15/05/2026
⭕উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যের মধ্যে নবম স্থান অধিকার করার খবর যখন পৌঁছয় গুজরাতে, তখন সাগর ছুটি নিয়েছে হোটেলের কাজ থেকে। কারণ, সেদিনই প্রকাশিত হয়েছে ফলাফল। ফোনের ওপার থেকে তার গলায় তখনও অবিশ্বাসের সুর “রাজ্যে র্যাঙ্ক করব কোনওদিন ভাবিনি। শুধু ভাল রেজাল্ট করার জন্য পড়াশোনা করেছি।” উচ্চ মাধ্যমিকে সাগরের প্রাপ্ত নম্বর ৪৮৮।
সাগরের বাবা মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডল গুজরাতের একটি হোটেলে ঝাড়ু-পোছা দেওয়ার কাজ করেন। মা সুষমা মণ্ডল কাজ করেন একটি হাসপাতালে। সংসারের অভাবে মাধ্যমিকের পর গ্রামের বাড়িতে একাই থাকতে শুরু করে সাগর। নিজের মুখে জানিয়েছে, “আমি একাই রান্না করে খেতাম, একাই থাকতাম। বাড়িতে আর কেউ ছিল না।” অভাব ছিল, কিন্তু স্বপ্নে ঘাটতি ছিল না। মাধ্যমিকে ৬৪৬ নম্বর পাওয়ার পর কালনা মহারাজা হাই স্কুলে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয় সাগর। বাংলা, ইংরেজির পাশাপাশি ইতিহাস, ভূগোল, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা শুরু করে। প্রত্যেক বিষয়ের জন্য আলাদা টিউশন ছিল। কিন্তু সেই টিউশনের ফি জোগানোর সামর্থ্য পরিবারে ছিল না। তখনই পাশে দাঁড়ান শিক্ষকরা। কেউ অর্ধেক ফি নিয়েছেন, কেউ আবার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়িয়েছেন।তবে উচ্চমাধ্যমিকের পর নতুন লড়াই শুরু হয়। IAS হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল সাগর। দিল্লিতে গিয়ে কোচিং করার ইচ্ছাও ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নের সামনে দাঁড়িয়ে যায় অর্থের অভাব। তাই পরীক্ষার পর সেও চলে যায় বাবা-মায়ের কাছে গুজরাতে। এখন সে-ও একই হোটেলে ঝাড়ু-পোছার কাজ করে। মাসে মেলে ১৫ হাজার টাকা।
ফোনে সাগর জানায়, “আইএএস পড়ার অনেক খরচ। তাই উচ্চমাধ্যমিকের পর আমি গুজরাতে চলে আসি। এখানে কাজ করছি টাকা জমানোর জন্য।” একদিকে রাজ্যের মেধাতালিকায় নাম, অন্যদিকে হাতে ঝাড়ু! এই বৈপরীত্যই যেন আরও বড় করে তুলে ধরছে সাগরের সংগ্রামকে। ঠিক যেমন 12th Fail ছবির মনোজ কুমার শর্মা দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে UPSC-র স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। বাস্তবের IPS অফিসার মনোজ কুমার শর্মার জীবনকাহিনীর উপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছিল সেই সিনেমা। তবে সাগরের গল্প শুধু সাফল্যের নয়, এই গল্প সমাজেরও। যেখানে একদল শিক্ষক টাকার অভাবে কোনও ছাত্রের স্বপ্ন ভাঙতে দেননি। যেখানে এক পরিযায়ী শ্রমিক পরিবারের ছেলে সমস্ত প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেই রাজ্যের সেরা দশে জায়গা করে নিয়েছে। এখনও সাগরের চোখে সেই একই স্বপ্ন IAS হওয়ার। আর হয়তো কোনও একদিন, গুজরাটের হোটেলে ঝাড়ু হাতে কাজ করা এই ছেলেটির গল্পই নতুন করে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে হাজার হাজার সংগ্রামী ছাত্রছাত্রীর কাছে।
সূত্র : NEWS18 বাংলা