06/04/2026
মহাকাশে যখন কোনো নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি আমাদের থেকে দূরে সরে যায়, তখন তা থেকে নির্গত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রসারিত বা বৃদ্ধি পায়। দৃশ্যমান বর্ণালীতে এই পরিবর্তন নীল প্রান্ত থেকে লাল প্রান্তের দিকে ঘটে বলে একে লাল সরণ বা Redshift বলা হয়। বিপরীতভাবে, কোনো বস্তু যদি আমাদের দিকে এগিয়ে আসে, তবে তার আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সংকুচিত হয় এবং বর্ণালীর লাল অংশ নীলের দিকে সরে যায়। তরঙ্গের এই আপেক্ষিক পরিবর্তনকেই বলা হয় ডপলার ক্রিয়া (Doppler Effect)।মহাবিশ্বের নিরন্তর প্রসারণের ফলে অধিকাংশ গ্যালাক্সিই বর্তমানে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, যার ফলে তাদের আলোতে লাল সরণ পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে সুদূর অতীতের আদি গ্যালাক্সিগুলো, যা দৃশ্যমান মহাবিশ্বের প্রান্তসীমায় অবস্থিত, সেগুলো অত্যন্ত দ্রুতগতিতে দূরে সরে যাচ্ছে। এই অতি-দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলোর লাল সরণের মাত্রা এতটাই বেশি যে, তাদের নিঃসৃত অতিবেগুনি (UV) রশ্মির ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্য (< 400 nm) বৃদ্ধি পেতে পেতে দৃশ্যমান বর্ণালী অতিক্রম করে অবলোহিত বা ইনফ্রারেড (> 700 nm) তরঙ্গে রূপান্তরিত হয়।বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী, আমাদের নিজস্ব মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিও মহাবিশ্ব সৃষ্টির কয়েকশ মিলিয়ন বছরের মধ্যেই গঠিত হয়েছিল। আমাদের গ্যালাক্সিতে এমন কিছু প্রাচীন নক্ষত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে যাদের বয়স প্রায় ১৩০০ কোটি বছর।মহাজাগতিক লাল সরণ বা z-এর মান নির্ণয় করা বেশ সহজ এবং গাণিতিকভাবে সুনির্দিষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, আমরা হাইড্রোজেন পরমাণুর ইলেকট্রন বিন্যাস লক্ষ্য করতে পারি। যখন কোনো ইলেকট্রন পরমাণুর পঞ্চম কক্ষপথ থেকে দ্বিতীয় কক্ষপথে ঝাঁপ দেয়, তখন তা থেকে একটি নির্দিষ্ট ফোটন বা আলোক কণা নির্গত হয়। গবেষণাগারে মেপে দেখা গেছে, এই ফোটনের তরঙ্গদৈর্ঘ্য ঠিক ৪৩৪.০৫ ন্যানোমিটার। উল্লেখ্য, উচ্চতর কক্ষপথ থেকে দ্বিতীয় কক্ষপথে ইলেকট্রনের এই স্থানান্তরের ফলে সৃষ্ট বর্ণালীকে বামার সিরিজ (Balmer Series) বলা হয়।পঞ্চম থেকে দ্বিতীয় কক্ষপথের এই নির্দিষ্ট নিঃসরণকে বলা হয় Hγ (এইচ-গামা), যা আমাদের চোখে বেগুনি বর্ণের দেখায়। তবে মহাবিশ্বের প্রসারণের কারণে বহু দূরের গ্যালাক্সি থেকে আসা এই একই Hγ ফোটনের তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যায়।ধরা যাক, জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের (JWST) NIRSpec যন্ত্র ব্যবহার করে একটি সুদূর গ্যালাক্সির বর্ণালী বিশ্লেষণ করা হলো। সেখানে দেখা গেল, ল্যাবে পাওয়া ৪৩৪.০৫ ন্যানোমিটারের সেই Hγ রেখাটি এখন ৩৭৬১.১৫ ন্যানোমিটারে গিয়ে পৌঁছেছে। এখানে ৩৭৬১.১৫ ন্যানোমিটার (বা ৩.৭৬১ মাইক্রোমিটার) তরঙ্গদৈর্ঘ্যটি আর দৃশ্যমান সীমানার মধ্যে নেই। এটি এখন নিকটবর্তী অবলোহিত (Near-Infrared) বর্ণালীর অন্তর্ভুক্ত। এখানে 'নিকটবর্তী' বলতে বোঝানো হচ্ছে যে, এই অবলোহিত তরঙ্গটি দৃশ্যমান আলোক বর্ণালীর ঠিক পরেই অবস্থান করছে।z = 7.66 লাল সরণসম্পন্ন একটি গ্যালাক্সি আমাদের থেকে ঠিক কত দূরে অবস্থিত? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কিছুটা জটিল, কারণ এটি মহাবিশ্বের গঠন এবং এর প্রসারণের হারের ওপর নির্ভর করে।
যদি আমরা মহাবিশ্বের বর্তমান গ্রহণযোগ্য মডেল অনুযায়ী ধরে নিই যে—মহাবিশ্বের মোট শক্তির ৭৩% তমোশক্তি (Dark Energy), ২৭% বস্তু (Matter) এবং হাবল ধ্রুবক (Hubble Constant) ৭১ কিমি/সেকেন্ড/মেগাপারসেক।এই গ্যালাক্সি থেকে আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে সময় নিয়েছে প্রায় ১৩০০ কোটি (১৩ বিলিয়ন) বছর।মহাবিশ্বের ক্রমাগত প্রসারণের ফলে এই মুহূর্তে গ্যালাক্সিটির প্রকৃত দূরত্ব আমাদের থেকে প্রায় ৩০০০ কোটি (৩০ বিলিয়ন) আলোকবর্ষ।অর্থাৎ, ৩০ বিলিয়নকে (7.66 + 1) দিয়ে ভাগ করলে দেখা যায়, আলো নিঃসরণের সময় গ্যালাক্সিটি আমাদের থেকে মাত্র ৩৫০ কোটি (৩.৫ বিলিয়ন) আলোকবর্ষ দূরে ছিল।সবসময় গ্যালাক্সির বর্ণালীতে স্পষ্ট রেখা খুঁজে পাওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা 'লাইম্যান ব্রেক' (Lyman Break) নামক একটি কৌশল ব্যবহার করেন।হাইড্রোজেন পরমাণুর উচ্চতর কক্ষপথ থেকে ইলেকট্রন যখন প্রথম কক্ষপথে নেমে আসে, তখন যে ফোটন বিকিরিত হয় তাকে লাইম্যান সিরিজ (Lyman Series) বলা হয়।যেসব গ্যালাক্সিতে নতুন নক্ষত্র জন্ম নিচ্ছে, সেখানে প্রচুর হাইড্রোজেন গ্যাস বা নীহারিকা থাকে। নতুন নক্ষত্রের অতিবেগুনি (UV) রশ্মি যখন এই নীহারিকার ভেতর দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তখন হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো সেই শক্তি শোষণ করে নেয়।
বিশেষ করে ১২১ ন্যানোমিটারের নিচের প্রায় সমস্ত অতিবেগুনি রশ্মি এই গ্যাস দ্বারা শোষিত হয়ে যায়। ফলে ওই গ্যালাক্সির বর্ণালী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ১২১ ন্যানোমিটারের নিচে কোনো আলো নেই—সেখানে একটি বড় 'খাদ' বা শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। একেই বলা হয় লাইম্যান ব্রেক।দূরবর্তী গ্যালাক্সির ক্ষেত্রে এই 'লাইম্যান ব্রেক' বা অন্ধকারের অংশটিও ডপলার ক্রিয়ার কারণে লাল সরণ বা Redshift-এর শিকার হয়। ফলে দৃশ্যমান বা অতিবেগুনি আলোর পরিবর্তে এই ব্রেক বা খাদটি অবলোহিত (Infrared) তরঙ্গে গিয়ে ধরা পড়ে। এই স্থানান্তরের মাত্রা দেখেই বিজ্ঞানীরা অতি দূরবর্তী গ্যালাক্সির দূরত্ব নিখুঁতভাবে পরিমাপ করতে পারেন।চিত্র ২-এ একটি লাইম্যান ব্রেক গ্যালাক্সি দেখানো হয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে, এই গ্যালাক্সির নীহারিকা লাইম্যান-আলফা রেখার নিচের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সমস্ত ফোটন শোষণ করে নিয়েছে। ডপলার লাল সরণের (Redshift) প্রভাবে এই 'ব্রেক' বা খাদটি এখন প্রায় ১৬০০ ন্যানোমিটারে পরিলক্ষিত হচ্ছে। গাণিতিক পদ্ধতি অনুসরণ করে দেখা যায়, এই গ্যালাক্সিটির z মান ১২.৬। এর অর্থ হলো, এই গ্যালাক্সি থেকে আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে সময় নিয়েছে প্রায় ১৩৩০ কোটি (১৩.৩ বিলিয়ন) বছর। অর্থাৎ, বিগ ব্যাং-এর মাত্র ৪০০ মিলিয়ন বছরের মধ্যেই এই গ্যালাক্সিটির জন্ম হয়েছিল।চিত্র ২-এর ওপরের প্যানেলে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের NIRCam ডিটেক্টরের সাতটি ভিন্ন ফিল্টারে তোলা ছবি লক্ষ্য করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। ৯০০ ন্যানোমিটার থেকে ৪৪৪০ ন্যানোমিটার পর্যন্ত এই ফিল্টারগুলোর মধ্যে ২০০০ ন্যানোমিটারের পরের ছবিগুলোতে (২৭৭০, ৩৫৬০ এবং ৪৪৪০ ন্যানোমিটার) কেন্দ্রে একটি ছোট গ্যালাক্সি দৃশ্যমান। কিন্তু ১৫০০ ন্যানোমিটার বা তার নিচের ফিল্টারগুলোতে এটি সম্পূর্ণ অদৃশ্য। এই অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার কারণই হলো 'লাইম্যান ব্রেক'। বর্ণালীতে এই ব্রেকটিকে নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করেই গ্যালাক্সিটির লাল সরণ ১২.৬ নির্ধারণ করা হয়েছে।হাবল স্পেস টেলিস্কোপ ১৬০০ ন্যানোমিটার পর্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় এটি z = 11-এর বেশি লাল সরণ পরিমাপ করতে পারে না। অন্যদিকে, জেমস ওয়েবের NIRCam ৫০০০ ন্যানোমিটার পর্যন্ত দেখতে সক্ষম, যা তাত্ত্বিকভাবে z = 40 পর্যন্ত লাল সরণ মাপতে পারে।
z = 40 মানে হলো বিগ ব্যাং-এর মাত্র ১০০ থেকে ২০০ মিলিয়ন বছর পরের সময়কাল। বিজ্ঞানীরা আগে ধারণা করেছিলেন যে, এত অল্প সময়ে গ্যালাক্সি তৈরি হওয়া কঠিন এবং চারপাশের নিরপেক্ষ হাইড্রোজেনের কারণে তাদের দেখা পাওয়া অসম্ভব হবে। নক্ষত্রের আলো যখন এই হাইড্রোজেনকে আয়নিত করে ইলেকট্রন মুক্ত করে, কেবল তখনই মহাবিশ্ব স্বচ্ছ হয়। এই আয়নিত হওয়ার পূর্ববর্তী সময়কে বলা হয় অন্ধকার যুগ (Dark Ages)। আগে ভাবা হতো এই প্রক্রিয়া বিগ ব্যাং-এর ৪০০ মিলিয়ন বছর পর শুরু হয়েছে, কিন্তু জেমস ওয়েবের তথ্য বলছে এই আয়নন প্রক্রিয়া আরও অনেক আগেই শুরু হয়েছিল।বর্তমানে জেমস ওয়েবের তথ্যে সর্বোচ্চ ১৬.৭ পর্যন্ত লাল সরণ পাওয়া গেছে। যদি এটি নিশ্চিত হয়, তবে বলতে হবে বিগ ব্যাং-এর মাত্র ৩০০ মিলিয়ন বছরের মধ্যেই মহাবিশ্ব গ্যালাক্সিতে পরিপূর্ণ ছিল এবং তারা অতিবেগুনি রশ্মিতে অত্যন্ত উজ্জ্বল ছিল। তবে এই উচ্চ রেডশিফট নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্কও আছে।
কিছু গবেষকের মতে, আমরা যেটিকে লাইম্যান ব্রেক ভাবছি, তা আসলে দৃশ্যমান তরঙ্গের বামার শোষণ রেখা (৪০০ ন্যানোমিটারের কাছাকাছি) হতে পারে। ধূলিময় গ্যালাক্সিগুলোকে শুধু ইনফ্রারেড তথ্য দিয়ে বিশ্লেষণ করলে অনেক সময় ভুলবশত উচ্চ রেডশিফট (z > 12) মনে হতে পারে। কিন্তু সেগুলোকে মিলিমিটার বেতার তরঙ্গে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় তাদের প্রকৃত রেডশিফট আসলে ৪ থেকে ৬-এর মধ্যে।জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ কেবল দূরবর্তী গ্যালাক্সিই নয়, বরং বহিঃগ্রহের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ, নক্ষত্রের জন্মপ্রক্রিয়া এবং তমোবস্তুর (Dark Matter) অবস্থান নির্ণয়েও বিপ্লব ঘটাচ্ছে। বিজ্ঞানের এই অগ্রগতি পূর্বসূরি হাবল এবং অন্যান্য রেডিও টেলিস্কোপের অর্জনের ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে। জেমস ওয়েবের এই অভাবনীয় সাফল্য মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে আরও বিজ্ঞানমনস্ক করে তুলবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।