19/05/2024
স্মাইলিং বুদ্ধা
লেখনীতে – অংকুর মাইতি
আজ 18ই মে 2024 – ঠিক তিন দিন পরে বুদ্ধ পূর্ণিমা। কিন্তু আজ থেকে ঠিক 50 বছর পূর্বে এই 18ই মে 1974 দিনটি ছিল বুদ্ধ পূর্ণিমা। ঐ দিন বিজ্ঞান তথা সামরিক ক্ষেত্রে ভারত চমকে দিয়েছিল সারা পৃথিবীকে-অপারেশন ‘স্মাইলিং বুদ্ধ’ এর মাধ্যমে। ঐ দিন পোখরান টেস্ট রেঞ্জে ঘটানো হয়েছিল ভারতের প্রথম পারমাণবিক বিস্ফোরণ। প্রকল্পটি এতটাই গোপনীয় ছিল যে পৃথিবীর অন্যান্য দেশ তো দূরের কথা এই প্রকল্পের সাথে যুক্ত 75 জন আসামরিক বিজ্ঞানীর মধ্যে অধিকাংশই জানত না সত্যি কি ঘটতে চলেছে।
প্রকল্পটির প্রধান ছিলেন ড: রাজা রামান্না। এছাড়াও অন্যতম যারা ছিলেন – ড: পি কে আইয়েঙ্গার, ড: রাজাগোপাল চিদাম্বরম, ড: নাগাপত্তিনাম লম্বাশিব বেঙ্কটেশন, ড: আব্দুল কালাম, ড: ওয়ামান দত্তাত্রেয় পটবর্ধন। পি কে আইয়েঙ্গার ডিভাইসটির মূল নকশাটি তৈরি করেছিলেন। সমগ্র প্রকল্প টির তত্ত্বাবধানে ছিলেন ড: হোমি এন সেতনা।
প্রকল্পের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য প্রকল্পটি কে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। এই ডিভাইসটির মূল দুইটি অংশ- ইমপ্লোশন সিস্টেমটি তৈরি হয়েছিল চণ্ডীগড়ের DRDO -এর টার্মিনাল ব্যালিস্টিক রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে এবং ডিটোনেশন সিস্টেমটি তৈরি হয়েছিল পুনের DRDO এর হাই এনার্জি মেটেরিয়াল রিসার্চ সেন্টার থেকে। সমস্ত কিছু এক সঙ্গে যুক্ত করে সম্পূর্ণ ডিভাইসটি তৈরির মূল দায়িত্ব ছিল মুম্বাই এর ভাবা অ্যাটোমিক রিসার্চ সেন্টারের যার কর্ণধার ছিলেন ড: রাজা রামান্না। এই অপারেশনের জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী পোখরানে যে সাইটটি নির্মাণ করেছিলেন তার কোড নাম ছিল হ্যাপি কৃষ্ণা।
সমস্ত ডিভাইসটি একটি ষড়ভুজাকৃতি ধাতব ট্রাইপডের মধ্যে মাউন্ট করা হয়েছিল। ডিভাইসটির ব্যাস ছিল 1.25 মিটার এবং ভর ছিল 1400কেজি। ডিভাইসটি ছিল ইম্প্রোশন টাইপের যা ছিল 1945 সালে জাপানের নাগাশাকিতে বিস্ফোরিত ফ্যাট-ম্যান এর সমগোত্রীয়। নিউক্লিয়ার ফিশন তত্ত্বটি ছিল এই ডিভাইসটির মূল কার্য প্রণালি। এই তত্ত্ব অনুসারে একটি ভারি তেজস্ক্রিয় পরমাণুকে নিউট্রন কণা দিয়ে আঘাত করলে ভারি নিউক্লিয়াসটি দুই বা ততোধিক অপেক্ষাকৃত হাল্কা অংশে বিভক্ত হয় এবং সঙ্গে তিনটি করে নিউট্রন কণিকা তৈরি করে যেগুলো পরবর্তী তিনটি ভারি তেজস্ক্রিয় পরমাণুকে ভাঙ্গতে পারে। এই ভাবে বিক্রিয়াটি গুনোত্তর প্রগতিতে বৃদ্ধি পেয়ে অনিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খল বিক্রিয়ার রূপ নেয়। প্রতিটি ভাঙ্গনের সময় কিছু পরিমাণ ভর আইনস্টাইনের E=mc² সূত্রানুসারে শক্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং এক সময় প্রচুর পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করে বিস্ফোরিত হয়। এই প্রকল্পের জন্য মূল তেজস্ক্রিয় পদার্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল প্লুটোনিয়াম এবং নিউট্রন ইনিশিয়েটর হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল পোলোনিয়াম-বেরিলিয়াম। এই পোলোনিয়াম-বেরিলিয়াম ইনিশিয়েটর তৈরির কোড নাম ছিল ফ্লাওয়ার। এই বোমাটির এক্সপ্লোসিভ ইয়েল্ডের পরিমান ছিল 8 কিলোটন।
18ই মে 1974,সকাল 8:05 মিনিট, এই মহেন্দ্রক্ষণে মাটির 107মিটার গভীরে ভারতের থর মরুভূমিতে বিস্ফোরিত হল ভারতের পরীক্ষামূলক প্রথম পারমাণবিক বোমা। তৈরি হল ইতিহাস আমেরিকা, সোভিয়েত রাশিয়া ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং চিনের সঙ্গে ষষ্ঠ দেশ হিসেবে একই সাথে উচ্চারিত হবে ভারতের নাম পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে। প্রকল্পটির প্রধান রামান্না এর ভাষায় বলা যায় 'বুদ্ধ হেসেছেন'।
___________