07/11/2024
আমেরিকার ৪৭ তম রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হবেন ডোনাল্ড জন ট্রাম্প। প্রাক নির্বাচনী সমীক্ষায় যে সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল তা বাস্তবে মিলে গেছে। রিপাবলিকান পার্টির পদপ্রার্থী এবং প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৭৭টি ইলেক্টোরাল ভোট পেয়ে নির্বাচনে তার জয় সুনিশ্চিত করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র নেতারা ট্রাম্পকে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ট্রাম্পের জয়কে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন আগামী দিনে ভারত ও আমেরিকার বন্ধুত্ব আরও সুদৃঢ় হবে এবং দুটি দেশ বিশ্বে শান্তি ও প্রগতি আনতে যৌথ ভাবে সচেষ্ট হবে। ট্রাম্পের জয়ে ভারতীয়দের একটা বড় অংশ উচ্ছসিত হলেও কূটনৈতিক মহল মনে করেন ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভূমিকা কিন্তু সব সময় নির্ভরযোগ্য নয়। বিদেশ মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর মনে করেন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি হিসেবে ট্রাম্প বিশ্ব রাজনীতিতে সদর্থক ভূমিকা নেবেন। ভারত -আমেরিকার বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার সম্পর্ক এমনিতেই যথেষ্ট দৃঢ়। রাষ্ট্রপতি পদে কে আসবেন তার উপর এই সম্পর্কের স্থায়িত্ব নির্ভর করে না। ভারতের সাথে আমেরিকার বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার ধারা উত্তোরত্তর বৃদ্ধি পাবে এবং আগামী দিনেও অক্ষুন্ন থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।
একথা সত্য যে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি পদে ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ায় আগামী দিনে ভারত -আমেরিকার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়বে। তা সে বেআইনি অনুপ্রবেশ হোক বা সন্ত্রাসবাদ হোক বা বানিজ্য সম্পর্কিত বিষয় হোক। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে ট্রাম্পের বিশেষ সখ্যতাও দুই দেশের সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে সহায়ক হবে। দীপাবলি উৎসব উপলক্ষ্যে ট্রাম্প তার শুভেচ্ছা বার্তায় হিন্দু- আমেরিকান সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষায় তার উদ্যোগী হবার কথা ঘোষণা করেছেন। শুধু তাই নয় যে সমস্ত হিন্দু সম্প্রদায় বিরোধী অতিবাম ও ধর্মবিরোধী শক্তি হিন্দু- আমেরিকান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কাজ করবে তাদের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হবেন বলে জানিয়েছেন। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি যে নির্মম অত্যাচার হচ্ছে তার কঠোর নিন্দা করেছেন। এবারের নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ের পেছনে আমেরিকাবাসী ভারতীয়দের মূল্যবান অবদান আছে বলে মনে করা হয়।
বাইডেন প্রশাসনের কার্যকালে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কে বহু জটিলতার সৃষ্টি হয়। বাইডেন -হ্যারিস যৌথ নেতৃত্ব ভারতের স্বার্থের ব্যাপারে উদাসীনতা দেখিয়েছেন। আপাতভাবে দুই দেশের সম্পর্কে বাহ্যিক কোন পরিবর্তন না থাকলেও আমেরিকার প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার কার্যকলাপের কারণে দুই দেশের সম্পর্কের শীতলতা দেখা যায়। যেমন আমেরিকা পান্নুন হত্যা প্রচেষ্টায় ভারতকে জড়িয়ে বিভিন্ন বক্তব্য প্রচার করেছে। এছাড়াও ভারত-রাশিয়া ব্যবসায়িক সম্পর্ক, চীন -ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ব্যাপারে আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি সমালোচনামূলক ছিল। আমেরিকার হিউম্যান রাইটস সংগঠনগুলি অযথা ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা চালিয়েছে এবং বিভিন্ন ভাবে ভারতকে বিব্রত করার চেষ্টা করেছে। বাইডেন প্রশাসনের পরোক্ষ সমর্থন ছাড়া এধরনের কাজ করা সম্ভব নয়। অনেকে মনে করেন পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশের পর ভারতেও অস্থিরতা তৈরির একটা চেষ্টা শুরু হয়েছিল। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। বাইডেন প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে ভারতকে নানারকম চাপের মধ্যে রাখার চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু ভারতের শক্তিশালী গনতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতৃত্ব সমস্ত ধরনের ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে।
নমুরা নামের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা তাদের রিপোর্টে বলেছেন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি পদে ট্রাম্পের পুনরাভিষেক হলে আমেরিকার সাথে এশিয়া মহাদেশের সম্পর্কে এক ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে। তা সে অর্থনৈতিক কারণে হোক বা ভূরাজনৈতিক কারণের জন্য হোক। ট্রাম্পের প্রথম রাষ্ট্রপতি সময়কালে আমেরিকার সাথে চীনের বানিজ্য যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। যার রেশ আজও বর্তমান। চীনের আগ্রাসী অর্থনীতি রুখতে ট্রাম্প অনমনীয় মনোভাব নিয়েছিলেন। বর্তমান সময়েও ট্রাম্প চীনকে যথেষ্ট স্বস্তিতে থাকতে দেবে বলে মনে হয়না।
ট্রাম্পের আমলে ভারত ও আমেরিকার মধ্যে প্রতিরক্ষা এবং বানিজ্যের ক্ষেত্রে গভীর সংযোগ গড়ে ওঠে। বাইডেনের আমলে সেই সম্পর্কের গতি কিছুটা শ্লথ হয়েছিল। আগামী দিনে এই সম্পর্ক পুনরায় গতি প্রাপ্ত হবে বলে মনে করা হয়।
চীনের সামরিক শক্তির ক্রমবর্ধমান বিকাশকে আমেরিকা কোনো দিনই ভালো চোখে দেখেনি। চীনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে আগামী দিনে আমেরিকার সুপার পাওয়ার তকমা অক্ষুন্ন রাখা সম্ভব নাও হতে পারে। অন্যান্য ক্ষেত্রেও চীন আমেরিকার সামনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে। সুতরাং ভারত- প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের দাদাগিরি রুখতে ভারতের মতো উদীয়মান একটি স্ট্র্যাটেজিক শক্তির সাথে জোট গড়া আমেরিকার স্বার্থের জন্য জরুরি। ভারতের বিশাল বাজার এবং বিপুল জনসংখ্যা আমেরিকার স্বার্থ পূরণে সক্ষম। ভারতকেও মনে রাখতে হবে বানিজ্য এবং অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আমেরিকার সাথে টানা পোড়েন চলতে পারে। কোন কারণেই ট্রাম্প আমেরিকার বানিজ্য স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে অন্য কোনো দেশের সাথে বন্ধুত্ব করতে যাবে না। আমেরিকার অভিবাসন নীতি কঠোর হলে ভারতীয়দের ওয়ার্ক ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমেরিকার সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলেও ভারতের ভূরাজনৈতিক অভিনবত্ব আমেরিকার বৃহত্তর স্বার্থের জন্য জরুরি। সেক্ষেত্রে কে বা কোন দল নির্বাচনে জয়ী হলো তা কোনো বিষয় হয়ে দাঁড়ায় না। সুতরাং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে আমরা আশা করতে পারি ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমেরিকা এবং নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ভারত আগামী দিনে দুই দেশের সম্পর্কের বাঁধন আরও দৃঢ় করতে সক্ষম হবে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যুদ্ধ বন্ধ করে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হবে।