19/02/2026
দিল্লিতে হওয়া AI সামিট হওয়ার কথা ছিল দেশের আগামী ভবিষ্যতের রোডম্যাপ। হওয়ার কথা ছিল দেশের গর্বের বিষয়। কিন্তু দেখা গেল তা অন্তঃসারশূন্য ঢক্কানিনাদ। সেখানে বড় বড় প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু নূন্যতম ভবিষ্যতের ডিজিট্যাল ভারতের কোনও ব্লু প্রিন্ট নেই।
আপনি হয়তো ভাবছেন ঐ সেই রোবো-ডগ নিয়ে আবার আপনিও পোস্ট করছেন। হ্যাঁ, আবার না। আমি ব্যক্তিগতভাবে খবরে নজর রাখছিলাম ইউটিউবে বিভিন্ন ক্লিপিংসে এই সামিটের ব্যাপারে। ওই একটি ঘটনা হাইলাইটেড হয়েছে বলে সবার চোখে পড়েছে। আর একটু খবর চেপে দেওয়া হয়েছে। অন্য একটি মানুষকে বোকা বানানোর কৌশল কারো চোখে ধরা পড়েনি।
গালগোটিয়াস ইউনিভার্সিটি চিনের একটি কোম্পানির তৈরি রোবো-ডগকে নিজেদের ইউনিভার্সিটিতে তৈরি বলে চালানোর চেষ্টা করল। সারা বিশ্বের সামনে দেশের নাক কাটা গেল। বিন্দুমাত্র লজ্জা শরম থাকলে একটি ইউনিভার্সিটি এরকম করতে পারে? একটি প্রাইভেট ইনস্টিটিউটে যখন আপনার ছেলেমেয়েকে পড়তে পাঠাবেন, সময় সময় খবর নিয়ে দেখুন সেখানে পড়াশোনা শেখানো হয় নাকি ফাঁকিবাকি লোকঠকানো?
তবেই এই একটি ঘটনা বিচ্ছিন্ন ঘটনা এরকম ভাবলে ভুল হবে। গত কাল বা পরশুই খবরের কাগজে খবরে প্রকাশ, ব্যাঙ্গালোরের একটি স্টার্ট আপ কোম্পানি এই সামিটে স্মার্ট ওয়্যারয়েবল ডিসপ্লে করতে গিয়েছিল। বহু পরিশ্রম করে তাঁরা বানিয়েছিলেন, এই সামিটে প্রথম দেখিয়ে ব্যান্ড প্রোমোশন করতে। প্রধানমন্ত্রী যখন এই সামিটে প্রবেশ করছিলেন, তখন সিকিউরিটির জন্য তাঁদের বাইরে যেতে বলা হয়। পরে যখন তাঁরা ফিরে আসেন, তাঁরা দেখেন তাঁদের স্টলের সবকটি গ্যাজেট চুরি হয়ে গিয়েছে। শুধু খালি প্যাকেটগুলো পড়ে ছিল। সিকিরিটির এমন বহর যে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন একটি প্রদর্শনীর জিনিসপত্র চুরি হয়ে যাচ্ছে!
আরও আছে। ভারতীয়দের গর্বের দেশীয় IT কোম্পানি TCS. আমরা যাঁরা একটু আধটু শেয়ার মার্কেটের খবর রাখি, তাঁরা জানি ভারতীয় বাজারে IT ইনডেক্স আক্ষরিক অর্থেই 'bleeding'। বিদেশি বিনিয়োগকারী সংস্থাগুলো মনে করে না যে ভারতীয় আইটি কোম্পানিগুলো এমন কোনও ইনোভেশনে ইনভেস্ট করছে, যা দিয়ে ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত কোনও বিরাট বিপ্লব আনা সম্ভব! ফলে তাঁরা মোটা বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছেন। সত্যি কি তাই? কিছুটা তো সত্যি! এই সামিটে TCS প্রদর্শনিতে দেখিয়েছে AI-এর সাহায্যে কীভাবে শাড়ি বোনা যায়।
এখন শুনে ব্যাপারটা যতটা বৈপ্লবিক মনে হচ্ছে যাঁরা পাঁচ-সাত বছর কাজ করছেন IT ফিল্ডে তাঁরা ভালো মতোই বুঝতে পারবেন ব্যাপারটা স্রেফ ভাঁওতাবাজি ছাড়া কিচ্ছু না। কেন? প্রদর্শনীতে ওঁরা দেখালেন, ট্যাবের স্ক্রিনে শাড়ির বিভিন্ন যে কালার প্যালেট আছে তার মধ্যে যে কোনও একটা নির্বাচন করা যাবে। তারপরে বিভিন্ন মোটিভের ডিজাইন থেকে পছন্দ মতো বেছে নেওয়া যাবে। এরপরে শাড়ি বোনার মেশিনের প্যানেলের উপরে কোন রঙের সুতো ব্যবহার করতে হবে, দেখিয়ে দেবে। ফলে যিনি বসে বুনবেন, তাঁকে আর মাথা ঘামাতে হবে না। অবশ্যই এর ফলে একটা পরিশ্রম কমে যাবে। একজন অদক্ষ শ্রমিককে বসে ভাবতে হবে না, কোন রঙের সুতোর পরে কোন রঙের সুতো ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু এখানে AI ঠিক কোথায়? মানে গা জোয়ারি করে যদি দুই লাইন আমি ঢুকিয়ে দিতে চাই সেটা অন্য কথা। কিন্তু একটা অ্যাপের প্যানেল থেকে আগে থেকে দেওয়া কালার প্যালেটের মধ্যে থেকে একটি সিলেক্ট করা এবং তারপরে আগে থেকে দেওয়া কিছু মোটিভের মধ্যে একটা সিলেক্ট করা । এখানে AI ঠিক কোথায়? Pre-feed করা ডেটা হিসাব করে ডিসপ্লেতে কালার দেখানো কীভাবে যে AI হল আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে অন্তত আমি বুঝতে পারিনি। AI-এর সঠিক ব্যবহার হত, যদি এটাই এরকম হত যে একজন ইউজার বলবে সে কী ধরণের শাড়ি চাইছে, কী রঙ তাতে থাকবে, কী উৎসব বা অনুষ্ঠানের জন্য একটি শাড়ি ডিজাইন করতে চাইছে। সেই সব ইনপুটের উপর ভিত্তি করে স্ক্রিনে দুটো বা তিনটে শাড়ির ডিজাইন এলো। তার থেকে পছন্দসই একটা বেছে নিতেই সেই শাড়িটি বুনতে কারিগরকে ডিসপ্লেতে যাবতীয় সহয়তা প্রদান করা। কিন্তু তার বদলে একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানি সাধারণ মানুষ ও মিডিয়াকে বোকা বানানো বেশি প্রয়োজনীয় মনে করল।
ভারতীয় মানুষজন, মিডিয়া এসব দেখে 'ও হো হো কী মহান টেকনলজি' বলে বাজার গরম করে খবর পরিবেশ করতে পারেন ঠিকই (কারণ আজকাল মিডিয়া হাউসগুলো আর তাবায়েবখানার মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই) । কিন্তু এসব করে বিদেশি বিনিয়োগ টানা যায় না। দেশের ভবিষ্যৎও শক্তপোক্ত করা যায় না! তার জন্য দেখনদারির থেকে বেশি দরকার সঠিক ট্যালেন্টে বিনিয়োগ করা। পরিশ্রম করা। স্কিল ডেভলপমেন্টে বড় বড় কোম্পানির মন দেওয়া প্রয়োজন। না হলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এভাবেই বারে বারে দেশের মুখ পুড়বে।
পুনশ্চ(edit): অনেকেই লেখাটিকে রাজনৈতিক রঙিন চশমার দৃষ্টিকোণে দেখছেন। আমার লেখার মুখ্য উদ্দেশ্য একেবারেই অরাজনৈতিক। আমার কাছে প্রশ্নটা দেশের সম্মানের। আমরা যাঁরা ভারতীয় প্রযুক্তিবিদ তাঁদের কাছে সুযোগ ছিল বিশ্বের সামনে এমন কিছু করে দেখানোর যাতে যে বিদেশি উদ্যোগপতিরাও এই প্রদর্শনীতে এসেছিলেন তাঁদের বিশ্বাস অর্জন করার। আমরা সেই সুযোগটা হারাচ্ছি স্রেফ নিজেদের ঠকবাজি আর জুয়াচুরি করার স্বভাবের জন্য। AI এখনও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিনোদন আর বাচ্চাদের খেলার উপকরণের মতোই হয়ে রয়েছে। বাস্তব জীবনের কী কী বাণিজ্যিক প্রয়োগ হতে পারে তাই নিয়েই বিশ্বময় এত কাজ, এত ধরনের প্রায়োগ প্রক্রিয়া চলছে। এটা দেখতে গেলে, Once in thousand years oppertunity যেখানে আজকের AI সংক্রান্ত ধারণা ও প্রয়োগ আগামী হাজার বছরের ভবিষ্যত নির্মাণ করবে। আমার কাছে সেইটা বড় নৈরাশ্যজনক যে আমরা ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও বড় বড় সংস্থাগুলো সেই সুযোগটা হেলায় হারাচ্ছি।