20/05/2026
তোমরা তো এখন মোবাইল খুললেই গুগল ম্যাপে গোটা পৃথিবী দেখতে পাও। কিন্তু আজ থেকে ৫০০ বছরেরও বেশি আগের পৃথিবীর কথা একবার চোখ বন্ধ করে ভাবো তো! তখন না ছিল কোনো ম্যাপ, না ছিল ইন্টারনেট।
ইউরোপের মানুষদের তখন ভারতের মশলার (বিশেষ করে গোলমরিচ আর এলাচের) দারুণ কদর। কিন্তু স্থলপথে এতটা পথ আসা ছিল ভীষণ ঝক্কির, বিপদের আর অনেক সময়ের ব্যাপার। তাই তারা মরিয়া হয়ে খুঁজছিল এমন একটা সমুদ্রপথ, যা দিয়ে সরাসরি ভারতে পৌঁছানো যায়।
পর্তুগালের রাজা এই অসাধ্য সাধনের দায়িত্ব দিলেন এক অকুতোভয় নাবিককে—নাম তাঁর ভাস্কো দা গামা। ১৪৯৭ সাল। চারটে পেল্লায় জাহাজ আর একদল দুঃসাহসী নাবিক নিয়ে অজানা, অচেনা সমুদ্রের বুকে ভেসে পড়লেন তিনি। লক্ষ্য একটাই—ভারতকে খুঁজে বের করা।
যাত্রাটা কিন্তু মোটেও সহজ ছিল না। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস চারদিকে শুধু জল আর জল! সঙ্গী বলতে আকাশের তারা আর কম্পাস। মাঝে মাঝেই ভয়ংকর ঝড় এসে জাহাজগুলোকে যেন খেলনার মতো দোলাতে লাগল। কখনো বা বিশাল বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়তে লাগল জাহাজের গায়ে।
ধীরে ধীরে জাহাজে টাটকা খাবার ফুরিয়ে আসতে লাগল। টানা সমুদ্রে থেকে অনেক নাবিক মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লেন, অনেকে মারাও গেলেন। চারদিকে তখন শুধু হতাশা আর ভয়। নাবিকরা চাইছিলেন দেশে ফিরে যেতে। কিন্তু গামা দমে যাওয়ার পাত্র নন! তিনি তাঁর নাবিকদের সাহস জুগিয়ে জাহাজ এগিয়ে নিয়ে চললেন।
আফ্রিকার একদম দক্ষিণ প্রান্তের ভয়ংকর উত্তাল সমুদ্র (যাকে বলে উত্তমাশা অন্তরীপ) পেরিয়ে তাঁরা অবশেষে ঢুকে পড়লেন ভারত মহাসাগরে।
অবশেষে দীর্ঘ প্রায় দশ মাসের একটানা লড়াইয়ের পর এল সেই স্বপ্নের দিন। ১৪৯৮ সালের ২০শে মে—ঠিক আজকেরই দিন! কেরালার কালিকট বন্দরে এসে নোঙর করল ভাস্কো দা গামার জাহাজ। মাটিতে পা রেখেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন সবাই।
ভাবতে পারো, এই একটা সমুদ্রযাত্রা পুরো পৃথিবীর ইতিহাস কীভাবে বদলে দিয়েছিল? ইউরোপের সাথে ভারতের সরাসরি যোগাযোগের রাস্তা খুলে গেল। পশ্চিমের মানুষদের সাথে আমাদের এই পূর্ব দিকের মানুষদের যেন একটা নতুন সাঁকো তৈরি হয়ে গেল। ভাস্কো দা গামার সেই অদম্য জেদ আর সাহসের গল্প তাই আজও আমরা পড়ে চলেছি।
19/05/2026
আজ ১৯শে মে। ক্যালেন্ডারের পাতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আজ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন। কিন্তু মানুষটার কথা একান্তে ভাবতে বসলে মনে হয়, এই মানুষগুলোকে কি কোনো নির্দিষ্ট তারিখের ফ্রেমে বেঁধে রাখা যায়?
আসুন, আজ কোনো সাহিত্য-সমালোচকের ভারী চশমা দিয়ে নয়, বরং একজন সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে দেখি আমাদের এই 'মানিক'কে।
গায়ের রংটা ছিল বেশ চাপা, কালোই বলা চলে। কিন্তু চোখদুটোতে অদ্ভুত এক মায়া ছিল। বাবা-মা তাই আদর করে ডাকতেন ‘মানিক’। বাবার বদলির চাকরি ছিল, তাই ছেলেটার ছোটবেলা কেটেছে বাংলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে। ধুলোমাটি মেখে, গ্রামের পর গ্রাম পার হয়ে।
এই ছেলেটা দূর থেকে জীবন দেখেনি। সে নদীর ঘাটে বসে মাঝির ঘাম দেখেছে, তাঁতির মাকুর খটখট শব্দ শুনেছে। ওই যে সাধারণ মানুষগুলো, যাদের কথা কেউ ভাবে না, যারা প্রতিদিন কেবল বেঁচে থাকার জন্য এক অসম্ভব লড়াই করে—তারাই হয়ে উঠল মানিকের জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ।
সালটা ১৯২৮। প্রেসিডেন্সি কলেজের ক্যান্টিনে বন্ধুদের সাথে জমজমাট আড্ডা চলছে। অঙ্কের এক মেধাবী ছাত্র বসে আছে সেখানে। বন্ধুরা হাসাহাসি করছে—"আরে, নামি পত্রিকাগুলো কি আর আনকোরা নতুনদের লেখা ছাপে? ওখানে তো শুধু প্রতিষ্ঠিত বড় বড় লেখকদের জায়গা!"
তরুণের চোখে জেদ চেপে গেল। সে বলল, "আমি বাজি ধরছি, আমার প্রথম লেখাই আমি সেরাদের পত্রিকায় ছাপিয়ে দেখাব।"
বাড়ি ফিরে ছেলেটা লিখল তার জীবনের প্রথম গল্প 'অতসীমামী'। তারপর বুক ফুলিয়ে সোজা চলে গেল সেকালের দাপুটে পত্রিকা 'বিচিত্রা'-র দপ্তরে। সম্পাদক উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় লেখাটা পড়লেন। হয়তো তাঁরও বুকের ভেতরটা একটু কেঁপে উঠেছিল সেই নতুন কলমের ধার দেখে। বাজিটা ছেলেটা জিতে গেল।
আর আমরা? আমরা পেলাম বাংলা সাহিত্যের এক জাদুকরকে। অঙ্কের জটিল সমীকরণ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল, খুলে গেল জীবনের সবচেয়ে রূঢ় আর সত্যি খাতাটা।
তখনকার দিনে বাংলা সাহিত্যে একটা অদ্ভুত রোমান্টিক ঘোর ছিল। গ্রামের মানেই যেন শান্ত নদী, পাখায় বাতাস আর প্রেমের মিষ্টি গান। মানিক এসে সেই সুন্দর স্বপ্নের আয়নাটা সজোরে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিলেন।
তিনি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেন, পেটে যখন তীব্র খিদে থাকে, তখন মানুষের ভেতরে কীভাবে একটা আদিম সত্তা জেগে ওঠে। তাঁর 'পদ্মানদীর মাঝি'-র কুবের বা কপিলার কোনো মেকি আদর্শ ছিল না; তারা ছিল বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ভালো-মন্দের হিসাব ভুলে যাওয়া কিছু জ্যান্ত মানুষ। 'পুতুলনাচের ইতিকথা'-য় তিনি বোঝালেন, আমরা সবাই আসলে পরিস্থিতির, সমাজের আর আমাদের ভেতরের লুকিয়ে রাখা বাসনার হাতের এক একটা অসহায় পুতুল।
মানুষটা সারা জীবন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য লড়াই করেছেন। কিন্তু নিজের জীবনে এক মুহূর্তের জন্যও স্বস্তি পাননি। নিদারুণ অভাব, দারিদ্র্য, আর তার সঙ্গে মৃগীরোগ—সব মিলিয়ে শরীরটা ভেতর থেকে ভেঙে পড়েছিল। টাকার অভাবে চিকিৎসা জোটেনি, তবু কলম থামেনি একদিনের জন্যও।
ভাবতে পারেন? মাত্র ৪৮ বছর বয়স! ১৯৫৬ সালের ৩রা ডিসেম্বর মানুষটা চিরতরে চোখ বুজলেন। কিন্তু ওইটুকু সময়ের মধ্যে, নিজের রক্ত আর ঘাম নিংড়ে তিনি আমাদের জন্য রেখে গেছেন ৩৯টি উপন্যাস আর আড়াইশোর বেশি গল্প।
তিনি বলতেন, "আমি পাঠককে আনন্দ দিবার জন্য লিখি না, তাদের অস্বস্তিতে ফেলিবার জন্য লিখি।"
সত্যিই তো! আজও যখন আমরা মানিকের বইয়ের পাতা উল্টাই, আমাদের বুকের ভেতরে একটা চাপা অস্বস্তি হয়। মনে হয়, এই তো আমাদের আশেপাশের মানুষগুলোর গল্প! এই তো আমার নিজের মনের ভেতরের অন্ধকার দিকটা! এই যে আয়নার সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেওয়া, আমাদের ভেতরের সত্যিকে খুঁড়ে বের করে আনা—এটাই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। আমাদের চিরকালের, সবচেয়ে কাছের মানিক।
18/05/2026
আজ থেকে ঠিক ৫২ বছর আগের কথা...
রাজস্থানের পোখরান। থর মরুভূমির বুকে তখন আগুনের মতো রোদ ঝরছে। চারদিকে শুধু ধূ ধূ বালি আর নিস্তব্ধতা। কিন্তু মাটির নিচে, একটা গভীর গর্তের ভেতর লুকিয়ে আছে এক অকল্পনীয় শক্তি।
দিনটা ছিল ১৯৭৪ সালের ১৮ই মে। ঠিক আজকের দিনটা!
সময় সকাল ৮টা ৫ মিনিট।
হঠাৎ... কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই মরুভূমির বুক চিরে একটা প্রবল কম্পন উঠল! কোনো সাধারণ ভূমিকম্প নয়, এক কান-ফাটানো গর্জনে চারপাশের মাটি যেন আকাশ ছুঁতে চাইল। চোখের পলকে একটা বিশাল মাশরুমের আকারের ধোঁয়ার মেঘ ঢেকে ফেলল মরুভূমির নীল আকাশটাকে।
দিল্লির কন্ট্রোল রুমে রুদ্ধশ্বাসে বসে থাকা বিজ্ঞানীদের মুখে তখন একগাল তৃপ্তির হাসি। সোজা ফোন গেল খোদ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। ওপাশ থেকে একটা সাঙ্কেতিক বার্তা ভেসে এল— "The Buddha has smiled" (বুদ্ধ হেসেছেন)!
আমার প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা, এই হাসি কোনো সাধারণ হাসি ছিল না। এই হাসি ছিল এক নতুন, শক্তিশালী ভারতের গর্জন!
তোমরা যারা স্কুলের বেঞ্চে বসে ইতিহাসের পাতায় বা ভৌতবিজ্ঞানের বইতে শুধু সাল আর সূত্র পড়ো, তারা একবার চোখ বন্ধ করে সেই দিনটার কথা ভাবো। রাষ্ট্রসংঘের মাত্র পাঁচটি দেশের হাতে তখন এই পরমাণু শক্তি ছিল। তাদের কড়া নজরদারি আর রক্তচক্ষুকে সম্পূর্ণ বোকা বানিয়ে, আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরা সেদিন অসাধ্য সাধন করেছিলেন।
ডক্টর রাজা রামান্না, ডক্টর হোমি সেঠনার মতো বিজ্ঞানীরা সেদিন অ্যাভেঞ্জার্সের কোনো সুপারহিরোর চেয়ে কম ছিলেন না! তাঁরা প্রমাণ করেছিলেন, মেধা আর জেদ থাকলে ভারত কারও কাছে মাথা নত করে না।
17/05/2026
একটি ছোট্ট গ্রামের ছেলে। নাম তার এডওয়ার্ড জেনার।
ছোটবেলা থেকেই তিনি মানুষের কষ্ট দেখতে পারতেন না। সেই সময় পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর রোগগুলোর মধ্যে ছিল গুটিবসন্ত। এই রোগে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারাতেন। গ্রামের পর গ্রাম ভয়ে কাঁপত।
একদিন জেনার লক্ষ্য করলেন, যারা গরুর বসন্তে আক্রান্ত হন, তারা আর গুটিবসন্তে সহজে আক্রান্ত হন না। এই ছোট্ট পর্যবেক্ষণই বদলে দিল মানব সভ্যতার ইতিহাস।
দীর্ঘ গবেষণা ও সাহসিকতার মাধ্যমে তিনি আবিষ্কার করলেন পৃথিবীর প্রথম ভ্যাকসিন। সেই থেকেই জন্ম নিল “Vaccination” শব্দটি। ল্যাটিন ভাষায় “Vacca” অর্থ গরু। গরুর বসন্ত থেকেই তৈরি হয়েছিল সেই আশার আলো।
আজ কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে তাঁর সেই আবিষ্কারের জন্য।
একজন মানুষের কৌতূহল, সাহস আর মানবতার গল্প আজও পৃথিবীকে পথ দেখায়।
এডওয়ার্ড জেনার শুধু একজন বিজ্ঞানী নন, তিনি মানবতার এক অমর রক্ষাকবচ।
১৭ মে, ১৭৪৯ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন মানব সভ্যতার এই মহান রক্ষাকর্তা, এডওয়ার্ড জেনার। তাঁর হাত ধরেই পৃথিবী প্রথম পেয়েছিল ভ্যাকসিনের আশীর্বাদ।
16/05/2026
অদম্য ইচ্ছাশক্তির গল্প: প্রথম নারী এভারেস্ট জয়ী জুনকো তাবেই
তোমরা কি জানো, পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বতশৃঙ্গ কোনটি? হ্যাঁ, মাউন্ট এভারেস্ট! যার উচ্চতা প্রায় ৮,৮৪৮ মিটার। এই বিশাল পাহাড়ের চূড়ায় ওঠা কত কঠিন, তা নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পারো? আজ তোমাদের এমন এক সাহসী মানুষের গল্প শোনাব, যিনি সব বাধা পেরিয়ে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখেছিলেন। তিনি হলেন জাপানের জুনকো তাবেই—পৃথিবীর বুকে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করা প্রথম নারী।
ছোটবেলার স্বপ্ন ও প্রতিবন্ধকতা
১৯৩৯ সালে জাপানের এক ছোট্ট শহরে জুনকোর জন্ম হয়। ছোটবেলায় তিনি বেশ দুর্বল আর রোগা ছিলেন। কিন্তু তাঁর মনের জোর ছিল আকাশছোঁয়া! মাত্র ১০ বছর বয়সে স্কুলের শিক্ষকের সাথে একটি পাহাড় ভ্রমণে গিয়েই তাঁর পাহাড়ে চড়ার নেশা তৈরি হয়।
সে যুগে জাপানে মেয়েদের ঘরের বাইরে গিয়ে এমন কঠিন কাজ করা সহজে মেনে নেওয়া হতো না। অনেকেই তাঁকে বলতেন, "পাহাড় চড়া মেয়েদের কাজ নয়, তুমি ঘরে বসে রান্নাবান্না শেখো।" কিন্তু জুনকো কারও কথায় কান দেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, পাহাড়ের কাছে ছেলে বা মেয়ের কোনো তফাত নেই।
সেই ঐতিহাসিক অভিযান: ১৯৭৫ সাল
১৯৭৫ সালে জুনকো তাবেই একদল জাপানি নারী পর্বতারোহীকে নিয়ে এভারেস্ট জয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৫ বছর।
হিমালয়ের বরফাবৃত পথ বেয়ে ওপরে ওঠা মোটেও সহজ ছিল না। পদে পদে ছিল তীব্র ঠান্ডা, অক্সিজেনের অভাব আর ভয়ানক বরফঝড়। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিপদটি আসে মে মাসের শুরুতে।
বরফ ধস এবং অলৌকিক বেঁচে ফেরা
জুনকো এবং তাঁর দল যখন প্রায় ৬,৩০০ মিটার উঁচুতে তাঁবু খাটিয়ে ঘুমাচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ এক ভয়ানক তুষারঝড় বা বরফ ধস (Avalanche) আছড়ে পড়ে তাদের ওপর। মুহূর্তের মধ্যে জুনকো বরফের নিচে চাপা পড়ে যান এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
সৌভাগ্যবশত, তাঁদের শেরপা গাইডরা দ্রুত বরফ খুঁড়ে জুনকোকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন। এই ঘটনার পর যে কেউ ভয়ে ভেঙে পড়তেন এবং ফিরে যেতেন। জুনকোও প্রচণ্ড চোট পেয়েছিলেন, সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারছিলেন না। কিন্তু তাঁর মনের ভেতরের আগুন নেভেনি। তিনি বললেন, "আমি ফিরে যাব না, আমি চূড়ায় পৌঁছাবই।"
ইতিহাস সৃষ্টি
টানা কয়েকদিন বিশ্রামের পর, পায়ে তীব্র ব্যথা নিয়েই জুনকো আবার ওপরে উঠতে শুরু করেন। অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—১৬ মে, ১৯৭৫ সাল।
চারিদিকে শুধু সাদা বরফ আর মাথার ওপর নীল আকাশ। সমস্ত বাধা, চোট আর সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে পায়ে দলিয়ে জুনকো তাবেই পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখলেন! প্রথম নারী হিসেবে ইতিহাস তৈরি হলো।
জুনকো তাবেই সারা জীবন খুব সাধারণ ও নম্র স্বভাবের মানুষ ছিলেন। তিনি বলতেন, "আমি কোনো বড় রেকর্ড করার জন্য পাহাড়ে উঠিনি, আমি পাহাড়কে ভালোবাসতাম বলেই উঠেছি।" ১৯৯২ সালের মধ্যে তিনি পৃথিবীর সাতটি মহাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গগুলোও (Seven Summits) জয় করে!
জুনকোর জীবন আমাদের শেখায় যে, শরীর দুর্বল হলেও যদি মনের ইচ্ছা আর ধৈর্য থাকে, তবে পৃথিবীর কোনো বাধাই তোমাকে আটকে রাখতে পারবে না। তোমরাও যদি জীবনে কোনো বড় স্বপ্ন দেখো, তবে শত বিপদেও হাল ছেড়ো না—সাফল্য আসবেই!
15/05/2026
🌸আজ মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী 🌸
(১৫ মে, ১৮১৭ — ১৯ জানুয়ারি, ১৯০৫)
জন্ম ও পরিবার
১৮১৭ সালের ১৫ই মে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর পিতা ছিলেন শিল্পপতি দ্বারকানাথ ঠাকুর এবং মাতা দিগম্বরী দেবী।
দ্বারকানাথকে "প্রিন্স" বলা হত তাঁর বিলাসবহুল জীবনযাপনের কারণে, এবং সেই সময় ঠাকুর পরিবারের সম্পদ ছিল অকল্পনীয়।
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক পরিবেশে বড় হওয়া দেবেন্দ্রনাথ সংস্কৃত, ফার্সি ও পাশ্চাত্য দর্শন অধ্যয়ন করেন।
📖
দেবেন্দ্রনাথের জীবনে সবচেয়ে বড় মোড় এসেছিল তাঁর ঠাকুরমার মৃত্যুশয্যার পাশে কাটানো একটি রাতে। সেই রাতে বিলাসিতার মাঝে বড় হওয়া তরুণ দেবেন্দ্রনাথ বুঝতে পারলেন — সম্পদ, প্রতিপত্তি, বৈভব — এ সবের মধ্যে প্রকৃত সুখ নেই। জীবনের গভীরে আছে অন্য কিছু। ঠাকুরমার মৃত্যুতে গভীরভাবে আঘাত পেয়ে তিনি ধর্ম ও জীবনের অর্থ নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়েন এবং উপনিষদসহ বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের নিবিড় পাঠ শুরু করেন।
তারপর একদিন তিনি খুঁজে পেলেন ঈশোপনিষদের একটি পাতা। সেই কয়েকটি লাইন তাঁর মনে আলোর মতো জ্বলে উঠল। শুরু হল এক নতুন জীবনের যাত্রা।
🏛️ তত্ত্ববোধিনী সভা — জ্ঞানের আলো ছড়ানোর স্বপ্ন
১৮৩৯ সালে পণ্ডিত রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের পরিচালনায় দেবেন্দ্রনাথ 'তত্ত্ববোধিনী সভা' প্রতিষ্ঠা করেন। এই সভার মাধ্যমে তিনি উপনিষদের জ্ঞান, যুক্তিবাদী চিন্তা এবং সংস্কারের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন।
১৮৪৩ সালের ২১শে ডিসেম্বর তিনি সভাটিকে ব্রাহ্মসমাজে রূপান্তরিত করেন — এই দিনটি আজও শান্তিনিকেতনের বার্ষিক পৌষমেলার মাধ্যমে স্মরণ করা হয়।
পরবর্তীকালে তিনি 'তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা' প্রকাশ করেন, যাতে ব্রাহ্মধর্মের যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা, স্ত্রীশিক্ষা, বিধবাবিবাহ এবং বহুবিবাহের বিরুদ্ধে প্রবন্ধ প্রকাশিত হত।
🌿 শান্তিনিকেতনের গল্প — শান্তির আশ্রম
দেবেন্দ্রনাথ প্রথম শান্তিনিকেতনে আসেন ১৮৬০-এর দশকে এবং এই স্থানটিকে ধ্যান ও আত্মানুসন্ধানের জন্য আদর্শ বলে মনে করেন।
১৮৬৩ সালে তিনি বীরভূমের ভুবনডাঙায় জমি কিনে একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন এবং তার নাম দেন "শান্তিনিকেতন" — অর্থাৎ শান্তির আবাস। সেখানে রঙিন কাচের তৈরি একটি ব্রহ্মমন্দির নির্মাণ করলেন, পুরনো বনাশ্রমের আদলে গাছ লাগালেন। ছাতিম গাছের ছায়ায় বসে তিনি নিজে ধ্যান করতেন এবং অন্যদেরও আমন্ত্রণ জানাতেন।
সেই ছোট্ট আশ্রমটিই একদিন তাঁর পুত্র রবীন্দ্রনাথের হাতে হয়ে উঠবে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়।
🏔️ পিতা-পুত্রের হিমালয় যাত্রার গল্প
১৮৭৩ সালে দেবেন্দ্রনাথ তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র রবীন্দ্রনাথকে সঙ্গে নিয়ে হিমালয় সফরে বের হন। পথে তাঁরা শান্তিনিকেতনেও কিছুদিন কাটান। এটিই ছিল রবীন্দ্রনাথের জীবনে প্রথমবার শহরের বাইরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসা।
হিমালয়ের নির্জন আবাসে দেবেন্দ্রনাথ পুত্রকে সংস্কৃত শেখালেন, শেখালেন মানুষ ও প্রকৃতি সম্পর্কে গভীর দর্শন। রবীন্দ্রনাথ নিজে লিখেছেন — পিতার সঙ্গে সেই যাত্রা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। পিতা তাঁকে শৃঙ্খলা শিখিয়েছেন, একইসঙ্গে শিখিয়েছেন স্বাধীনতা ও দায়িত্ববোধ।
⚖️ সমাজ-সংস্কারক দেবেন্দ্রনাথ
দেবেন্দ্রনাথ বিধবাবিবাহের পক্ষে ছিলেন, কিন্তু বালিকা-বিবাহ ও বহুবিবাহের তীব্র বিরোধী ছিলেন।
১৮৫১ সালে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি তার সম্পাদক হন এবং দরিদ্র কৃষকদের চৌকিদারি কর মওকুফের চেষ্টা করেন ও ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারতের স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়ে চিঠি পাঠান।
📚 মহর্ষি উপাধি
১৮৬৭ সালে রাধাকান্ত দেব তাঁকে 'জাতীয় ধর্মের রক্ষক' উপাধি প্রদান করেন এবং ব্রাহ্মসমাজ তাঁকে 'মহর্ষি' উপাধিতে ভূষিত করে। এই উপাধি স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবও স্বীকার করেছিলেন।
🕊️ জীবনাবসান
১৯০৫ সালের ১৯শে জানুয়ারি কলকাতায় ৮৭ বছর বয়সে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পেছনে রেখে গেলেন ধর্মীয় সংস্কার, যুক্তিবাদী চিন্তা ও সামাজিক পরিবর্তনের এক অনন্য উত্তরাধিকার।
🙏 আজকের এই বিশেষ দিনে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি।
14/05/2026
Narayanpur High School (Old Site)
📘 HS Examination 2026 Result
মোট পরীক্ষার্থী : ৮৯ জন
✅ উত্তীর্ণ : ৮১ জন
❌ অনুত্তীর্ণ : ৮ জন
🌟 প্রথম বিভাগ : ২৯ জন
🏆 সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্ত :
✨ Reshma Khatun — ৪১২
সফল সকল ছাত্রছাত্রীকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। 💐
তোমাদের এই সাফল্য বিদ্যালয়ের গর্ব, শিক্ষকদের পরিশ্রম এবং অভিভাবকদের আশীর্বাদের ফসল।
ভবিষ্যতের পথ আরও উজ্জ্বল হোক।
সাফল্যের এই যাত্রা অব্যাহত থাকুক। 🌼
13/05/2026
নারায়ণপুর হাই স্কুল (পুরাতন)-এর সকল ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের জানানো যাচ্ছে যে, পশ্চিমবঙ্গ স্কুল শিক্ষা দপ্তরের নির্দেশিকা অনুযায়ী গ্রীষ্মের ছুটি আগামী ৩১শে মে, ২০২৬ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিদ্যালয় পুনরায় আগামী ১লা জুন, ২০২৬ সোমবার থেকে স্বাভাবিক নিয়মে খুলবে ও পঠনপাঠন শুরু হবে।
12/05/2026
শুভ জন্মদিন, ছোটবেলার জাদুকর উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী! 🌸
ছোটবেলার কথা মনে পড়লেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গুপী-বাঘার কাণ্ডকারখানা, চালাক টুনটুনি আর বোকা বাঘের গল্প। আর যাঁর জাদুকরী কলম থেকে এই সব অমর চরিত্রের জন্ম, তিনি হলেন আমাদের সবার প্রিয় উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। আজ ১২ই মে, এই অসাধারণ মানুষটির জন্মদিন। নারায়ণপুর হাই স্কুল (পুরাতন)-পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে জানাই আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণাম ও অনেক ভালোবাসা।
বাঙালির শৈশব তাঁর গল্প ছাড়া যেন একেবারেই অসম্পূর্ণ! একবার ভাবুন তো সেই গল্পগুলোর কথা:
গানের পাগল দুই বন্ধু গুপী আর বাঘা, ভূতের রাজার বর পেয়ে যাদের জীবনের মোড়ই ঘুরে গেল!
কিংবা সেই ছোট্ট টুনটুনি পাখিটা, কী দারুণ বুদ্ধিতে সে রাজামশাইকে নাজেহাল করে ছেড়েছিল!
আর 'নরহরি দাস'? অন্ধকারে ছোট্ট ছাগলছানাকে দেখে বাঘ আর শিয়ালের সেই কাঁপুনি— "সিংহের মামা আমি নরহরি দাস..." আজও পড়লে হো হো করে হাসি পায়।
লাউয়ের খোলে ঢুকে বনের পশুদের বোকা বানিয়ে 'কুঁজো বুড়ির' সেই গড়িয়ে গড়িয়ে চলার গল্পটা তো ছোটদের অলটাইম ফেভারিট!
শুধু কি গল্প? ছোটদের জন্য তিনি নিয়ে এসেছিলেন 'সন্দেশ' পত্রিকা, যা এককথায় ছিল ছোটদের জন্য এক নতুন পৃথিবী! মজার ব্যাপার হলো, তিনি শুধু গল্পকার বা আঁকিয়ে ছিলেন না, ছিলেন দারুণ একজন বিজ্ঞানীও। বইয়ের পাতায় সুন্দর সুন্দর ছবি ছাপানোর যে আধুনিক কায়দা (হাফ-টোন ব্লক প্রিন্টিং), সেটা নিয়ে তাঁর কাজ সারা পৃথিবীতে সমাদৃত। তিনি একাই যেন ছিলেন একটা আস্ত প্রতিষ্ঠান!
আজকের এই বিশেষ দিনে, বাবা-মায়েদের কাছে আমাদের একটি ছোট্ট অনুরোধ— স্মার্টফোন আর কার্টুনের এই যুগেও বাচ্চাদের হাতে তুলে দিন উপেন্দ্রকিশোরের বইগুলো। আসুন, আমরা সবাই মিলে আজ অন্তত তাঁর লেখা একটা মজার গল্প পড়ে এই প্রিয় মানুষটিকে স্মরণ করি।
সবার দিনটি সুন্দর হোক! ✨
11/05/2026
আজ ১১ মে। উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে সাহসী গল্পকারদের একজন— সাদাত হাসান মান্টো-র ১১৪তম জন্মবার্ষিকী।
মান্টো কেবল একজন লেখক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক নিপুণ শৈল্যচিকিৎসক, যিনি তাঁর লেখনীর ছুরি দিয়ে সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভণ্ডামি, কুসংস্কার আর ক্ষতগুলোকে ব্যবচ্ছেদ করে দেখাতেন। দেশভাগ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জীবনের অন্ধকার অলিগলি— তাঁর কলম থেকে কোনো সত্যই বাদ পড়েনি।
"আমি সমাজের কলঙ্কগুলোকেই তুলে ধরি, যা আসলে সমাজেরই সৃষ্টি। যদি আমার লেখা আপনাদের কাছে অসহ্য মনে হয়, তবে বুঝে নিন যে সমাজেই বাস করছেন তা সহ্য করার ক্ষমতা আপনার নেই।"
— সাদাত হাসান মান্টো
তাঁর অমর সৃষ্টিগুলো— যেমন 'টোবা টেক সিং', 'খোল দো' কিংবা 'ঠাণ্ডা গোশত'— আজও আমাদের শিখিয়ে দেয় যে সাহিত্য কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং চেতনা জাগানিয়া হাতিয়ার হিসেবে কতটা শক্তিশালী হতে পারে।
এই মহান লেখকের জন্মদিনে আমাদের স্কুলের পক্ষ থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা। বর্তমান প্রজন্মের তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাঁর মতো সত্যনিষ্ঠা এবং সাহসিকতা ছড়িয়ে পড়ুক, এই আমাদের প্রত্যাশা।