Myth = Somebody's Truth

Myth = Somebody's Truth

Share

There will be two or three STORIES in every week. Stories from Hindu-Islam-Christian Mythology which

Bengali Translation 01/08/2020

#বিবাহ #শিব_গৌরী

বিবাহ, চলতি ভাষায় যেটিকে আমরা বিয়ে বলে থাকি। এই বিবাহ প্রথাটি আমাদের হিন্দুশাস্ত্রে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। বেশিরভাগ নথিতে যেমন পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত-এ আমাদের আরাধ্য দেবদেবীদের বিবাহ অনুষ্ঠান দেখানো হয়েছে। তার মধ্যে সব থেকে জনপ্রিয় আখ্যান হল – “শিব-শক্তি সংবাদ“ ( শিব পুরাণ )। এখানে মহাদেবর সাথে দেবীর বিবাহের উল্লেখ আছে। কিন্তু কিভাবে দেবী, মহাদেবকে বিবাহ করবার জন্য বারংবার জোড় করতে থাকেন, বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে, তারও উল্লেখ আছে। একসময় মহাদেব তাতে প্রসন্ন হন এবং বিবাহ করেন। তাঁদের দুই সন্তান, কার্তিক ও গনেশ। কিন্তু বিবাহ করবার জন্য মহাদেবকে সুদূর কৈলাস, যেখানে চারিদিক বরফে ঢাকা, না আছে কোন গাছপালা, না আছে কোন জীবনযাপনের সংস্থান, সেখান থেকে স্বস্ত্রীক নীচে কাশীতে নেমে আসতে হয়, যেখানকার পরিবেশ উষ্ণ, আদ্র এবং জমিও উর্বর আর সেখানে আছে মনোরম বাগান, জীবন জীবিকা নির্বাহের জন্য আছে বাজার আর পরলোক গমনের জন্য রয়েছে শ্মশান।
এই ঘটনা দেখে আমাদের মনে কিছু প্রশ্ন আশা স্বাভাবিক ব্যপার। কেন আখ্যানটিকে এই ভাবে বলা হয়েছে ? কেন মহাদেব, একজন সন্ন্যাসী, শিব, থেকে একজন গৃহস্থ, শঙ্কর-এ পরিবর্তীত হলেন ? কেন তিনি বিবাহ করলেন ? কেন তিনি ওই সুউচ্চ পর্বত থেকে নিচে নেমে এলেন ? অনিচ্ছা সত্ত্বেও কেন তিনি সন্তানের জন্ম দিলেন ? আজ না হয়, শিব থেকে শঙ্কর হওয়ার কথাই জেনে নেওয়া যাক।
এই আখ্যান এক বিশেষ দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার জন্য বারবারই একটি ঘটনার উপর বেশ জোড় দিয়েছে যে, হতে পারেন দেবাদিদেব মহাদেব একজন অদ্বিতীয় সন্ন্যাসী, তিনি নিজ ক্ষুধা নিবারন করতেও সক্ষম, কিন্তু ওনার চারপাশে চরাচর ( প্রাণী জগৎ ) যারা আছে, তারা তো ক্ষুধার্ত। তাদের ক্ষুধা নিবারন করা কি তাঁর উচিত নয় ?
এই প্রসঙ্গে আমরা যদি আমাদের জীবনের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাবো, আমাদের জীবনেও এমন অনেকেই আছেন যাদের লক্ষ্মী অর্থাৎ ধন, দুর্গা অর্থাৎ শক্তি বা উপার্জিত অর্থ ও প্রতিশ্রুতি বা আশ্বাসনের প্রয়োজন নাই হতে পারে, কিন্তু তাদের আশেপাশে এমন অনেকেই আছেন, যাদের জীবনধারনের জন্য এগুলির মূল্য অনেক এবং তারা বিভিন্ন ভাবে তাদের ওপরই নির্ভরশীল। আমাদের তাদের প্রতি যত্নবান হওয়া উচিৎ নয় কি ? শুধুমাত্র দায়িত্ব বা প্রতিশ্রুতি বোধের জন্যই যে অন্যদের প্রতি যত্নবান হবেন, তা কিন্তু নয়, এই প্রচেষ্টা হওয়া উচিৎ সহানুভূতির দ্বারা। তবেই সেই প্রয়াস আসবে মন থেকে, নাকি সমাজের প্রতি কোন কর্তব্য বা দায়িত্ববোধের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে।
এই সহানুভূতির পন্থাটি দৃষ্টিগোচর করবার জন্য মহাদেব শিব-এর বিবাহকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি সেই পর্বত থেকে এই ধরাধামে নেমে আসেন এবং তাঁর সমস্ত সন্তানদের ভরনপোষণের জন্য এই জগতের নিয়মনিধি পালন করতে থাকেন।
এবার দেখে নেওয়া যাক, মহাদেবের দুই পুত্র কার্তিক ও গনেশ, তাঁরা একে ওপরের থেকে কতটা ভিন্ন। আমরা যদি খুব মন দিয়ে লক্ষ্য করি এই দুই সন্তানকে, তাহলে আমরা বুঝতে পারবো তাঁদের মধ্য দিয়ে কিভাবে আমাদের জীবনের দুই মৌলিক কামনা বা চাহিদার প্রকাশ ঘটানো হয়েছে। কি সেই দুই মৌলিক চাহিদা ? ভোগ এবং ভয়। এই দুটিকে নিয়ন্ত্রন করা। গনেশ, ওনার এক বিশালাকৃতি ভুঁড়ি, যা ধনধান্য, সমৃদ্ধি, প্রাচুর্যর নিদর্শন এবং তিনি লক্ষ্মীদেবীর সাথে সংযুক্ত হন। তাই তিনি আমাদের ভোগের খেয়াল রাখেন। আর সেই কারণে ওনার মাতা, সেই দেবীরই এক রূপ, দুর্গা নন, অন্নপূর্ণা, যিনি আমাদের অন্নের দেবী। অপরদিকে কার্তিক, যুদ্ধের দেবতা, যিনি বল্লমধারী বা তির-ধনুক ধারী, তিনি বল বা শক্তির প্রতীক। তিনি আমাদের নানান সঙ্কট বা ভয় থেকে রক্ষা করেন, তাই ওনার মাতা দুর্গা। এর থেকেই বোঝা যায়, শিবের দুই পুত্র আমাদের মৌলিক দুই চাহিদার আধার এবং আমাদের জীবনে লক্ষ্মী ও দুর্গার প্রয়োজন অনস্বীকার্য – একজন উপার্জন তো অপরজন সুরক্ষার প্রতিমূর্তি।
শিব, যিনি নিজ ভোগ থেকে বিরত থাকতে পারেন, তাই দেবীর সাহায্যে তিনি বিবাহ করতে উদবুধ হন, যাতে তাঁর আশেপাশের চরাচর জগতের জন্য ভোগের ব্যবস্থা হতে পারে। এই ভাবনা কিন্তু স্বর্গে ( Heaven ) নেই। খুব মন দিয়ে যদি খেয়াল করেন, বুঝতে পারবেন, সেখানকার রাজা ইন্দ্র, যিনি এমন দেবতা নন যে জগতের অন্য প্রাণীদের প্রতি তাঁর কোন চিন্তা বা উদ্বেগ আছে। সেই কারণে কারোর জীবনে কোন সঙ্কট এলে, সকলে শিব কিংবা বিষ্ণুর শরণাপন্ন হয়, কিন্তু ইন্দ্রের কাছে যায় না। তিনি নিজ “ইন্দ্রসভা“–তে অপ্সরা, গন্ধর্ব এবং সমরসে এতটাই নিমজ্জিত থাকেন যে, অন্যদের জীবনের খেয়াল রাখার কথা তাঁর মননেও আসে না। সেই কারণে, সকলেই শিব এবং বিষ্ণুর পূজা করেন, ইন্দ্রের নয়।
প্রসঙ্গত, শিবের এই বিবাহ, গৌতম বুদ্ধের জীবনধারাকে প্রতিরোধ করে। জীবনের দুঃখ, কষ্ট ও নানান দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তিনি ( বুদ্ধ ) তাঁর স্ত্রী, পুত্র, পরিবার এমনকি রাজত্ব পর্যন্ত ত্যাগ করেন। এই ভাবে হিন্দুশাস্ত্র, বৌদ্ধ মতবাদের প্রতি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বোঝায়, জীবনে ধম্ম নয়, প্রয়োজন ধর্মের। শুধুমাত্র জ্ঞান ও জগৎ থেকে বিচ্ছিন্নতা নয়, জীবনে দরকার পরিবারের সাথে সম্পর্ক ও সহানুভূতির দ্বারা পালন করা। বুদ্ধের সময়ের অনেক আগেই বেদ ও উপনিষদে শিবের ( রুদ্র ) উল্লেখ আছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর বিবাহ, গৃহস্থ জীবনের কাহিনী পুরাণ, রামায়ণ ও মহাভারত থেকে আমরা পেয়ে থাকি, যা বুদ্ধের সময়ের অনেক পরে রচিত হয়। বিবাহ করাকে এখানে সমাজে অংশগ্রহন করার এক রূপক বা প্রতীকী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একজন সাধারন মানুষের জন্য, যেখানে গৌতম বুদ্ধ ত্যাগকে ( nirvana or moksha ), সমাজের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তির উপায় দেখাচ্ছেন, সেখানে শিবজি, শঙ্কর রূপে এই সমাজের মধ্যে থেকেই মুক্তির পথ নির্ধারণ করতে সাহায্য করছেন ( jiva-mukta )। এর থেকে আমরা এটা খুব স্পষ্ট করে বুঝতে পারি যে, সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্নতা ( viyoga ) নয়, সম্পর্কে নিমজ্জিত ( yoga ) হওয়াটাই মুক্তির একমাত্র পথ।
আপনারা কোন পথ অবলম্বন করতে ইচ্ছুক ?


- তাপস পাল

-Translated the Idea From Devdutt Pattanaik's Article
-https://devdutt.com/articles/why-shiva-marries/

Bengali Translation 25/07/2020

#কুকুর #সারমেয়

কুকুর, আমাদের ভীষণই আদরের এক প্রাণী। সে খুবই প্রভুভক্ত। তাকে ঠিকমতো অনুশীলন বা তালিম দিলে অনেক ক্ষেত্রেই সে আমাদের কথার অনুরূপ কাজও করতে সক্ষম। কিন্তু সব কুকুর তা পেরে ওঠে না, কারণ প্রকৃতিতে, অন্য সমস্ত প্রাণীর মতো একটি গোষ্ঠী হলেও, সংস্কৃতিতে তারা মাঝে মধ্যেই উপেক্ষিত হয় এবং তথাকথিত হিন্দু সমাজ তাদেরকে অশুভ বা অমঙ্গলকর বলেও চিহ্নিত করে থাকে। আজ থেকে প্রায় ২০০০ বছর পূর্বে সৃষ্ট ধর্মশাস্ত্রে যার উল্লেখ বহুবার হয়েছে। সেখানে কুকুরকে মৃত্যুর সাথে তুলনা করা হয়েছে, এছাড়াও সমাজকে দূষিত করার মূলে এদেরকে দোষী মনে করে সমাজের পরিসীমার বাইরে তাদেরকে স্থান দেওয়া হয়েছে। তাই কুকুরের মাংস ভক্ষন করা চণ্ডাল সম্প্রদায়, আমাদের ধারনায়ে যারা তথাকথিত সমাজকে কুলষিত করে, তাদেরকেও আমরা অঞ্চলের বাইরে জায়গা দিয়েছে। হয় তারা শ্মশানে, না হয় আমাদের তথাকথিত ভদ্র সমাজ থেকে অনেক দূরে কোন জঙ্গলে আড়ালে আবডালে জীবনযাপন করে। আর আমরা খুঁজি বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য। কি করে তা সম্ভব !
পৃথিবীতে নানান সম্প্রদায় রয়েছে, তারা তাদের নিজেদের সংস্কৃতির মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু প্রাণী বা জন্তুকে উচ্চ ও কিছুকে নিম্ন স্থান দিয়েছে। যেমন ধরা যাক, খ্রীষ্টধর্ম-এ, নাগ বা সাপেদের শয়তানের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে, এছাড়া ইসলাম ধর্মে, কুকুরের থেকে বিড়ালকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, কারণ নবী মহম্মদের একটি পষ্য বিড়াল ছিল। এটি এটাই প্রকাশ করে যে কীভাবে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে বিভিন্ন প্রাণীকে বিভিন্ন অর্থ দেওয়া হয়েছে।
ইতিহাসবীদেরা খুঁজতে খুঁজতে হরপ্পা সভত্যাতেও কুকুরের অনেক প্রতীকী খুঁজে পান। এছাড়াও সেখানে এমন অনেক সমাধির খোঁজ পাওয়া যায়, যেখানে মানুষের সাথে কুকুরকেও সমাধি দেওয়া হয়েছিল। এর থেকে বোঝা যায়, সেই প্রাচীন সময় থেকেই কুকুরকে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ গৃহপালিত এবং মানুষের খুবই প্রিয় এক প্রাণী হিসাবে গণ্য করা হয়ে আসছে।
ঋক বেদেও এই প্রাণীর উল্লেখ আছে। সেখানে এক কুক্কুরী অর্থাৎ স্ত্রীকুকুরের কথার উল্লেখ পাওয়া যায়, নাম সরমা। যে দেবরাজ ইন্দ্রকে পানি ( Panis - bargainer, miser ) দ্বারা চুরি করা ঈশ্বরিক গরুগুলিকে পুনরুদ্ধারে সাহায্য করেছিল। আর এই কারণে অনেকেই সরমাকে শিকারী কুকুর বা ইন্দ্রের প্রহরী হিসাবে বিবেচনা করে থাকেন। সরমার পুত্র, সারমেয় এবং পুত্রী, সারমেয়ী। তাই মনে করা হয়ে থাকে, এই জগতের সমস্ত কুকুর জাতির মা হলেন সরমা। প্রসঙ্গত, ঋক বেদে সরমার আরও দুই সন্তানের উল্লখ আছে, শামা ও শবলা। এই চতুষনেত্রধারী সরমার দুই সন্তানকে ধর্মরাজ অর্থাৎ যমরাজের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে বিভিন্ন চিত্রকলাতে ভৈরব, মহাদেবের এক ভয়ঙ্কর রূপ, তাঁর সাথেও এই মৃত্যুরূপী কুকুরকে যুক্ত এবং কাশী রাজ্যের পালক বা রক্ষকরূপে কল্পনা করা হয়েছে। ভৈরব, যিনি কাশীর কোতোয়াল, তিনিও কুকুরকে সাথে নিয়ে রাজ্যের ভেতরের জগৎকে বাইরের বিপদসঙ্কুল পরিবেশ থেকে রক্ষা করেন। এখানেও কুকুরকে মহাদেবের প্রহরীর রূপ দেওয়া হয়েছে।
অথর্ব বেদে রুদ্র দেবকে সারমেয়দের দেবতা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। এর সাথে বোঝা উচিৎ, সেই সময়ে রুদ্র অর্থাৎ মহাদেবকে সমাজ থেকে পরিত্যক্ত ভগবান হিসাবে মান্য করা হতো। যতদিন না পৌরাণিক শাস্ত্রে শিব বা মহাদেবের রূপকে পবিত্রতা জ্ঞাপন করা হয়, ততদিন তাঁর এই ভয়ঙ্কর রূপকে সমাজ থেকে দূরে রাখার কথাই বলা হতো। আর সেই শিব থেকে শঙ্কর রূপে পরিবর্তিত হওয়ার আখ্যানই হল “শিব পুরাণ ”।
আর আপনারা তো সকলেই জানেন, মহাভারতে কথিত আছে, ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির যখন এই জগতের সমস্ত কিছু ত্যাগ করে স্বর্গে যাওয়ার পথে অগ্রসর হন, তখন একটি কুকুর তাঁর সাথে সহগমন করেছিল। আসলে কুকুরকে অশুভ মনে করা হতো বলেই স্বর্গে সেই তাকে জায়গা দেওয়ার জন্য যুধিষ্ঠির দেবরাজকে জোরাজুরি করতে থাকেন। সাথে তিনি এও বলেন, স্বর্গে যদি এই কুকুরকে ধুকতে দেওয়া না হয়, তাহলে তিনিও প্রবেশ করবেন না।
কুকুরকে নিয়ে এমনই আরেক কাহিনী আমরা রামায়ণও পেয়ে থাকি। উত্তরা কাণ্ডে, যখন রাজা রাম স্বপরিবারে ধর্মের সাথে রাজ্যপালন করছিলেন, সেই সময় একদিন শ্রীরাম অযোধ্যার কুশল সংবাদ জানতে লক্ষণকে আজ্ঞা দেন। সেই কথা মতো লক্ষণ সভা থেকে বেরিয়ে আসেন এবং দরজার সামনে এক কুকুরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। সে সেখানে দাঁড়িয়ে অনবরত চিৎকার করতে থাকে। লক্ষণ তার আসার কারণ জেনে রাম সমীপে নিয়ে যান। রামের কাছে তার কষ্টের কথা বলে। তাকে বিনা অপরাধে প্রহার করা হয়েছে। তা শুনে রাজা রাম সর্বার্থসিদ্ধ নামক সেই ভিক্ষুককে ডেকে পাঠান। ভিক্ষুকের কাছ থেকে প্রহারের কারণ জেনে, রাজা রাম কুকুরকেই তার দণ্ড বিধান করার অনুমতি দেন। কুকুর সেই ভিক্ষুককে কালঞ্জর নামক এক জায়গার কুলপতি হওয়ার বিধান দেন। এই বিধানকে ভিক্ষুক বর হিসাবে গ্রহন করে প্রফুল্ল মনে সভা থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর রাজা রাম, এই বিধানের কারণ জানতে চাওয়ায়ে, কুকুরটি বলে, সে পূর্বজন্মে একজন ধর্মনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ ছিলেন, তুবুও তিনি অধম যোনিতে জন্ম লাভ করেন আর এই ভিক্ষুক তো লোভী, নিজ ক্রোধ সংবরন করতে অক্ষম, এমনিতেই তার এবং তার উত্তরাধিকারীদের নরক লাভ নিশ্চিত, তাই সে এই বিধানই দেয়। শ্রীরাম এবং তাঁর সভাসদগন এই ধর্মনিষ্ঠ বিধান শুনে খুবই আল্লাদিত হন।
পুরাণে কথিত আছে, বিশ্বামিত্র মুনি উপবাস কালে খুবই ক্ষুধিত হন এবং তিনি খাবারের অনুসন্ধান করতে থাকেন। তিনি কোন খাবার না পাওয়ায়ে, অরণ্যবাসী চণ্ডালদের কাছ থেকে কুকুরের মাংস চুরি করে তা ভক্ষন করার জন্য রান্না করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এতে দেবরাজ ইন্দ্র খুবই সন্ত্রাসিত হন এবং তিনি বারি বর্ষণ করেন, তার ফল স্বরূপ এই ধরাধাম, খরা থেকে মুক্তি পায়ে। অপর এক কাহিনীতে বিশ্বামিত্র, কোন কারণ বসত বশিষ্ঠ মুনিকে অভিশম্পাত করেন এই বলে যে, তাঁর ( বশিষ্ঠ ) পুত্র এবং তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম কুকুর রূপে জন্ম লাভ করবে।
পরবর্তী অনেক সাহিত্যে, ভৈরবের ( মহাদেবের রুদ্র রূপ ) বাহন সেই হিংস্র কুকুরকে, চারটি খুবই মৃদু কুকুরছানা হিসাবে প্রকাশ করা হয়েছে। এই চারটি কুকুরছানাকে বেদের চারটি খণ্ডের সাথে তুলনা করা হয়েছে আর এরা দত্তাত্রেয়ের সাথে সহগমন করে। দত্তাত্রেয় হলেন নাথ-যোগীদের প্রথম গুরু। যিনি এই তথাকথিত বৈদিক সমাজে কুকুরদের অশুভ ভাবার ধারনার প্রতি আপত্তি পোষণ করেন।
এখন ভাবনার বিষয় হল, এই বিশাল প্রকৃতির নানান প্রাণীকে আমরা, আমাদের জীবনে কতটা স্থান দিতে পারি…!!


- তাপস পাল

-Translated the Idea From Devdutt Pattanaik's Article
-https://devdutt.com/articles/dogs-of-the-gods/

Bengali Translation 18/07/2020

#পুনর্জন্ম #যজ্ঞ #কর্ম #কর্মফল #ঋণ

পুনর্জন্ম, এই শব্দটি শুনলেই কত অলৌকিক গল্প, কত কল্পনা আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তার মধ্যে কিছু ঘটনাকে আমরা সত্যি বলেও মনে করি। দিদিমা-ঠাকুমা, বাড়ির বয়স্ক গুরুজনদের কাছ থেকে অনেক কথা ও কাহিনী আমরা শুনে থাকি, এই পুনর্জন্ম-এর ব্যাপারে। সব থেকে বহুল প্রচলিত গল্প হল, বৈতরিনী নদী পারাপার নিয়ে। কিন্তু সত্যই যদি বলতেই হয়, এই পুনর্জন্মই আমাদের হিন্দু পৌরাণিক শাস্ত্রের ( বৌদ্ধ, জৈন, হিন্দুধর্ম ) মূলনীতি। এর অর্থ, কোন মানুষই খালি হাতে পৃথিবীতে জন্মগ্রহন করে না। সে আসে পিতৃঋণ ( Debt – পূর্বপুরুষদের কর্মের ফল ) নিয়ে। আমরা সকলেই পূর্বপুরুষদের ঋণের ঋণগ্রস্ত থাকি, কারণ তাদের থেকেই আমাদের জন্ম হয়। এরফলে উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে ঋণী।।
বিভিন্ন গল্পের মধ্যে দিয়ে জানতে পারি যে, আমরা আমাদের ভগবানের কাছেও ঋণী আর তাই মন্দিরে নানারকম পূজা-অর্চনার অনুষ্ঠান এবং ধনধান্য উৎসর্গ করি ওনাদের উদ্দেশ্যে। আমরা উদ্ভিদ এবং প্রাণী জগতের কাছে ঋণী, যারা আমাদের জীবন ধারন করতে প্রতিনিয়ত সাহায্য করে চলেছে। এমনকি আমরা সেই সমস্ত ঋষিদের কাছেও ঋণী, যারা এই বেদ রচনা করে জীবনের গভীর সত্যকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন, যাতে আমরা, কিছু সময় এই বৈদিক জ্ঞানের সাথে অতিবাহিত করে তার আসল বক্তব্যগুলিকে উদ্ধার করতে পারি। সেই জ্ঞানের মূল সার হল, শুধুমাত্র বহির্জগতে বিচরণ এবং সাফল্যে মননিবেশ না করে, কিছু সময় নিজ অন্তরে অভ্যন্তরীণ যাত্রা করাও দরকার, যাতে নিজ মনেই মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে পারা যেতে পারে।।
দায়িত্ব এবং কর্তব্য, চিরাচরিত হিন্দু ঐতিহ্য মতে এই দুই নিয়েই পৃথিবীতে মানুষের জন্ম হয়। ঋণের এই দুই বন্ধনে আবদ্ধ হয়েই তা পরিশোধ করাই মনুষ্য জীবনের উদ্দেশ্য। আর সেই ঋণ পরিশোধ না হওয়া অবধি এই বন্ধন থেকে উদ্ধার পাওয়াও অসম্ভব, এটি মুক্তি ( Moksha – মোক্ষ ) লাভের একমাত্র পথ।।
তাহলে বোঝাই গেল, মুক্তি এবং ঋণ, তারা এক অপরের পরিপূরক। আমরা যখন রামায়ণ কিংবা মহাভারত পড়ি, সেখানে ঋণ পরিশোধের বিভিন্নরকম প্রকার দেখতে পাই, যেমন পুত্র হিসাবে, পিতা হিসাবে, সামাজিক সদস্য হিসাবে যে দায়িত্ব, এমনকি এই জগতের অংশ হওয়ার জন্য যে কর্তব্য। নিজস্ব বংশ, পরিবার, গ্রাম, সমাজ এবং জগতের এই বিশাল অংশের প্রতি আমাদের যে দায়িত্ব, আমরা অজান্তেই সেই বন্ধনের মধ্যে ঢুকে পরি এবং তা পরিপূর্ণ করার অর্থই হল ধর্ম। এইসূত্রে, রামায়ণ আর মহাভারত, আমাদেরকে এই ধর্মের পথ ধরে মুক্তির ( মোক্ষ ) দিকে অগ্রসর হওয়ার মার্গ দর্শন করিয়েছে। আরও একটি ব্যপার খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে, এই দায়িত্ব ও কর্তব্য পূর্ণ করাই কিন্তু পুনর্জন্মের বন্ধন থেকে মুক্তি, তা কখনই নয়, কারণ ধর্ম ও মুক্তি, গরুর গাড়ির দুটি চাকার মতন, একে ছাড়া অন্যটি সম্পূর্ণ অচল। সেই কারনেই, আমাদের জন্মের একটাই লক্ষ, ঋণ শোধ করা।।
অপরপ্রান্তে, আধুনিক জীবনযাত্রা আমাদের কি শেখায়ে, জন্মের সাথে সাথেই আমাদের মধ্যে আসে অধিকার বোধ, নাকি ঋণ। যেমন, মা-বাবার ছেলে-মেয়েদের প্রতি, বন্ধুর বন্ধুর প্রতি, প্রেমিকের প্রেমিকার প্রতি বা বিপরীতমুখী, কিংবা স্বামীর স্ত্রীর প্রতি অথবা উল্টোটাই, সেই জন্য আমাদের বোঝানো হয়, আমরা খালি হাতেই আসি এবং কোন ঋণের বোঝা আমাদের ওপর নেই। এরফলে আমরা দায়িত্ব এবং কর্তব্যগুলোকে নিজেদের জীবন থেকে দূরে রাখি। আর তাই, এই সমাজ থেকে অনেক সুযোগ-সুবিধা পাওয়া সত্ত্বেও দোষারোপ করি আমাদের পূর্বপুরুষদের, তৎকালীন সরকারকে, উচ্চপদস্ত আধিকারিকদের, কিন্তু নিজেদের বাদ রাখি। আমরা শুধু এটাই চাই যে, সরকার আমাদের সাথে সাথেই আমাদের বাচ্চা, বয়স্ক এবং অসুস্থ পরিবারবৃন্দ সকলের দায়িত্ব নিয়ে, এক কল্যানকর সমাজ গঠন করুক। আমরা সাথে এটাও চাই যে, এই সুন্দর সমাজকে শোষণ করার পরও তারা আমাদের জীবনে কিছু ফিরিয়ে দিক। হায় রে মনুষ্য জীবন…!!
এখানেই শেষ নয়, আমাদের আরও বলা হয়, এই জগতের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে, কিন্তু এই জগতের দায়িত্ব নিতে কখনও শেখানো হয় না, না কোথাও পড়ানো হয়। এটি খুবই ভিন্ন এক পথ, যেখানে দানই হল কৃতজ্ঞতার স্বরূপ। তারমানে এটাই দাঁড়াল, শুধুমাত্র জীবন যদি তোমার জন্য ভালো কাজ করে, তবেই তুমি কৃতজ্ঞ থাকবে এই সুন্দর জীবনের প্রতি, না হলে তুমি কোন দায়িত্ব ও কর্তবের বন্ধনে আবদ্ধ নয়। একদম সহজ অঙ্ক।।
পাশ্চাত্য সমাজ এই নীতি মেনেই সমাজ গঠন করেছে, তাই দরিদ্রদের জন্য অধিকার এবং ধনীদের জন্য কর্তব্যবোধ, যা ভারতীয় চিন্তা ভাবনার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এই মতে ধনী ও দরিদ্র, উভয়েরই নিজস্ব কিছু দায়িত্ব আছে, যার সাহায্যে আমরা খুব সুন্দর, সুস্থ পরিবেশ যুক্ত সমাজ গঠন করতে পারি।।
পশ্চিমী সভ্যতা এটাই মনে করে, মানুষ দানশীল এবং বিচক্ষণ তখনই হতে পারে, যখন সে ধনী বা বিত্তশালী হয়, আর আমরা আশা করবো সেই মানুষটি আমাদের সুন্দর সমাজ গঠনের মার্গ দর্শন করবেন। কিন্তু ভারতবর্ষ, এই চিন্তা ভাবনার একদম বিপরীত দিক তুলে ধরেছে, যেমন, তুমি এই জগতে যখন জন্ম লাভ করেছ, তার মানেই তুমি এই সমাজের প্রতি দায়িত্ববদ্ধ এবং কর্তব্যপরায়ণ।
আমরা সকলেই সকলের প্রতি দায়িত্ববদ্ধ এবং কারোর প্রতি কারোর কোন অধিকারবোধ নেই। আমরা সকলেই মানুষ, শুধুমাত্র বাধ্য বলে নয়, মনুষ্যত্ব দ্বারাই মানুষের সেবা করা উচিৎ। কারণ এই মনুষ্যত্বই হল ঋণ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ।। ধর্ম হোক মনুষ্যত্ব, গোত্র হোক মানবতা।।


- তাপস পাল

-Translated the Idea From Devdutt Pattanaik's Article
-https://devdutt.com/articles/when-the-concept-of-liberation-is-closely-linked-to-the-concept-of-debt/

11/07/2020

"লক্ষণ রেখা" অতিক্রম করা কি উচিৎ ?

Bengali Translation 10/07/2020

#ব্রাহ্মণ

ব্রাহ্মণ, এটি কি এক জাতি নাকি বর্ণ…?!
আমাদের হিন্দুশাস্ত্রের সমস্ত নথিতে ব্রাহ্মণ হত্যাকে এক গুরুতর অপরাধ বলে গণ্য করা হয়েছে। যাকে বলা হয় ব্রহ্মহত্যাপাপ। কিন্তু নথি গুলির অসংখ্য জায়াগায়ে এই ব্রহ্মহত্যা গত পাপের অনেক কাহিনী আছে, যেখানে ভগবান ব্রাহ্মণদের নিধন করছেন। কিন্তু কেন…? সেটি আজকের আলোচ্য বিষয়।
রামায়ণে, বিভিন্ন সাম্রাজ্য অধিগ্রহণ, রাজা-প্রজাদের উৎপীড়ন এবং সীতা হরণের মত ঘৃণ্য অপরাধ করা সত্ত্বেও লঙ্কাধিপতি রাবণকে ব্রাহ্মণ রূপে বিবেচনা করা হয়েছে। তিনি রাক্ষস হওয়া সত্ত্বেও, বেদ অধ্যয়ন করেন, মহাদেবের একনিষ্ঠ ভক্ত এবং তিনি শৈব শ্লোক ও জ্যোতিষ শাস্ত্রের ওপর কিছু নথিও রচনা করেন। এতো গুন থাকা সত্ত্বেও শ্রীরাম তাঁকে নিধন করেন, মানে ব্রহ্মহত্যা। ভারতবর্ষের কোন কোন জায়গার, যেমন রামেস্বরম ( Rameswaram ) ও ঋষিকেশ-এ ( Rishikesh ), পৌরাণিক কাহিনীতে কথিত আছে, এই পাপকার্য করার ফলে শ্রীরাম খুবই দুঃখিত হন এবং ভীষণ আক্ষেপের সাথে প্রায়শ্চিত্তও করেন।
অপরদিকে মহাভারতে, দ্রোণাচার্য, যিনি একজন ব্রাহ্মণ, উপরন্তু পাণ্ডবদের শিক্ষাগুরুও বটে, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ, তাঁদেরকে ( পাণ্ডব ) বারবারই ওনাকে বধ করার জন্য অনুপ্রানিত করতে থাকেন। তারই ফলে পাণ্ডবদের সেনাপতি, ধৃষ্টদ্যুম্ন-এর ( দ্রৌপদীর ভাই ) দ্বারা তাঁর ( দ্রোণাচার্য ) শিরচ্ছেদ করানো হয়। এখানে শুধুমাত্র ব্রহ্মহত্যাই নয়, গুরু অর্থাৎ একজন শিক্ষকেরও নিধন প্রকাশ পায়।
এছাড়াও পুরানে কথিত আছে, দেবাদিদেব মহাদেবও ব্রহ্মহত্যার সাথে যুক্ত। ব্রহ্মা, যিনি আমাদের সৃষ্টিকর্তা, একদা তিনি নিজ পুত্রী, শতরূপার রূপে মুগ্ধ হয়ে আকাশপথে তাঁকে অনুধাবন করতে থাকেন, তখন মহাদেব তাঁর ( ব্রহ্মা ) সেই কামনাকে দূর করার জন্য, তাঁর ( ব্রহ্মা ) পঞ্চম শিরটি ধর থেকে আলাদা করে দেন। সেই শির হাতে নিয়ে মহাদেব পৃথিবী ভ্রমন করতে করতে কাশি এসে পৌঁছান। আরও কথিত আছে, সেখানেই মহাদেব, গঙ্গা জল দ্বারা নিজ হাত শুদ্ধ করার পরই সেই শির তাঁকে ( মহাদেব ) ত্যাগ করে। এই ঘটনার পর থেকেই মহাদেবের নাম হয় “ কাপালিক “ ( Kapala meaning " skull ", Kapalik means the " skull-men " )। মহাদেব আরও এক ব্রহ্মহত্যার সাথে জড়িত, তাঁর নাম দক্ষ-প্রজাপতি, তিনিও ব্রাহ্মণ ছিলেন। সতী, দক্ষ-প্রজাপতির পুত্রী, মহাদেবকে বিবাহ করতে চাইলে, তিনি নিজ মেয়েকে ঘরবন্দি ও সাথে সাথে মহাদেবকেও অপমানিত করেন আর তার ফলে তিনি ( মহাদেব ) তাঁর (দক্ষ-প্রজাপতি ) সংহার করেন।
তাহলে বুঝতে পারলেন, হিন্দুশাস্ত্রকে আমরা যতই ব্রাহ্মণ্য ধর্ম বলে থাকি না কেন, যেখানে ব্রাহ্মণরা বেশ উচ্চপদে বিরাজ করেন, আসলে কি তাই ? সম্ভবত ব্রাহ্মণরা এই গ্রন্থগুলি লিখেছিলেন বা নিয়ম-নিধির প্রচলন করেছিলেন বলে এটি সম্ভব হয়েছে। কিন্তু তবুও অনেক চিত্রকলাতে মহাদেবের রুদ্রমূর্তিতে তাঁর হাতে ব্রহ্মার শির দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়াও রাবণ, দ্রোণাচার্য, ব্রাহ্মণদের কুলপতি দক্ষ এবং ব্রাহ্মণদের মধ্যে সর্বপ্রথম ব্রহ্মা, সকলেই বিষ্ণুর কোন অবতার বা মহাদেব দ্বারা নিধন হয়েছেন।
তাহলে কেন ব্রহ্মহত্যার মতো দুর্বৃত্ত বা নীচ চিত্র বারবারই আমাদের সামনে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ? কোন সামাজিক প্রতিচ্ছবিকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে ?
আমরা জানি আজ থেকে প্রায় ৩০০০ বছর আগে, বৈদিক সময়ে, জ্ঞান বা শিক্ষা মৌখিক ভাবে প্রেরণ করা হতো, মানে শুনে শুনে মনে রাখতে হতো, যা “ শ্রুতি “ নামে পরিচিত। আর ব্রাহ্মনেরা সেই শিক্ষা দানে সুদক্ষ ছিলেন। যজ্ঞ এবং উপনিষদের গূঢ় তথ্যের দ্বারা কিভাবে ব্রহ্মন অর্থাৎ ঈশ্বরের সাথে সংযুক্ত হওয়া যায় তার পথ নির্ধারণ করতেন। আর তাই একজন ব্রাহ্মণকে হত্যা করা বৈদিক জ্ঞান হ্রাস করার সমতুল্য হিসাবে বিবেচনা এবং এটিকে এক ঘৃণ্য অপরাধ বা পাপ বলে মনে করা হত। এই নীতিই মেনে আনুমানিক ২৩০০ বছর আগে মৌর্য কালে যখন সেই জ্ঞান পুস্তক বা বই আকারে প্রকাশ পায়, তখন ব্রাহ্মণরা সমাজে এক অনুকূল বা উচ্চ স্থান অর্জন করেছিল। এরফলে তাদেরকে ভগবানের স্বরূপ বলে মনে করা হত। ওনারা রাজ-রাজাদের সাম্রাজ্য পরিচালনাতে এবং সৌর ও চন্দ্র রাজবংশের সাথে সংযুক্ত হওয়ার জন্য তাদেরকে সাহায্য করতেন। তারা রাজাদের দ্বারা খুবই সম্মানিত হতেন এবং তাঁদের এই কার্য-এর বিনিময়ে অনেক ভূমি বা জমি দান হিসাবে পেতেন। কিন্তু তবুও ২০০০ বছর পূর্বে রচিত রাজকীয় মহাকাব্য, রামায়ণ এবং মহাভারতে, ব্রহ্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কেন ?
আজ থেকে প্রায় ১৫০০ বছর পূর্বে ভারতবর্ষে যখন প্রথম মন্দির স্থাপিত হয়, তখন সেই মন্দিরে যেখানে ভগবানের মূর্তি স্থাপন করা থাকতো মানে “ গর্ভগৃহ “, সেই অবধি শুধুমাত্র ব্রাহ্মণদেরই প্রবেশাধিকার থাকতো, কারণ একমাত্র তাদেরকেই মন থেকে পরিশুদ্ধ বলে মনে করা হতো। আর সেই সমসাময়িক রচিত পুরাণ গ্রন্থগুলিতে বারবারই মহাদেব এবং বিষ্ণু কর্তৃক ব্রাহ্মণ নিধনের কাহিনী বলা হচ্ছে, তার কারণ তো নিশ্চয়ই আছে ! যদি ব্রাহ্মণকে জাতি বা বর্ণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে বলা যেতে পারে, রাবণ এবং দ্রোণাচার্য, দুইজনেই তাঁদের প্রথাগত পেশা পরিত্যাগ করেছেন এবং তাঁরা নিজ ধর্ম ত্যাগ করে যথাক্রমে রাজা এবং যোদ্ধার মতো ব্যবহার করেছেন। তাই বর্ণধর্মের ( family vocation ) বিরুদ্ধাচরণ করবার জন্য তাঁরা শাস্তি পেয়েছেন। সেইরূপে অপরপ্রান্তে, পরশুরাম, ব্রাহ্মণ হওয়া সত্ত্বেও, একজন রাজার ন্যায় আচরন এবং বর্ণধর্মের অনুসরন না করার জন্য কৃতবীর্য ( Kartavirya ) নামক এক ক্ষত্রিয়কে নিধন করেন। সমাজের দুই ভিন্ন প্রান্তের টানাপড়েনের এক অদ্ভুত নিদর্শন। কেন ? এবার সেই উত্তরই জানব।
ব্রাহ্মণ শব্দটিকে ভগবানের বৈদিক জ্ঞানের প্রেরক, এই রূপক হিসাবে যদি আমরা দেখি, তবে ব্রহ্মহত্যাকে অনেকটা মায়া এবং অজ্ঞতার দ্বারা বিচার করা হবে। আগে দেখে নেওয়া যাক, কিভাবে ব্রাহ্মণ শব্দটি তৈরি হল ? “ব্রাঃ“ মানে “সম্প্রসারণ“ বা “বিস্তার“ এবং “মনঃ“ মানে “মন“। তার সম্পূর্ণ অর্থ হল, যার কাছে অনন্ত বিস্তৃত মন আছে, তিনিই ব্রাহ্মণ বা ভগবান। সেই জন্যই আমাদের মনুষ্য জীবনের অর্থ হল নিজস্ব মনকে বর্ধিত করে ওই পরমাত্মা অর্থাৎ ঈশ্বরে মিলিত হওয়া। কিন্তু আমাদের এই মন যদি নিজস্ব জীবনের ভোগ ও ভয় দ্বারা পরিপূর্ণ থাকে, তবে আমরা আত্মম্ভরি ( আত্ম অহম ), কর্তৃত্ব প্রবণ, নিজ ক্ষেত্র আগলে রাখার প্রবনতা, হিংসা, দম্ভ এবং লিপ্সার বশবর্তী হয়ে পরি। আর যখনই সেই মনের বিস্তার ঘটে, তখন ভোগ ও ভয় থেকে আমাদের মুক্তি ঘটে এবং আমরা আরও উদার ও সহানুভূতিশীল হয়ে উঠি। এই বক্তব্য গুলিই প্রকাশ করার জন্য বোঝানো হয়েছে, ব্রাহ্মণ তারাই, যারা আমাদের সকলের মনকে বিস্তার করাতে সাহায্য করাবেন, নাকি নিজস্ব স্বল্প জ্ঞানে পরিপূর্ণ মন দ্বারা নিজেদেরকে অশ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত করবেন। তাই যখনই ব্রহ্মার দ্বারা কামবাসনা, দক্ষের দ্বারা অশ্রদ্ধা, এছাড়া রাবণের পরস্ত্রীর প্রতি আকর্ষণ এবং দ্রোণাচার্যের নিজস্ব পুত্রের প্রতি অন্ধকারাচ্ছন্ন ভালোবাসা ও অনুদার রাজার প্রতি অবিবেচনামূলক আনুগত্য প্রকাশ পায়, তখনই ভগবান তাদের হত্যা করেন।
তাই অবশেষে একটাই কথা বলার, নিজ মনের বিস্তার ঘটান এবং অন্যদেরও সহানুভূতির দ্বারা সাহায্য করুন, তবেই আপনি ব্রাহ্মণ হওয়ার পথে অগ্রসর হতে পারবেন।


- তাপস পাল

-Translated the Idea From Devdutt Pattanaik's Article
-https://devdutt.com/articles/

Bengali Translation 03/07/2020

#কর্ম #কর্মফল

কর্ম ও কর্মফল, হিন্দুশাস্ত্রের বুনিয়াদ বলা যেতে পারে। আমাদের জীবন প্রতিনিয়ত যে সমস্ত জটিল সমস্যা বা দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হয়, তা এই দুই ধারনার দ্বারা ভীষণই সহজ ভাবে বুঝতে পারি। শুরু করি খুবই সাধারন একটা ভাবনা দিয়ে, আমরা যখনই কোন পরিস্থিতি থেকে খুব আঘাতপ্রাপ্ত হই, তখন প্রথম দুটি কথা আমাদের মনে আসে। এক, সেই খারাপ পরিস্থিতির জন্য যে বা যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের আগুনে দগ্ধ হয়ে ন্যায় বিচার চাওয়া, নাকি দুই, তাকে বা তাদের ক্ষমা করা দেওয়াই উচিৎ ? ন্যায় এবং ক্ষমা, সত্যি কথা বলতে, এই দুই ধারনার ব্যখ্যা আমরা বাইবেল ( Bible ) –এ পেয়ে থাকি। এই ইহুদী-খ্রিষ্টান-ইসলাম ধ্যান-ধারনার সূত্রপাত হয় ইব্রাহিমিক শাস্ত্র থেকে, যেখানে ঈশ্বর হলেন বিচারপতি। এই সমস্ত ব্যাপার বুঝতে গেলে বাইবেলের দুটি ভাগই পড়তে হবে। প্রথম ভাগ, “Old Testament” – সেখানে ন্যায়বিচার ও প্রতিহিংসার নিরিখে বলা আছে, “an eye for an eye”, মানে “রক্তের বদলে রক্ত চাই”, এবং দ্বিতীয় ভাগ, “New Testament” – সেখানে আবার ক্ষমাশীলতার দ্বারা বোঝানো আছে, “turning the other cheek, if slapped on one”, মানে “কেউ যদি আপনার এক গালে চড় মারে, আপনি ওপর গালটি এগিয়ে দিন”। দ্বিতীয় কথাটি খুবই পরিচিত, তাই না…! আর এই দুই ধারনার ওপর ভর করেই আমরা আমাদের জীবনের সমস্যাগুলির বিচার করি আর নিস্পত্তির আশাতে থাকি। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বরাবরই আমাদের মনে করিয়ে একটি কথাই বলে গেছেন। কি বলেছেন এবং তার দ্বারা আমাদের কি বোঝাতে চেয়েছেন, আসুন সেটাই দেখেনি।
হিন্দুশাস্ত্র শুধুমাত্র একটি ধারনার আধারে তৈরি – কর্ম ( Action and Reaction )। এর মানে হল, আমাদের সাথে এখন যা ঘটছে বা আগে যা ঘটেছে, তা আমাদের অতীতে করণীয় কোন কর্মের প্রতিক্রিয়া মাত্র আর সেই জন্য তার পুরোপুরি দায়িত্ব নেওয়া আমাদের কর্তব্য। এই দায়িত্ব নেওয়া, বলা যতটা সহজ, করা ঠিক ততটাই কঠিন। মন শান্ত করে একবার ভেবে দেখুনই না…!
তবে কি আমাদের মহাকাব্য, রামায়ণ ও মহাভারত, এতে কি এই কর্মের ( Karma ) কোন উল্লেখ আছে…? নিশ্চয়ই। শুনুন তাহলে, রামায়ণ শুরু হয় খুব ছোট্ট একটি ঘটনার ওপর ভিত্তি করে। একদা ঋষি বাল্মীকি শিষ্যদের নিয়ে বনবিহার করছিলেন, সেখানে তিনি একজোড়া খুব সুন্দর পাখি ( ক্রৌঞ্চ – সারস জাতীয় পাখি ) দেখে মোহিত হয়ে যান। কিন্তু হঠাৎ একজন ব্যাধের ( শিকারি ) দ্বারা পুরুষ পাখিটি নিহত হয়। সেই নির্মম দৃশ্য দেখে তিনি খুবই ব্যথিত চিত্তে ব্যাধকে অভিশাপ দেন। কারণ, পাখিদের মধ্যে অভিশাপ দেওয়ার কোন ধারনা নেই, তারা শুধু শোক করতে জানে। এই ঘটনা থেকে আমরা মানুষ ও প্রাণীজগৎ বা সংস্কৃতি ও প্রকৃতির দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের আভাস পাই। আমারা দেখতে পাই, প্রকৃতিতে ন্যায় বা ক্ষমা, এই দুই ধারনার কোন অস্তিত্ব নেই, তারা শুধু জানে ক্লেশ বা পীড়া সহ্য করতে। কিন্তু মানুষ, তাদের নিজস্ব ব্যথা-বেদনা থেকে নিস্তার পেতে ন্যায় বা ক্ষমার দ্বারস্ত হয়, নতুবা, মানুষ কর্মের সংজ্ঞাও বুঝতে পারে যে, এই সমস্ত ঘটনা তার জীবনে ঘটবারই ছিল, তাই কারোর উপর দোষ চাপানো বা কাউকে ক্ষমা করার কোন প্রয়োজন নেই।
এবার রামায়ণের আরও একটি কাহিনীর দিকে নজর দেওয়া যাক, রাম, সীতা উদ্ধারের জন্য সূর্যপুত্র সুগ্রীবের সাথে মিত্রতা করে, ইন্দ্রপুত্র অসীম শক্তিধর বালিকে এবং লঙ্কাধিপতি রাবণকে নিজ হাতে সংহার করেন। রামায়ণের বিভিন্ন গাথাতে কথিত আছে, দুই বিধবা নারী, বালিপত্নী তারা ও রাবণপত্নী মন্দোদরী, তাঁদের স্বামীর মৃত্যুর জন্য রামচন্দ্রকে পত্নী বিয়োগের অভিশম্পাত করেন, যার ফল স্বরূপ রামকে পরবর্তীকালে সীতাকে অয্যোধ্যা থেকে নির্বাসিত করে প্রিয় পত্নী বিয়োগ যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়। যতই ধর্মকে অবলম্বন করে সেই যুদ্ধ লড়া হোক বা না হোক, রামকে তাঁর বিজয়ের মূল্য দিতেই হয়েছে, তারজন্য তিনি অনেক দুঃখ পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু কখনও কোন অভিযোগ করেননি।
এবার আসি শ্রীকৃষ্ণের কথায়ে, প্রসঙ্গত, মহাভারতে ওনার ধর্ম স্থাপনের কথা লোকমুখে বহুল প্রচলিত। কিভাবে তিনি ধর্মের দ্বারা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবদের সঙ্গী হয়ে কৌরবদের পরাজিত করান। কিন্তু আমরা সেই যুদ্ধের পরিণতির সাথে সাথেই তার সমসাময়িক যে কত ক্ষতি অন্তর্নিহিত ছিল, তা সর্বদাই উপেক্ষা করে যাই বা আমাদের সেই দিকটার কথা দেখানোও হয় না খুব একটা, বোঝানোতো দূরদুরস্ত।
১. দ্রৌপদীর পাঁচ সন্তানের মৃত্যু।
২. অর্জুন পুত্র অভিমুন্যের মৃত্যু।
৩. ভিম পুত্র ঘটৎকচের মৃত্যু।
৪. গান্ধারীর ১০০ জন পুত্রের মৃত্যু।
যার ফলস্বরূপ গান্ধারী, শ্রীকৃষ্ণকে অভিশম্পাত করে বলেন, ধর্ম স্থাপন করার জন্য সে যেমন তাঁর ( গান্ধারী ) ১০০ জন পুত্রের মৃত্যুর কারণ হয়েছে, ঠিক সেই প্রকারেই তাঁর ( শ্রীকৃষ্ণ ) যদুকুল নির্বংশ হবে এবং বনের মধ্যে তাঁর ( শ্রীকৃষ্ণ ) পাশবিকরূপে মৃত্যু হবে। শ্রীকৃষ্ণ, উনিও সেই অভিশাপের কোন বিরধিতা করেননি। শ্রীকৃষ্ণ ভালোভাবেই জানতেন, কর্ম ( Karma ), সে ধর্মের দ্বারা প্রতিপালিত হলেও, তার প্রতিক্রিয়া ভোগ করতেই হবে, এতো মনুষ্য জীবনের অভিন্ন অঙ্গ।
হিন্দু শাস্ত্রেতে জীবনকে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গি, পৃথিবীর অন্যত্র কোন শাস্ত্রে দেখা যায় না। রাম এবং কৃষ্ণের জীবনধারা দিয়ে এটাই বোঝানো হয়েছে, আমরা মানুষেরা, আমাদের জীবদ্দশায়ে যাই কর্ম করে থাকি না কেন, সে ভালো কিংবা মন্দ, তার প্রতিক্রিয়া আমাদের ভোগ করতেই হবে। যদি এখন কেউ কোন খারাপ অবস্থার মধ্যে দিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন, একটু শান্ত মনে ভেবে দেখলেই বুঝতে পারবেন, সেটি অতীতের কোন এক কর্মের প্রতিক্রিয়া। আমরা যদি সেই ঘটনাগুলির অনুরূপ কর্ম করি, তার মানে এক নব বীজ বপন করা হয় নিজ জীবনে, আর ফল, ইতিবাচক বা নেতিবাচক, যেকোনোটিই হতে পারে। সেই রোপিত বীজ এবং তা থেকে প্রাপ্ত ফল, একে অপরের পরিপূরক, যদি না আমরা নিজ মনকে শান্ত করে অতীতে সেই করনীয় কর্মকে প্রত্যক্ষ করি।
এই কারণেই শ্রীকৃষ্ণ বারবারই একটি কথা বলেছেন – “ কর্ম করে যাও, ফলের আশা করো না “। খুবই সহজ সমাধান, কিন্তু বাস্তবে রূপ দেওয়া বেশ কঠিন।


- তাপস পাল
-Translated the Idea From Devdutt Pattanaik's Article
-https://devdutt.com/articles/

Bengali Translation 24/06/2020

#গুজব

গুজব বা রটনা ( Rumors or Fake News ), যা সত্যকে এক মুহূর্তের মধ্যে বদলে দেয়। যার জন্য কোন তথ্য বা প্রমানের প্রয়োজন হয় না। কারণ, আমাদের একটা বিশ্বাস আছে – “যা রটে, তার কিছুটা তো ঘটে”। আর ঠিক এই কারণেই আমাদের মধ্যে ভ্রান্ত ধ্যান-ধারনার উদ্ভব হয়। এখনকার এই তথ্য-প্রযুক্তির যুগে, এই গুজব ছোড়ানোটা আরও অনেক সহজ হয়ে গেছে। One of the Strength of Social Media। ভালো দিক অবশ্যই আছে, তা অনস্বীকার্য। কিন্তু এই গুজব বা রটনার ফলে আমাদেরই মতো কোন মানুষের জীবনে সেটির কতটা প্রভাব পরে, তা কি আমরা কখনও ভেবে দেখি ? একটু ভাবলেই বুঝতে পারবেন।
এখনকার জগৎ না হয় অনেক উন্নত হয়েছে বিভিন্ন প্রযুক্তির দ্বারা, কিন্তু আমাদের হিন্দু শাস্ত্রে কি এই গুজব বা রটনার কোন উল্লেখ আছে ? আসুন আজ না হয় তার ওপরই একটু চিন্তন করা যাক।
লঙ্কাকাণ্ডে, লঙ্কাধিপতি রাবণের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করার এবং এতদিনের বিচ্ছেদের বিরহ বেদনার পর, শ্রীরাম-এর সাথে, প্রথমবার তাঁর প্রানপ্রিয়, পতিব্রতা স্ত্রী সীতার সাক্ষাৎ হয়। তিনি এতটাই আপ্লুত হন, যে তাঁর নয়নযুগল দিয়ে অশ্রুধারা নির্গত হয়। কিন্তু তার সাথেও তাঁর মনে এক আশঙ্কার উদ্ভব হয়, সেই জন্য তিনি সীতাকে অগ্নিপরীক্ষা দেওয়ার নির্দেশ দেন। রামের নির্দেশ অনুসারে সীতা অগ্নিতে প্রবেশ করায়, লোকসকলের সামনে অগ্নিদেব আবির্ভূত হন এবং তাঁকে রক্ষা করে সকলের সামনে বলেন “হে রাঘব ! আমি স্বয়ং তোমায় আদেশ করছি, তুমি এই শুদ্ধস্বভাবা পাপ-বিরহিতা সীতাকে গ্রহন কর।“ এই কথা শুনে রাম খুবই প্রফুল্ল মনে সীতা, লক্ষণ এবং বানর সহযোগে পুস্পক বিমানে আরোহণ করে অযোধ্যাতে ফিরে আসেন।
উত্তরা কাণ্ড, সপ্তকাণ্ড রামায়ণের একদম অন্তিম এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক পর্ব। এই পর্বের ব্যাপারে আমাদের বলা হয় কিন্তু খুব বেশি গভীরে বোঝানো হয় না। তার কিছু কারণ আছে, পড়তে পড়তে সেই কারণটা বোঝা যায় কিনা দেখা যাক। অযোধ্যাতে ফিরে আসার পর, রাম বহু বছর ধরে ধর্মের সাথে রাজ্য পালন করতে থাকেন। একদা এক সান্ধ্য রসিক জলসায়ে রাম, তাঁর অন্তরঙ্গ সাথীদের সঙ্গে আনন্দ পরিহাস করতে করতে ভদ্র নামক একজনকে জিজ্ঞাসা করলেন – “ভদ্র ! আমার সম্বন্ধে গ্রামে-নগরে কি কি কথার আলোচনা হয় ?“। মজার ছলে ভদ্র তাঁকে ( রাম ) বলে ফেলেন, নগরে জনসাধারনের মধ্যে তাঁর সুন্দরভাবে রাজ্যপালনের সাথে সাথেই সীতার পতিব্রতা হওয়ার বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ পাচ্ছে। এই কথা শোনার পর, রাম খুবই ব্যথিত হন। মনে মনে ভাবেন, যে আশঙ্কার জন্য কিছু বছর পূর্বে, তিনি নিজ মনে সীতার শুদ্ধতা সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া সত্ত্বেও, শুধুমাত্র নিজ রঘুকুলের মর্যাদার কথা ভেবে তাঁর ( সীতা ) অগ্নিপরীক্ষা করান, তবুও তিনি সেই মান রাখতে অসমর্থ হলেন। তার কারণ, রামের স্ত্রী বলে নয়, অযোধ্যা বাসীর মনে হয়েছে, তারা জানে না রাবণ কর্তৃক অপহৃত হওয়ার পর, রঘুকুলের রানী সীতা, রাবণ নিবাসে কিভাবে বসবাস করেছেন ! রাজ্যবাসী এরকমও ভাবেন, রাক্ষস কর্তৃক হৃৎ একজন স্ত্রী, অযোধ্যার রানী কিংবা রাজা রামের পাশে উপবিষ্ট হওয়ার যোগ্য কি ? এই সমস্ত কথা শোনার পর, তিনি নিজের প্রানের থেকে প্রিয় সীতাকে তাঁর রাজ্য থেকে নির্বাসিত করার সিদ্ধান্ত নেন।
এরই মাঝে একদা সন্তানসম্ভবা সীতা অযোধ্যার নিকটে এক অরণ্যে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করলে, রাম লক্ষণকে ডেকে নির্দেশ দেন, সে যেন সীতাকে সেই অরণ্য অবধি পৌঁছে দিয়ে আসে এছাড়াও তাঁকে অবগত করিয়ে দেওয়া হয়, কেন তাঁর ( সীতা ) আর অযোধ্যাতে ফেরার অনুমতি নেই বা সমস্ত পৃথিবীকে যেন জানিয়ে দেওয়া হয়, সেই শ্রীরামের একমাত্র স্ত্রী। সীতা, রামের এই সিদ্ধান্তে খুবই কষ্ট পান, কিন্তু তার কোন প্রকাশ না করেই সেই বনমধ্যে ঋষি বাল্মীকির আশ্রমে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি ( সীতা ) যমজ দুই সন্তানের জন্ম দেন, কুশ ( জ্যেষ্ঠ পুত্র ) ও লব ( কনিষ্ঠ পুত্র ) এবং তাদের সত্যিকারের পরিচয় গোপন রাখেন।
এই আশ্রমেই, ঋষি বাল্মীকি রামায়ণ নামক মহাকাব্যটি রচনা করেন। একদা লব ও কুশের মাধ্যমে এই কাব্যটি রাম সমীপে প্রকাশ পায় এবং মূলত তাতে বলা থাকে, শ্রীরামের জয়গান, তাঁর রাজ্যপালন, আর সাথে থাকে, সীতার নির্বাসন কিভাবে রঘুকুলের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখে। কোথাও কোথাও শ্রীরামকে আমরা বলে থাকি – রামচন্দ্র। যদিও তিনি সৌরবংশজাত, তা সত্ত্বেও তাঁর নামে রয়েছে চন্দ্র, একটু অদ্ভুত নয় কি ? কিছু কিছু লোক গাথা ( Folk Tale ) আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যেরূপে তিনি সীতার সাথে নিষ্ঠুর ব্যবহার করেছেন, সেইরূপেই তাঁর মহত্ত্ব বা আভিজাত্য চন্দ্রের ন্যায় রাহুগ্রস্থ হয়েছে।
উত্তরা কাণ্ডে, সীতার এই নির্বাসন অধ্যায়টি খুবই বিতর্কমূলক। অনেকেই এই অধ্যায়কে আসল রামায়ণের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করেন না, তারা জানেন আসল রামায়ণ, রামের অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন এবং তাঁর রাজ্যাভিষেক দিয়ে সমাপ্ত হয়। সীতার এই নির্বাসন পর্ব পরে যুক্ত করা হয়। আবার অনেকে মনে করেন এই অধ্যায় থেকেই শ্রীরামের রাজা হওয়ার সঠিক মূল্যায়ন হয়, যেখানে তিনি তাঁর রাজ্যবাসীর সুখ এবং রঘুকুলের মর্যাদা রক্ষার জন্য নিজের সর্বসুখ ত্যাগ করতেও পিছপা হন না।
কিন্তু সেই পর্ব থেকে আমরা এও জানতে পারি, শ্রীরাম পুনরায় আর বিবাহ করেননি, এই ঘটনাটি কদাচিৎ অগোচরে রয়ে যায়। রঘুবংশের রাজা তিনি, রাজকীয় ভাবে পুনঃ বিবাহ করে রাজকুলের উত্তরাধিকারের জন্ম দেওয়া তাঁর কর্তব্যের মধ্যে পরে, তবুও তিনি তা করেননি। ইহা সীতার প্রতি তাঁর অমোঘ প্রেম এবং নিরঙ্কুশ প্রতিশ্রুতির পরিচয়। হিন্দু পুরাণশাস্ত্রে ইনিই একমাত্র এক্ম-পত্নী-ব্রতা। সীতা নির্বাসনের পর, তিনি যেখানেই যেকোন কার্য সম্পন্ন করতে উপস্থিত হয়েছেন, পাশে স্বর্ণখচিত সীতার মূর্তি সর্বদা বিদ্যমান থাকতো। স্বর্ণ অর্থাৎ সোনা শুদ্ধতার প্রতীক, যেমন তাঁর মনের গভীরে অন্তর্নিহিত ছিল সীতার প্রেমের শুদ্ধতা। শুধুমাত্র রাজ্যবাসীর গুজব, তার জন্য রঘুকুলের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়াতে, রাজার রাজধর্ম পালন এবং রাজকীয় কর্তৃত্ব স্থাপন করার জন্য, দায়িত্ব ও কর্তব্যের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এই পথ অবলম্বন করতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ, সর্বপ্রথম তিনি রঘুকুলের রাজা, সীতার পত্নীব্রতা স্বামী নন।
আমরা যতই আমাদের আধুনিক মনে করি না কেন, যখনই এই ধরনের পরিস্থিতি নিজ পরিবার বা কোন সংস্থার উপর আসে, আমরা সেই সত্য-মিথ্যার চক্রব্যূহতে আটকে পরি। এই ধরুন না অভিযান, এটি যেকোন মানুষের চরিত্র বা পেশা, সে নারী হোক বা পুরুষ, এক মুহূর্তে নষ্ট করে দিতে পারে এবং এটি কদাচিৎ খুবই অস্বস্থিকর পরিবেশ তৈরি করে। শুধু তাই-ই নয়, সেখানে মাঝে মধ্যেই অপরাধের সত্যতা প্রমান করা খুবই দুষ্কর হয়ে ওঠে। এই সমস্ত পরিস্থিতিতে, বিশ্বাসযোগ্য তথ্য না থাকা বা তার অপরাধ প্রমান না হওয়া সত্ত্বেও, যেহেতু সে সেই অপরাধের আসামী, তাই তাকে হয় পরিবার, না হয় কোন সংস্থা থেকে বিতারিত হতে হয়। আবার কোন কোন সময়ে, সেই পরিস্থিতির ভুক্তভুগি যে নারী, তাঁর ওপরই অনেক মানুষের বিশ্বাস থাকে না, যার ফল স্বরূপ তাঁকে সমাজের মধ্যে থেকেও আলাদা নজরে দেখা হয়, বলতে পারেন ঐ “একঘর”-এ করে রাখার মতন। আমাদের আধুনিক সমাজে এই ধরনের পরিস্থিতির অভিযোগ ও উৎপীড়নের যে জটিল সমস্যা, তা থেকে নিবৃত্তি পেতে অনেক ন্যায়নীতি স্থাপন করার চেষ্টা করে হয়েছে, কিন্তু ফলাফল, সেই সত্য-মিথ্যার মায়াজালে আটকে পরে থাকে। তার কারণ, এই ধরনের ঘটনা ঘটবার পর, খুবই যৎসামান্য তথ্য পাওয়া যায়, আবার কখনও তথ্য প্রমান সমেত উদ্ধার হলেও, সেই সমস্ত মানুষদের উচ্চ মান-মর্যাদা, সমাজে তাদের জনপ্রিয়তা ও ক্ষমতার জন্য তাদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।
শ্রীরাম এবং মাতা সীতার এই বিয়োগ-বিরহ রামায়ণের মূল মন্ত্র, যার সাহায্যে আমাদের মননে এই ধারনার সৃষ্টি হয় যে, একজন রাজা মহান হতে পারেন তখনই, যখন তিনি তাঁর জীবনের সর্বসুখ বলিদান দিয়েও এক গরিষ্ঠ সাম্রাজ্য স্থাপন করতে সক্ষম হন। শ্রীরাম ছিলেন রাজ্যবাসীর ধর্মরক্ষক, তাদের কথা যতই মিথ্যে বা অন্যায্য হোক না কেন, বংশের মর্যাদা রাখতে তিনি সেই অনুরূপ কর্ম করতে বদ্ধপরিকর। এটি সত্য- মিথ্যা বা ন্যায়-অন্যায়ের কথা নয়, তিনি অর্থাৎ শ্রীরাম সর্বপ্রথম রাজা, তারপর তিনি স্বামী।
আরও একটি কথা সকল পুরুষদের উদ্দেশ্যে, শুধুমাত্র নারীদের পতিব্রতা হওয়ার কথা উল্লেখ না করে, নিজেরাও শ্রীরামের মতো পত্নীব্রতা হওয়ার চেষ্টা করে দেখুনই না, বা নারীদের বলবো অভিযান খুব একটা কার্যকর নয়, দু'জন, দু'জনের পরিপূরক হন, হয়তো আধুনিক এই সমাজ ব্যবস্থা একটু হলেও সুন্দর পরিবর্তনের হাওয়াতে মত্ত হতে পারে।।


- তাপস পাল
-Translated the Idea From Devdutt Pattanaik's Article
https://devdutt.com/articles/

Want your school to be the top-listed School/college in KOLKATA?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Category

Website

Address


A/138, Ramkrishna Nagar, P.O.-Laskarpur
Kolkata
700096