01/08/2020
#বিবাহ #শিব_গৌরী
বিবাহ, চলতি ভাষায় যেটিকে আমরা বিয়ে বলে থাকি। এই বিবাহ প্রথাটি আমাদের হিন্দুশাস্ত্রে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। বেশিরভাগ নথিতে যেমন পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত-এ আমাদের আরাধ্য দেবদেবীদের বিবাহ অনুষ্ঠান দেখানো হয়েছে। তার মধ্যে সব থেকে জনপ্রিয় আখ্যান হল – “শিব-শক্তি সংবাদ“ ( শিব পুরাণ )। এখানে মহাদেবর সাথে দেবীর বিবাহের উল্লেখ আছে। কিন্তু কিভাবে দেবী, মহাদেবকে বিবাহ করবার জন্য বারংবার জোড় করতে থাকেন, বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে, তারও উল্লেখ আছে। একসময় মহাদেব তাতে প্রসন্ন হন এবং বিবাহ করেন। তাঁদের দুই সন্তান, কার্তিক ও গনেশ। কিন্তু বিবাহ করবার জন্য মহাদেবকে সুদূর কৈলাস, যেখানে চারিদিক বরফে ঢাকা, না আছে কোন গাছপালা, না আছে কোন জীবনযাপনের সংস্থান, সেখান থেকে স্বস্ত্রীক নীচে কাশীতে নেমে আসতে হয়, যেখানকার পরিবেশ উষ্ণ, আদ্র এবং জমিও উর্বর আর সেখানে আছে মনোরম বাগান, জীবন জীবিকা নির্বাহের জন্য আছে বাজার আর পরলোক গমনের জন্য রয়েছে শ্মশান।
এই ঘটনা দেখে আমাদের মনে কিছু প্রশ্ন আশা স্বাভাবিক ব্যপার। কেন আখ্যানটিকে এই ভাবে বলা হয়েছে ? কেন মহাদেব, একজন সন্ন্যাসী, শিব, থেকে একজন গৃহস্থ, শঙ্কর-এ পরিবর্তীত হলেন ? কেন তিনি বিবাহ করলেন ? কেন তিনি ওই সুউচ্চ পর্বত থেকে নিচে নেমে এলেন ? অনিচ্ছা সত্ত্বেও কেন তিনি সন্তানের জন্ম দিলেন ? আজ না হয়, শিব থেকে শঙ্কর হওয়ার কথাই জেনে নেওয়া যাক।
এই আখ্যান এক বিশেষ দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার জন্য বারবারই একটি ঘটনার উপর বেশ জোড় দিয়েছে যে, হতে পারেন দেবাদিদেব মহাদেব একজন অদ্বিতীয় সন্ন্যাসী, তিনি নিজ ক্ষুধা নিবারন করতেও সক্ষম, কিন্তু ওনার চারপাশে চরাচর ( প্রাণী জগৎ ) যারা আছে, তারা তো ক্ষুধার্ত। তাদের ক্ষুধা নিবারন করা কি তাঁর উচিত নয় ?
এই প্রসঙ্গে আমরা যদি আমাদের জীবনের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাবো, আমাদের জীবনেও এমন অনেকেই আছেন যাদের লক্ষ্মী অর্থাৎ ধন, দুর্গা অর্থাৎ শক্তি বা উপার্জিত অর্থ ও প্রতিশ্রুতি বা আশ্বাসনের প্রয়োজন নাই হতে পারে, কিন্তু তাদের আশেপাশে এমন অনেকেই আছেন, যাদের জীবনধারনের জন্য এগুলির মূল্য অনেক এবং তারা বিভিন্ন ভাবে তাদের ওপরই নির্ভরশীল। আমাদের তাদের প্রতি যত্নবান হওয়া উচিৎ নয় কি ? শুধুমাত্র দায়িত্ব বা প্রতিশ্রুতি বোধের জন্যই যে অন্যদের প্রতি যত্নবান হবেন, তা কিন্তু নয়, এই প্রচেষ্টা হওয়া উচিৎ সহানুভূতির দ্বারা। তবেই সেই প্রয়াস আসবে মন থেকে, নাকি সমাজের প্রতি কোন কর্তব্য বা দায়িত্ববোধের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে।
এই সহানুভূতির পন্থাটি দৃষ্টিগোচর করবার জন্য মহাদেব শিব-এর বিবাহকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি সেই পর্বত থেকে এই ধরাধামে নেমে আসেন এবং তাঁর সমস্ত সন্তানদের ভরনপোষণের জন্য এই জগতের নিয়মনিধি পালন করতে থাকেন।
এবার দেখে নেওয়া যাক, মহাদেবের দুই পুত্র কার্তিক ও গনেশ, তাঁরা একে ওপরের থেকে কতটা ভিন্ন। আমরা যদি খুব মন দিয়ে লক্ষ্য করি এই দুই সন্তানকে, তাহলে আমরা বুঝতে পারবো তাঁদের মধ্য দিয়ে কিভাবে আমাদের জীবনের দুই মৌলিক কামনা বা চাহিদার প্রকাশ ঘটানো হয়েছে। কি সেই দুই মৌলিক চাহিদা ? ভোগ এবং ভয়। এই দুটিকে নিয়ন্ত্রন করা। গনেশ, ওনার এক বিশালাকৃতি ভুঁড়ি, যা ধনধান্য, সমৃদ্ধি, প্রাচুর্যর নিদর্শন এবং তিনি লক্ষ্মীদেবীর সাথে সংযুক্ত হন। তাই তিনি আমাদের ভোগের খেয়াল রাখেন। আর সেই কারণে ওনার মাতা, সেই দেবীরই এক রূপ, দুর্গা নন, অন্নপূর্ণা, যিনি আমাদের অন্নের দেবী। অপরদিকে কার্তিক, যুদ্ধের দেবতা, যিনি বল্লমধারী বা তির-ধনুক ধারী, তিনি বল বা শক্তির প্রতীক। তিনি আমাদের নানান সঙ্কট বা ভয় থেকে রক্ষা করেন, তাই ওনার মাতা দুর্গা। এর থেকেই বোঝা যায়, শিবের দুই পুত্র আমাদের মৌলিক দুই চাহিদার আধার এবং আমাদের জীবনে লক্ষ্মী ও দুর্গার প্রয়োজন অনস্বীকার্য – একজন উপার্জন তো অপরজন সুরক্ষার প্রতিমূর্তি।
শিব, যিনি নিজ ভোগ থেকে বিরত থাকতে পারেন, তাই দেবীর সাহায্যে তিনি বিবাহ করতে উদবুধ হন, যাতে তাঁর আশেপাশের চরাচর জগতের জন্য ভোগের ব্যবস্থা হতে পারে। এই ভাবনা কিন্তু স্বর্গে ( Heaven ) নেই। খুব মন দিয়ে যদি খেয়াল করেন, বুঝতে পারবেন, সেখানকার রাজা ইন্দ্র, যিনি এমন দেবতা নন যে জগতের অন্য প্রাণীদের প্রতি তাঁর কোন চিন্তা বা উদ্বেগ আছে। সেই কারণে কারোর জীবনে কোন সঙ্কট এলে, সকলে শিব কিংবা বিষ্ণুর শরণাপন্ন হয়, কিন্তু ইন্দ্রের কাছে যায় না। তিনি নিজ “ইন্দ্রসভা“–তে অপ্সরা, গন্ধর্ব এবং সমরসে এতটাই নিমজ্জিত থাকেন যে, অন্যদের জীবনের খেয়াল রাখার কথা তাঁর মননেও আসে না। সেই কারণে, সকলেই শিব এবং বিষ্ণুর পূজা করেন, ইন্দ্রের নয়।
প্রসঙ্গত, শিবের এই বিবাহ, গৌতম বুদ্ধের জীবনধারাকে প্রতিরোধ করে। জীবনের দুঃখ, কষ্ট ও নানান দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তিনি ( বুদ্ধ ) তাঁর স্ত্রী, পুত্র, পরিবার এমনকি রাজত্ব পর্যন্ত ত্যাগ করেন। এই ভাবে হিন্দুশাস্ত্র, বৌদ্ধ মতবাদের প্রতি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বোঝায়, জীবনে ধম্ম নয়, প্রয়োজন ধর্মের। শুধুমাত্র জ্ঞান ও জগৎ থেকে বিচ্ছিন্নতা নয়, জীবনে দরকার পরিবারের সাথে সম্পর্ক ও সহানুভূতির দ্বারা পালন করা। বুদ্ধের সময়ের অনেক আগেই বেদ ও উপনিষদে শিবের ( রুদ্র ) উল্লেখ আছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর বিবাহ, গৃহস্থ জীবনের কাহিনী পুরাণ, রামায়ণ ও মহাভারত থেকে আমরা পেয়ে থাকি, যা বুদ্ধের সময়ের অনেক পরে রচিত হয়। বিবাহ করাকে এখানে সমাজে অংশগ্রহন করার এক রূপক বা প্রতীকী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একজন সাধারন মানুষের জন্য, যেখানে গৌতম বুদ্ধ ত্যাগকে ( nirvana or moksha ), সমাজের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তির উপায় দেখাচ্ছেন, সেখানে শিবজি, শঙ্কর রূপে এই সমাজের মধ্যে থেকেই মুক্তির পথ নির্ধারণ করতে সাহায্য করছেন ( jiva-mukta )। এর থেকে আমরা এটা খুব স্পষ্ট করে বুঝতে পারি যে, সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্নতা ( viyoga ) নয়, সম্পর্কে নিমজ্জিত ( yoga ) হওয়াটাই মুক্তির একমাত্র পথ।
আপনারা কোন পথ অবলম্বন করতে ইচ্ছুক ?
- তাপস পাল
-Translated the Idea From Devdutt Pattanaik's Article
-https://devdutt.com/articles/why-shiva-marries/
25/07/2020
18/07/2020
10/07/2020
03/07/2020
24/06/2020