20/08/2026
পিএম শ্রী স্কুল (PM SHRI Schools) নির্দেশিকা: একটি সম্পূর্ণ ও বিস্তারিত পর্যালোচনা
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ (NEP 2020)-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং দেশের স্কুল শিক্ষাব্যবস্থাকে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগ করে তোলার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় 'পিএম শ্রী স্কুল' (PM SHRI Schools) নামক এই রূপরেখাটি প্রণয়ন করেছে। এই প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো সমগ্র ভারতে ১৫,০০০-এর বেশি আদর্শ বা exemplar স্কুল গড়ে তোলা, যা তাদের নিজ নিজ অঞ্চলের অন্যান্য স্কুলগুলোকে পথপ্রদর্শন ও সহায়তা করবে।
পিএম শ্রী স্কুলের গাইডলাইনের সম্পূর্ণ ও বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. রূপকল্প ও মিশন (Vision and Mission)
* রূপকল্প: এমন আজীবন শিক্ষানবিশু (lifelong learners) তৈরি করা, যাদের মধ্যে নতুন কিছু শেখার আগ্রহ থাকবে এবং যারা জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-এর ভিষন অনুযায়ী একটি সমতাভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুত্ববাদী সমাজ গঠনে অবদান রাখতে পারবে।
* মিশন: দেশের ১৪,৫০০-এর বেশি স্কুলকে এমনভাবে রূপান্তরিত করা যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী স্বাগত বোধ করবে, একটি নিরাপদ ও উদ্দীপনামূলক পরিবেশ পাবে এবং উচ্চমানের ভৌত অবকাঠামো ও সম্পদের সুব্যবস্থা থাকবে।
২. পিএম শ্রী স্কুলের মূল গুণগত মানদণ্ড (Quality Assurance)
* জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-এর বিভিন্ন নীতির সফল প্রদর্শন।
* শিক্ষার্থী এবং দিব্যাঙ্গ (বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন) শিশুদের ভর্তির সঠিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থা।
* প্রতিটি শিশুর শিখন বা লার্নিং আউটকাম (Learning Outcomes) বৃদ্ধি করা।
* মাধ্যমিক স্তরের প্রতিটি শিক্ষার্থী যাতে কমপক্ষে একটি করে বৃত্তিমূলক বা স্কিল নিয়ে পাস করে, তা নিশ্চিত করা।
* খেলার মাঠ, শিল্পকলা এবং আইসিটি (ICT) সুবিধার প্রাপ্যতা।
* পরিবেশবান্ধব ও টেকসই 'গ্রিন স্কুল' হিসেবে গড়ে তোলা।
* উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় উদ্যোক্তা ব্যবস্থার সাথে সংযোগ স্থাপন।
* মানসিক সুস্বাস্থ্য এবং ক্যারিয়ার কাউন্সিলিংয়ের সুযোগ।
* ভারতীয় জ্ঞান ঐতিহ্য, মূল্যবোধ এবং 'এক ভারত শ্রেষ্ঠ ভারত' ভাবনার বিকাশ।
৩. ছয়টি মূল স্তম্ভ (The Six Pillars)
পিএম শ্রী স্কুলের পুরো কাঠামোটি ৬টি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা এনইপি ২০২০-এর বিভিন্ন অধ্যায় থেকে গৃহੀত:
* কারিকুলাম, পেডাগজি এবং অ্যাসেসমেন্ট (অধ্যায় ১, ২, ৪ এবং ২৪)
* অ্যাক্সেস এবং অবকাঠামো (অধ্যায় ৩ এবং ৭)
* মানবসম্পদ এবং স্কুল নেতৃত্ব (অধ্যায় ৫ এবং ১৫)
* অন্তর্ভুক্তিমূলক চর্চা এবং লিঙ্গ সমতা (অধ্যায় ৬)
* ব্যবস্থাপনা, পর্যবেক্ষণ এবং শাসনব্যবস্থা (অধ্যায় ৮)
* উপভোক্তার সন্তুষ্টি (অধ্যায় ৮)
৪. স্কুল নির্বাচন পদ্ধতি (Selection Methodology)
স্কুল নির্বাচন প্রক্রিয়াটি একটি প্রতিযোগিতামূলক 'চ্যালেঞ্জ মোড'-এর মাধ্যমে তিন ধাপে সম্পন্ন হয়:
* স্টেজ ১: কেন্দ্র ও রাজ্য/কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর।
* স্টেজ ২: UDISE+ ডেটার ভিত্তিতে ন্যূনতম বেঞ্চমার্ক পূরণকারী যোগ্য স্কুলগুলোর একটি পুল তৈরি করা। এর ন্যূনতম শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে পাকা ও নিরাপদ ভবন, র্যাম্প বা প্রতিবন্ধী-বান্ধব যাতায়াত, বিদ্যুৎ সংযোগ, পৃথক শৌচাগার, নিরাপদ পানীয় জল এবং খেলার মাঠ বা লাইব্রেরি কর্নার।
* স্টেজ ৩: শর্টলিস্ট করা স্কুলগুলো অনলাইন পোর্টালে আবেদন করে। এক্ষেত্রে শহরাঞ্চলের স্কুলগুলোকে ন্যূনতম ৭০% এবং গ্রামাঞ্চলের স্কুলগুলোকে ৬০% নম্বর পেতে হয়। শারীরিক পরিদর্শনের মাধ্যমে যাচাইাইবাছাই শেষে চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করা হয়।
৫. কারিকুলাম, পেডাগজি এবং মূল্যায়ন (Chapter 1)
* নতুন পেডাগজিক্যাল কাঠামো: ৫+৩+৩+৪ শিক্ষাক্রম কাঠামো অনুসরণ করা হয়। মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা (critical thinking) এবং একবিংশ শতাব্দীর দক্ষতার ওপর জোর দেওয়া হয়।
* উদ্ভাবনী পেডাগজি: খেলাধুলাভিত্তিক (sports-integrated), শিল্পকলাভিত্তিক (art-integrated), কথ্য বা গল্পভিত্তিক (story-telling) এবং খেলনাভিত্তিক (toy-based) শিখন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
* মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা: প্রাথমিক স্তরে (বিশেষ করে গ্রেড ৫ পর্যন্ত এবং পরবর্তীতে গ্রেড ৮ পর্যন্ত) মাতৃভাষা বা স্থানীয় ভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
* এফএলএন (FLN - NIPUN Bharat): তৃতীয় শ্রেণির মধ্যে প্রতিটি শিশুর মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞান (Foundational Literacy and Numeracy) অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
* মূল্যায়ন পদ্ধতি: শুধুমাত্র Summative বা সমাপনী পরীক্ষা নয়, বরং 'Assessment for, of, and as learning' নীতি অনুসরণ করা হয়। শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের জন্য 'হোলিস্টিক প্রোগ্রেস কার্ড' (HPC) বা ৩৬০-ডিগ্রি মাল্টিডাইমেনশনাল রিপোর্ট কার্ড ব্যবহার করা হয়।
৬. অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা (Chapter 2)
* ভৌত অবকাঠামো: ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (NBC) মেনে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসযুক্ত শ্রেণিকক্ষ, মাল্টিমিডিয়া বা স্মার্ট ক্লাসরুম এবং কম্পাউন্ড ওয়াল থাকা আবশ্যক।
* স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন: ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক শৌচাগার, সাবান ও হাত ধোয়ার সুবিধা, এবং মেয়েদের শৌচাগারে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন ও ইনসিনারেটর নিশ্চিত করা হয়।
* ল্যাবরেটরি: পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, গণিত, ভাষা এবং আইসিটি ল্যাব বা অটল টিংকারিং ল্যাবের ব্যবস্থা থাকে।
* গ্রিন স্কুল উদ্যোগ: সোলার প্যানেল স্থাপন, এলইডি লাইটের ব্যবহার, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং (বৃষ্টির জল সংরক্ষণ), বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জৈব কিচেন গার্ডেন তৈরিতে জোর দেওয়া হয়।
৭. মানবসম্পদ ও স্কুল নেতৃত্ব (Chapter 3)
* শিক্ষক প্রশিক্ষণ: প্রতিটি শিক্ষককে পেশাগত উন্নয়নের জন্য প্রতি বছর অন্তত ৫০ ঘণ্টার সিপিডি (Continuous Professional Development) কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে হয়।
* শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত (PTR): RTE আইন অনুযায়ী সঠিক পিটিআর বজায় রাখা এবং নিয়মিত শিক্ষক মূল্যায়ন (PINDICS) নিশ্চিত করা হয়।
* নেতৃত্ব: প্রধান শিক্ষকদের পেডাগজিক্যাল ও সহযোগিতাপূর্ণ নেতৃত্ব (Pedagogical and Collaborative Leadership) বিকাশের জন্য বিশেষ ওয়ার্কশপের ব্যবস্থা থাকে।
৮. অন্তর্ভুক্তিমূলক চর্চা ও লিঙ্গ সমতা (Chapter 4)
* লিঙ্গ সংবেদনশীলতা: শ্রেণিকক্ষে জেন্ডার-নিউট্রাল ভাষা ব্যবহার এবং ছেলে-মেয়েদের মধ্যে কোনো ধরনের বৈষম্যমূলক স্টেরিওটাইপ না রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়।
* বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু (CwSN): প্রাথমিক শনাক্তকরণের জন্য 'প্রশাস্থ' (PRASHAST) অ্যাপ ব্যবহার এবং মূলধারার স্কুলগুলোতে তাদের জন্য বিশেষ শিক্ষিকা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়।
* মেধাবী শিক্ষার্থী: প্রতিভাবান বা gifted শিশুদের জন্য বিশেষ সমৃদ্ধিমূলক কারিকুলাম ও আলাদা প্রজেক্টের ব্যবস্থা থাকে।
৯. ব্যবস্থাপনা, পর্যবেক্ষণ ও শাসনব্যবস্থা (Chapter 5)
* প্রাতিষ্ঠানিক পরিকল্পনা: স্কুল ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (SDP) তৈরি করে স্থানীয় সম্পদ ও অনুদানের সঠিক সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়।
* মনিটরিং সিস্টেম: UDISE+, PRABANDH পোর্টাল এবং জাতীয় ও রাজ্য স্তরের 'বিদ্যা সমীক্ষা কেন্দ্র'-এর মাধ্যমে রিয়েল-টাইমে স্কুলের কার্যক্রম নজরদারি করা হয়।
* অন্যান্য প্রকল্পের অভিসন্ধি (Convergence): সম শিক্ষা (Samagra Shiksha), পিএম পোষণ (PM POSHAN - মিড ডে মিল), আয়ুষ্মান ভারত স্কুল হেলথ প্রোগ্রাম এবং জল জীবন মিশনের সাথে সুসংহতভাবে কাজ করা হয়।
১০. উপভোক্তার সন্তুষ্টি ও বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা (Chapter 6)
এই প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করে বিভিন্ন অংশীজনের সমন্বিত ভূমিকার ওপর:
* প্রধান শিক্ষক (Principal): প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে সামগ্রিক পরিবেশ রক্ষা, স্টেকহোল্ডারদের সাথে যোগাযোগ এবং নীতি বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেন।
* শিক্ষকবৃন্দ (Teachers): শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক শিক্ষাদান, শিখন ফল অর্জন এবং অভিভাবক ও সমাজের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করেন।
* স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি (SMC): স্কুল ও সমাজের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে এবং স্কুলের সার্বিক তদারকি ও উন্নয়নমূলক কাজে সহায়তা করে।
* সরকার ও অভিভাবক: কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার প্রয়োজনীয় আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা প্রদান করে এবং অভিভাবকরা ঘরের পড়াশোনা ও সহায়ক কার্যক্রমে অংশ নেন।