10/07/2026
দিন কয়েক আগে দেখি একটা অচেনা নাম্বার থেকে হোয়াটসঅ্যাপ, "দাদা,চিনতে পারছ?" ছবি দেখে চিনলাম,আরে এতো সেই পুরনো পাপী,আমার প্রথম ইকোনমিক্স ব্যাচের স্টুডেন্ট,অরিন। তখন সদ্য কোভিড কেটেছে,পেটের তাগিদে টিউশন পড়ানো শুরু করেছি। আমি এতটাই ছাত্রদরদী অমায়িক মাস্টার ছিলুম যে একবার নিজের জন্মদিনটাও ওদের থেকে ৫টাকা করে চেয়ে পালন করেছি 😛 তো এইরকম সংযোগ কি ভোলা যায়? ছেলে এখন সাহিত্যচর্চায় মগ্ন।
এই গদ্যটা আমার বিশেষ পছন্দ হল।বিশেষ করে ওই লাইনদুটো —
শুভঙ্কর তখন আর শুভঙ্কর নেই।
সে একটা উদাহরণ।
তোমরাও ওই পেজটা দেখো।ভালো লাগলে লাইক করিও।
।। ফার্স্টবয় ।।
বর্ষার পরে স্কুলের মাঠে যে কাদা জমত, সেখানে আমরা দুজন একসাথে গোলপোস্ট এঁকে ফুটবল খেলতাম।
আমি আর শুভঙ্কর।
তখনও কেউ জানত না শুভঙ্কর একদিন মাধ্যমিকে ফার্স্ট হবে।
আমরাও না।
শুভঙ্কর অঙ্কে ভালো ছিল, আমি বাংলায়।
ও দ্রুত হিসেব করতে পারত, আমি রচনা লিখতে পারতাম।
ক্লাস সেভেনে একবার “আমার প্রিয় ঋতু” রচনায় আমি পুরো ক্লাসে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছিলাম। শুভঙ্কর খাতা দেখে বলেছিল, — “অশোক, তুই লেখক হবি একদিন।”
তারপর ধীরে ধীরে আমাদের স্কুলে একটা শব্দ খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠল — “র্যাঙ্ক”।
শব্দটা প্রথমে শুধু ক্ষতিকর ছিল।
তারপর সেটা রোগ হয়ে গেল।
শুভঙ্করকে আলাদা বেঞ্চে বসানো হলো।
টিফিনে স্যাররা তাকে স্টাফরুমে ডেকে নিতেন।
হেডস্যার অ্যাসেম্বলি-তে বলতেন, — “শুভঙ্কর আমাদের স্কুলের মুখ উজ্জ্বল করবে।”
আমাদের বাকিদের মুখ বুঝি অন্ধকার করতেই জন্মেছিল।
আমি খারাপ ছাত্র ছিলাম না।
মাধ্যমিকের টেস্টে আমার বাহাত্তর শতাংশ এসেছিল।
বাড়ি ফিরে মা বলেছিল, — “শুভঙ্কর কত পেল জানিস?”
আমি জানতাম।
পুরো পাড়া জানত।
শুভঙ্কর তখন আর শুভঙ্কর নেই।
সে একটা উদাহরণ।
চায়ের দোকানে বাবারা নিজেদের ছেলেকে অপমান করার আগে তার নাম নিতেন।
মায়েরা বলতেন, — “ছেলেটা নাকি ষোলো ঘন্টা পড়ে!”
আমাদের ঘুম তখন অপরাধ হয়ে গেল।
রেজাল্ট বেরোনোর দিন শুভঙ্কর সত্যিই ফার্স্ট হলো।
টিভির গাড়ি এল।
স্কুলের সামনে ব্যানার পড়ল।
তার মা কাঁদতে কাঁদতে সাংবাদিকদের বললেন, — “ও ছোট থেকেই অন্যরকম ছিল।”
আমি সেদিন ভিড়ের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
শুভঙ্কর একবার আমাকে দেখেছিল।
চোখাচোখি হতেই হাসতে গিয়েও হাসেনি।
তারপর বহুদিন আমরা কথা বলিনি।
শুনলাম সে কলকাতায় পড়তে গেছে।
তারপর আইআইটি।
তারপর বিদেশ।
মাঝে মাঝে ফেসবুকে ছবি দেখতাম।
নীল suit, কাঁচের office, বিদেশি সহকর্মী।
একবার একটা ইন্টারভিউতে সে বলেছিল, — “I always wanted to leave small-town mentality behind.”
“small-town” কথাটার ভিতরে আমাদের স্কুল, মাঠ, লাইব্রেরি, আমিও ছিলাম কিনা জানি না।
আমি তখন একটা কোচিং সেন্টারে বাংলা পড়াই।
মধ্যমেধার ছাত্রদের।
যাদের নাম কেউ মনে রাখে না।
একদিন রাত্তিরে হঠাৎ শুভঙ্করের মেসেজ এল।
“তুই কি এখনও লিখিস?”
প্রশ্নটা দেখে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলাম।
লিখতাম একসময়।
এখন আর না।
আমি শুধু উত্তর দিলাম , “না। তুই?”
ও অনেকক্ষণ পরে লিখল, “আমি বোধহয় কোনোদিনই লিখিনি।”
তারপর তিন মাস কোনো কথা নেই।
শীতের এক রাতে হঠাৎ ভিডিও কল।
শুভঙ্কর।
চোখের নিচে কালি।
পেছনে অচেনা বিদেশি ফ্ল্যাট।
সে ফিসফিস করে বলল, — “অশোক, তুই একটু থাক… ফোনটা কাটিস না।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, — “কি হয়েছে?”
সে উত্তর দিল না।
শুধু ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে বাথরুম-এর দিকে গেল।
সাদা আলো।
সাদা বেসিন ।
তারপর আচমকা সে ঝুঁকে বমি করতে শুরু করল।
প্রথমে শুধু জল বেরোল।
তারপর কালো, আঠালো কিছু।
আমি ভেবেছিলাম রক্ত।
তারপর দেখলাম জিনিসগুলো নড়ছে।
বাংলা অক্ষর।
“অ”
“ক”
“মা”
“ঘর”
বেসিনের ভিতরে কিলবিল করছে।
আমি চিৎকার করে উঠলাম, — “এগুলো কী!”
শুভঙ্কর কাঁপছিল।
— “ওরা কয়েকদিন ধরে বেরোচ্ছে…”
একটা “ঋ” ধীরে ধীরে বেসিন বেয়ে উঠল।
তারপর একটা “ছ”।
শুভঙ্কর গলা চেপে ধরল।
— “আমি বাংলা ভুলে যাচ্ছিলাম রে… ইচ্ছে করে… আমি ভাবছিলাম ভাষাটা useless…”
হঠাৎ সে কাশতে শুরু করল।
তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল — “বিদ্যালয়” “বর্ষা” “বন্ধু”
শব্দগুলো যেন বহুদিন অন্ধকারে আটকে ছিল।
তারপর আমি দেখলাম একটা অক্ষর ধীরে ধীরে তার গলার কাছে উঠে যাচ্ছে।
“মা”
শুভঙ্কর দুহাতে গলা চেপে মেঝেতে পড়ে গেল।
ফোনের ওপারে শুধু হাঁসফাঁস শব্দ।
আমি চেঁচিয়ে যাচ্ছিলাম, — “শুভঙ্কর! শুভঙ্কর!”
সে কষ্ট করে বলল, — “ওরা বলছে… আমি ওদের ফেলে এসেছি…”
তারপর স্ক্রীন কেঁপে উঠল।
ফোনটা মাটিতে পড়ে গেল।
শেষবার আমি শুধু দেখেছিলাম — সাদা টায়াল্স-এর উপর ছড়িয়ে থাকা কালো বাংলা অক্ষর।
যেন তারা বহুদিন পরে নিজেদের ভাষা ফিরে পেয়েছে।
© অরিন
Golper Goru - গল্পের গরু