11/02/2024
ভালোবাসার এযুগ - ওযুগ
সামনেই আসছে ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইন ডে। গোলাপ, চকলেটে সাজানো উপহারে কাছের মানুষটিকে সারপ্রাইস্ দেওয়ার আকাঙ্খাও বেড়ে চলছে ক্রমাগত। কিন্তু জানেন কি কেন এই ১৪ই ফেব্রুয়ারী দিনটিকে ভেলেন্টাইন ডে বলা হয়ে থাকে? কেন যাকে অন্যভাবে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন্স উৎসবও বলা হয়?
তাহলে বলি শুনুন, এই দিনটির মহাত্ম্য প্রথমার্ধে কেবলমাত্র একটি খ্রিষ্টীয় ধর্ম উৎসব হিসেবে পালিত হয়ে আসলেও, পরবর্তীতে মানব ঐতিহ্যের ছোঁয়ার পরে বিভিন্ন দেশে আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পরে। ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা এবং অনুরাগের মধ্যে দিয়ে দিনটি উদযাপিত হয়।
যদিও সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে কেন্দ্র করে বহু মতবিরোধ ও জনশ্রুতি শুনতে পাওয়া যায়। জানা যায় খ্রীষ্টিয় ২৬৯ সালে ইতালির রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন বসবাস করতেন। তিনি ছিলেন একজন খ্রিস্টান পাদ্রী ও চিকিৎসক। তবে ধর্ম প্রচারের অভিযোগে নয়,বরং অনেকের সাথে অবৈধ শারীরিক সম্পর্কের অভিযোগে তৎকালীন রোম সম্রাট দ্বিতীয় ক্রাডিয়াস তাকে বন্দী করেন। যদিও এখানে আরো একটি মত প্রকট হয়, কেউ কেউ বলেন মানুষের প্রতি ভালোবাসাই তার মৃত্যুদন্ডের কারণ। জানা যায় সম্রাট দ্বিতীয় ক্রাডিয়াস পুরুষদের বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া নিষিদ্ধ করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ পুরুষদের শক্তিক্ষয় হবে এবং দেশের আপাতকালিন পরিস্থিতিতে যুদ্ধক্ষেত্রে শক্তিশালী সৈন্যেবাহিনী তৈরীতে প্রভাব ফেলবে, আর অন্যদিকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন লুকিয়ে রাজ্যাভ্যান্তরিন যুগলকে বিবাহ দিতেন। এজন্য তাকে বন্দি করা হয়। যাই হোক পূর্বমতানুযায়ী, তৎকালিন রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচার ছিল নিষিদ্ধ ,আর এহেন অনৈতিকতার অবক্ষয়ও রোধ করা প্রয়োজন হয়ে পরে। বন্দী থাকা অবস্থায় তিনি জনৈক কারারক্ষীর দৃষ্টিহীন মেয়েকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন। এখানেও একটি দ্বিমত পোষিত হয়, অনেকে বলেন, তিনি সেই দৃষ্টিহীন মেয়েটিকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন। আবার অনেকের মতে এই কারারক্ষীর দৃষ্টিহীন মেয়ের সুস্থতার পেছনে কালো সত্যি আরো ভয়াবহ, সেই অন্ধ মেয়েটির সাথেও তিনি অবৈধ লালসার বসবর্তী হয়ে সম্পর্ক করতে ছাড়েন না। এহেন ঘটনায় সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের জনপ্রিয়তা ক্রমাগত তৎকালিন সমাজে বেড়ে চলে, আর তাই তার কৃতকর্মে ক্ষুব্ধ ও ঈর্শান্বিত হয়ে রাজা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। সেই দিন ছিলো ১৪ই ফেব্রুয়ারি। অতঃপর ৪৯৬ সাল নাগাদ পোপ সেন্ট জেলাসিউ ও প্রথম জুলিয়াস ভ্যালেন্টাইনের স্মরণে ১৪ই ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ভ্যালেন্টাইন' দিবস ঘোষণা করেন।
খ্রিস্টান জগতে পাদ্রী বা সাধু সন্তোদের স্মরণে ও তাদের বিভিন্ন কর্মের ভিত্তিতে এ ধরনের অনেক দিবস পালনের চল রয়েছে।
যেমন: ২৩ শে এপ্রিল - সেন্ট জজ দিবস,
১১ই নভেম্বর - সেন্ট মার্টিন দিবস,
২৪শে আগস্ট - সেন্ট বার্থোলোমিজম দিবস,
১ লা নভেম্বর - আল সেইন্টম দিবস,
৩০ শে নভেম্বর - সেন্ট এন্ড্রু দিবস,
১৭ ই মার্চ - সেন্ট প্যাট্রিক দিবস ইত্যাদি।
একটু লক্ষ করলেই দেখতে পাবেন পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে জন্মদিন হোক বা ধর্মোৎসব যেকোনো ক্ষেত্রেই ভোগের বিষয়টি মুখ্য। তাই তারা গির্জার অভ্যন্তরেও মদ্যপানের সুখ নিতে দ্বিধা বোধ করেন না।
১৭৭৬ সালে ফ্রান্স সরকার কর্তৃক ভ্যালেইটাইন উৎসব নিষিদ্ধ করা হয়। ইংল্যান্ডে ক্ষমতাসীন পিউরিটানরাও একসময় প্রশাসনিকভাবে এ দিবস উদ্যাপন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
এছাড়া অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও জার্মানিতে বিভিন্ন সময়ে এ দিবস প্রত্যাখ্যাত হয়। সম্প্রতি পাকিস্তানেও ২০১৭ সালে ইসলামবিরোধী হওয়ায় ভ্যালেন্টাইন উৎসব নিষিদ্ধ করে সেদেশের আদালত। যদিও বর্তমানে পাশ্চাত্যে এ উৎসব মহাসমারোহ ভাবে উদ্যাপিত হয়। যুক্তরাজ্যে মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক, ১০০ কোটি পাউন্ড ব্যয় করে এই ভালোবাসা দিবসের কার্ড, ফুল, চকোলেট, অন্যান্য উপহারসামগ্রী ও শুভেচ্ছা কার্ড কেনার জন্য। এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে আনুমানিক প্রায় ২.৫ কোটি শুভেচ্ছা কার্ড আদান-প্রদান করা হয় প্রতিবছর।
তবে যাই হোক, বহুল প্রচলিত ভ্যালেন্টাইন যতই মহা ধুমধামে পালিত হোক না কেন, বাঙালির সরস্বতী পূজোর আবেগি প্রেমকে কখনোই হারাতে পারবে না। ভালো থাকুক সকল ভালোবাসারা, ভালো থাকুক আঁকড়ে ধরা হাতগুলো। আদরে-আবদারে দায়িত্বে, ভালোবাসায় যুগ যুগ ধরে পালন হয়ে যাক বাঙালির সরস্বতী আর পাশ্চাত্বের ভ্যালেন্টাইন দিবস।।
সমাপ্ত