03/05/2026
সম্প্রতি একাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এ
Tannistha Biswas এর আমন্ত্রণে একটা নাটক দেখলাম। প্রায় পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে।
"এবার খলনায়কের পালা" কৌশিক করের নির্মাণ।
_________________________________
রাজনৈতিক নাটক vs রাজনীতির নাটক
--------------------------------------------------------
মঞ্চের বাইরেও যে অভিনয় চলে সেই
রাজনীতি আর নাটকের মধ্যে সম্পর্কটা বহু পুরনো। অ্যারিস্টটল তাঁর Poetics-এ বলেছিলেন, নাটক হলো মানবজীবনের অনুকরণ — আর রাজনীতি? সেটাও কি মানবজীবনের এক বিশেষ ধরনের অনুকরণ নয়? ক্ষমতার মঞ্চে প্রতিদিন যা ঘটে, তার একটা বড়ো অংশই আসলে সুচিন্তিত পরিকল্পনায় সাজানো "Political Theatre" — অর্থাৎ রাজনৈতিক নাটক। (রাজনীতির নাটক!)
Political Theatre কী?
সহজ কথায়, Political Theatre হলো এমন কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা বক্তব্য, যার মূল উদ্দেশ্য বাস্তব পরিবর্তন নয় — বরং জনমানসে একটি নির্দিষ্ট ধারণা বা আবেগ তৈরি করা। এটি হতে পারে একটি ভাষণ, একটি সংসদীয় বিতর্ক, একটি প্রেস কনফারেন্স, এমনকি একটি বিপ্লব ঘোষণা — যেখানে দর্শকই মূল লক্ষ্য, কিন্তু সেখানে কোনো সমাধান নেই। থাকে কিছু আশ্বাস বা কিছু আশার বাণী।
জার্মান নাট্যকার Bertolt Brecht তাঁর Epic Theatre-এর ধারণায় বলেছিলেন, নাটকের কাজ শুধু আবেগ জাগানো নয় — দর্শককে ভাবাতে হবে। তিনি চেয়েছিলেন মানুষ মঞ্চ দেখে জেগে উঠুক। কিন্তু রাজনীতিবিদরা ঠিক উল্টোটা করেন — তাঁরা চান দর্শক ভাবুক কম, দেখুক বেশী - শুনুন বেশী।
আধুনিক রাজনীতিতে "নাটক" :
আজকের রাজনীতিতে Political Theatre- এর রূপটা অনেক বেশি পরিশীলিত। কয়েকটি চেনা উদাহরণ —
১. সংকট তৈরি ও সমাধানের নাটক: একটি সমস্যাকে ইচ্ছাকৃতভাবে বড়ো করে দেখানো। তারপর তার "সমাধানকারী" হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন। দর্শক হাততালি দেয়, কারণ সে ভাবেই না সংকটটা কৃত্রিম ছিল।
২. প্রতীকী পদক্ষেপ: যে সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রভাব নগণ্য, কিন্তু প্রতীকী মূল্য বিশাল — এটি Political Theatre-র সবচেয়ে বড়ো চালিকা শক্তি।
৩. শত্রু নির্মাণ (Enemy Construction): জনগণের ক্ষোভকে একটি নির্দিষ্ট "শত্রু"র দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া। শেক্সপিয়ারের Julius Caesar-এ Antony ঠিক এটাই করেছিলেন — একটি ভাষণ দিয়ে জনতাকে দাঙ্গায় নামিয়েছিলেন।
৪. মিডিয়া পারফরম্যান্স: আধুনিক রাজনীতিবিদ জানেন, ক্যামেরার সামনে সঠিক মুহূর্তে সঠিক আবেগ দেখানোটাই আসল দক্ষতা।
দর্শকের দায় :
নোবেলজয়ী নাট্যকার Dario Fo (Accidental Death of an Anarchist) বলেছিলেন, ক্ষমতা তখনই টিকে থাকে যখন জনগণ নাটকটা বিশ্বাস করে (রাজনীতি)! সুতরাং প্রশ্ন হলো — আমরা দর্শক হিসেবে কতটা সজাগ?
রাজনৈতিক নাটকের সবচেয়ে বড়ো বিপদ এখানেই। মঞ্চের নাটকে আমরা জানি এটা কাল্পনিক। কিন্তু রাজনীতির মঞ্চে সবাই প্রায়ই ভুলে যায় — এটাও একটা performance। সঠিক না হলে বিদায় অবসম্ভাবি।
এবং এখানে পর্দা কখনো পড়ে না। অভিনয় চলতেই থাকে।
________________________________
এই প্রসঙ্গে একটা নাটকের কথা মনে পড়লো। মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের "নোনা জল"। বিষয় প্রায় একই। উপস্থাপনা আলাদা। সে যাইহোক,
কৌশিক করের "এবার খলনায়কের পালা" বর্তমান প্রেক্ষাপটে সব অনাচারের পাশে আমাদের স্থানু অবস্থানের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আমরা দৌড়োচ্ছি, অথচ এক ইঞ্চিও এগোচ্ছি না! Anti-establishment বা প্রতিষ্ঠান-বিরোধী কত কথাই না আমরা বলে যাই — কিন্তু বাস্তব জীবনে তার প্রকাশ কোথায়? পুঁজির প্রবল তাণ্ডবে বৈশিষ্ট্যহীন হতে হতে মানুষ তার আত্মপরিচয়টাই ভুলে যাবে? নৈতিকতার কোনো স্থান থাকবে না জীবনে? বিত্তবান, ক্ষমতাবানের ছোবল থেকে আর কতদিন সাধারণ মানুষ নিজেকে বাঁচাতে পারবে? প্রশ্ন অনেক। "এবার খলনায়কের পালা" এই প্রশ্নগুলো নতুন করে ভাবিয়ে তুললো।
Political Theatre —
"এবার খলনায়কের পালা" কৌশিক করের নির্মাণ, সেই অর্থেই একটি সত্যিকারের Political Theatre। দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা, বড়ো প্রোমোটার, উঁচু বিল্ডিং - রেড - গ্রীন - ব্লু জোন, 'দখলের চেষ্টা' — আর তার ঠিক পাশে বস্তির সাধারণ মানুষের অসহায় দিনযাপন। নেশা, মারপিট, চুরি, টাকার লোভে খুন — এই নির্মম চিত্রপটে নাটকটি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত উপস্থাপন করেছে Opera-ধর্মী আঙ্গিকে, নাচ ও গানের সমন্বয়ে এবং সুনিপুন আলোর ব্যাবহারে। এই contrast-ই নাটকের সবচেয়ে বড়ো শক্তি — যন্ত্রণার কথা বলা হচ্ছে সুরে, ক্রোধের কথা বলা হচ্ছে নৃত্যে।
এই ধারার নাটক বাংলায় নতুন নয়। বিজন ভট্টাচার্যের "নবান্ন" (১৯৪৪) দুর্ভিক্ষের যন্ত্রণাকে মঞ্চে এনেছিল এমন তীব্রতায় যা দর্শককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। উৎপল দত্তের "টিনের তলোয়ার" সরাসরি রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করেছিল। মারাঠি নাট্যকার বিজয় তেন্ডুলকরের "Ghashiram Kotwal"(ঘাসিরাম কোতোয়াল) ক্ষমতার দুর্নীতিকে এতটাই নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছিল যে সরকার নাটকটি নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল। আর বিশ্বমঞ্চে Bertolt Brecht-এর Threepenny Opera — যেখানে অপরাধ ও রাষ্ট্রক্ষমতার মধ্যে ফারাকটা যে কতটা কম, সেটাই ছিল মূল বক্তব্য। "এবার খলনায়কের পালা"-র Opera আঙ্গিকটি সেই Brecht-এর উত্তরাধিকারকেই মনে করিয়ে দেয়।
কিন্তু Political Theatre-র সবচেয়ে বড়ো বিপদ হলো — সে কখনো "আরামদায়ক" নয়।
আবার বলি - নোবেলজয়ী নাট্যকার Dario Fo বলেছিলেন, ক্ষমতা তখনই টিকে থাকে যখন জনগণ নাটকটা বিশ্বাস করে — অর্থাৎ, ক্ষমতার নিজের সাজানো নাটকটা। সেই মিথ্যা নাটকের বিরুদ্ধে সত্যিকারের নাটককেই দাঁড়াতে হয়।
"এবার খলনায়কের পালা" সেই কাজটাই করেছে। কৌশিক কর (চরিত্রের নাম: কন্ডোম) এবং তন্নিষ্ঠা বিশ্বাস (চরিত্রের নাম: 'শাক'চুন্নি) — এই নামকরণেই বোঝা যায় নির্মাতা কতটা নির্ভয়ে ও নির্মম ভাবে ব্যবস্থাটাকে বিদ্রূপ করতে চেয়েছেন। অভিনয়ে তাঁরা দুজনেই উপভোগ্য — বহু চরিত্রের ভিড়েও স্বতন্ত্র।
তবে একটি কথা না বললেই নয়। বিজন ভট্টাচার্যের "নবান্ন", শম্ভু মিত্রের "চাঁদ বনিকের পালা", বা Shakespeare-এর "হ্যামলেট" — এই দীর্ঘ নাটকগুলো দর্শককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বেঁধে রাখে তার অসাধারণ বাঁধুনি ও সাহিত্যরসের কারণে। তিন ঘণ্টার নাটক দীর্ঘ নয়, যদি প্রতিটি মুহূর্ত অপরিহার্য মনে হয়। "এবার খলনায়কের পালা"-র নির্মাতাদের কাছে আবেদন — এই শক্তিশালী বিষয়বস্তুটিকে আরও শানিত করুন।
আমি নিজে অতিদীর্ঘ নাটক দেখে অভ্যস্ত। উল্লেখযোগ্য - কসবা নাট্য অর্ঘ্য-র "উরুভঙ্গম" (৬ ঘন্টার নাটক, কতবার দেখেছি ঠিক মনে নেই। বারে বারে দেখতে ইচ্ছা করে এখনো।) আবার অনু নাটক দেখেও অভিভূত হয়েছি (ইছাপুর স্মৃতি নাট্য সংঘ-র "দগ্ধ ফিনিক্স")। অর্থাৎ নাটকের পুরো সময়টা যেনো মানুষকে বসিয়ে রাখতে কোনো অসুবিধা না হয়। তবেই তার সার্থকতা। সংলাপের উপর সঙ্গীত নয়, সঙ্গীত ও সংলাপ পাশাপাশি — সমান মর্যাদায়।
কারণ, এই নাটক যে কথা বলতে চাইছে, সেই কথা শোনা দরকার। সম্পূর্ণভাবে।
নাটকের জয় হোক। "শূন্য" নামের দলটি "শতায়ু" পেরিয়ে এগিয়ে চলুক।
নিচের দামী সিটের বদলে ওপরে ব্যালকনিতে গিয়ে বসে নাটকটা দেখলাম তার অপেরা ধর্মী ক্যানভাসের সম্পূর্ণ স্বাদ নেবার জন্য। তাই জুম্ করেও অতো দূর থেকে মোবাইলে ছবি ভালো ওঠেনি। অগত্যা তিনটে ছবি ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করতে হোলো।
[কিছু ভুল লিখে থাকলে মার্জনা প্রার্থী]
🖋️ Parthapratim Das
(পার্থপ্রতিম দাস)