14/09/2021
#জানা_অজানা - ১৭
❝সাপের বিষের প্রকারভেদ!❞
সাপের বিষ একধরণের বিশেষ লালা যাতে খুবই উচ্চপর্যায়ের ভিন্ন ভিন্নভাবে কার্যকরী আলাদা আলাদা প্রোটিন ও এনজাইম উপাদান রয়েছে। যেগুলোর দরুন এদের রকম ও তীব্রতায় রয়েছে পার্থক্য। সেই অনুযায়ী বহু উপাদান আর কার্যকরণের প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে সাপের বিষ মূলত ৩ প্রকারের হয়ে থাকে।
১. Neurotoxic Venom বা Neurotoxin (স্নায়বিক বিষ)
২. Hemotoxic Venom বা Hemotoxin (রক্তের উপর সরাসরি হামলাকারী বিষ)
৩. Cytotoxic Venom বা Cytotoxin (কোষঘাতি বিষ)
বিষের এই ধরণগুলোর মধ্যে আছে আবার আরও বহু প্রকারভেদ। রয়েছে তাদের কর্মপ্রক্রিয়া।আর এসব বিষের মাঝে নানারকম উপাদানের মাত্রার তারতম্য অনুযায়ী ভিন্নতা হয়ে থাকে। যার দরুন কামড় খাওয়া রোগীর দেহে এগুলোর প্রতিক্রিয়াও হয় ভিন্ন ভিন্ন রকমের৷
:
যে সকল রাসায়নিক পদার্থ স্নায়ুকোষ,নিউরন,নার্ভাস টিস্যু ও স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ও বিষক্রিয়া ঘটায় তাদেরকে নিউরোটক্সিন(Neurotoxin) বলে।
Neurotoxin শব্দতা এসেছে 'Neuron' (nerve অর্থাৎ স্নায়ু) এবং 'toxicum' (poison অর্থাৎ বিষ) থেকে।
নিউরোটক্সিনের প্রভাবে স্নায়ুকোষ গুলো বুঝতে পারে না যে তাকে কি কাজ করতে হবে।আমরা রোজ প্রতি মুহূর্তে যে কাজ গুলো করি তার প্রায় প্রত্যেকটির পিছনেই স্নায়ুতন্ত্রের অবদান রয়েছে।আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস, হেটে চলে বেড়ানো,দেখা, শওনা,ঘ্রাণ নেয়া,স্বাদ অনুভব করা -এসবকিছুই স্নায়ুতন্ত্র দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়।
সাপের বিষের নিউরোটক্সিন এক স্নায়ু কোষ থেকে অন্য স্নায়ুকোষে খবর আদান প্রদানে বাধা দিয়ে শারীরবৃত্তীয় কাজের বিঘ্ন ঘটায়।
এর ফলে নিউরোটক্সিন যুক্ত সাপের বিষ প্রাণীর দেহে ঢুকলে সাধারণত এই লক্ষ্মণ গুলো দেখা দেয়ঃ
১. চোখ স্থির হয়ে যায় (ptosis)
২. ধীরে ধীরে তার শ্রবণশক্তি হ্রাস পায় এবং স্পষ্ট ভাবে কথা বলা যায় না,কথা জড়িয়ে আসে।
৩. চলাফেরা করতে পারে না (paralysis)
৪. শ্বাসনালীর প্যারালাইসিসজনিত কারণে ফুসফুসের সংকোচন-প্রসারণ ক্ষমতা শেষ হলে ভিক্টিমের মৃত্যু হয়।
বিষের নিউরোটক্সিন উপাদান সাপের শিকারকে পঙ্গু করে ধীরে ধীরে মেরে ফেলে। আর এভাবেই নিউরোটক্সিন যুক্ত সাপেরা শিকার করে।
যেসব সাপের বিষে নিউরোটক্সিন ভেনম থাকেঃ Common Krait (কালাচ), Banded Krait (শঙ্খিনী),
Monocled Cobra (কেউটে), Spectacled Cobra (গোখরো) [গোখরো আর কেউটেতে cardiotoxin ও থাকে], Black Mamba ... ইত্যাদি।
:
হ্যামোটোক্সিন (হেমোটোক্সিন বা হেমটোটোক্সিন নামেও পরিচিত) টক্সিন যেগুলি লাল রক্তের কোষ ধ্বংস করে, রক্তের ক্লোটিং এ বাধা দেয় এবং ব্যাপক টিস্যু ক্ষতি করে।হেমোটক্সিন শব্দটি টক্সিন হিসাবে ব্যবহার করা হয় যা রক্তকে ক্ষতি করে এবং অন্যান্য টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত করে।
হিমোটক্সিন রক্তের লোহিত কণিকার ভাঙন ঘটায়। রক্তের জমাট বাঁধাকে প্রতিহত করে। ফলে টিস্যু বা কলার মৃত্যু হয় এবং অঙ্গ নষ্ট হয়। লোহিত রক্ত কণিকার ভাঙ্গনের ফলে রক্ত জমাট বাঁধা ব্যাহত হয় এবং অভ্যন্তরীণ রক্তপাত শুরু হয়। যেহেতু এখানে লোহিত রক্ত কণিকাগুলো মারা যায় তাই মৃত রক্ত কণিকাগুলো যথাযথভাবে কিডনির কার্যক্রমকে পরিচালিত হতে দেয় না। টক্সিনগুলো প্লাটিলেটস ও অন্যান্য রক্ত কোষগুলোকে একত্রে আটকে ফেলে। রক্তবাহী নালীগুলোতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়। এর ফলে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে রোগীর মৃত্যুর কারন হতে পারে।
একটি হেমোটক্সিক উপাদান থেকে ক্ষতি নিয়মিতভাবে খুব যন্ত্রণাদায়ক এবং স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে এবং গুরুতর হলে মৃত্যু হতে পারে।
হেমোটক্সিন শুধুমাত্র একটি বিষ হিসাবে কাজ করে না, এটি হজমে কাজে লাগে ; বিষাক্ততার অংশে প্রোটিন ভেঙ্গে ফেলতে পারে, শিকারের মাংসকে হজম করতে সহজ করে তোলে।
যেসব সাপে হেমোটক্সিন বিষ থাকে :
some species of Cobras, most of the Vipers,
যেমন: Pit Vipers (mix type venom), Rattlesnakes [কিছু মাত্রায় নিউরোটক্সিনও থাকে]
Russell’s Viper(চন্দ্রেবোড়া)...... ইত্যাদি।
[রাসেল ভাইপারে নিউরোটক্সিনও থাকে]
:
সাইটোটক্সিন দেহকোষ নষ্ট করে। এটি কোষকে ধ্বংস করার পর সেগুলোকে পঁচিয়ে ফেলে এবং তরলীকরণ করতে সহায়তা করে। সাইটোটক্সিন আংশিকভাবে শিকারকে হজম করতে সহায়তা করে। সাধারণত সাপ যেখানে কামড় দেয় সেখানকার কোষগুলোই বেশি ধ্বংস হয়। কামড়ের স্থান ফুলে যায়,প্রচুর রক্তপাত হয়, পঁচন শুরু হয় এবং অসহনীয় যন্ত্রণা হয়।
যেসব সাপের মধ্যে সাইটোটক্সিন থাকে :
King Cobra(শঙ্খচূড়) [ কিং কোবরার মধ্যে সাইটোটক্সিন এবং নিউরোটক্সিন দুইটাই থাকে এবং কিছু মাত্রায় কার্ডিওটক্সিন থাকে]
Gaboon viper, Puff Adder.... ইত্যাদি।
ভাইপারদের কামড় সাধারণত সব থেকে ন্যাসটি মানে একদম জঘন্য হয়।
Puff adder এর টক্সিক ইফেক্ট ভাইপারদের মধ্যে সব থেকে বেশি। কামড়ানোর স্থানে অস্বাভাবিক পেইন হয়, অনেক বেশি ফুলে যায় এবং নেক্রোসিস( মাংসপেশীর পঁচন) হয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নিলে নেক্রোসিস আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে এবং ছড়িয়ে পড়ে।
★এছাড়াও কিছু বিশেষ ধরনের টক্সিন রয়েছে সেগুলো হচ্ছে:-
-কার্ডিওটক্সিন(Cardiotoxin),
-মায়োটক্সিন(Myotoxin) ও -নেফ্রোটক্সিন(Nephrotoxin)।
-Cardiotoxin:-
কার্ডিওটক্সিন হৃদপিন্ডের ওপর কাজ করে হৃদপিণ্ডের কোষগুলোকে নষ্ট করে। নেফ্রোটক্সিন কিডনির কোষকে ধ্বংস করে ও কিডনির কাজকে ব্যহত করে। অপরদিকে মায়োটক্সিন পেশীর কোষগুলোকে নষ্ট করে পেশীর কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এভাবেই এক সময় শিকারের মৃত্যু হয়।
কিছু কিছু সাপে সাধারণত এসব ভেনমের মিক্সার থাকে।
যেমন : Rattlesnake এ একইসাথে hemotoxin ও কিছু মাত্রায় Neurotoxin থাকে।
আবার Western Diamondback Rattlesnake এ একই সাথে hemotoxin,cytotoxin এবং myotoxin থাকে।
ভাইপার প্রজাতির সাপগুলাতে এই মিক্সার ভেনমের জন্যই এরা অনেক ডেডলিয়েস্ট হয়।
আবার King Cobra তে একই সাথে cytotoxin,neurotoxin, alpha-neurotoxin, three-finger toxin এবং Cardiotoxin থাকায় এর বিষ অত্যন্ত জটিল মিক্সার এবং কিং কোবরা এক কামড়েই ৪০০-৬০০ মি.গ্রা. ভেনোম ইঞ্জেক্ট করতে পারে। কামড়ানোর ৩০ মিনিটের মধ্যেই ভিক্টিমের মৃত্যু নিশ্চিত যদি এন্টিভেনম না দেয়া হয়।
বাংলাদেশের স্থলে সাধারণত যেসব সাপ পাওয়া যায় তাদের প্রায় সবই নিউরোটক্সিন বিষধারী।এদের মধ্যে কালাচ(common krait), কেউটে(monocled cobra) এবং গোখরো(spectacled cobra) অন্যতম। ভারত এবং বাংলাদেশে প্রতি বছর এই সাপগুলার কামড়েই সব থেকে বেশি মানুষ মারা যায়।
কালাচের বিষ ধীরে ধীরে ছড়ায়। কামড়ানোর পরে মোটামুটি ৪-৫ ঘন্টার আগে মৃত্যু হয় না সাধারণত যদি না বিষের মাত্রা খুব বেশি হয়।তাই এন্টিভেনম দেওয়ার যথেষ্ট সময় থাকে। আর কালাচের কামড়ের লক্ষ্মণ প্রকাশ পেতেও একটু দেরি হয়। তাই সাপে কাটার সাথে সাথে বা কোনভাবে যদি সাপে কাটা শনাক্ত করতে না পারেন তাহলে দুই একটা লক্ষ্মণ প্রকাশের সাথে সাথেই কোনো রকম দেরি না করে হাসপাতালে যাবেন।
আর কেউটে বা গোখরো সাপের কামড় সবচেয়ে মারাত্মক। কেননা এদের মধ্যে নিউরোটক্সিন এর পাশাপাশি কার্ডিওটক্সিন থাকে। তাই কামড়ানোর ১০-১৫ মিনিট পরেই হার্টবিট অস্বাভাবিক হয়ে যায় এবং এক ঘন্টার মধ্যেই হার্ট ফেইল করে ভিক্টিম মারা যেতে পারে।
সুতরাং সাপে কাটার সাথে সাথেই হাসপাতালে নিয়ে যাবেন। রোগীকে না হয় বাঁচানো সম্ভব না।
#তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া এবং বিভিন্ন আর্টিকেল থেকে র্যান্ডমলি সংগৃহীকৃত
Animal RAF society of Bangladesh (Animal Rescue, Adoption & Foster)
Collection