27/03/2024
(আমার লেখা নয়)
☣️ অবশ্যই পড়ুন!
রণছোড়দাস চাঞ্চোরের চাঞ্চল্যকর খ্যাপামি এবং আমি আপনি সবাই জানি।
কিন্তু এখন একটা গল্প বলবো। যা গল্প হলেও সত্যি। আর সত্যি হয়েও গল্পের চেয়ে আশ্চর্য।
এক সিনেমায় তাকে কেন্দ্র করে গল্প বোনা হয়েছে। সবাই দেখেছেন সিনেমাটি। থ্রি ইডিয়টস।
সিনেমায় তার নাম ছিল ফুংসুখ ওয়াংড়ু। সত্যি নামটা এখন সবাই জানেন।
এই ছেলেটি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেল। প্রভাবশালী বাবার নাম বলেনি ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হবার সময়। নিজের যোগ্যতায় ভর্তি হতে চায় বলে। পড়া চলাকালীন বাবা খরচ দিলেন না। কারণ ছেলে কথার অবাধ্য। তিনি চেয়েছিলেন ছেলে সিভিল পড়ুক।
তাই ছেলেটি তখন থেকেই ছাত্র পড়ানো শুরু করে।
পড়া শেষ করে সে শুরু করলো ফেল করা ছাত্রদের পড়ানো। ইশকুল তৈরি হলো। সে ইশকুল SECMOL নামে এখন পরিচিত। Student Education and Cultural Movement of Ladakh.
হ্যাঁ মুভমেন্ট। যে এলাকায় শতকরা পাঁচ জন ছাত্রছাত্রী ক্লাস টেনের পরীক্ষা পাশ করতো, সে এলাকায় এখন 75% পাশ করে। আর ঐ ইশকুলের বৈশিষ্ট্য ছিল এটাই যে শুধুমাত্র ফেল করা ছাত্রছাত্রী সেখানে ভর্তি হতে পারতো। মুভমেন্ট নয়তো আর কী বলবেন একে !!?
সেই ফুংসুখ ওয়াংড়ু হয়ে উঠলেন একজন বিজ্ঞানী।
আর দেশের যে এলাকায় তাঁর বসবাস সেই এলাকার সংবেদনশীল জলবায়ু, পর্যাবরণের সংরক্ষণ করে কী করে উন্নয়ন করতে হয়, যাকে বলে sustainable development. ... সেই লক্ষ্যে চললো তার অধীত বিজ্ঞানের প্রয়োগ।
ও হ্যাঁ ..... তাঁর ঐ ইশকুল পুরোপুরি সৌরশক্তি প্রয়োগে চলে। অন্য কোনো এনার্জি ব্যবহার হয় না।
হিমবাহ পিছিয়ে যাচ্ছে। জলের অভাবে চাষবাসের সঙ্কট। সেই সঙ্কট দূর করতে শুরু করলেন আর্টিফিশিয়াল গ্লেসিয়ার তৈরীর কাজ। আইস স্তূপ।
... তাতেও জলের পাইপলাইনে ব্যবহার করা হয়নি কোনো বিদ্যুৎ শক্তি। শুধুমাত্র গ্র্যাভিটেশন মানে অভিকর্ষজ শক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
হিমবাহটি এখন অনেকটা উঁচু হয়ে উঠেছে। পৃথিবীর সম্ভবত প্রথম এবং একমাত্র মানব নির্মিত হিমবাহ। এখান থেকে অটোমেটিক জল সাপ্লাই হয় চাষের জন্য। গরমকালে।
এই লোকটি বানালেন...*ওয়ার্ম শেল্টার ফর সোলজার্স*...। লাদাখের হাড় ফুটো করা শীতে দেশের সৈনিকরা যাতে গরমে আরামে থাকতে পারে। কোনো এসি নয় সেটা। কোনো প্রচলিত শক্তির ব্যবহার ছাড়াই তৈরি করলেন ঐ ওয়ার্ম শেল্টার।
তাঁর এ হেন কাজের জন্য সরকার তাকে এক কোটি টাকা দিলেন। সে টাকা তিনি ছাত্রদের জন্য খরচ করলেন।
এরকম আরো অনেক উদ্ভাবন। কিন্তু সর্বোপরি তিনি একজন পরিবেশ প্রেমী, জলবায়ু গবেষক, শিক্ষাবিদ। এই লোকটি আজ একুশ দিন একটি খাবারের দানা গ্রহণ না করে কীসের জন্য আন্দোলন করছেন ?
2019 সালে জম্মু কাশ্মীর থেকে যখন 370 ধারা তুলে নেওয়া হয় তখন লেহ্ লাদাখ একটি আলাদা কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল হিসেবে অস্তিত্ব পেল। খুশি হয়েছিল সেখানকার লোকজন। কারণ কাশ্মীর কেন্দ্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে লাদাখের প্রয়োজন কখনো গুরুত্ব পায়নি।
আর তখন সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তাদেরকে সংবিধানের ষষ্ঠ শিডিউলে অন্তর্ভুক্তি দেওয়া হবে।
কিন্তু দিচ্ছে না। ভোট ফুরিয়েছে। সরকারও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
(রঘুকুলরীতি... প্রাণ যায় পর বচন না যায় 🙂)
কিন্তু কী এই ষষ্ঠ শিডিউল ?
ভারতের যেসব রাজ্যে শিডিউল্ড ট্রাইবের সংখ্যা 50% তাদের এই শিডিউলে অন্তর্ভুক্তির সংরক্ষণ দেওয়া আছে সংবিধানে। আর লাদাখের অধিবাসীদের 97% শিডিউল্ড ট্রাইবের মানুষ। তাদের এই সংরক্ষণ পাওয়ার অধিকার সংবিধান স্বীকৃত।
সেটাই তারা চায়। এই সংরক্ষণ পেলে তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের ওপর তাদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ থাকবে।
আর একটা দাবী তাদের নিজস্ব বিধানসভা থাকতে হবে। এখন তাদের মাত্র দুজন প্রতিনিধি, কাশ্মীর বিধানসভায়। নির্বাচিত যথেষ্ট সংখ্যক প্রতিনিধিত্ব না থাকায় তাদের সমস্যার কথা প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না তারা। তারা নিজস্ব Public Service Commission চায়। যার মাধ্যমে তাদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ার পর চাকরি পাবে।
লোকসভায় তাদের একজন মাত্র প্রতিনিধি। এই সংখ্যা তারা বাড়াতে চায়।
এখন কথা হলো তাদের এই আন্দোলনের পাশে আমরা দাঁড়াতে যাবো কেন ..
আমাদের এত মাথাব্যথা করার দরকারটা কী ?
আছে দরকার।
আর সেটাই জানতে হবে। লাদাখের ভূপ্রকৃতি এবং হাড়হিম করা ঠাণ্ডা, এবং স্বর্গের মতো বরফাবৃত সৌন্দর্য,....তার সুবিশাল হিমবাহ..
উত্তর ভারতের নদীগুলোর প্রাণশক্তি। এই প্রকৃতি সামান্য এদিক ওদিক হলে সমূহ বিপদ।
কিছুদিন আগে গত বর্ষায় সিকিমের একটা মোরেন গ্লেসিয়ার লেক ফেটে কী কাণ্ড হলো ভুলে গেছেন নাকি ? রাতের বেলায় মুহূর্তে ভেঙে চুরে ভাসিয়ে নিয়ে গেল তিস্তার মহাপ্রলয়ের মতো হড়পা বান ? উত্তরবঙ্গের লোক মনে হয় এখনো ভোলেননি।
উত্তরাখণ্ড হিমাচল প্রদেশে (যোশীমঠ) যেভাবে ব্যবসায়ী কর্পোরেটের হাতে পর্যটন ব্যবসার নামে যথেচ্ছ নির্মাণ হয়েছে, তার ফলশ্রুতিতে যখন তখন ভেঙে পড়ছে ভেসে যাচ্ছে পাহাড়, মানুষ, সম্পদ... ঠিক সেরকমই আশঙ্কা করছেন ফুংসুখ ওয়াংড়ু। লাদাখের জন্য।
অনেক বিরল খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে লাদাখের মাটিতে। অনেক বড়ো জমি। ব্যবসা করবার পয়সা কামাবার লোভে চকচক করছে হায়নার মতো কর্পোরেটের চোখ।
লাদাখের ভূপ্রকৃতির ওপরে বড়ো থ্রেট সামনে। বড়ো থ্রেট উত্তর ভারতের নদীগুলোর ওপরে। হড়পা বান অথবা খরা। দুটোরই।
তাই লাদাখকে দিতে হবে ষষ্ঠ শিডিউলের সংরক্ষণ। যাতে তাদের ভূমি জল জঙ্গল তাদের সম্মতি ছাড়া বেচুবাবু চারটে পয়সার জন্য লোভী হায়নার কাছে নির্দ্বিধায় বেচে না দিতে পারে।
সব জায়গায় একভাবে উন্নয়ন হয় না। মাল্টিস্টোরিড, ফোরলেন, শপিং কমপ্লেক্স, ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন.... দিল্লি ব্যাঙ্গালোর মুম্বাই এর মতো করে গোটা দেশের সব জায়গায় উন্নয়ন হয় না। হবে না। ওটাকে সায়েন্টিফিক ডেভেলপমেন্ট বলে না। প্রকৃতিকে রক্ষা করে হয় উন্নয়ন। তাকেই বলে Sustainable Development.
আরও অনেক কথা আছে। লাদাখের মানুষের অনন্য বৈশিষ্ট্য অনন্য সংস্কৃতি ভাষা ও খাদ্যাভ্যাসের স্বাধীনতা তারা রক্ষা করতে চায়।
কে না চায় বলুন তো ?
আমি আপনি সবাই চাই নিজেদের সংস্কৃতি ও ভাষা নিয়ে বাঁচতে।
ভারত তো বহু -র দেশ। বৈচিত্র্য এবং ঐক্য। প্রভাতাংশু মাইতি থেকে তাই তো পড়ছি।
যে মানুষের ভারতরত্ন পাওয়ার কথা সে মানুষ আজ একুশ দিন না খেয়ে আন্দোলনে। যারা দেশ চালায় তারা বোবা কালা হলে আমি আপনি তো বোবা কালা হতে পারি না..
তাই না ?
কলমে
Abhra Chakrabarti