12/06/2022
কতটা মেধা আর কতটা পরিশ্রম ?
আমরা সকলেই মোটামুটি উচ্চ মধ্যবিত্ত -মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলেময়ে। মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকে গড়পড়তা ভালো রেজাল্টই ব্যাগে পুরেছি আমরা । যতটুকু মনে পড়ে, ওই সময়গুলোতে ওপরের প্রশ্নটাই বাবা-মা-পাড়া-পড়শি-আত্মীয়-স্বজনদের-পড়শি-আত্মীয়-স্বজনদের-স্বজনদের মুখে কিম্বা টিভিতে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠতে দেখেছি, যে ছেলেটি বা মেয়েটির ভালো রেজাল্টের পেছনে মেধা কতটা ছিল আর তার সাথে কতটা পরিশ্রম জুড়ে ছিল? মানে যেন, বাবা মায়েদের একটা উদ্যোগ থাকতো প্রশ্নের উত্তরগুলো থেকে মেধা এবং পরিশ্রমের একরকম অনুপাত ঠরে-দরে আন্দাজ করে নিয়ে নিজের ছেলে-মেয়েদের ক্ষেত্রে মেধা বুঝে পরিশ্রমের দৈনন্দিন রুটিন সাজিয়ে দেওয়ার তাগিদ! তাই এই গল্পগুলো রূপকথা হতে পারেনা। রূপকথার গল্প কেমন হয় শুনবেন?
বিশ্ব শিশুশ্রম বিরোধী দিবস আজ।
এবার ভাবুন তো, যাদেরকে আমরা জন্মসূত্রে নিম্নমেধাসম্পন্ন ধরে নিই কারণ প্রত্যন্ত এলাকার পিছিয়ে পড়া অংশের অংশীদার তারা আর যাদের অধ্যবসায়ে পরিশ্রম আমাদের চোখেই পড়ে না, কারণ তারা, তাদের বন্ধুবান্ধব সকলেই শিশুশ্রমিক।
মনের ভেতরে একটা বিশ্বাস রয়েছে, সাফল্য বেপারটা একটা বানানো জিনিস। মেধা সকলের মধ্যেই আছে। নানা দিকে নানা ভাবে। সাফল্য সকলের বিচারে কিকরে মাপবো যদি সবাই সমান সুযোগই না পেলো। তাই যখন, এই মনে হওয়াগুলোর বাস্তব প্রমান পাই, তখন চোখ দয়ে আনন্দাশ্রু বয়ে আসে বইকি! বিশেষ করে আজকের কোভিড জনিত দুর্ভিক্ষসম অবস্থা, টানা স্কুল বন্ধ থাকা, অন্যদিকে সর্বগ্রাসী প্রাইভেট ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো , স্মার্টফোন - ট্যাবলেটের মধ্য দিয়ে প্রকট হয়ে ওঠা ডিজিটাল ডিভাইড - এসবের মধ্যেও যদি মাটি কামড়ে পড়ে থাকা স্বপ্নকে বাস্তব হতে দেখি, তখন চোখে জল কেন আসবে না বলুন দেখি!
হাওড়ার চেঙ্গাইল পৃথিবীর পাঠশালায় পড়তে আসা ছয় ছাত্রী জুন,সানিয়া, সালেমা, নাদিয়া, জেবা, আর্শি এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছিল। ওদের বাড়িতে স্মার্টফোন ছিল না , দামী টিউশনে পাঠানোর ক্ষমতাও ছিল না বাড়ির। লক ডাউনের প্রভাবে পড়াশুনাটাই মুলতুবি হওয়ার পথে ছিল। এদের কারোর বাবা জুট মিলের শ্রমিক তো কারোর বাবা জরির কাজ করেন । সেখানেও যখন তখন ছাঁটাই লেগেই রয়েছে। বাবা-মা পুরোটা পেরে ওঠেন না বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। ফলত বাবা মায়ের কাজে সাহায্য করেই দিনের বেশিরভাগ সময় বেরিয়ে যায় জুন, জেবা, আর্শিদের । এত কিছুর পরও কিন্তু নিজেদের স্বপ্ন ভোলেনি ওরা । ওদের প্রাপ্য নম্বর ৪২৬,৪৮৩,৪৪০,৪৮৫,৩৯৪ । ওরা হয়ত টিভিতে আসার মতো চমকে দেওয়া রেজাল্ট করতে পারেনি কিন্তু যেখান থেকে লড়াই করে ওরা বেরিয়েছে, সেটা কি নেহাতই চমকে দেওয়া নয়! প্রথম দিকে খানিক ভয় ও আত্মবিশ্বাস এর অভাব ভালোই ছিল । এখানে পৃথিবীর পাঠশালার মতো উদ্যোগ, যেখানে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা টানা দেড়বছরের বেশি লেগে রয়েছেন ওদের পেছনে, নিখরচায় পড়াচ্ছেন, উৎসাহ যুগিয়ে যাচ্ছেন তাদের অবদান তো আছে নিশ্চয়ই।
দক্ষিন ২৪ পরগনা জেলার পাথরপ্রতিমা ব্লক, সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রাম সুরেন্দ্রনগরের ছাত্র রাজা রয় মাধ্যমিকের পর সায়েন্স নিয়েছিল। অনেকে না করার পরও, এলাকার স্কুলে বিঞ্জানবিভাগ না থাকার পরও রাজা সপ্ন ছাড়েনি। বিঞ্জান বিভাগে কাকদ্বীপে একটি স্কুলে ভর্তি হয়েছিল সে। বাড়িতে কেবল মা, দুই বোন, এক ভাই। বাড়ি বলতে একখান ছিটেবেড়া। সেটাও বলা যায় না। আম্ফানে একবার সে বাড়ি ভেঙে মাটিতে মিশে যায়, তার পরের বছর ইয়াসে সবে বাঁশ-কঞ্চি-খড়-প্লাস্টিক ঢেকে দাঁড় করানো বাড়ি আবার ভেঙে পড়ে। রাজার কথা আমরা এই পেজে আগেও দিয়েছিলাম। সেই সময়ে পোস্টটি থেকে জানতে পেরে রাজাকে খানিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন আমাদের পরিচিত প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাক্তনী সিঞ্জিনি দি। কোনোভাবে রাজার জন্য একটা ছোট্টো স্মার্টফোনের বন্দোবস্ত করা যায়। ওনলাইনেই কোনো ভাবে ওকে অঙ্ক এবং স্ট্যাটিটিক্সটা দেখানোর চেষ্টা করত যাদবপুর বিশ্ববদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র দীপ নারায়ন এবং সন্মিত্র। কম্পিউটারটা দেখাত যাদবপুর প্রাক্তনী অরিজিত। কিন্তু ইন্টারনেটের দুর্বলতার জন্য বেশিরভাগ সময়ই তা ভালো করে হয়ে উঠত না।
রাজার বাবা থাকতেও নেই। একটা সংসারে বাবার যা দায়িত্ব থাকে, সেটা রাজাকেই নিতে হয় । কখনো কারো জমিতে দিন-রাত এক করে খেটে দেওয়া, কখনো কাকদ্বীপে এসে কয়েকদিনের জন্য ছোটো কিছু কাজ করে উপার্জন। রাজার মা অনেকটা দূরে একটি প্রাইমারি স্কুলে ঠিকা হিসেবে মিড-ডে মিলের রাঁধুনির কাজ শুরু করেছিলেন, সেটাও কোভিড আসতে ছাঁটাই। তবু এত কিছুর পরেও কে জানত, যে দুর্ভাগ্যের নির্নিমেষ অশনি স্বপ্নের জোরের কাছে এভাবে হেরে যায়! রাজার বিঞ্জানবিভাগে সাবজেক্ট নিয়েছিল -- গনিত, স্ট্যাটিস্টিক্স, ইকনমিক্স, কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশান , সেই সাথে ছিল বাংলা, ইংরাজি। রাজার প্রাপ্ত নম্বর ৫০০ তে ৪০২। অঙ্কে প্রাপ্ত নম্বর ৯০, কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশানে ৮২, ইংরাজিতে ৮৪। তবু ওর মন খারাপ, বাংলা এবং ইকনমিক্সে কম পেতে নম্বরটা কমে গেছে বলে! রাজার ইচ্ছে কোলকাতায় ভালো কলেজে পড়ার। রাজার মা যদিও চিন্তা করছেন, রাজা চলে এলে সংসার চলবে কিকরে আর কলেজে ভর্তি করতে এত টাকা লাগে, সেটাই বা জোগাড় হবে কোথা থেকে! সঞ্চয় বলে তো কখনোই কিছু ছিল না।
কিন্তু এরাই তো ভবিষ্যৎ। এদের মাধ্যেমেই তো 'জন-গন-মন' র নিদ্রিত ভারত জেগে ওঠে। হাত লাগান না এই নির্মানযজ্ঞে, যেমনভাবে পারেন তেমনভাবেই।
নইলে ভাবুন, এরকম একটা সময়, যখন শুঁয়োপোকারা কমে আসছে পৃথিবীতে, গুটি আর চোখে পড়ছে না কোথাও, আমরাও কিন্তু আর পিছন ফিরে তাকালাম না, জামাকাপড় আরো বেশি করে নষ্ট করতে শুরু করলাম। একদিন শেষ রেশমপোকা এবং শেষ গুটিপোকাটাও পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে।
এরপরে কিন্তু আপনি কখনো আর প্রজাপতি দেখতে পাবেন না।