20/04/2026
কলুষিত কৌশলে জনমত বেচাকেনা
প্রসূন ভট্টাচার্য
পারমানবিক শক্তি ভালো না মন্দ? ‘হ্যাঁ বা না’ দিয়ে এর কোনও উত্তর হয় না। ভালো মন্দের এই বিচারটা আসলে সমস্ত প্রযুক্তির ক্ষেত্রেই খাটে, কমিউনিকেশন প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও। যে কমিউনিকেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমাজের উন্নয়নকে দ্রুততর করে তোলা যায়, সেই কমিউনিকেশন প্রযুক্তির অপব্যবহার করে সমাজকে ধংসের দিকে ঠেলে দেওয়াও যায়। আধুনিক কমিউনিকেশন প্রযুক্তি এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে এর অপব্যবহার কোনও সশব্দ বিস্ফোরণ ছাড়াই, নিঃশব্দে, চুপচাপ সমাজের গণতন্ত্রকে ধংস করে দিতে পারে।
কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, একবিংশ শতাব্দীতে এসে সংসদীয় গণতন্ত্রের নির্বাচন ব্যবস্থা আর আগের মতো নেই। নির্বাচনে জয় পরাজয় নির্ধারণের ক্ষমতা জনগণের হাত থেকে দূরে চলে যেতে যেতে তা এখন এমনকি রাজনৈতিক দলগুলির কর্মকাণ্ডের ওপরেও পুরোপুরি নির্ভর করছে না। কোনও ভোট কুশলী সংস্থাকে কতো টাকার বিনিময়ে নিযুক্ত করে জনমতে কতখানি অদলবদল ঘটানো যাবে তার ওপরে নির্ভর করছে নির্বাচনের ফলাফল। মোটা টাকা দিলেই আধুনিক কমিউনিকেশন প্রযুক্তির ব্যবহার করে সংস্থাগুলি এনে দেবে কাঙ্ক্ষিত জয়! এরকম সংস্থাগুলিরই গালভরা নাম হলো ‘পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি’ বা প্যাক।
আই-প্যাক’এর কথা মনে পড়ে গেলো তো? ঠিকই, প্রশান্ত কিশোরের তৈরি এই সংস্থাটি ইন্ডিয়ান প্যাক। নানা নামে আরও অনেক সংস্থা কাজ করছে। আমেরিকা বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় বিশ্বকে পাবলিক রিলেশন শিখিয়েছে, বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে রাজনীতিতে ‘প্যাক’ শিখিয়েছে, লবিং শিখিয়েছে। সেগুলি আইনসম্মত ও নিয়ন্ত্রিত বলে গর্ব করে দাবিও করতো। একবিংশ শতাব্দীতে এসে দেখা যাচ্ছে সেগুলি থেকে এপস্টিন ফাইলের দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে। এলন মাস্ক ‘আমেরিকা-প্যাক’ গঠন করে যেভাবে ট্রাম্পকে জিতিয়েছেন, তার পরিণতি তো বিশ্ববাসী টের পাচ্ছেন।
একই কৌশল ব্যবহার করে আই-প্যাক এবং বিজেপি’র পোল স্ট্র্যাটেজিস্টরা ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ভারতে বিপদ আরও জোরালো, কারণ এখানে নাগরিকদের অধিকারবোধ ও সচেতনতা কম, আমেরিকার মতো ভোট কুশলীদের নিয়ন্ত্রণের আইনি কোনও ব্যবস্থাও এখানে নেই। ভারতে কোনও স্বচ্ছতা নেই। এখানে তো সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আগে ইলেক্টোরাল বন্ডের হিসাবই প্রকাশ্যে আসছিল না। এখনও কেউ জানে না আই-প্যাক’এর সঙ্গে চুক্তির পরে তৃণমূল তাদের কত টাকা দিয়ে কী কী কাজ করিয়েছে। ভোটে জিততে বিজেপি, তৃণমূলের মতো দলগুলি ভোট কুশলী সংস্থাগুলির পিছনে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করছে, কিন্তু নির্বাচন কমিশনের কাছে তাদের হিসাব দেওয়ার কোনও দায়ই নেই। এগুলি নাকি নির্বাচনী প্রচার খাতে খরচের মধ্যেই পড়ছে না! খরচের কোনও উর্ধ্বসীমার আওতায় আসছে না! ভোট পর্বে নগদ টাকা, মদ, উপঢৌকন বিলোনো ঠেকাতে নির্বাচন কমিশনের লোক দেখানো ব্যস্ততা । মশা ঠেকাতে গিয়ে ওদিকে হাতি গলে যাচ্ছে। টাকার জোরে নির্বাচনে জেতা এখন আক্ষরিক অর্থেই বাস্তবতা।
যারা কেবল চিরাচরিত ধারার রাজনীতির সঙ্গে পরিচিত তাঁরা হয়তো ভাবছেন, রাজনৈতিক দলগুলি তাদের নিজস্ব মতাদর্শের ভিত্তিতে নিজস্ব নেতাদের সামনে রেখে নিজস্ব কৌশলে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, জনগণ যাকে সমর্থন করে তার ভিত্তিতে কেউ জেতে কেউ হারে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এটা সেকেলে হয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলকে এখন পরিচালনা করছে কর্পোরেট স্ট্র্যাটেজিস্ট কোম্পানি। এটা নিছক কিছু টাকার বিনিময়ে কনসালটেন্সি বা পরামর্শদান নয়, এটা বিপুল টাকার বিনিময়ে ভোটে জেতানোর শর্তে রাজনৈতিক দল ও তাদের কাজকর্মকে সম্পূর্ণ পরিচালনার অধিকার। যাতে আধুনিক কমিউনিকেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে জনমতকে আগাম নিখুঁত পরিমাপ করে খুবই কম সময়ের মধ্যে তাতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটানো যায়।
সদ্ব্যবহার হলে এভাবে কমিউনিকেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমাজের উন্নয়নও ঘটানো যায়। বহু সামাজিক বা অর্থনৈতিক উন্নয়নে মানুষকে শামিল করতে কমিউনিকেশন প্রযুক্তির ব্যবহার করা যায়। যাকে ডেভেলপমেন্ট কমিউনিকেশন বা উন্নয়ন জ্ঞাপন বলা হয়। অনেক এনজিও এসব কাজ করছে। কিন্তু তাদের সফলতম কারোর মধ্যেও প্রশান্ত কিশোর কিংবা সুনীল কানুগোলুর মতো অর্থ যশ প্রতিপত্তি দেখেছেন?
বড় বড় কোম্পানিও তাদের পণ্য ও পরিষেবা বিক্রয়ের জন্য পেশাদারি দক্ষতা নিয়োগে একাজ করে বাণিজ্যিক মুনাফার লক্ষ্যে। বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করা, সেই তথ্যের বিশ্লেষণ করে বাজার ও ভোক্তাদের যথাসম্ভব বোঝা, সেই পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানির পণ্য ও পরিষেবা বিক্রি বৃদ্ধির নির্দিষ্ট স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণ করা এবং সেই স্ট্র্যাটেজির রূপায়ণের জন্য প্রচার ও অন্যান্য কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে ভোক্তাদের মনোভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানো। লক্ষ্য মুনাফা। কোম্পানিগুলির এই কাজের ওপরে কম বেশি নজরদারিও আছে, আইনি নিয়ন্ত্রণ বিধি আছে, ক্রেতা বা ভোক্তাদের সুরক্ষা ও সচেতনতার বন্দোবস্ত আছে।
কিন্তু এখন রাজনৈতিক দল বিপুল বিনিয়োগে সেই পদ্ধতি ব্যবহার করার মানে নিশ্চিতভাবেই তারাও ভোটের বাজারে মুনাফা করতে নেমেছে, জনসেবা করতে নয়। রাজনীতি তো ব্যবসা নয়, তাহলে ‘মুনাফা’ আসে কোথা থেকে? সোজা কথায়, ভোটে জিতে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর লুট দুর্নীতির মাধ্যমে।
প্রশান্ত কিশোরের উত্থানের শুরুর দিকে তাকিয়ে দেখুন। তাঁর সংস্থার নাম তখন আই-প্যাক ছিল না। ২০১৩ সালে সংস্থার নাম ছিল সিএজি, সিটিজেনস্ ফর অ্যাকাউন্টেবল গভার্নেন্স। দুষ্কর্ম আড়াল করতে একটা সুন্দর নাম দেওয়া এবং উদ্দেশ্য হিসাবে ঘোষণা করা যে নাগরিকদের তথ্য জানিয়ে সক্ষম ও সরব করে তোলা হবে যাতে তারা প্রশাসনকে সুশাসনে দায়বদ্ধ করে তুলতে পারে। কার্যক্ষেত্রে তারা কী করল? গুজরাট দাঙ্গায় কালিমালিপ্ত নরেন্দ্র মোদীর গায়ের কালি মুছে ২০১৪ সালে তাঁকে দেশের প্রধানমন্ত্রী করে তুললো। এটাই তাহলে দেশবাসীকে সচেতন ও সক্ষম করে তোলা? সুশাসন কায়েম করার নমুনা? নাকি কুৎসিত কদর্য ইমেজকে সাজিয়ে গুছিয়ে মিথ্যা প্রচারে সুন্দর করে দেখানোর সাফল্য?
আই-প্যাক সহ যে কোনও কোম্পানির ওয়েবসাইটে যান, তাদের কর্ণধারদের বক্তব্যগুলো পড়ুন ও শুনুন। তাদের মোদ্দা কথা, ‘আমাদের কাছে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও পরিকাঠামো রয়েছে যা ব্যবহার করে আমরা যে কোনও রাজনৈতিক নেতা ও সংগঠনের অনুকূলে জনমত সংগঠিত করে তুলতে পারি। কিন্তু এটা ভুল ধারণা যে আমরা ক্লায়েন্টদের নিছক পরামর্শদান করে থাকি। কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করার জন্য আমরাই স্ট্র্যাটেজি তৈরি করি ও তা অনুসরণ করে ক্লায়েন্টদের পদক্ষেপ নিতে বলি। সাফল্য শুধু আমাদের স্ট্র্যাটেজির ওপরেই নির্ভর করে না, তা রূপায়ণে আমাদের নির্দেশ ক্লায়েন্ট সঠিকভাবে পালন করছে কিনা তার ওপরেও নির্ভর করে।’
সিএজি থেকে নাম পরিবর্তন করে আই-প্যাক হওয়ার পরে এই সংস্থা বিজেপি থেকে কংগ্রেস, তৃণমূল, আপ, জেডি(ইউ), নানা দলকে ভোটে জেতানোর বরাত নিয়ে কাজ করেছে। এটা তো ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানের মধ্যে কোচ বদলের খেলা নয়। যদি গতকাল ‘ক’ দলকে হারাতে ‘খ’ দলের হয়ে প্রচার করে থাকি এবং তারপরে আজকে ‘খ’ দলকে হারাতে ‘ক’ দলের প্রচারের দায়িত্ব নিই, তাহলে গতকাল আর আজকের দুটো প্রচারই ‘সত্য’ হতে পারে না। কমিউনিকেশনের জ্ঞান এবং প্রযুক্তির ব্যবহারে পেশাদারি দক্ষতা সহ নিছক মিথ্যা প্রচার। ভোট কুশলী সংস্থার পদ্ধতিতে এখানে দূষণ অনিবার্য। জনস্বার্থবাহী, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার সম্প্রসারণের রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে তার থেকে ‘মুনাফা’ লোটা সম্ভব নয়। ‘মুনাফা’ লোটা রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা করে ভোট কুশলী সংস্থার লুটের ভাগীদারী নিশ্চিত করতে গেলে জনসাধারণ, বিশেষত শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব নয়।
ভোট কুশলী সংস্থার সাফল্য এবং সুনামও এখানেই। সংস্থাগুলির উঁচু পদে দায়িত্ব পালন করে বেরিয়ে আসার পরে অনেকেই ফাঁস করে দিচ্ছেন ক্লায়েন্ট রাজনৈতিক দলকে জেতাতে দেদার নীতিহীন ও অপরাধজনক কাজের নমুনা। শাসকদলের হয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে অবাধে সরকারি ফাইল থেকে ডেটা চুরি, সরকারি প্রশাসনকে দিয়ে বৈষম্যমূলক কাজ করানো, ঘুষ দেওয়া, পুলিশকে দিয়ে বেআইনি কাজ করানো, ফোনে আড়িপাতা এসব তো আছেই। এমনকি সাম্প্রদায়িক বা জাতিগত বিরোধ লাগানোর প্রচার করতেও এরা কসুর করে না। মার্কসের সেই কথা স্মরণ করুন, একশো শতাংশ মুনাফার জন্য পুঁজি মানুষ খুন করতেও পিছপা হয় না। ভোট কুশলী সংস্থা আর তার ক্লায়েন্ট রাজনৈতিক দলের কাছে ভোটে জেতা আর মুনাফা তো সমার্থক। তাদের হাতে কমিউনিকেশন প্রযুক্তির ব্যবহার কলুষিত হবে না?
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মমতা ব্যানার্জি নিজেই তৃণমূল দলকে আই-প্যাকের হাতে তুলে দিয়েছেন। তৃণমূল এখন একটি কর্পোরেট রাজনৈতিক কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে যার প্রতিটি পদক্ষেপ নির্ধারিত হয় দলীয় বৃত্তের বাইরে, আই-প্যাকের অফিসে। এমনকি সংবিধান বহির্ভূতভাবে প্রশাসনিক অফিসের ভিতরেও কাজ করছে আই-প্যাকের হাত। মমতা ব্যানার্জি ও তাঁর ভাইপো আই-প্যাক’কে যে এক্তিয়ার দিয়েছেন তাতে তৃণমূলের বাকি সমস্ত নেতা থেকে জনপ্রতিনিধি এমনকি মন্ত্রীরাও আসলে ঐ কোম্পানির হুকুম পালনের ভৃত্যে পরিণত হয়েছেন। আই-প্যাকের ভৃত্য হলে যদি ভোটে জেতা যায়, যদি কোটি কোটি টাকা কামানো যায় তাহলে তাতে আপত্তির কি আছে? একই কৌশলে যদি বিজেপি’র জনপ্রতিনিধি হয়ে টাকা কামানো যায়, তাহলে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সংবিধান বাঁচলো কি মরলো তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় লাভ কী?
প্রযুক্তির অপব্যবহারে রাজনীতিকে এভাবে কলুষিত করতে পারলে আটকানো যাবে বামপন্থীদের। কারণ তাদের রাজনীতিতে আগে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থরক্ষার মতাদর্শ, তারপরে সেটার অনুসারী কৌশল। প্রশান্ত কিশোর, অমিত মালব্য, কিংবা সুনীল কানুগোলুদের ভৃত্য হয়ে জনমতে সুইং ঘটানোর আশায় তারা মন্দির নির্মাণ কিংবা মসজিদ নির্মাণের কৌশলে শামিল হতে পারে না। কিন্তু সমস্যাটা তো আসলে রাজনৈতিক দল বা নেতাদের নয়, সমস্যাটা আমাদের মতো সাধারণ জনগণের। ভোটকুশলীদের রাজনীতি শেষপর্যন্ত আমাদেরকে প্রতারণা করারই ব্যবসা। ভোটের আঙ্গুল নিয়ন্ত্রণ করুক আমাদের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার প্রয়োজনগুলো। সেটাকে কোনও ‘প্যাক’ প্রলোভনে নিয়ন্ত্রণ করছে না তো?
15/04/2026
14/04/2026
03/04/2026
22/03/2026