20/10/2025
শহীদ অধ্যাপক কমরুল হকের জীবনী এবং উনার স্বপ্নের পাতারকান্দি কলেজ নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা!👇👇👇
পাতারকান্দি রূপকার শিক্ষার প্রদীপ শহীদ অধ্যাপক কমরুল হক ১৯৬৪ সালের ৪ জুন জন্মগ্রহণ করে!
পাতারকান্দি সমষ্টির অন্তর্গত আছিমগঞ্জ এলাকার পূর্বগোল গ্রামের ইব্রাহিম আলী এবং খায়রুন্নেসা বেগমের পঞ্চম সন্তান হলেন শাহিদ অধ্যাপক কমরুল হক!
জীবন কালে উনি বেঁচে ছিলেন মাত্র ৩৪ বছর! স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনায় কেটে গিয়েছিল ২৫ বছর! পড়াশোনার সময় শেষে শিক্ষার আলো জ্বালাতে বৃহত্তর পাতারকান্দি জন্য কাজ করেছেন মাত্র ১৪ টি বছর!
এই ১৪ বছরের কাজের অবদান কোনদিনও আমরা ভুলতে পারবো না বৃহত্তর পাতারকান্দি বাসি! উনার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলি হল :-
১/ পাতারকান্দি কলেজ!
২/ পাতারকান্দি সর্বপ্রথম ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল!
৩/ ইসমাইলিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা।
৪/ পাতারকান্দি কলেজ অফ এডুকেশন!
৫/ পাতারকান্দি জুনিয়র কলেজ!
আরো অনেক একাধিক হাই স্কুল এবং বিভিন্ন শিক্ষা
প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন!
১৯৯৪ বা ১৯৯৫ সালে কমরুল হোক তখন করিমগঞ্জ কলেজের ছাত্র! ছাতবস্থায় তার বুকে কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্ম নেয়! একটাই উদ্দেশ্য! কলেজ হলে পাতারকান্দি এলাকার ছাত্র-ছাত্রীরা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারবে! শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে না!
চিরাচরিত গন্ডি ভেঙ্গে সামনের দিকে এগোতে থাকেন! কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে এই উদ্দেশ্যে কাজ করতে থাকেন! এর আগে ১৯৮৮ সালের পাতারকান্দি হইতরখায় ইসলামিয়া মাদ্রাসা স্থাপন করে!
মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করলেও সব সম্প্রদায়ের মানুষের চিন্তা করে মাদ্রাসার স্থাপন করে থেমে থাকতে পারেন না!
স্বপ্নের পাতারকান্দি কলেজের রূপরেখা নিয়ে বিভিন্ন জনের সাথে আলোচনা শুরু করেন! এর মধ্যে পাতারকান্দি মডেল হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষক তথা আমারও শিক্ষক লতুর রহমান স্যারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন!
প্রস্তুতির প্রাথমিক পর্বে ৫ সদস্যের একটি কোর কমিটি গঠন করেন অধ্যাপক কমরুল হক! তিনি সব সম্প্রদায়ের মানুষকে যুক্ত করেন কমিটিতে!
১/ কামরুল হক!
২/ রামেন্দ্র চৌধুরী!
৩/ মনোরঞ্জন দাস!
৪/ আহমেদ হোসেন!
৫/ লুৎফুর রহমান স্যারকে নিয়ে কোর কমিটি গঠন করেন
পাতারকান্দি এলাকায় কলেজে প্রয়োজনীয়তা বুঝাতে বিভিন্ন এলাকায় মিটিং, পথসভা, জনসভা করে মানুষকে বুঝান অধ্যাপক কমরুল হক স্যার!
শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে পাতারকান্দি রাজবাড়ী এলাকায় কলেজ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন! কারণ পাতারকান্দি থেকে রাজবাড়ী বেশি দূরত্বেও নয় এবং সেখানে সব সম্প্রদায়ের জনবসতিপূর্ণ এলাকা। সেখানে আবার কলেজ নির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ জমে ১১বিঘার উপরে পাওয়া গেছে!
এই জমি পাতারকান্দির তৎকালীন জেলাশাসক সুরেশ চন্দ্র কলেজের জন্য অনুমোদন দেন!
তার আগে ১৯৯০ সালের জুলাই মাস থেকে কলেজের পাঠদান শুরু করেন! পাতারকান্দির স্থানীয় রবীন্দ্রভবনে পাঠদান হতো! অধ্যাপকের দায়িত্ব ছিলেন করিমগঞ্জ কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ জ্ঞানেন্দ্র শর্মা মহাশয়!
এবার এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে কলেজের পরিচালনা কমিটি গঠন করে অধ্যাপক কমরুল হক!
পাতারকান্দি ব্লকের বিশিষ্ট সমাজসেবী শিক্ষাবিদ কোকিল সেনা সিনহা কে সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে আরো দশ জনকে দিয়ে পরিচালনা কমিটি গঠন করে!
এদের মধ্যে ছিলেন হাজী কাসিম আলী হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আহমেদ হোসেন, আবুল হোসেন, মৌলানা নাজিরুল হক ( উনার বড় ভাই মাদ্রাসার সুপারেন্টেন ), চৌরান সেনার রাজকুমার, শফিক উদ্দিন আহমেদ, পাতারকান্দির বিশিষ্ট সমাজসেবিকা গীতা দাস! সেক্রেটারির দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক কমরুল হকের নিজে!
এভাবে পাতারকান্দি রবীন্দ্র গ্রহণে প্রায় এক বছর পাঠদান চলে! তারপর কিছু বিষয় নিয়ে রবীন্দ্র ভবন কর্তৃপক্ষের সাথে মলমালিন্য হয়! তাই রবীন্দ্রভবন ছাড়তে হয় অধ্যাপক কমরুল হকের! রবীন্দ্র ভবন ছেড়ে দেওয়ার পর বেশ সমস্যায় পড়ে যান তিনি ! তবুও বিভিন্ন জায়গায় পাঠদান চালিয়ে যান!
রাজবাড়ীতে দ্রুত কলেজ নির্মাণের জন্য সর্বশক্তি দিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন অধ্যাপক কমরুল হোক ও তার সহকর্মীরা! অধ্যাপক কমরুল হক বললেন চলো কাজ শুরু করি টাকার অভাব হবে না এটা জনগণের সম্পত্তি তাই জনগণের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে কলেজ তৈরি করব!
যেমন কথা তেমন কাজ!
একদিকে কলেজের কাজ শুরু হল অন্যদিকে আর্থিক অনুদানের আবেদন নিয়ে বাড়ি বাড়ি যেতে লাগলেন অধ্যাপক কমরুল হক! সঙ্গে ছিলেন অরুন চৌধুরী, কুল চন্দ্র সিনহা, রাজকুমার সিনহা, গীতা দাস সহ আরো অনেক!
সাধ্যমত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন পাতারকান্দির সব সম্প্রদায়ের মানুষ! কেউ টাকা পয়সা, কেউ জিনিস দিয়ে,
ধান, চাল, সুপারি ইত্যাদি দ্রব্য সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করে কলেজের শ্রমিকদের কাজের পয়সা জোগাড় করা হত! কারণ সবার তো নগদ টাকা দিয়ে সাহায্য করার ক্ষমতা ছিল না! তাই যে যাহা পারতো তাহা দিয়ে সাহায্য করে যেত কলেজের জন্য!
স্থানীয় লোকজন এবং কলেজ ছাত্ররা কলেজের কাজে হাত লাগানো! তখন রাজবাড়ী এম এ স্কুলে ক্যাম্প করে ছাত্ররা থাকতেন কাজের সুবিধার জন্য ! ৩০ থেকে ৩৫ জন ছাত্ররা সারাদিন কলেজের জন্য কাজ করতেন! ক্যাম্পে তাদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা হতো!
তাদের সুবিধা ও অসুবিধার কথা জানতে সাদা মারুতি ব্যান করে কমরুল হক স্যার সেখানে গিয়ে খবর নিতেন এবং তাদের সাথে তিনি কখনো খাওয়া-দাওয়া করতেন। তিনি নিজেও শ্রমিকদের সাথে কলেজের কাজে হাত লাগাতেন!
কলেজের জন্য চাঁদার সংগ্রহ থেকে মাটি কাটার সহ সব কাজে ওনার উৎসাহের কোন কমতি ছিল না!
সহকর্মীদের সংঘ করে মাঝে মাঝে পার্শ্ববর্তী লোয়ারপুয়া, কটামনি চলে যেতেন এখান থেকে সস্তায় কলেজের দরজা জানালার কার্ড সংগ্রহের জন্য!
১৯৯৩ সালের মাঝামাঝি তখন কলেজের ভবন নির্মাণের কাজ পূর্ণ গতিতে চলছে তখন চরম অর্থসংকট দেখা যায়! তখন তহবিল সংগ্রহের জন্য অধ্যাপক কমল হোক ডিমাপুর এমনকি মুম্বাই পর্যন্ত চলে গেলেন!
সেখানে গিয়ে সেখানকার ব্যবসায়ী দের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ করে কলেজের কাজ চালিয়ে গেছেন! এখানে আমাদের পাতারকান্দি অঞ্চলে কিছু মানুষ বিভিন্ন কাজ ব্যবসায় থাকতেন এরা সাধ্য অনুযায়ী সাহায্য করে গেছেন!
১৯৯৪ সালের প্রথম দিকের তৈরি হয় কলেজের প্রথম ক্লাস রুম! এবং সেখানেই কলেজের পাঠদান শুরু!বছরখানেকের মধ্যে আরও দুটি ক্লাসরুম তৈরি হল!
পরিকাটামোর কাজ যখন মোটামুটি শেষ তোমার রাজ্য সরকারের উচ্চ শিক্ষা দপ্তরের প্রয়োজনীয় অনুমোদনের জন্য দৌড়াদৌড়ি শুরু করলেন অধ্যাপক কামরুল হক! এই এই সংক্রান্ত কাজে প্রায়ই গৌহাটি যেতে!
১৯৯৪ সালের শেষ দিকে গৌহাটি থেকে উচ্চ শিক্ষা দপ্তরের এক প্রতিনিধি দল পাতারকান্দি কলেজ পরিদর্শন করতে আসেন! কলেজে আসার সরাসরি রাস্তা না থাকায় প্রতিনিধি দল সেদিন সাফ জানিয়ে দেন রাস্তা না হলে কলেজের অনুমোদন কখনোই দেওয়া হবে না!
এবার মহা বিপদে পড়লেন অধ্যাপক কামরুল হক! জাতীয় সড়ক থেকে কলেজের দূরত্ব মাত্র ৮০০ মিটার! এই ৮০০ মিটার রাস্তা হলে সব ঝামেলা মিটে যাবে!
রাস্তার সমস্ত জমিটাই ছিল স্থানীয় কয়েকটি পরিবারের! শুরু হলো জমির মালিকদের সঙ্গে আলোচনা! আলোচনা ফলপ্রসু হলে রাস্তার ঝামেলা মিটে যায়! সাথে সাথে উচ্চশিক্ষা দপ্তরে অনুমোদনের ঝামেলা মিটে যায়!
কলেজ প্রতিষ্ঠার পিছনে মেয়েদেরও অবদান কম ছিল না! করুনা সিনা নেতৃত্বে মেয়েরা সব কাজের সহযোগিতা করেন!
পাতারকান্দির বিশিষ্ট সমাজসেবিকা গীতা দাস সামাজিক কাজের সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন! তাকে অধ্যাপক কমরুল হক মাসীমা বলে ডাকতেন!
কমরুল হককে পুত্রের মতো স্নেহ করতেন গীতা দাস! গীতা দাসকে তিনি কলেজের কাছে যুক্ত করেন এবং গীতা দাসও কলেজের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন!
একদিন কলেজের দরজা জানালার কার্ড সংগ্রহ করতে লোয়ারপোয়া যান! কাঠ সংগ্রহ করে ভোররাতে কাঠ নিয়ে আসতে ফরেস্টের লোকেরা গাড়ি আটকে ফেলেন! তখন কমরুল হককে গাড়িতে বসিয়ে গীতা দাস নেমে ফরেস্টার লোকদের সাথে আলোচনা করে কাঠ নিয়ে আসেন!
১৯৯৫ সালের শেষ এবং ১৯৯৬ সালের প্রথম দিকে পাতারকান্দি কলেজের ভবন নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ হয়ে যায় ! তখন কলেজের সব কিছু ঠিকঠাক হলে ছাত্র ভর্তির হার ও বাড়তে থাকে!
কমরুল হক তখন তিনি বদরপুর নবীনচন্দ্র কলেজের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক হিসাবে কাজে যোগ দেন! বদরপুর নবীনচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনার সাথে সাথে পাতারকান্দি কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।
বদরপুর তখন কমরুল হকের রুমমেট ছিলেন সদ্য প্রাক্তন নবীনচন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ মোর্তজা হোসেন! কমরুল হকের সহকর্মীরা বলেন আমরা কলেজের কাজে যুক্ত ছিলাম কিন্তু কমরুল হক ভোরে ডেকে জড়ো করতো!
তাই কমরুল হকের এর জন্য আজ পাতাকান্দি কলেজ!
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ১৯৯৮ সালের ১৯ অক্টোবর শিক্ষা সংক্রান্ত কাজে গৌহাটি থেকে আসার সময় এক রহস্যময় পথ দুর্ঘটনা অধ্যাপক কমরুল হকের জীবন দীপ নিভে যায়!
তাই ১৯ অক্টোবর প্রতিবছরই শহীদ অধ্যাপক কমরুল হকের মৃত বার্ষিকী পালন করা হয় এবং রহস্যময় মৃত্যু সিপিআই তদন্তের দাবি জানানো হয় কিন্তু আজ পর্যন্ত শীঘ্রই তদন্ত দেওয়া হয়নি! তাই মৃত্যুর রহস্য ও রহস্যই রয়ে গেল!
✍️ Hussain Ahmed