আশ্রমের বিশেষত্ব যেন অন্য কোথাও। এখানে যুগে যুগে এমন কিছু মানুষ এসেছেন, যাঁরা নিজেদের সম্পূর্ণ বিলিয়ে দিয়ে মায়ের স্নেহকে জীবন্ত করে তুলেছেন। তাঁরা সন্ন্যাসী ছিলেন, কিন্তু আমাদের কাছে ছিলেন মা। তাঁদের হাতে শাসন ছিল, অথচ সেই শাসনের অন্তরালে ছিল সীমাহীন মমতা; তাঁদের মুখে উপদেশ ছিল কম, কিন্তু জীবনের প্রতিটি আচরণ ছিল এক একটি নীরব শিক্ষা।

আমরা ১৯৯৭ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত এই আশ্রমের ছাত্র ছিলাম। তখন ডাইনিং-এর দায়িত্বে ছিলেন পূজনীয় শিবদাস মহারাজ, সন্ন্যাস-নাম স্বামী স্কন্দানন্দজী। আজও তাঁর কথা মনে পড়লে বিস্ময়ের সঙ্গে এক অদ্ভুত উষ্ণতা অনুভব করি। খাটো গড়ন, পা দুটি একটু ফুলে থাকত, চলাফেরায় বার্ধক্যের ছাপ স্পষ্ট ছিল। কিন্তু আশ্চর্য, তাঁর দৃষ্টি যেন সর্বত্র পৌঁছে যেত।

তিনি থাকতেন বিবেকানন্দ ধামে। ভোরের আলো যখন পুকুরের জলে নরম সোনালি রেখা এঁকে দিত, তখন তাঁকে দেখা যেত পুকুরপাড় দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতে। হাঁটতে হাঁটতে দু-একটি ফুল তুলে নিতেন। সেই ফুল হয়তো ঠাকুরের পূজায় যেত, আর তিনি চলে যেতেন ডাইনিং-এর দিকে। তারপর শুরু হতো তাঁর সারাদিনের নিরবচ্ছিন্ন কর্মযজ্ঞ।

সকালের টিফিন থেকে রাতের শেষ আহার—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি। প্রতিটি ব্যাচে ঘুরে ঘুরে দেখতেন, সবাই ঠিকমতো খাচ্ছে কি না।
কখনও তাঁকে সকলের আগে খেতে বসতে দেখিনি। কোনো সাধু মহারাজ যদি খেতে দেরি করতেন, তিনিও অপেক্ষা করতেন। তাঁকে ডেকে এনে, সযত্নে খাইয়ে তবেই নিজে দুপুর দুটো বা আড়াইটার সময় আহারে বসতেন।

সামান্য বিশ্রামের পর আবার বিকেল চারটায় তিনি হাজির। ছাত্রদের টিফিন বিতরণ, তারপর রাতের খাবার শেষ না হওয়া পর্যন্ত একই নিষ্ঠা, একই ধৈর্য।

কোনো কোনো দিন কোনো ছাত্র ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে। রাত দশটার পর হঠাৎ তিনি বলতেন, "দেখ তো, ওই ছেলেটা খেতে আসেনি কেন? ডেকে আনো।" ঘুমজড়ানো চোখে ছেলেটি এসে বসলে, তাঁকে স্নেহভরে খাইয়ে তবেই যেন তাঁর মন শান্ত হতো।

তিনি খুব কম কথা বলতেন। কিন্তু তাঁর নীরবতাই ছিল সবচেয়ে বড় ভাষা।
শুনেছি, তিনি রসায়নের ছাত্র ছিলেন। একসময় ছাত্রদের পড়াতেন। ফুটবল খেলায় রেফারির দায়িত্বও পালন করেছেন। আবার আশ্রমের প্রয়োজনে অর্থসংগ্রহের জন্য ঘরে ঘরে গিয়েছেন।

আমাদের আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা পূজনীয় স্বামী নির্বেদানন্দজী মহারাজ একদিন তাঁকে শুধু বলেছিলেন, "তুই ডাইনিংটা দেখিস।" গুরুজনের সেই সামান্য নির্দেশই তিনি জীবনের ব্রত করে নিয়েছিলেন। একদিন, একমাস বা একবছর নয়—অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

পরে শুনেছি, একসময় বেলুড় মঠ থেকে তাঁকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব—সেক্রেটারি হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি।

আজ এত বছর পরে বুঝতে পারি, আমরা শুধু একজন সন্ন্যাসীকে দেখিনি; আমরা এক জীবন্ত আদর্শকে দেখেছিলাম।
মহারাজের সঙ্গে আমার জীবনের কয়েকটি ছোট্ট ঘটনার কথা এবার বলব।
ক্রমশ…

Third Year Students. Few are going to study IIT. So today they took these shot.
16/07/2026

Third Year Students. Few are going to study IIT. So today they took these shot.

MOST REVERED SWAMI GAUTAMANANDAJI MAHARAJ AT STUDENTS' HOME
13/04/2026

MOST REVERED SWAMI GAUTAMANANDAJI MAHARAJ AT STUDENTS' HOME

Address

R K Mission Road, Belgharia
Kolkata
700056

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Ramakrishna Mission Calcutta Students' Home posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share

Category