20/08/2026
গঙ্গোত্রীর পথে এক গুহাবাসী সাধু
গঙ্গোত্রী থেকে ফিরছিলাম আমি আর আরও একজন মহারাজ। হরশিল পৌঁছানোর কিছুটা আগে মূল রাস্তা থেকে একটু ভিতরে ঢুকে, বেশ খানিকটা পথ হেঁটে একদিন আমরা পৌঁছে গেলাম একটি গুহার কাছে। সময়টা মার্চ মাস। তখনও গঙ্গোত্রী বরফে ঢাকা। চারদিকে কনকনে ঠান্ডা, পাহাড়ের বুক জুড়ে শীতের শেষ আঁচড়। বিকেলের দিকে আমরা সেই গুহাটিতে পৌঁছেছিলাম।
গুহাটি আসলে ঠিক গুহার মতো নয়। একটি বিশাল পাথর পাহাড়ের গা থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছে; তার এক পাশে পাথর ও মাটি দিয়ে একটু ঘিরে নিয়ে থাকার মতো জায়গা তৈরি করা হয়েছে। জায়গাটি খুব বড় নয়। একেবারে গঙ্গার ধারে—সামনেই নিরন্তর বয়ে চলেছে হিমশীতল নদী।
সেই ছোট্ট গুহায় তখন বাস করছিলেন প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়সী এক সাধু। বাঙালি। শক্ত-পোক্ত চেহারা, মুখে এক ধরনের দৃঢ়তা, অথচ চোখেমুখে শিশুর মতো সরলতা। আমাদের দেখে তিনি যেন খুব খুশিই হলেন।
জানলাম, প্রায় বারো-তেরো বছর ধরে তিনি ওই গুহাতেই আছেন। একসময় রামকৃষ্ণ মিশনে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু বয়স বেশি হয়ে যাওয়ায় যোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। তারপর একদিন সব ছেড়ে চলে এসেছেন এই নির্জন পাহাড়ে।
গুহার সামনে অল্প একটু জায়গা ছিল। সেখানে তিনি আলু চাষ করেছিলেন। সেই সামান্য জমি, গুহা, সামনে গঙ্গা আর চারপাশের পাহাড়—এই নিয়েই তাঁর সংসার।
আমরা পৌঁছাতেই তিনি হেসে বললেন,
—“একটু চা বানাই?”
আমরা সানন্দে রাজি হয়ে গেলাম।
তিনি গল্প করতে করতে চা বানাতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পরে গরম ধোঁয়া ওঠা চা আমাদের হাতে দিলেন। নিজে অবশ্য চা খান না।
আমরা দুজনেই তখন ধূমপান করতাম। বাইরে তখন কনকনে ঠান্ডা। তাই মহারাজকে বললাম,
—“মহারাজ, চায়ের সঙ্গে যদি একটু স্মোক করি, তাহলে এই ঠান্ডার মধ্যে বেশ একটা আমেজ হবে।”
কথাটা শুনে তিনি আমাদের বেশ বকেই দিলেন।
বললেন,
—“সব ছেড়ে সাধু হতে এসেছ, আর স্মোকিংটা ছাড়তে পারলে না? দেখছ না, বিজ্ঞান বলছে—স্মোকিং কত খারাপ অভ্যাস! তবুও ছাড়তে পারছ না। সামান্য একটা স্মোকিং ছাড়তে পারছ না, আর কামিনী-কাঞ্চন কী করে ছাড়বে?”
আমরা একেবারে চুপ।
এভাবে কেউ আমাদের বলবেন—তা যেন আমাদের ধারণার মধ্যেই ছিল না। তাঁর কথায় রাগ ছিল না, অহংকার ছিল না; ছিল একেবারে সরল, অকপট সত্যকথন। আমরা মাথা নিচু করে শুনতে লাগলাম।
তিনি আবার বললেন,
—“সাধন-ভজন হচ্ছে? না হলে সব ছেড়ে এদিকে চলে এসো।”
আমরা বললাম,
—“মহারাজ, আমরা এখানে এসে থাকতে পারব না।”
তিনি বললেন,
—“তাহলে তোমাদের আশ্রমের সেক্রেটারি মহারাজকে জিজ্ঞেস করো—দিনে কতক্ষণ কাজ করতে হবে? পাঁচ ঘণ্টা, না ছয় ঘণ্টা? বাকি সময়টা সাধন-ভজনে ডুবে যাও।”
কথাগুলি শুনে আমরা যেন অন্য এক জগতের মানুষের সামনে বসে আছি বলে মনে হচ্ছিল।
এরপর তিনি নিজের সাধনার কথা বলতে শুরু করলেন।
—“আমি সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রায় তিন ঘণ্টা শীর্ষাসন করি।”
আমরা দুজনেই অবাক!
তিনি যেন আমাদের বিস্ময় বুঝতে পেরে বললেন,
—“আসলে শীর্ষাসন করলেই প্রাণায়াম এমনিই হয়ে যায়।”
তারপর তাঁর প্রতিদিনের সাধনার কথা বললেন। শীর্ষাসন করার পর বাইরে বেরিয়ে গঙ্গার ধারে গিয়ে বসেন। নদীর শব্দ শুনতে থাকেন। সেই শব্দ শুনতে শুনতে ধীরে ধীরে মন নিজের ভিতরে ঢুকে যায়। কখনও কখনও এভাবে বসে থাকতে থাকতে কখন যে বিকেল হয়ে যায়, তা তাঁর নিজেরই খেয়াল থাকে না।
বললেন,
—“এইভাবেই ধ্যান করি। খুব পবিত্রতা রাখতে হয়। পবিত্রতা না থাকলে ধ্যান হয় না।”
কী আশ্চর্য সরলতা! তাঁর সাধনা সম্পর্কে বলার মধ্যে কোনও জাহির করার ভাব নেই। যেন তিনি নিজের জীবনের একেবারে স্বাভাবিক একটি কথা বলছেন।
তিনি ছিলেন সত্যিই খুব সরল মানুষ। ভিতরে যা, বাইরে ঠিক তাই। কোনও আবরণ নেই, কোনও অভিনয় নেই।
আমরা জিজ্ঞাসা করলাম,
—“মহারাজ, আপনার খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা কী করে হয়?”
তিনি বললেন, দূরের রেশন দোকান থেকে কেউ কেউ চাল, আটা ইত্যাদি এনে দিয়ে যায়। আর এখানে কিছু আলু চাষ করেছেন। সেই দিয়েই কোনওরকমে চলে যায়।
তারপর আরও বললেন,
—“শীতকালে এদিকে কেউ আসে না।”
আমরা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম,
—“এতদিন কোনও মানুষ ছাড়া কী করে থাকেন?”
তিনি খুব স্বাভাবিকভাবে বললেন,
—“অভ্যাস হয়ে গেছে। গরমকালে মাঝে মাঝে দু-একজন আসে। কিন্তু শীতকালে প্রায় কেউই আসে না।”
কথাটা তিনি এমনভাবে বললেন, যেন এত নির্জনতা, এত শীত, এত একাকিত্ব—এসব তাঁর কাছে একেবারেই স্বাভাবিক।
আমরা তখন ভাবছিলাম—আমরা শহরে থেকে কত মানুষ, কত শব্দ, কত ব্যস্ততার মধ্যে থেকেও এক মুহূর্ত নিঃসঙ্গ থাকতে পারি না। আর এই মানুষটি বছরের পর বছর ধরে বরফঢাকা পাহাড়ের কোলে, গঙ্গার তীরে, একটিমাত্র গুহাকে আশ্রয় করে দিব্যি আছেন!
এইভাবে গল্প করতে করতে কখন যে এক ঘণ্টারও বেশি সময় কেটে গেল, বুঝতেই পারিনি।
এরপর আমাদের ফিরে আসার সময় হল। আমরা মহারাজকে কিছু প্রণামী দিতে চাইলাম। তিনি নিতে চাইছিলেন না। অনেকটা জোর করেই তাঁর হাতে কিছু প্রণামী দিলাম।
তারপর আমরা উঠে পড়লাম।
মহারাজও আমাদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে এলেন। বিদায়ের সময় তাঁর সেই সরল মুখটি আজও মনে পড়ে।
সেদিন সেই গুহাবাসী মহারাজের সঙ্গে দেখা করে মনে হয়েছিল—ভারতবর্ষের প্রকৃত সাধুদের কত বিচিত্র জীবন! কেউ মঠে, কেউ আশ্রমে, কেউ মন্দিরে; আবার কেউ বা হিমালয়ের কোনও অজানা গুহায়, জনমানবহীন নির্জনতায় বসে নিজের মতো করে সাধনা করে চলেছেন।