24/09/2026
২২শে আগস্ট, ১৯০৭। জার্মানির স্টুটগার্ট শহর। বিশাল হলঘরে চলছে আন্তর্জাতিক সমাজবাদী সম্মেলন। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের প্রতিনিধিরা এসেছেন। হঠাৎ সব কোলাহল থেমে গেল।
মঞ্চের দিকে এগিয়ে এলেন এক ছোটখাটো চেহারার মহিলা। পরনে সাদা পার্সি শাড়ি, কপালে কুমকুম নেই, চোখে অদম্য আগুন। কারও অনুমতি না নিয়েই তিনি হাতে তুলে ধরলেন এক অদ্ভুত পতাকা - সবুজ, গেরুয়া আর লাল রঙের তিনটি ডোরা, মাঝখানে লেখা 'বন্দে মাতরম'।
তিনি গলা তুলে বললেন, "এই পতাকা স্বাধীন ভারতের। ব্রিটিশ শাসন ভারতকে শ্মশান বানিয়েছে। ভারতের কোটি কোটি মানুষের রক্তে এই পতাকা একদিন লাল হবে, কিন্তু আজ এটা আশার প্রতীক।"
হলঘর স্তব্ধ। এটাই ইতিহাসে প্রথমবার - বিদেশের মাটিতে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন। যিনি করলেন, তিনি ভিকাজি রুস্তম কামা। সেদিন থেকে বিশ্ব তাঁকে চিনল মাদাম কামা নামে।
ভিকাজির জন্ম ১৮৬১ সালের আজকের দিনে, ২৪শে সেপ্টেম্বর, বোম্বাইয়ের এক সম্ভ্রান্ত পার্সি পরিবারে। বাবা সোরাবজি ফ্রামজি প্যাটেল ছিলেন শহরের নামকরা মানুষ। ভালো ইংরেজি শিক্ষা, সচ্ছল জীবন - সবই ছিল। বিয়ে হল ধনী আইনজীবী রুস্তম কামার সঙ্গে। কিন্তু সেই সংসার তাঁকে বাঁধতে পারল না।
১৮৯৬ সালে বোম্বাইয়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আর প্লেগ। শহর মরছে। ভিকাজি ঝাঁপিয়ে পড়লেন সেবায়। তিনি কাজ করলেন গ্র্যান্ট মেডিক্যাল কলেজের ত্রাণ শিবিরে, রোগীদের সেবা করতে করতে নিজেই প্লেগে আক্রান্ত হলেন। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরলেন, কিন্তু শরীর ভেঙে গেল। ডাক্তাররা বললেন ইউরোপে যেতে।
১৯০২ সালে তিনি লন্ডন গেলেন। আর ফিরলেন না।
লন্ডনেই তাঁর দ্বিতীয় জন্ম হল। দেখা হল শ্যামজী কৃষ্ণ বর্মা আর দাদাভাই নৌরোজির সঙ্গে। তাঁদের মুখে শুনলেন পরাধীন ভারতের আসল ছবি। ভদ্র, নরম মনের সমাজসেবিকা ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন আগুনের মতো বিপ্লবী।
ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের চোখ এড়াতে তিনি পাড়ি দিলেন প্যারিসে। সেখানে তৈরি করলেন 'প্যারিস ইন্ডিয়া সোসাইটি'। তাঁর ছোট্ট ফ্ল্যাট হয়ে উঠল ভারতীয় বিপ্লবীদের গোপন আস্তানা। সেখানে বসে ছাপা হতো নিষিদ্ধ পত্রিকা 'বন্দে মাতরম', তৈরি হতো বোমা বানানোর ফর্মুলা, লেখা হতো স্বাধীনতার ইশতেহার।
ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ভয় পেল। তাঁর ভারতের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হল। তাঁকে ঘোষণা করা হল রাষ্ট্রদ্রোহী। দেশে ফেরার পথ বন্ধ।
কিন্তু সম্মান এল অন্য দিক থেকে। রুশ বিপ্লবের পর সোভিয়েত রাশিয়া থেকে স্বয়ং লেনিন তাঁকে আমন্ত্রণ জানালেন, "আপনি আমাদের দেশে এসে আশ্রয় নিন।" ভিকাজি বিনয়ের সঙ্গে ফিরিয়ে দিলেন। তিনি বলেছিলেন, তাঁর জায়গা ইউরোপের বিপ্লবীদের মাঝেই, যেখান থেকে তিনি ভারতের কথা বিশ্বকে বলতে পারবেন।
দীর্ঘ ৩৪ বছর নির্বাসনে কাটিয়ে, অসুস্থ, নিঃস্ব অবস্থায় ১৯৩৫ সালে তিনি বোম্বাই ফিরতে পেরেছিলেন। পরের বছর, ১৯৩৬ সালের ১৩ই আগস্ট, পার্সি জেনারেল হাসপাতালে নিঃশব্দে চলে গেলেন।
তাঁকে ভারতীয় বিপ্লববাদের জননী বলা হয়। কারণ তিনি শুধু পতাকা তোলেননি, তিনি শিখিয়েছিলেন কীভাবে দেশকে মায়ের মতো ভালোবাসতে হয় - সব সুখ, সব আরাম ত্যাগ করে।
আজ যখন আমরা লালকেল্লায় তেরঙ্গা উড়তে দেখি, মনে রাখা দরকার, তার প্রথম সেলাইটা করেছিলেন এক পার্সি নারী, বিদেশের মাটিতে, একা দাঁড়িয়ে, সমস্ত সাম্রাজ্যের চোখে চোখ রেখে।