18/08/2026
কী কথা ছিল, আর কী হলো!
কথা ছিল এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করব আমরা। কালনাবাসী তাকিয়ে দেখবে কালনা কলেজের গ্ল্যামার। আড়ম্বরের শীর্ষে থাকবে কালনা কলেজের শোভাযাত্রা। প্রশাসনকে বলে পুরো রাস্তা খালি রাখার ব্যবস্থা করা হলো, MLA-এর অন্য অনুষ্ঠান বাতিল করা হলো। যাঁর থাকার কথা ছিল ৩০-৪০ মিনিট, তিনি প্রায় দেড় ঘন্টা সময় দিলেন। তিনটে টোটো বড় বড় সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে প্রস্তুত হয়ে বসে থাকল। আদিবাসী পোশাকে মাদল নিয়ে স্নেহের ছাত্রছাত্রীরা কী অপরূপ সাজে সেজে এল, NCC শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে খাকিতে সারি দিল, লাল-সাদা বাঙালি শাড়িতে B.Ed. বিভাগ দেশের গানের আয়োজন করল। ১২০০-এর বেশি ছেলে-মেয়ে প্রবল বৃষ্টির পূর্বাভাস উপেক্ষা করে ভিজতে ভিজতে, ছাতা মাথায় কলেজে এল। দলে দলে গেরুয়া, সাদা আর সবুজ পোশাকে ছাত্ররা এল। বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা হবে, হাতে প্ল্যাকার্ড, তিরঙ্গা, গান, বাজনা, স্লোগান দিতে দিতে কালনা কলেজের গৌরব প্রচারে বেরোব আমরা। কালনাকে দেখাব কালনা কলেজের জৌলুশ।
কিন্তু পাগলিনী প্রকৃতির মাথা খারাপ। কান্না তার আর থামে না!
অপেক্ষায় সাড়ে বারোশো ছাত্রছাত্রী। বৃষ্টি কখন থামে! বৃষ্টি আর থামে না। আর আমরাও থামলাম না। দেখলাম সত্যিকারের ছাত্রছাত্রী কারা। দেখলাম গুরু-নির্দেশ পালনের মনন আজকের দিনে একেবারে মুছে যায়নি।
বেলা দেড়টা পেরিয়ে যায় যায়। দূরের থেকে আসা ছেলে-মেয়েদের ফিরতে হবে, ট্রেন নেই আর! প্রায় অর্ধেক ছেলে-মেয়েকে বাধ্য হয়েই ফিরে যেতে হল! তারপরেও এদিক থেকে ওদিক, দৌড়ে দৌড়ে লাইন তৈরি করা হলো। অনুষ্ঠান হলো। এটা কী অনুষ্ঠান হলো! আমাদের স্লোগানে, মাইক ছাড়া স্লোগানে কালনা কলেজ কেঁপে গেল। খালি গলার স্লোগানে এত জোর কোথা থেকে এল? অন্তর থেকে গো... প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসার অন্তর থেকে!
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। থামছে না। ছাত্রছাত্রীরা নিজের থেকে বাইরে র্যালি করতে উৎসাহী! বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে র্যালি হলো। অগোছালো - আগের পরিকল্পনার কাছে নস্যি মাত্র। কিন্তু রাস্তায় লোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ভিডিও করল। কেন? ক’জন লোক র্যালির ভিডিও করে? না, করে না তেমন! কিন্তু এটা করল। কারণ এমন উৎসাহের র্যালি তারা দেখেনি। একটা কলেজের এত ছাত্রছাত্রী, এরকম আন্তরিকতার সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে জাতীয় পতাকা হাতে র্যালি করছে—এ জিনিস তারা দেখেনি। তাই রেকর্ড করে নিয়ে যাচ্ছে, কাউকে দেখাবে বলে!
আজ আমরা যা চেয়েছিলাম, তা করতে পারিনি।
আজ আমরা যতটা জৌলুশ আনতে পারতাম, তার এক ভাগ-ও আসেনি।
কিন্তু অন্তর থেকে “বন্দে মাতরম” বলেছি। অন্তর থেকে চিৎকার করে “ভারতমাতাকে” ডেকেছি। রাষ্ট্র-শত্রুদের বুঝিয়ে দিয়েছি—পাগল প্রকৃতিকে মানি না, তুমি হে কোন দূর ছার!
মাদল বাজিয়ে, গান গেয়ে কালনাবাসীকে জানাতে পারিনি কালনা কলেজের ক্ষমতা কী। কিন্তু শেষে মাদলের তালে তালে Teaching, Non-Teaching, SACT, Full-time, Senior-junior—একসঙ্গে হাত ধরে নেচেছি এবং না উচ্চারণ করেও অন্তরে অন্তরে চিৎকার করে বলেছি— আর নয়, এবার-
"এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান!"
স্বপন দা, অমিত দা, মহাদেব দা, গোবিন্দ দা, রাফাজ দা, কৌশিক, আশিস, অসীম দা, বিকাশ দা, অনিকেত দা, পল্লব দা, রজত দা, দীপঙ্কর দা, অভিষেক দা, বিশ্বজিৎ দা, জয়দীপ দা, দীনবন্ধু দা, মহুয়া দি, দেবাশিস বাবু—এঁদের প্রণাম করছি। এঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম, উদ্যোগ ও সহযোগিতা ছাড়া আজকের দিনটি লেখা হতো না। আমাদের TIC-কে তাঁর অসীম উদ্যম, সাহস ও জেদের জন্য ধন্যবাদ। বৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি আরো হাঁটতে চেয়েছিলেন। ছাত্রদের ইচ্ছে থাকলেও, তিনি সাহস না দিলে হয়ত আমরা বৃষ্টিতে ছাত্রদের ভেজাব কি না সেই দ্বন্দেই আটকে যেতাম!
সুনম্রা দি, সুদেষ্ণা দি, পৌষালী দি, এবং অন্যান্য সকলকে, যাঁরা ওপরে, হলে সাথে থেকেছেন, কিন্তু পৌঁছাতে পারিনি বলে দেখতে পাইনি, তাঁদের প্রত্যেককে ধন্যবাদ পাশে থাকার জন্য, B.Ed.এর আমার স্নেহের ছাত্ররা, সব ABVP volunteers দের, ব্যানার ডিজাইন টিমকে, সম্পূর্ণ গানের টিমকে, সম্পূর্ণ আদিবাসী সাংস্কৃতিক টিমকে, এন সি সি টিমকে, অনেক ভালোবাসা, এই দিনটিকে আমাদের সঙ্গে থেকে স্মরণীয় করে তোলার জন্য।
এঁরা না থাকলে আজকের দিনটি বিশেষ পাতায় লেখা হতো না।
হয়তো আমরা আজ পরিকল্পনা অনুযায়ী শোভাযাত্রাটি একটুও করতে পারিনি।
হয়তো জৌলুশ দেখাতে পারিনি।
হয়তো আমাদের প্রস্তুতির একশো ভাগের এক ভাগও দেখাতে পারিনি।
কিন্তু আজ আমরা আরও বড় কিছু দেখেছি—
কালনা কলেজকে ভালোবাসে এমন ছাত্রছাত্রী এখনো আছে!
শিক্ষকের আবেদন মানে এমন ছাত্রছাত্রী এখনো আছে!
অন্ধকারের কাছে হার না মানা ছাত্রছাত্রী এখনো আছে!
আর সবচেয়ে বড় কথা—কালনা কলেজের জন্য একসঙ্গে দাঁড়াতে পারে এমন শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী, ছাত্রছাত্রী একসাথে আছে!
বন্দে মাতরম।
জয় হিন্দ।
জয় কালনা কলেজ।
- তনুময় পণ্ডা
বিভাগীয় প্রধান, বি. এড. বিভাগ, কালনা কলেজ