19/03/2026
ব্যর্থতার ভয় কাটিয়ে ওঠা
ব্যর্থতার ভয় অনেক শিক্ষার্থীর মনে নীরব এক বোঝা হয়ে থাকে। যেসব শিক্ষাব্যবস্থায় কেবল ফলাফলের উপর বেশি জোর দেওয়া হয়, সেখানে ছোটখাটো ব্যর্থতাও ব্যক্তিগত পরাজয় বলে মনে হতে পারে—শেখার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে নয়। এই ভয়ই প্রায়শই শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিতে, প্রশ্ন করতে বা নতুন সুযোগ চেষ্টা করতে বাধা দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যর্থতা এড়ানোর প্রবণতা শিক্ষার্থীর অগ্রগতিকে ব্যর্থতার চেয়েও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
আসলে ব্যর্থতা সাফল্যের বিপরীত নয়; বরং এটি শেখার প্রক্রিয়ার এক অপরিহার্য ও অনিবার্য অংশ। প্রতিটি ভুল, প্রতিটি পিছিয়ে পড়া বা প্রতিটি অসম্পূর্ণ প্রচেষ্টা আমাদের জানায়—কী কাজ করেনি এবং কীভাবে উন্নতি করা যায়। যখন শিক্ষার্থীরা ব্যর্থতাকে ব্যক্তিগত বিচারের বদলে গঠনমূলক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখতে শেখে, তখন তারা শেখার জন্য আরও উন্মুক্ত হয়, নিজেদের পদ্ধতি বদলাতে পারে এবং চ্যালেঞ্জের মধ্যেও লেগে থাকতে শেখে। দৃষ্টিভঙ্গির এই পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতাকে শেষ নয়, বরং অগ্রগতির সোপান হিসেবে দেখতে সাহায্য করে।
১. ফলাফল থেকে নিজের পরিচয় আলাদা করুন
একটি পরীক্ষায় খারাপ ফল বা কোনো সুযোগ হাতছাড়া হওয়া আপনার মূল্য বা সক্ষমতাকে নির্দেশ করে না। “আমি যথেষ্ট ভালো নই” বলার বদলে বলুন, “এই চেষ্টা সফল হয়নি।” নিজের আত্মসম্মান বজায় রেখে পদ্ধতির উন্নতি করলে মানসিক দৃঢ়তা গড়ে ওঠে।
২. একটি “ব্যর্থতার জীবনবৃত্তান্ত” তৈরি করুন
আপনি যে সব বাধা বা ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছেন, সেগুলি লিখে রাখুন এবং প্রতিটি অভিজ্ঞতা আপনাকে কী শিখিয়েছে তা নোট করুন। এই সহজ অভ্যাসটি আপনাকে উন্নতির ধারাবাহিকতা বুঝতে সাহায্য করবে। অধিকাংশ সাফল্যই আগের ভুলের উপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠে। ব্যর্থতাকে পরিশ্রমের প্রমাণ হিসেবে দেখলে তা কম ভয়ংকর মনে হয়।
৩. অস্বাস্থ্যকর তুলনা সীমিত করুন
সোশ্যাল মিডিয়ায় সাধারণত ফলাফলই দেখা যায়, পরিশ্রমের গল্প নয়। যে অ্যাকাউন্টগুলো আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়, সেগুলোর সংস্পর্শ কমান। মনে রাখবেন, সবার যাত্রাপথেই সংগ্রাম থাকে—কিন্তু সেগুলো খুব কমই অনলাইনে প্রকাশ পায়।
৪. সাহসের ছোট ছোট চর্চা করুন
আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে কাজের মধ্য দিয়ে। কোনো ভাবনা শেয়ার করুন, প্রশ্ন করুন, কিংবা সামান্য অপ্রস্তুত বোধ হলেও কোনো কিছুর জন্য আবেদন করুন। ছোট কিন্তু নিয়মিত ঝুঁকি নিতে শিখলে মন ধীরে ধীরে অস্বস্তিকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য বলে ভাবতে শেখে।
শিক্ষাবিদ Dr. Lata Swaminathan জোর দিয়ে বলেন, ব্যর্থতার ভয় কাটিয়ে ওঠা শুরু হয় একেবারে নিজের পরিচয়কে একাডেমিক ফলাফল থেকে আলাদা করার মাধ্যমে। কোনো হতাশাজনক ফলাফল শিক্ষার্থীর বুদ্ধিমত্তা, মূল্য বা সম্ভাবনাকে নির্ধারণ করে না। বরং তা ইঙ্গিত দেয়—কোনো নির্দিষ্ট কৌশল, পদ্ধতি বা প্রস্তুতিতে আরও উন্নতির প্রয়োজন আছে। শিক্ষার্থীরা যখন এটি বুঝতে পারে, তখন তারা ব্যর্থতাকে নিজেদের সক্ষমতার প্রতিফলন হিসেবে না দেখে উন্নতির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। তিনি বলেন, “আপনি আপনার ফলাফল নন। একটি পিছিয়ে পড়া মানে কৌশলের সমস্যা, আপনার সম্ভাবনার নয়।”
ড. স্বামিনাথন আরও পরামর্শ দেন—বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে—অস্বাস্থ্যকর তুলনা সম্পর্কে সচেতন থাকতে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রায়শই শুধু সাফল্য ও উদযাপন দেখা যায়; কিন্তু তার আগে থাকা সংগ্রাম, সন্দেহ ও ব্যর্থতা আড়ালেই থেকে যায়। এই নির্বাচিত উপস্থাপন অনেক সময় মনে করিয়ে দেয় যেন অন্যরা খুব সহজেই সফল হয়েছে, ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের অগ্রগতি খাটো করে দেখে। অতিরিক্ত তুলনা আত্মবিশ্বাস কমায় এবং ব্যক্তিগত উন্নয়ন থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেয়। ড. স্বামিনাথনের কথায়, “তুলনা আপনার অগ্রগতিকে আড়াল করে এবং আপনার সন্দেহকে বড় করে তোলে।” নিজের উন্নতি ও ব্যক্তিগত শেখার যাত্রার উপর মনোযোগ দিলে শিক্ষার্থীরা আরও সুস্থ ও টেকসই অনুপ্রেরণা গড়ে তুলতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে সাহসের ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে—যেমন প্রশ্ন করা, নিজের ভাবনা প্রকাশ করা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যেও চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, তিনি শিক্ষার্থীদের সাফল্যের সংজ্ঞা নতুন করে ভাবতে বলেন। “যখন আপনি প্রশংসা কতটা পেলেন তার বদলে কী শিখলেন—তা দিয়ে সাফল্য মাপেন, তখন ব্যর্থতা আর থামার জায়গা থাকে না; তা হয়ে ওঠে অগ্রগতির ধাপ।” দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে শিক্ষার্থীরা ব্যর্থতার ভয়কে রূপান্তরিত করতে পারে সহনশীলতা, আত্মবিশ্বাস ও বিকাশের ভিত্তিতে।
Translate from 'FREE PRESS JOURNAL SCHOOL'
Avijit Modak